অতিকথনের দায়

কয়েক বছর ধরে আমাদের রাজনীতিকেরা কুকথার স্রোত বইয়ে চলেছেনচলছে বেফাঁস কথার প্রতিযোগিতাভাবটা এমন, কে কাকে ছাপিয়ে যেতে পারেন! জাতীয় সংসদে দেখা গেছে সাংসদেরা একের পর এক বেফাঁস আর অপ্রীতিকর মন্তব্যের ফোয়ারা ছোটাচ্ছেনসংসদের বাইরেও সেই একই অবস্থা! শুধু কথা নয়, অঙ্গভঙ্গিটাও ঠিক মার্জিত, রুচিসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বেমানানসবকিছু দেখে মনে হয়, আমাদের রাজনীতিতে অভিব্যক্তির সংকটও চলছেযেখানে অভিব্যক্তির সংকট, সেখানে গণতন্ত্রের সংকট প্রকট হওয়ার কথাকারণ, গণতন্ত্র তো নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার আগে অন্যের মতটাও ধৈর্য ধরে শুনতে বলেকিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদদের দেখলে মনে পড়ে বিজ্ঞাপনের সেই জিঙ্গেলটা-শুনতে কি পাও…!

না, তারা শুনতে চান নাশুধু বলতে চানকী বলছেন, তা নিজেও বুঝতে চান নাআর যা বলেন, সেটা প্রবল অশিষ্টাচার ছাড়া অন্য কিছু নয়আমাদের রাজনীতিতে সবার ওপরে কথা সত্যকথার ওপরে আর কিছু নেই এবং যে কথাটা বলেন, সেখানে সত্য নয়মিথ্যার দাপাদাপি! তাদের এই সব কথাবার্তা সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলে, সেটা তারা বুঝতে পারেন নাবিশেষ করে, যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন

কিন্তু তার পরও কি কথা বলা থেমে আছেচব্বিশ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেলে নিজের মুখ দেখার আশায় হোক আর অন্য কারণেই হোক কথা তারা বলেই চলেছেনএখন আর টোয়েন্টি ফোর সেভেন নয়; ত্রিশ দিন চব্বিশ ঘণ্টাও নয়বারো মাস ত্রিশ দিন তারা কথা বলছেন দিন-রাত! কিন্তু কী বলছেন তারা! কে কোন কথা বলার অধিকার রাখেন, জানেন নাকোন কথা কার বলা উচিত, ভাবেন না! কোন কথা কোথায় বলা ঠিক, বুঝে উঠতে পারেন না! কোন কথা জনসমক্ষে বলা দরকার আর কোনটা জনান্তিকে, সেটা ভাবার দায় তাদের নেই! কোন কথার অর্থ আছে আর কোন কথা অর্থহীন সেটা জানেন নাজানার চেষ্টা করেন নাঅথচ দিন-রাত কথা বলেই চলেছেন! এই শ্রাবণের বর্ষায় বাংলাদেশের কোন কোন জায়গা প্লাবিত হয়েছে জানি না; কিন্তু বুঝতে পারছি, সংযমের এই রমজান মাসেও কথার প্লাবনে ভাসছে আমাদের রাজনীতির মাঠ!

কথা! নাকি আকথাকুকথা! সেই প্রশ্নটাও উঠে পড়েছেকারণ, যার যা বলার নয়, তিনি তা-ই বলছেনযেভাবে বলছেন, তাতে মনে হবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো অনেক আগেই ডুবে গেছেএখন আমাদের সামাজিকতাও ডুবুডুবুযায় যায়এই রমজানে আমাদের রাজনীতিতে ইফতার সংস্কৃতিচলছেকিন্তু সংযম নেই! ইফতার ঠান্ডা হয়ে যায়; কিন্তু সেখানে গরম কথার ফোয়ারা ছোটে! এসব দেখে শুধু এইটুকু বলতে ইচ্ছে করে, রমজান মাসেও কি আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় আর দর্শনেন্দ্রিয়কে একটু মাফ করতে পারেন না আপনারা!

 না, তারা পারেন নাতাই কথা বলেই যাচ্ছেনহয়তো বলেই যাবেনকারণ, তারা জেনে গেছেন, প্রচারমাধ্যমের এই বৈপ্লবিক যুগে আত্মপ্রচারের সুযোগ হচ্ছে কথা বলাবেশি বেশি কথা বলাবেশি কথা বলা মানে আত্মপ্রচারে বেশি বেশি বোনাসবেশি কথা বললে বেশি বোনাসমোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর ওই বিজ্ঞাপন শুধুই বিজ্ঞাপন কি না বুঝে উঠতে পারি নাকিন্তু রাজনীতিবিদদের বেশি কথা মানে বেশি প্রচার, এটা টের পাচ্ছিসিংক, বাইট, কাট, আনকাট কত নামে আমাদের রাজনীতিবিদদের কথা প্রচার করা হয় এখন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে! তার ওপর আবার টক শোনামক ঘণ্টা খানেকের রাজনৈতিক কমেডি শোও আছে! প্রচারমাধ্যমের এই বিপুল ব্যাপ্তি যেখানে সেখানে তারা কথা বলবেন না কেন? প্রচারমাধ্যমে নিজের উপস্থিতি রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের পথে অনেকের বড় হাতিয়ারসস্তায় আত্মপ্রচারের এই সুযোগ হাতছাড়া করার মতো বোকা কজন আছেন আমাদের রাজনীতিতে? শুধু অত্মপ্রচারের সুযোগ বলছি কেন, অনেকের কাছে এটা বাজিমাতেরও সুযোগঅতএব দিন-রাত কথা চালিয়ে যাওয়াই ভালো

 কিন্তু সেই কথাগুলো কীভাবে বলছেন আমাদের রাজনীতিবিদেরা? তাদের কথার ধরন তো সব জায়গায় একইরাজপথ থেকে সংসদসংসদ থেকে টেলিভিশনকিংবা সভা-সেমিনার-স্মরণসভা-শোকসভা-কোথাও কথা এবং কথা বলার ধরন বা ভঙ্গিতে তো কোনো রকমফের খুঁজে পাওয়া যায় না! অতিকথন আর অপকথনে ভরপুরঅতিকথন হতেই পারেকিন্তু সেটাও হয়ে যায় কুকথনভালো বাক্যের চেয়ে খারাপ বাক্য আর শব্দের প্রয়োগও হচ্ছে বেশিকিন্তু তাতে কার কী এসে যায়এ নিয়ে কারও ভাবারও সময় নেইআবার ভালো কথাও অনেকে বিনা দরকারে বলেই যাচ্ছেনসেখানেও অতিকথন!

কিন্তু মূল কথাটা হচ্ছে প্রচারসবাই প্রচার চাইছেনতাই জনপরিসরে কথা বাড়ছেকথা যত বাড়ছে, তত চড়ছে গলার আওয়াজপড়ছে কথার গুণগত মান! কিন্তু তাতে কী! নিজের বক্তব্য জনসমক্ষে জাহির করাই মূল লক্ষ্যসে কাজটা তারা করেই যাচ্ছেনভালোভাবেই করে যাচ্ছেন বলতে হবেতা না হলে দল আর দলের অনুগতরা হাততালি দিচ্ছেন কেন? অতএব যা বলছি, ঠিক হচ্ছেএই প্রশান্তিতে ভুগছেন আমাদের রাজনীতিবিদেরাআর চালিয়ে যাচ্ছেন অতিকথন

অতিকথনে যুক্তি-তর্ক সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে যায়আর অতিকথক যারা, তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না যা বলছেন তা কি যুক্তি দিয়ে বলছেন? রাজনীতিতে যুক্তিতর্ক থাকবেতর্কশীল মানুষ কথা বলেন যুক্তি দিয়েআর অন্যের কথা শোনেন মনোযোগ দিয়েধৈর্য ধরেকিন্তু অতিকথন এই সব যুক্তি-তর্কের ধার ধারে নাঅতিকথনের প্লাবনে ভাসতে থাকা কথামালা থেকে দু-একটা ফুল তুলে ধরলেই বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবে না; অতিকথনে যুক্তি-তর্কের কী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ!

আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবেআমার কাছে তথ্য আছে!যুব লীগের ইফতার আর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে এমন বিস্ফোরক তথ্য দিলেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তথ্য-প্রযুক্তিবিদ সজীব ওয়াজেদ জয়তিনি রাজনীতিবিদ ননআওয়ামী লীগ নামক দলে তার কোনো পদ-পদবি আছে, তা-ও নয়কিন্তু তিনি আগামী দিনে আওয়ামী লীগের হাল ধরবেন, এমন ধারণা আওয়ামী ঘরানার লোকজনদেরপেশায় তথ্য-প্রযুক্তিবিদ যিনি তার কাছে অনেক তথ্য থাকবেথাকতেই পারেথাকাটাই স্বাভাবিককিন্তু তিনি যা বললেন, সেটা অস্বাভাবিক! আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু হবে, তা-ও নয়কিন্তু জয় যেভাবে কথাটা বলেছেন, সেটা অস্বাভাবিকযুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মানুষটা বিদেশে থেকেই যদি দেশের সব তথ্য জেনে যান, তাহলে সেটাও ভয়ংকর এক ব্যাপার! গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল হয় জনগণের ভোটেভোট দেন ভোটাররা গোপনেআগামী দিনে জনগণ কাকে ক্ষমতায় বসাবেন কিংবা কাকে ক্ষমতা থেকে দূরে ঠেলে দেবেন, সেটা শুধু জনগণই জানেদেশে কোনো প্রাক-ভোট জনজরিপ হয়েছে, তা-ও নয়তাহলে জয়ের কাছে কী তথ্য আছে যে জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে আবার ক্ষমতায় বসাচ্ছেই!

জনগণের মনের খবর জয় কেন, আওয়ামী লীগের কোনো নেতা কি জানতে চাচ্ছেন? কিংবা বোঝার চেষ্টা করছেন! খোদ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নাকি গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পর বিদেশে থেকে ফিরে দলের নেতা-কর্মীদের বলেছেন, ‘হারু পার্টি!সেই হারু পার্টিকে আগামী দিনে জিতিয়ে দেওয়ার মতো কি সঞ্জীবনী সুধা নিয়ে এসেছেন জয়! কীভাবেই বা তিনি বলছেন তার কাছে তথ্য আছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে! যদি তার কাছে কোনো তথ্য থেকেও থাকে, তিনি কি সেটা ওভাবে ইফতার মাহফিলে জনসমক্ষে বলতে পারেন? তার কি বলা উচিত? এতে কি শুধু বিরোধী দলের মনে অবাধ-নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কাটা আরও জোরালো হবে, নাকি জনমনেও একটা ভুল বার্তা পৌঁছে দিলেন জয়জনগণের ভোটের আগাম তথ্য এখনই কীভাবে পেলেন তিনি? তার চেয়েও জোরালো হয়ে উঠছে আর একটা প্রশ্ন, প্রযুক্তিবিদ জয় কোনো প্রযুক্তির খোঁজ পেয়েছেন কি, যাতে ভোটের আগে ভোটের ফলাফল জানা যায়! অতিকথনের এই হচ্ছে বড় দায়!

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *