রিহ্যাব মেলা খুদেরা সক্রিয়, সাড়া নেই বড়দের

গত মাসের ২৬-২৯ জুন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল রিহ্যাব মেলা৷ মূলত বাজেটে আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ এবং নতুন গ্যাস-সংযোগের সিদ্ধান্তের পর এই মেলার আয়োজন করে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব৷ অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, মেলায় অখ্যাত-খুদে, ভুঁইফোড় অনেক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেলেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অংশই নেয়নি৷ অথচ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড (এইএল), বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড (বিটিআই), শেলটেক, শান্তা প্রপার্টিজ, গ্রীন ডেল্টা হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, এডভান্স, ডমিনো, চারুকার মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে সর্বোচ্চ মানের আবাসন-সুবিধা দিয়ে আসছে৷ রিহ্যাবের ১ হাজার ১৮৫ সদস্যের মধ্যে মেলায় অংশ নিয়েছে মাত্র ১২৩টি প্রতিষ্ঠান৷
উল্লেখ্য, নিজস্ব আয় বাড়াতে আবাসন খাতের নতুন নতুন প্রকল্প তুলে ধরতে এবং গ্রাহকদের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে রিহ্যাব বছরে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মেলার আয়োজন করে৷ মেলায় মূল্য ছাড়ের ঘোষণা, ফ্ল্যাট বা জমি বুকিং দিলেই গাড়ি, এলইডি টিভিসহ নানা দামি উপহারের লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়৷ এ ক্ষেত্রেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধা বা প্যাকেজ থাকে সবচেয়ে ভালো৷ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ না নেওয়ায় মেলা ঘুরতে আসা অনেকেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন৷ স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া মেলা সফল হবে না জেনেও রিহ্যাবের এমন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
রিহ্যাব সহসভাপতি ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জানালেন, যেসব প্রতিষ্ঠান এবার অংশ নেয়নি তারা শীতকালীন মেলায় যোগ দেবে৷ তা ছাড়া জায়গা কম হওয়াতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি৷ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিতে চেয়েছে আর রিহ্যাব তাদের সুযোগ দিতে পারেনি, এই বক্তব্য কেউ কি বিশ্বাস করবে? জানা গেছে, রিহ্যাব তড়িঘড়ি করে মেলার আয়োজন করায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়া দেয়নি৷ তা ছাড়া বর্ষার এই মৌসুমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষ মেলায় কতটা সাড়া দেবে তা নিয়েও বড়দের সংশয় ছিল৷ বিষয়টি রিহ্যাবকে জানানোর পরও তারা মেলার আয়োজন করে৷ এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের চেয়ে রিহ্যাব নিজস্ব আয়ের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মেলায় কারা যোগ দিল বা দিল না তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি সংগঠনটি৷
আবাসন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রূপসী বাংলার উইন্টার গার্ডেনে আয়োজিত মেলায় স্টল বরাদ্দ ফি ধরা হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার আর টেনিস কোর্টে ১ লাখ ৫০ হাজার৷ লক্ষাধিক টাকা খরচ করে স্টল নিলেও চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে ব্যর্থ রিহ্যাব৷ এ ছাড়া স্টল নিয়ে তা সুন্দর করে সাজাতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে৷ অন্যদিকে মেলায় প্রবেশের জন্য দর্শক-ক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট সেলামি নির্ধারণ করাতেও অনেকেই রিহ্যাবের ওপর ক্ষুব্ধ৷ এমনকি এ কারণেই অন্তত দু-তিনটি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা সত্ত্বেও অংশ নেয়নি৷
জানা গেছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক নিয়ে চিন্তিত নয়৷ সার্বিকভাবে আবাসন খাতে মন্দা চললেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছে না৷ কারণ, এখনো যারা ফ্ল্যাট-জমি কিনছে তাদের বেশির ভাগই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রেতা৷ এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা মনে করেন, অনুমোদনহীন, ভুয়া প্রকল্প ও সাইনবোর্ড-সর্বস্ব ভুঁইফোড় অনেক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয়৷ এদের কাছ থেকে ফ্ল্যাট-জমি কিনে গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে প্রচুর৷ এমন অনেক অভিযোগ তাদের কাছে আছে৷ ফলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রিহ্যাব মেলায় অংশ নেওয়ার চেয়ে নিজেরাই আলাদাভাবে নিজেদের পণ্য নিয়ে মেলা আয়োজনে আগ্রহী৷ একক এসব মেলায় লাভ অনেক বেশি বলে মনে করেন তারা৷
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ আবাসন ব্যবসায়ী জানান, যে উদ্দেশ্য নিয়ে রিহ্যাবের যাত্রা শুরু, সংগঠনটি এখন আর সেই অবস্থানে নেই৷ অবিন্যস্ত আয়োজন ও অতিমাত্রায় মুনাফানির্ভরতা এবং অঙ্গীকার সত্ত্বেও কথা না রাখা রিহ্যাব কর্মকর্তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷ অন্যদিকে পণ্য প্রদর্শনের জন্য মেলায় যে জায়গা দেওয়া হয় তা-ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খুবই অপ্রতুল৷ এ কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয় না৷ এদিক থেকে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো থাকে সুবিধাজনক অবস্থানে৷ তাই মেলা নিয়ে তাদের আগ্রহও অনেক বেশি৷
গত কয়েক বছরে রিহ্যাব মেলায় ফ্ল্যাট বিক্রির পরিমাণ খুবই কম৷ আবাসন খাতে মন্দা শুরুর আগে মেলা থেকে পুরো খাতে হাজার কোটি টাকার ওপর অর্ডার পেত ব্যবসায়ীরা৷ মন্দা শুরুর পর মেলায় দর্শনার্থী বাড়লেও বুকিং বা বিক্রি ছিল কম৷ গত শীতকালীন মেলায় মাত্র ৬২০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রির আদেশ পায় ব্যবসায়ীরা৷
অনুত্‍পাদনশীল খাত হিসাবে ঋণদানে নিরুত্‍সাহিতকরণ, ঋণের উচ্চ সুদ, ফ্ল্যাট নিবন্ধনে উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় ও রেকর্ড-সংখ্যক বুকিং বাতিলের ঘটনায় কয়েক বছর ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে নির্মাণ ও আবাসন খাত৷ জমি ও নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে এ বছর নতুন প্রকল্প গ্রহণের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে৷
এ বিষয়ে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী আবাসন খাতে নতুন করে গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার ঘোষণায় উদ্যোক্তারা মেলা আয়োজনের ব্যাপারে উত্‍সাহিত হয়েছেন৷ আবার, প্লট ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও উত্‍সাহিত হবেন৷ বাজেটে আবাসন খাতে টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় খাতটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে৷ এতে ফ্ল্যাট-জমি বিক্রির সরকারের রাজস্বও বাড়বে৷ সব মিলিয়ে আয়োজক হিসেবে রিহ্যাব এই মেলা নিয়ে অনেক আশাবাদী৷ মেলায় গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণেও মেলা কমিটি তত্‍পর৷ কেউ যাতে ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে সে জন্য রিহ্যাবের পাশাপাশি রাজউক থেকেও মেলায় নজরদারি বাড়ানো হয়৷
কিন্তু এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি সংগঠনটি৷

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *