ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা

ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা চলছেসীমাহীন যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, পথে পথে নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে মানুষ ফিরছে ফেলে আসা শৈশবস্মৃতিমাখা গ্রামের বাড়িতেবাঙালির বন্ধন হৃদয়-মন-প্রাণ-রক্তেরএ রকম বন্ধন অন্য কোনো জাতির নেইহাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝে একটু সময় পেলেই ছুটে চলে শেকড়ের টানেআর সময়টি যদি ঈদের হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেইঈদে বাড়ি ফেরার কী যে আনন্দ, তা কেবল তারাই জানেন, যারা গ্রামের বাড়িতে পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করেনবাঙালির ঈদের সঙ্গে গ্রামের একটি সেতুবন্ধন রয়েছেঈদ এলেই যেন মনের কোণে বারবার হাতছানি দেয় সেই মেঠো পথ, জমির আল ধরে ধানখেতের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়া, সবুজ গাছের সারি, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-আড্ডা-খেলাধুলা, নদীর পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি আর দল বেঁধে মাছ ধরার স্মৃতিময় দিনগুলোপ্রতিবছর রাজধানী থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজ নিজ গন্তব্যে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের আকাক্সক্ষা যেন কোনো বাধাকেই বাধা মনে করে নাবাসে সিট নেই, ট্রেনের টিকিট নেই, লঞ্চের ছাদ পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড়পথে পথে সীমাহীন কষ্টঅনেককে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কত যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে, তা ভুক্তভোগীরাই কেবল জানেতার পরও গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে পারার আনন্দের কাছে সব কষ্টই ম্লানফলে, ঈদে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের এই কষ্টযাত্রা আর কষ্টের থাকে না, হয়ে ওঠে এক অনন্য আনন্দযাত্রা

কংক্রিটের এই শহরে যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষ ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করতে থাকেবাস্তবতা মেনে ক্ষণিকের জন্য হলেও সে মুক্তি চায়সে বুঝতে পারে, এই যন্ত্রের মতো উদয়াস্ত ছুটে চলা, চারপাশে তারই মতো আরও কিছু যান্ত্রিক মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনোভাবেই আত্মিক নয়সে মনের গহিন গোপনে ফিরে পেতে চায় তার আত্মার আত্মীয়ের সান্নিধ্য

যেখানে একজন মানুষের জন্ম-শৈশব কেটেছে, পরিবার, পূর্বপুরুষের ধারাবাহিক বসবাস রয়েছেতার একটা আকর্ষণ রয়েছে মানুষের কাছেএকটি বাড়ি, কয়েকজন মানুষ, সেই মানুষগুলো ঘিরে তার অস্তিত্ব, যে দিগন্তবিস্তৃত আকাশের দিকে তাকিয়ে তার শৈশবের কল্পনার বিস্তার ঘটেছিল, যেখানে তরুণ বয়সের স্বপ্নগুলো পাখা মেলেছিল, যে গ্রাম, শহরে বা পাড়ায় একজন মানুষের সেই স্বপ্নগুলোকে সত্যি করে তুলবার শক্তি জুগিয়েছে, সেখানে ফিরতে মন টানেসেখানে ফিরে গেলে যেন ফেলে আসা সেই শৈশব, স্মৃতিময় দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার একটা অনুভূতি ফিরে আসে

প্রয়োজনের তাগিদে, চাকরি বা ব্যবসার কারণে মানুষ যেখানে থাকে, সেখানে হয়তো সে একজন নগণ্য ব্যক্তি; কিন্তু নিজের গণ্ডিতে সেই ব্যক্তিই হয়ে ওঠেন বিশেষ একজনসেখানে তার আশ্রয়সে আশ্রয় মনের, আত্মিক আশ্রয়রয়েছে অকপটভাবে নিজেকে প্রকাশের সাবলীল পরিবেশঅসহায় মুহূর্তে বাড়িই যেন আমাদের কাছে শেষ আশ্রয়স্থল

কবি মহাদেব সাহা বলেন, জন্মের জায়গা, জন্মস্থান প্রতিটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ রয়েছেআত্মার স্পর্শ আছেএটা একজন মানুষ আজীবন বহন করে বেড়ায়বাড়ি মানেই তো শৈশব, কৈশোর, গাছপালা, সবুজ মাঠ, বাবা-মা, ভাই-বোন, নদী, পুকুর, খেলার সাথিÑএসব জড়িয়েই তো বাড়িবাড়ি ফেরা মানে, মানুষের তার আপন লোকদের মাঝে ফিরে যাওয়াযাদের সঙ্গে ভদ্রতা, কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতার পরিচয় নয়, তাদের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্কসেই সান্নিধ্যের মধ্যে, মানুষের উষ্ণতার মধ্যে ফিরে যাওয়াযে মানুষদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা অকপটে বলা যায়যাদের সঙ্গে একটি মানুষের বুদ্ধির সম্পর্ক নয়, আবেগের সম্পর্কবাড়ি ফেরা মানে মাটির কাছে যাওয়াএমন জায়গায় যেতে কার না মন চায়! সেই মানুষের কাছে, সেই পরিবেশে ফিরে যেতে মানুষের আকুতি চিরকালীন

ঈদ এলেই মানুষের বাড়ি ফেরার এই তীব্র আকুতি চোখে পড়েঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসস্ট্যান্ডে বা লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে থেকে, নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে মাত্র দুই বা তিন দিনের জন্য বাড়ির পানে ছোটে মানুষঢাকায় প্রতিদিন চাকরি, সংসার, বাজার সামলিয়ে জীবনসংগ্রামে ছুটে চলার পর মন দমে যায়তখন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার চেয়ে গ্রামে গেলেই বেশি ভালো লাগেঅনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, নিজের শৈশব, কৈশোরের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটালে খুব আনন্দ পাইমনে হয়, যেন বয়সটা কমে গেছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আফরোজা হোসেন বলেন, বাঙালিরা চারিত্রিক দিক থেকে খুব আবেগপ্রবণ হয়সে কারণে যেখানে হৃদয়ের টান অনুভব করে, সে কাজটি করবার জন্য মনের তীব্রতা বেড়ে যায় তারএই শেকড়ের টান হচ্ছে নিখাদ আবেগীয় টানতিনি বলেন, তারাই বাড়ি যেতে চায়, যাদের স্বজনরা এখনো বাড়িতে রয়েছেনযাদের ভালোবাসার টান খুব তীব্রযেখানে একটি মানুষ ছোটবেলায় মানুষ হয়েছে, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন রয়েছে, রয়েছে তার স্মৃতিঘেরা স্থানতারাই শহর থেকে গ্রামে ফিরে যায়, ফিরে তার শৈশবে

 

আকাশের গায়ে চাঁদ উঠবে, নিয়ে আসবে আনন্দের বার্তাদিনটি ধনী-গরিব, আশরাফ-আতরাফনির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায়এদিক থেকে ঈদ কেবল আনন্দের বার্তাই নিয়ে আসে না, ইসলামের সাম্যের এক বড় বন্ধন এই ঈদইসলাম ধর্মের দুই ঈদের মধ্যে এক মাস রোজার কারণে ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতি-আয়োজন নজর কাড়েদীর্ঘ এক মাস সংযম পালনআল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় রোজা রেখেছে কোটি মানুষঘরে ঘরে, মসজিদে-মক্তবে করা হয়েছে কোরআন খতমইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি ছিল সবার জন্য নতুন পোশাক-সংস্থানের চেষ্টানিজের আর প্রিয়জনের জন্য সাধ্যমতো পোশাক-আশাক কেনার আনন্দই বা কম কিসের!

 

চাঁদ দেখা গেলে সরকারি ঘোষণার সমান্তরালে বাজবে সাম্যের কবি নজরুলের অমরগাথা-‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ…পাড়া-মহল্লায় মসজিদের মাইকে ভেসে আসবে ঈদ মোবারকধ্বনিজানিয়ে দেওয়া হবে ঈদের জামাতের সময়সূচিঘরে ঘরে শুরু হবে সাধ্যমতো উপাদেয় খাবারের আয়োজনের তোড়জোড়সেমাইয়ের ঈদনামে প্রচলিত এই ঈদে নানা রকম সেমাইয়ের সঙ্গে থাকবে ফিরনি, পিঠা, পায়েস, পোলাও, কোরমাসহ মুখরোচক খাবারের আয়োজনবিশেষ আয়োজন থেকে বাদ যাবে না রোগী, চিকিৎসাধীন বন্দী বা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত কর্মীরাওরোগীদের জন্য হাসপাতালে, এতিমদের জন্য এতিমখানায় ও বন্দীদের জন্য কারাগারগুলোতে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা থাকবেসরকারি শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, ভবঘুরে কল্যাণকেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণকেন্দ্রেও থাকবে খাবার ও বিনোদনের বিশেষ ব্যবস্থাবিনোদনকেন্দ্রগুলোও সাজবে উৎসবের রূপেঈদের আনন্দ আরও বাড়াতে আমাদের দেশের মিডিয়াপাড়ায় থাকে ব্যাপক আয়োজনইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে থাকে ঈদ আনন্দ ম্যাগাজিন, নাটক, টেলিফিল্ম, কনসার্টসহ নানা আয়োজনআর প্রিন্ট ও ওয়েব মিডিয়াগুলো আয়োজন করে বিশেষ বিশেষ ঈদসংখ্যাথাকে সাহিত্য পাতা, গল্প, কবিতা, ঈদের ছড়াসহ নানা আয়োজন

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *