জাতীয় নিবার্চন নিয়ে যত সংশয়

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিবার্চনের পর, দেশের রাজনীতি এখন শুধুই আগামী জাতীয় নিবার্চন নিয়ে। সবর্ত্র একই আলোচনা; কবে হবে, কীভাবে হবে-এই নিবার্চন । তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে নাকি অন্তবর্র্তীকালীন সরকারের ফর্মুলাই বাস্তবায়িত হবে? অবশ্য সরকারি দল চায় অন্তবর্র্তীকালীন সরকারের ফর্মুলার বাস্তবায়ন আর বিরোধী দল চায় তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের বাস্তবায়ন।

 

আগামী নিবার্চন নিয়ে রাজনীতির দোলাচলে নানা হিসাব থাকলেও পর্দার আড়ালে নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্য আগামী নিবার্চনই হতে যাচ্ছে শেষ নিবার্চন । এ কারণে প্রত্যেকেই বিদায়বেলায় ক্ষমতার মসনদ কিংবা সান্নিধ্যের বিষয়টি বেশি বেশি ভাবছেন। দুই নেত্রীর একজন চান ক্ষমতায় টিকে থাকতে; আরেকজন চান ক্ষমতা ফিরে পেতে। আর সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ চান, ক্ষমতায় যেতে না পারলেও ক্ষমতায় ভাগ বসাতে।

 

রাজনীতিতে যখন এই হিসাব-নিকাশ, তখন পাঁচটি সিটি করপোরেশনের ফলাফলে বিএনপি প্রাপ্তির আনন্দে দিশেহারা। আর হারানোর পরও জয়ের নতুন সমীকরণ দিয়ে নিজেদের সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টির সোজা-সাপটা হিসাব, ক্ষমতার অংশীদার না হলেও বিরোধী দলের আসনে বসা। এই হিসাব রাজনীতি-সচেতন প্রতিটি মানুষকে আন্দোলিত করছে।

 

প্রথমে চার সিটি করপোরেশন-খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটে নিবার্চন । তারপর নতুন গঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিবার্চন । রাজনৈতিক মোড়কে অরাজনৈতিক এই নিবার্চন গুলো কেবল সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এলাকার অধিবাসীদেরই আন্দোলিত করেনি; পুরো দেশকেই আন্দোলিত করেছে। এই নিবার্চন গুলো সরকারের টেস্ট কেস আর বিরোধী দলের প্রেস্টিজ ইস্যু মনে হলেও কার্যত এরই মধ্য দিয়ে জাতীয় নিবার্চনের ড্রেস রিহার্সেল হয়ে গেল। পাঁচটি নিবার্চনে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি ও বিরোধী দল-সমর্থিতদের বিশাল বিজয় সরকারকে নতুন ভাবনায় ফেলেছে। বিরোধী দলকে করেছে অনেক বেশি আন্দোলিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সিটি নিবার্চনের ঢেউ জাতীয় রাজনীতির ওপর হামলে পড়েছে। তৈরি করেছে জাতীয় নিবার্চনের স্বপ্নিল আবহ।

 

বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, সিটি করপোরেশন নিবার্চনে জনগণ বিরোধী দলের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে। আর নীরব গণরায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জোরালো হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সিটি নিবার্চনের পর সরকার ক্ষমতায় থাকার নৈতিকতা হারিয়েছে। তিনি অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে জাতীয় নিবার্চন  দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াসহ অনেকেই বলেছেন, কার্যত নিবার্চনে সরকারের বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ হয়েছে।

 

তবে সরকারি দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, হেফাজতসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে অপপ্রচারের কারণে চারটি সিটি নিবার্চনে তাদের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। আর এর সঙ্গে প্রার্থী নিবার্চনে দ্বন্দ্বের বিষয়টি গাজীপুরে পরাজয়কে নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দলের মুখপাত্র ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, সিটি নিবার্চন  থেকে দলকে শিক্ষা নিতে হবে। তবে তারা মনে করেন, এ নিবার্চনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে কোনো রায় আসেনি। বরং বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নিবার্চন  সম্ভব, সেটাই নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে।

 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ কে এম পাটোয়ারী মনে করেন, সিটি করপোরেশন নিবার্চনের পর বিরোধী দল যদি প্রাপ্তির আনন্দে আস্ফালন শুরু করে তবে তা ঠিক হবে না। আবার সরকারি দলকেও জনগণের মনের অভিব্যক্তিকে আমলে নিতে হবে। তিনি বলেন, পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে দু’দল জাতীয় নিবার্চন  ইস্যুতে সমঝোতায় উপনীত না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

 

বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দলীয় নেতা-কর্মীদের আন্দোলনের পাশাপাশি নিবার্চনের প্রস্তুতি নেওয়ার সামপ্রতিক নির্দেশনাকে একটি কৌশলী ঘোষণা বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট স ম রেজাউল করিম। তবে এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন জাসদের কার্যকরী সভাপতি মঈন উদ্দিন খান বাদল এমপি। তিনি বলেন, নিবার্চনের তফসিল ঘোষণা হলে প্রথম দল হিসেবে বিএনপিই তাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে সবার আগে। পিপলস পালস বা জনগণের হৃৎস্পন্দন বুঝতে পেরেছেন বলেই খালেদা জিয়া এমন ঘোষণা দিয়েছেন বলে মনে করেন সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদল।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃঢ় অভিমত, বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও সাবির্ক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী নিবার্চন  জাতীয়ভাবে যেমন নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি দলগুলোর ভেতরে শীর্ষ নেতাদের বিশেষ করে আওয়ামী লীগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার, বিএনপিতে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার ও জাতীয় পার্টিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের এই নিবার্চনে অংশ নেওয়া নিয়েও জোরালো হচ্ছে আলোচনা। শীর্ষ নেতারা প্রত্যেকেই এমনকি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও বেশির ভাগ মনে করেন, আগামী নিবার্চন ই হতে যাচ্ছে এই তিনজনের জন্য শেষ নিবার্চন । আর তাই প্রত্যেকেই চান, এই নিবার্চনের বৈতরণি পেরিয়ে শেষ সময়টা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে।

 

লেখক : হেড অব নিউজ, মাই টিভি

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *