অনিশ্চয়তায় ডিসিসি নিবার্চন গাজীপুরে বড় ধরনের হোঁচট খেল সরকার

মাহবুব মাসুম

সমপ্রতি ৫ সিটি করপোরেশন নিবার্চনে সরকারি দলের প্রার্থীদের চরম ভরাডুবি দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকেত দেখা দিয়েছে। ভোটের রাজনীতি আসলে এমনই; এক দিনেই যেখানে বদলে যায় সবকিছু। রাজা হয়ে যান প্রজা, প্রজার ভূমিকা নেন রাজা। অসহায়-ক্ষমতাবঞ্চিত মানুষ ব্যালটকেই বেছে নেন জবাবের হাতিয়ার হিসেবে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিবার্চনে ও তেমনটি হয়েছে। পরোড়্গভাবে এই সরকারের প্রতি জনগণ অনাস্থা জানিয়েছেন দেশের সব চেয়ে বড় এই সিটি করপোরেশনের ভোটাররা। এর ফলে কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। এ কারণে জাতীয় নিবার্চন নিয়ে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। আবার এর ঠিক উল্টোটাও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

তবে গাজীপুরের ফলাফল দীর্ঘ দিন থেকে জনপ্রতিনিধিহীন থাকা ডিসিসি নিবার্চনকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। মহাজোটের বড় শরিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এ নিবার্চনকে সরকারের জন্য ১০ নম্বর বিপদসংকেত বলে মনে করছেন।

শেয়ারবাজার ধস, হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের বাড়াবাড়ি, দলের সিনিয়র নেতাদের অবমূল্যায়ন ও সব শেষ হেফাজতের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিফলন ঘটেছে এসব নিবার্চনে, এমন দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। এ দেশের জনগণ যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই রাজনীতিবিদদের সঠিক জবাব দিয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীনরা বরাবরই জনগণকে বোকা মনে করে আসছেন।

সিলেট, রাজশাহী, খুলনা আর বরিশাল সিটি করপোরেশন নিবার্চনে পরাজয়ের পর গাজীপুরের নিবার্চনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল ও জোট। নিয়োগ করা হয়েছিল সবর্শক্তি। আর আত্মবিশ্বাসের সূত্রও খোলাসা করেছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ। বলেছিলেন, গাজীপুর রাজশাহী আর বরিশাল নয়। গোপালগঞ্জের পর গাজীপুরেই আওয়ামী লীগের সমর্থন সবচেয়ে বেশি। আর তাই গোপালগঞ্জের পরই আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয় গাজীপুরকে। কিন্তু আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দুর্গের ভাঙন ঠেকাতে পারেনি দেশের সবচেয়ে প্রবীণ এই দল। এদিকে নিবার্চনকালীন সময়জুড়েই ছিল এরশাদ-নাটক। দোয়া করা আর দোয়া নেওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন প্রধান দুই প্রার্থী ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তবে নিবার্চনের ঠিক আগ মুহূর্তে সমর্থন দেন মহাজোট-সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাকে।

গাজীপুরের নিবার্চনে  এরশাদকেও হয়তো একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে জনগণ।

এবার হবে তো ঢাকা সিটি নিবার্চন?

একের পর এক সিটি করপোরেশন নিবার্চনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের চরম ভরাডুবির কারণে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। টানা পরাজয়ে হাবুডুবু খাওয়া সরকারি দল কি শেষ মুহূর্তে ঢাকা সিটি করপোরেশন নিবার্চন হতে দেবে, না মুলা ঝুলিয়ে রাখবে জাতীয় নিবার্চন পযর্ন্ত? জাতীয় নিবার্চনের আগে খুদ রাজধানীতে হয়তো আর ঝুঁকি নিতে চাইবে না ক্ষমতাসীন দল।

প্রচণ্ড ইমেজসংকটে থাকা দলটিকে সামপ্রতিক সময়ের ৫ সিটি নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা ভাবিয়ে তুলেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নিবার্চনের আগাম সংকেত ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে দলটি। ঠিক এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকারের ঢাকা সিটি করপোরেশন নিবার্চন আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল বলে মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘ ৬ বছরের বেশি সময় ধরে নিবার্চনবিহীন অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির সেবাকাযর্ক্রম।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকার এ মুহূর্তে কোনোভাবেই চায় না এ নিবার্চন করতে। এর চেয়ে প্রশাসক দিয়ে কাজ চালানোকেই সুবিধাজনক বলে মনে করছে সরকার। তাই এ দুই সিটিতে সহসা নিবার্চন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গত বছরের ২৯ এপ্রিল ঢাকাকে দুই ভাগ করে সিটি নিবার্চনের তফসিল ঘোষণা করে নিবার্চন কমিশন। কিন্তু ভোটার তালিকা হালনাগাদ আর সীমানা পুনর্নির্ধারণ-জটিলতায় হাইকোর্টের আদেশে আটকে যায় ডিসিসি নিবার্চন । সবর্শেষ আদালত এ নিবার্চনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও জটিলতা কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না।

এদিকে বিরোধপূর্ণ সুলতানগঞ্জ ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনভুক্ত করা হলেও ওয়ার্ডভুক্ত করা হয়নি। ফলে এ অবস্থায় পুনঃ তফসিল ঘোষণা করলে আবার আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে নিবার্চনের সময় নিচ্ছে (ইসি)। প্রধান নিবার্চন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ যদিও বলছেন, রমজানের পরই বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নিবার্চনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এর আগে নিবার্চন নিয়ে চলমান সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করেন প্রধান নিবার্চন কমিশনার।

নিবার্চন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নিবার্চন কমিশন কয়েক দফায় নিবার্চন করার উদ্যোগ নিলেও সরকার থেকে কোনো ধরনের সায় পাচ্ছেন না। নিবার্চন কমিশন ইতোমধ্যে দুটি সিটি করপোরেশনের ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজও শেষ করেছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ ও সময় বিচিত্রাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা সিটি করপোরেশন নিবার্চনের সম্ভাবনা অনেকটা কমে গেছে। এই মুহূর্তে সরকার ভুলেও এদিকে পা বাড়াবে না। তবে জনগণের  স্বার্থে দ্রুত এ নিবার্চন সম্পন্ন করা দরকার বলে মনে করেন নগরবাসী। দীর্ঘ ১১ বছর আগে ২০০২ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা সিটি করপোরেশন নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৭ সালের মে মাসে মেয়াদ শেষ হলে প্রশাসকের মাধ্যমে অনিবার্চিত ব্যক্তিদের দিয়ে কোনো রকমে চলছে সিটি করপোরেশনের সেবাকাযর্ক্রম।

 

 

জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে সরকার

সাদেক হোসেন খোকা

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ও সময় বিচিত্রাকে বলেন, জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে সরকার। তাই নিবার্চনে পরাজয়ের ভয়ে ডিসিসি নিবার্চন বছরের পর বছর নানা অজুহাতে ঝুলিয়ে রেখেছে। সমপ্রতি ৫টি সিটি নিবার্চনে পরাজয়ের পর সরকার আরও দিশেহারা হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক এই মেয়র। তিনি বলেন, এখন আর তারা নিবার্চন দেবে না। এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ও আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না বিধায় স্থানীয় সরকারের এ নিবার্চন দিচ্ছে না। এ নিবার্চন নিয়ে পুতুলের ভূমিকায় রয়েছে নিবার্চন কমিশন। কারণ, সরকারের আজ্ঞাবহ এই কমিশন সরকারের নির্দেশ ছাড়া নিবার্চন করতে সাহস পাবে না। তার পরও আমি মনে করি, জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে শিগগির এ নিবার্চন দেওয়া উচিত।

 

আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ও নিবার্চনমুখী দল

সাঈদ খোকন

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকন ও সময় বিচিত্রাকে বলেন, জনগণের সমস্যার কথা বিবেচনা করে ডিসিসি নিবার্চন দ্রুত দেওয়া উচিত। বিভিন্ন কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ সিটি নিবার্চন বারবার হোঁচট খাচ্ছে বলে জানান ঢাকার সাবেক সফল মেয়র মরহুম মোহাম্মদ হানিফ-তনয় তরুণ প্রজন্মের এই নেতা। ডিসিসি নিবার্চন না হওয়ায় জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। সাঈদ খোকন বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের দল। তাই জনগণের কল্যাণে সব সমস্যা সমাধান করে দ্রুততর সময়ের মধ্যে এই নিবার্চন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকার আসলে নিবার্চন করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেন, যতটুকু জানি, স্থানীয় সরকার বিভাগ নিবার্চন করার জন্য নিবার্চন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। কিন্তু কী কারণে নিবার্চন হচ্ছে না তার সঠিক জবাব কারোর কাছে পাওয়া যায়নি। কমিশন দুষছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে, আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুষছে কমিশনকে। আসলে গোলকধাঁধার মধ্যে রয়েছে এ নিবার্চন। সাঈদ খোকন বলেন, আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ও নিবার্চনমুখী দল। তাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন এই সরকার সঠিক সময়েই ঢাকা সিটি করপোরেশনের নিবার্চন করবে।

ড. তুহিন মালিক

ঢাকা সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. তুহিন মালিক ও সময় বিচিত্রাকে বলেন, সরকার ডিসিসি নিবার্চন নিয়ে নানা টালবাহানা করছে। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রে বিশ্বাস ও জনগণের ওপর আস্থা থাকলে এ নিবার্চন অনেক আগেই দিয়ে দিত। জনবিচ্ছিন্ন এ দল এখন পরাজয়ের ভয়ে ডিসিসি নিবার্চন দিতে চাচ্ছে না বলে দাবি করেন ড. তুহিন মালিক। ডিসিসি নিবার্চন না হওয়ায় দীর্ঘ দিন থেকে নগরবাসী সেবাবঞ্চিত হয়ে আসছেন বলে ক্ষোভ জানান তিনি। অবর্ণনীয় দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাজধানীবাসী অভিভাবকহীন অবস্থায় আর থাকতে চায় না। সরকার উপলব্ধি করতে না পারলেও নিবার্চন কমিশনকে অত এটি উপলব্ধি করা উচিত বলে মনে করেন তুহিন মালিক। তিনি বলেন, নগরবাসীর উন্নয়নে নিবর্চিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প নেই।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *