জবাবটা জরুরি ছিল

জনগণ চায় সুশাসন৷ যদি না পায়, তাহলে চায় পরিবর্তন৷ এই সত্যটা বুঝতে চায় না শাসকগোষ্ঠী৷ আর চায় না বলেই পরিবর্তনের হাওয়ায় ক্ষমতা হারানোর পর নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দাঁড় করানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে হয়! চারটা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর সেই একই চেষ্টা করে গেছেন ক্ষমতা হারানো লোকগুলো এবং তাদের অনুগামীরা৷
কিন্তু তাদের সে চেষ্টা বৃথা এবং ব্যর্থ৷ তাই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিল জনগণ৷ কিন্তু তাতে কি ক্ষমতাসীনদের চিন্তা-চেতনায় কোনো পরিবর্তন হবে? কেন জনগণ প্রত্যাখ্যান করছে ক্ষমতাধরদের, সেটা কি তারা ভেবে দেখেছেন? রাজনৈতিক দোকানে বক্তৃতাবাজি করে বেড়ানো আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার কথায় পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই! নিজেদের ব্যর্থতা, দায়-এসব পাশে সরিয়ে রেখে তারা বলেই যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কারণেই নাকি সিটি নির্বাচনে মহাজোট-সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন! তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হঠাত্‍ বড় নেতা হয়ে যাওয়া লোকগুলোর পক্ষে জনগণের মন বোঝা সত্যিই কঠিন৷ আসলে তারা তো জনগণকে নিয়ে চিন্তা করতে পারেন না৷ করার সময়ও তাদের নেই৷ নিজেদের ক্ষমতা আর দলীয় পদ ধরে রাখার চিন্তায় (পড়ুন; দুশ্চিন্তা) তাদের সময় পার হয়ে যায়৷
এখন তাদের চিন্তার গোড়ায় সার দেওয়ার উপযুক্ত সময়৷ কিন্তু সেই সার দিতে চান না ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদেরা৷ আর তাদেরই বা দোষ কী? আমাদের সমাজে রাজনীতি থেকে শোবার ঘর-সব জায়গায় নিজের মতামতকে অদ্বিতীয় এবং অভ্রান্ত বলে মানা, অন্যের যুক্তিকে অযৌক্তিক বলে খারিজ করে দেওয়ার প্রবণতা প্রবল৷ যেকোনো পরিস্থিতিতে এখানে ‘আমিত্ব’কে প্রতিষ্ঠার একটা চেষ্টা থাকবেই৷ সিটি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও সেই আমিত্ব! ক্ষমতা হারানো মেয়রদের অনেকের কথায়: আমি এই করেছি৷ সেই করেছি…! কিন্তু নেই তিনি কী করেননি৷ নগরের উন্নয়ন দেখা যায়৷ কিন্তু দেখা যায় না সুশাসন৷ তার অভাবটা শুধু উপলব্ধি করা যায়৷ সেই উপলব্ধি থেকেই নগরপিতা বাছতে গিয়ে চার নগরের নাগরিকেরা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন৷ পরিবর্তনের পক্ষে রায় গাজীপুরে প্রথম নগরপিতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও৷
এই রায়ে হতাশ হতেই পারেন সাবেক মেয়ররা৷ অনেক হতাশার মাঝেও তারা একটা সান্ত্বনা খুঁজে পেতে পারেন৷ তার পরাজয়ই শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীর জয়৷ আর জয়ী মেয়রদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে রাখলেন নগরবাসী৷ ইট-পাথর-রড-সিমেন্ট-টাইলস-রঙিন নিয়নবাতির উন্নয়ন-পরবর্তী ভোটের জন্য যথেষ্ট হবে না৷ নাগরিক সেবার পাশাপাশি নগরপিতার কাছ থেকে সুশাসনও পেতে চান তারা৷ জনগণ পরিবর্তন চেয়েছেন৷ কিন্তু নগরপিতারা যদি পরিবর্তনের সেই হাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মেলাতে না পারেন, তাহলে আগামী দিনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হবে৷ নির্মম এই সত্য উপলব্ধি করতে পারলে মঙ্গল৷ কিন্তু আর একটা কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে, জনগণ যে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলেন, তার পেছনে দলীয় রাজনীতিরও একটা বড় ভূমিকা ছিল৷ সেই রাজনীতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রভাব ফেলল৷ যারা জয়ী হয়ে এলেন এবং তারা যে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাকে জনগণ একেবারে লুফে নিয়েছে তা-ও নয়৷ কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অনেক কিছু জনগণ পছন্দ করছে না, সেই বার্তা তারা দিয়ে দিলেন৷ একে কেউ বলছেন ক্ষমতাসীনদের জন্য লাল কার্ড৷ কেউ বলছেন হলুদ কার্ড৷
লাল কার্ড৷ হলুদ কার্ড৷ যে কার্ডই হোক না কেন, জনগণের যে কার্ড দেখানোর ক্ষমতা আছে, আমাদের রাজনীতিবিদেরা সেটা বুঝতে পারছেন, এটা অবশ্য একটা ভালো দিক৷ একে একে পাঁচ-পাঁচটি সিটি করপোরেশনে বিপযর্য়কে ক্ষমতাসীন নেতারা বলছেন সতর্কসংকেত৷ কেউ বলছেন জনগণ হলুদ কার্ড দেখিয়েছে৷ বিরোধী দল বলছে লাল কার্ড৷ যার অর্থ, এদের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই৷ কিন্তু এই চিন্তাও একটু বাড়াবাড়ি৷ জনগণ মেয়রদের ভোট দিয়েছেন সিটি করপোরেশনে বসে জনগণের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য, পার্লামেন্টে যাওয়ার জন্য নয়৷ জনগণ যদি ক্ষমতাসীনদের লাল কার্ড দেখানোর কথা ভাবেন, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে সেটা তারা দেখাবেন৷ তবে এটাও ঠিক, পাঁচটা সিটি করপোরেশনে ক্ষমতাসীনদের পরাজয়কে যদি পাঁচ-পাঁচখানা হলুদ কার্ড ধরে নিই, তাহলে বলতে হবে, বর্তমান সরকার হলুদ রোগাক্রান্ত! রীতিমতো জন্ডিজে ভুগছে! নিয়মশৃঙ্খলা মেনে না চললে এসব রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়৷ ক্ষমতায় বসে অবশ্য নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু ভাবটা টের পাওয়া যায় না৷ বর্তমান ক্ষমতাসীনরাও টের পাচ্ছেন না৷
ভোটে জিতলে আমাদের রাজনীতিবিদেরা একটা কথা প্রায়ই বলেন, ভোট-বিপ্লব ৷ জনগণ ভোট-বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে৷ সেই কথাটা পুনরায় বলার কিছু নেই৷ তবে একটা কথা বলতে হচ্ছে, পাঁচ শহরের নাগরিকেরা সাফ জানিয়ে দিলেন, রাষ্ট্র এবং সরকারের কাছে তারা সুশাসন চান৷ সেটা পাচ্ছেন না বলেই তারা পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন৷ এখানে বিরোধী দলের কোনো কৃতিত্ব আছে বলে মনে হয় না৷ পরিবর্তনকামী মানুষগুলো পরিবর্তনের হাওয়ায় ভেসে নতুন ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে পুরোনো ঠিকানায় নোঙর ফেলেছে৷ তাদের সেই পুরোনো ঠিকানার নাম বিরোধী দল৷ সুতরাং তাদেরও পুলকিত হওয়ার কিছু নেই৷ বরং তাদের জন্যও অন্যরকম এক বার্তা জনগণ দিয়ে যাচ্ছেন৷ দুই-চারটা সিটি নির্বাচনে জিতে স্বপ্নে ক্ষমতায় অবগাহন না করাই ভালো৷
ক্ষমতাসীনদের অপছন্দ করেন আবার ক্ষমতার বাইরে যারা আছেন তাদেরও খুব একটা পছন্দ করেন না, এরকম বিজ্ঞজ্জনেরা জনগণের পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়াকে স্বাগত জানাচ্ছেন৷ কিন্তু এই রোটেশন-পদ্ধতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চান না৷ তারা যে একেবারে নিশ্চুপ বসে আছেন, তা-ও নয়৷ বিদেশি শক্তিতে বলীয়ান ভেবে তাদের কেউ কেউ সরকারকেও হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন৷ তাদের কারও কারও মনোভাব, বিদেশিরা কোলে করে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যাবে কোনো একদিন! যেটা কোনো দিন সম্ভব নয়৷ কারণ, বাংলাদেশে কোনো দিন ‘আরব বসন্ত’ আসবে না৷ এ দেশের মানুষ গরিব হতে পারে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক চেতনা আর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা অনেক প্রবল৷ জনবিচ্ছিন্ন লোকগুলোকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন অন্যরা, আর এ দেশের মানুষ সেটা বসে বসে দেখবেন, তা ভাবার কোনো কারণ নেই৷ এ দেশের জনগণের ইতিহাস সেটা বলে না৷
কিন্তু ইতিহাসের কথা কে মনে রাখে? বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কি ইতিহাস মনে রেখেছেন? রাখলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে এরকম জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন কেন তারা? এই উপমহাদেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে কোনো সরকারই খুব ভালো কিছু করতে পারেনি৷ বরং বিপযর্য়ে পড়েছে৷ দেশকে, দেশের জনগণকে বিপযর্য়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে৷ মহাজোট সরকারের দিকে তাকান৷ আওয়ামী লীগ এখন ‘অপূর্ব একা’৷ জোট-শরিকেরা প্রকাশ্যে একে অপরের হাত ধরে হাঁটলেও জনানত্মিকে অন্য কথাই বলছেন তারা৷ আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তো আগামী দিনে কারাগারে থাকতে হবে না, এই নিশ্চয়তা পেলে এখনই মহাজোট ছেড়ে বিরোধী দলে নাম লেখাতে প্রস্তুত ৷ সুতরাং বন্ধুহীন হয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগছে না আওয়ামী লীগের৷
অবশ্য আওয়ামী লীগের এখন যা অবস্থা, তাতে তাদের আর বাইরের শত্রুর দরকার পড়ছে না৷ আওয়ামী লীগকে জনগণ ভোট দিয়েছিল একটা জনপ্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারের আশায়, যে সরকারের কাছে তারা সুশাসন পাবে, দেশের অর্থনীতির চিত্রটা পাল্টে দেবে৷ গণতন্ত্রের ভিতটাকে মজবুত করবে৷ দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনবে৷ কিন্তু বাস্তবে কী পেল তারা? জনপ্রতিনিধিদের বাইরে রেখে সরকার হয়ে পড়ল দলবাজ সাবেক আর বর্তমান কিছু আমলানির্ভর, যাদের জনগণের কাছে যেতে হবে না ভোটের জন্য৷ তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের আখের গোছাতে৷ এই সরকারের সময় বড় বড় সব কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওই সব আমলা-কাম উপদেষ্টাদের অনেকের নাম৷ পদ্মা সেতু, হল-মার্ক, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে এরাই আবার গলা ফাটিয়ে যাচ্ছেন! শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর সাবেক আমলা-কাম প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের উপহাস করেন! পদ্মা সেতু দুর্নীতির সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর তিনি ছুটিতে যান; কিন্তু পদত্যাগ করেন না! স্বাস্থ্য খাতে একজন মন্ত্রী আর একজন প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও একজন উপদেষ্টা কেন লাগে? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ খুঁজে পায় যখন হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে ওই উপদেষ্টার নাম জড়িয়ে যায়৷ বিদু্ত্‍ এবং জ্বালানি খাতে কেন একজন সাবেক আমলাকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ পেয়ে যায় কুইক রেন্টাল নামক বিদু্যত্‍ কেনাবেচার মধ্যে৷ জনপ্রশাসনকে মেধাহীন করে ফেলা হয়েছে দলবাজি করে৷ যেখানে নেতৃত্বে দলবাজ এক সাবেক আমলা৷ এই সব আমলারা মন্ত্রী হলেও যে তাদের মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন আসে না, তার প্রমাণ ‘নাড়াচাড়া তত্ত্ব’ দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর ‘রাবিশ!’ ‘বোগাস!’ বলতে থাকা অর্থমন্ত্রী৷
বস্তাপচা ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক মনস্ক শাসনব্যবস্থা দেবে আওয়ামী লীগ এবং তার শরিকেরা, এমন আশা থেকেই তো জনগণ ব্যালট বাঙ্ ভরে দিয়েছিলেন বিগত নির্বাচনে৷ কিন্তু কী পেলেন তারা? গণতন্ত্র নয়, একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবমান একটা সরকার দেখলেন তারা৷ যে সরকার জনগণ কেন, নিজের দলের কাছেও জবাবদিহি করে না৷ তাই জনগণ এখন যেখানেই সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানেই জবাব দিচ্ছেন৷ সুশাসনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দাপট দেখিয়ে দুর্বিনীত, বেপরোয়াভাবে সরকার চালাতে চাইলে ফলাফল ৪-০ থেকে ৫-০ হতে বেশি সময় লাগে না৷ আগামী দিনে জাতীয় নির্বাচনে স্কোরলাইনটা কী হতে পারে, পরিবর্তনের হাওয়ায় সেই পূর্বাভাসও পাওয়া যাচ্ছে৷ ক্ষমতাসীনরা কি সেটা টের পাচ্ছেন?

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *