পারিবারিক নিযার্তন রোধে আদালতের দ্বারস্থ হোন

কাজী রুনা

গত ১ জুলাই গুলশানের নিজ বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন টিভি অভিনেত্রী মিতা নূর। তার এই আত্মহত্যার জট এখনো খুলেনি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে স্বামীর পরকীয়া ও নিযার্তনের শিকার হয়ে তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে। এমনকি তার শরীরে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মিতার বান্ধবী অ্যাডভোকেট সায়িকা বলেছেন, মিতার স্বামী শাহনুর রহমান রানা মিতার বোনসহ বিভিন্ন নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন। এ ঘটনায় বাধা দেওয়ায় তাকে বারবার নিযার্তনের শিকার হতে হয়েছে। পারিবারিক নিযার্তনের শিকার হয়ে তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে শতকরা ৫৩ এবং গ্রামাঞ্চলে ৬২ ভাগ নারী এ ধরনের নিযার্তনের শিকার হন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই তাদের পরিবারে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন দ্বারা শারীরিক-মানসিক ও যৌন নিযার্তনের শিকার হন।

 

অথচ এ ধরনের পারিবারিক নিযার্তন প্রতিরোধে দেশে একটি স্পর্শকাতর আইন রয়েছে, যা পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ নামে পরিচিত। এ আইনানুযায়ী, পারিবারিক সহিংসতা বলতে বোঝায় পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা অপর কোনো নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিযার্তন  বা আর্থিক ক্ষতি করা। শারীরিক নিযার্তন বলতে বোঝাবে এমন কোনো কাজ বা আচরণ যা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জীবন, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বা শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইসাথে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে কোনো অপরাধকাজে বাধ্য করতে বলপ্রয়োগ করাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। মানসিক নিযার্তনের মধ্যে পড়বে মৌখিক নিযার্তন, অপমান, অবজ্ঞা, ভীতিপ্রদর্শন বা এমন কোনো কাজ করা যা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ব্যর্ক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং হয়রানি করা অর্থাৎ ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মতামত প্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ করা এর অন্তর্ভুক্ত। যৌন নির্যাতন বলতে যৌন প্রকৃতির এমন আচরণ বোঝাবে যার দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্ভ্রম, সম্মান বা সুনামের ক্ষতি হয়। এ ছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের আদেশে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, সম্পদ ও সম্পত্তি লাভের যতটুকু অধিকারী তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা আর্থিক ক্ষতির শামিল। এ ছাড়া তার মালিকানাধীন যেকোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অনুমতি ব্যতীত হস্তক্ষেপ করা বা বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা দান করা আর্থিক ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত।

 

যেখানে এ ধরনের পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সেখানকার পুলিশ অফিসার, উপজেলা মহিলা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সেবালাভের অধিকারী হবেন এই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। সাধারণত সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রত্যেক উপজেলা, থানা, জেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০-এর অধীনে এক বা একাধিক প্রয়োগকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে থাকে। এই প্রয়োগকারী কর্মকর্তা পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাবলি সম্পর্কে আদালতে বা সংশিস্নষ্ট থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অবহিত করবেন। এ ছাড়া উক্ত প্রয়োগকারী কর্মকর্তা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে বিনা খরচে আইনগত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করবেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্মতির ভিত্তিতে তাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাবেন এবং এ সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তা ও আদালতকে অবহিত করবেন। এ ছাড়া প্রয়োগকারী কর্মকর্তা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পাঠাতে পারেন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আদালতের কাছে পাঠাবেন।

 

বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থা অর্থাৎ ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত কোনো অলাভজনক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান অথবা এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত কোনো অলাভজনক সংস্থা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, যা মহিলা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে, সেসব সংস্থাও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্তকে আইনি সহায়তা দিতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মতির ভিত্তিতে উক্ত সেবা প্রদানকারী সংস্থা নির্ধারিত ফরমে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা লিপিবদ্ধ করবেন এবং আদালত ও প্রয়োগকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। এ ছাড়া সরকার কর্তৃক বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে এসব সংস্থা।

 

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত  ব্যক্তি সংশিস্নষ্ট থানার পুলিশ অফিসার কর্তৃক সব ধরনের আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হবেন, যা আইন ও বিধি দ্বারা নির্ধারিত। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিকারে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার পড়্গে কোনো প্রয়োগকারী কর্মকর্তা বা সেবা প্রদানকারী সংস্থা আদালতের কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করবে। এই আইনের অধীনে আদালত অন্তবর্তীকালীন সুরক্ষার আদেশ দিতে পারেন। যদি আদালতের কাছে উপস্থাপিত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে মনে হয়, প্রতিপক্ষ  কর্তৃক বা তার প্ররোচনায় কোনোরূপ পারিবারিক সহিংসতা ঘটেছে বা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে আদালত এ আদেশ প্রদান করতে পারবেন।

 

অনত্মর্বর্তীকালীন সুরক্ষার  নোটিশপ্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিপক্ষ কে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবেন আদালত। প্রতিপক্ষ এ সময়ের মধ্যে কারণ দর্শাতে না পারলে তার বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষার  আদেশ দেওয়া হয়। আদালতের সুরক্ষা বলবৎ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত  ব্যক্তির বাসস্থানে প্রতিপক্ষের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবেন আদালত। এ সুরক্ষা আদেশ বা এর কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে অপরাধীকে প্রথমবারের মতো ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকবারের জন্য অপরাধী দুই বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ ছাড়া মিথ্যা মামলার জন্য এক বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

 

এ মামলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষেত্রবিশেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর আবেদন করা যাবে। তবে এ ধরনের মামলা আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপিলযোগ্য। সাধারণত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা সিএমএম আদালতে এ মামলা আপিলের বিধান রাখা হয়েছে। আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আঘাত, ভোগান্তি, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির প্রকৃতি এবং পরিমাণ, চিকিৎসা-খরচ, সহিংসতার জন্য ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।

 

পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে এ ধরনের একটি আইন প্রণয়ন একটি মাইলফলক হলেও জনসচেতনতার অভাবে অনেকেই এ আইনটি সম্পর্কে অজ্ঞ। এ ছাড়া আইন বাসত্মবায়নে রয়েছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা। একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে নিয়ে আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রচার না থাকায় সাধারণ মানুষ পারিবারিক সুরক্ষা আইন সম্পর্কে অবহিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োগকারী কর্মকর্তার সহযোগিতা যথাযথভাবে পাওয়া যায় না এবং তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হওয়ায় নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহালও নন। তাই এ আইনের সুফল পেতে সরকারের পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। এ আইনের অধীনে সব ধরনের সুরক্ষার  অধিকার থাকা সত্ত্বেও তারা আইনের আশ্রয়ে না এসে নিযার্তিত হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, যা একেবারেই কাম্য নয়।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *