মধুর খোঁজে মৌটুসি

সাহাদত পারভেজ

দুপুরের ফুরফুরে বাতাস৷ তার দোলায় দুলছে রক্তকাঞ্চনের ফুলগুলো৷ ফুলের ওপর বসেছে সুন্দর দুটি পাখি৷ সোনালি রোদের আভা ওদের শরীরজুড়ে৷ গোলাপি ফুলের বুকে ঠোঁট গুঁজে দিয়ে মধু খাচ্ছে৷ বিরতি নেই৷ মধু খেতে গিয়ে মাঝেমধ্যে উলটে পড়ে যাওয়ার জোগাড়, তবু ফুল ছাড়ে না৷ পা দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখে ডাল৷ কৌতূহলী হয়ে গাছের দিকে এগিয়ে যেতেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখা গেল অসংখ্য পাখি৷ আকারে খুব ছোট বলে দূর থেকে ওদের দেখা যায়নি৷

খুব কাছে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটি ভোমরা আলতো করে বসে আছে ফুলের গায়ে৷ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ওদের মিষ্টি গলার গান৷ একটুও জায়গা না বদলে তিরতির করে ডানা ঝাপটাচ্ছে আর উড়ে উড়ে রক্তকাঞ্চনের মধু খাচ্ছে মৌটুসির দল৷ ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাসে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে গেলে দেখা যায় এ রকমের চিত্র৷ বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের অনুপম স্থাপত্যিক নিদর্শন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন৷ ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত এমন জায়গায় পাখি না থেকে কি পারে?

সংসদ ভবনের উত্তর-পশ্চিম কোণের এক সারিতে আছে পাঁচটি রক্তকাঞ্চনের গাছ৷ এদের নিষ্পত্র শাখাজুড়ে ফুলের প্লাবন৷ বসন্তের শুরুতে শাখা-প্রশাখা কিংবা এলোমেলো কাণ্ড ফুলে ফুলে ভরে যায়৷ সেই ফুলে মধু খেতে আসে মৌটুসির ঝাঁক৷ এক ডালে বেশিক্ষণ থাকতে চায় না৷ মধুর লোভে এ ডাল থেকে ও ডাল চষে বেড়ায়৷ সারাক্ষণ মধু খেয়েও যেন তৃপ্তি মেটে না মধুপায়ী মৌটুসির৷ আরও মধুর আশায় উড়ে যায় অন্য গাছে৷ কখনো বা উড়ে বেড়ায় সংসদ ভবনের ওপরের আকাশে৷ মৌটুসিদের দেখে দেখে রক্তকাঞ্চনের গায়ে এসে বসে মধুচুষকি নীলটুনি৷ উড়ে-ঘুরে দিন কাটে মৌটুসি আর নীলটুনিদের৷

আমাদের রূপসী তরুশ্রেণীর মধ্যে রক্তকাঞ্চনের স্থান প্রথম কাতারে৷ পাতার জন্যও কাঞ্চন অনন্য৷ শীতের শেষে পাতাগুলো ঝরে যায়৷ বসন্তে আবার গজায় নতুন পাতা৷ কাঞ্চনের তিনটি জাত৷ সৌন্দর্যে ও রূপ-লাবণ্যে রক্তকাঞ্চন অনেক বেশি আকর্ষণীয়৷ গোলাপি রঙের জন্য এর বেশ সমাদর৷ দুধ-সাদা রঙের শ্বেতকাঞ্চনও ফোটে এই মৌসুমে৷ ফুলগুলো একই রকম, পার্থক্য শুধু রঙে৷ দেবকাঞ্চন ফোটে হেমন্তের শেষে৷ কাঞ্চনগাছ আকারে ছোট থেকে মাঝারি৷ বাকল ধূসর আর অমসৃণ৷ পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে একটির বর্ণবিন্যাস একটু স্বতন্ত্র৷ মৃদু গোলাপি রেখায় চিহ্নিত এই পাপড়ির সঙ্গে কৃষ্ণচূড়ার বেশ মিল৷

মৌটুসির ইংরেজি নাম চঁত্‍ঢ়ষব-ত্‍ঁসঢ়বফ ঝঁহনরত্‍ফ৷ বৈজ্ঞানিক নাম ঘবপঃধত্‍রহরধ ুবুষড়হরপধ৷ বড় চঞ্চল পাখি এরা৷ ছবি তোলাও বেশ কঠিন৷ আর তুললেও তা দেখায় ঘাসফড়িঙের মতো৷ মৌটুসিকে কেউ কেউ আদর করে ডাকেন ফুলটুনি৷ জোড়া ছাড়া চলে না৷ মৌটুসির মাথার ওপরের অংশ জ্বলজ্বলে ধাতব সবুজ৷ চোখ লালচে বাদামি৷ গলার রং বেগুনি৷ পিঠের শেষ ভাগ থেকে লেজ পর্যন্ত ঢাকনি-পালক বেগুনি৷ বুক উজ্জ্বল হলুদ, যা ফিকে হতে হতে পেটে গিয়ে সাদা রং ধারণ করে৷ ঠোঁট সুইয়ের মতো৷ নিম্নমুখী আর বাঁকা৷ লেজ, ঠোঁট ও পা কালো৷ দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০ সেন্টিমিটার৷ ঠোঁট ১ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার এবং লেজ ৩ দশমিক ৩ সেন্টিমিটারের মতো৷

সারা দেশে ব্যাপক হারে মৌটুসি দেখা যায়৷ এরা আমাদের খুবই পরিচিত৷ বলা হয়ে থাকে, এরা নাগরিক পাখি৷ ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত বাসা তৈরি করে৷ উদ্যান, বসতবাড়ির আঙিনার ফুলগাছ কিংবা গাছের নিম্নমুখী ডালে ঝুলন্ত বাসা বানায়৷ সেই বাসা বাতাসে দোলে৷ এদের বাসায় শিমুল তুলা কিংবা তুলাজাতীয় কিছু থাকবেই৷ সাধারণত মেয়ে পাখিরা বাসা বাঁধে৷ পুরুষ পাখিরা কেবল সঙ্গ দেয়৷ ডিম দেয় দুটো৷ ১৫ দিনের মাথায় বাচ্চা ফোটে৷ বাচ্চাদের উড়তে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন৷ এরা মধুসিক্ত যেকোনো ফুল খায়৷ মধু, তাল ও খেজুরের রস এদের খুবই প্রিয়৷

চঞ্চলমতি পাখিটির গলায় অফুরন্ত সুরের কারুকাজ৷ এরা নিজেদের মিষ্টি ধাতব সুরেলা কন্ঠে সাধারণত টিস টিস করে ডাকে৷ বাসা বাঁধার আনন্দে গায় টুইসি টুইসি গান৷ আর বাচ্চাদের খাওয়ানোর সময় ডাকে ফুটসি ফুটসি৷ ডাকগুলো কেবল শোনা যায়, হূদয় দিয়ে অনুভব করা যায়৷ কিন্তু সাধারণ ভাষায় কি এসব কিছু প্রকাশ করা যায়?

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *