ফতোয়া মানতে কাউকে বাধ্য করা যায় না

স্বপ্নহারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে সেদিনই, যেদিন তিনি ধর্ষিত হলেন। কার্তিক মাসের নির্জন এক দুপুরে মাঠে একা পেয়ে তাকে ধর্ষণ করে তারই এলাকার ছেলে শফিকুল ইসলাম। বছর না ঘুরতেই ধর্ষিত স্বপ্নহার যখন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করলেন, তখন তিনি জগতের সবচেয়ে অসহায় ও বিব্রত নারী। কেননা, একটি অবৈধ সন্তান প্রসবের জন্য তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন স্থানীয় মাওলানা ফজলুল হক। স্থানীয় মাওলানা তাকে জেনা করার অপরাধে একশো দোররা মারার ফতোয়া দেন। পরবর্তী সময়ে পত্রপত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলে এ ফতোয়া থেকে রেহাই পান স্বপ্নহার।

 

নোয়াখালীর আরেক মেয়ের নাম দুলালী বেগম। অবৈধ সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধেও ১০১টি বেত্রাঘাত দেওয়ার ফতোয়া দেওয়া হয়। কন্যাসন্তান প্রসবের সাত দিনের মধ্যে এ ফতোয়া কাযর্কর করার সিদ্ধান্ত দেন স্থানীয় মাওলানারা।

 

ধর্মের নামে এরকম হাজারো ফতোয়া জারি করেন ধর্মান্ধরা। নারীকে ঘিরে এখনো যে মধ্যযুগের অন্ধকার স্তূপ হয়ে আছে এ দেশে, তার প্রমাণ এসব ফতোয়া জারির মধ্য দিয়ে। অথচ ফতোয়া কোনো আইন নয়; আমাদের দেশে এমন কোনো আইনের প্রচলনও নেই। বরং নারী ও শিশু নিযার্তন দমন (সংশোধন) আইন ২০০৩ অনুযায়ী নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো সহিংস ঘটনা অপরাধের শামিল। সে অর্থে নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো ফতোয়া জারি ও কাযর্কর করা অবশ্যই একটি আমলযোগ্য অপরাধ। কিন্তু নারী ও শিশু নিযার্তন দমন আইনের ১৩ নং ধারা অনুযায়ী, কোনো নারী যদি ধর্ষিত হওয়ার পর সন্তানসম্ভবা হন, তাহলে ওই সন্ত্মানের যাবতীয় খরচ বহন করবে রাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ধর্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের খরচ রাষ্ট্র আদায় করতে পারবে। কিন্তু একশ্রেণীর ধর্মান্ধ মাওলানা বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে দরিদ্র, অসহায় নারীদের ওপর নানা ধরনের ফতোয়াবাজি করে চলেছেন। এদের মধ্যে কাউকে করা হয় বেত্রাঘাত, কাউকে ভিটেছাড়া করা হয়, আবার কোনো কোনো অসহায় নারী অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। হিল্লা বিয়ের মাধ্যমে ফতোয়ার বেশি অপব্যবহার হচ্ছে।

 

ফতোয়া কী? ফতোয়া শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ইসলাম ধর্ম শাস্ত্রসংবলিত রায়। যারা সেই রায় ঘোষণা করেন, তাদের বলা হয় ফতোয়াবাজ। ফতোয়াবাজি আমাদের দেশে নতুন নয়। অনেক আগে থেকে এটি প্রচলিত। এটি চলত প্রধানত দু’ভাগে। ইসলাম ধর্মে মতাদর্শগতভাবে যে শ্রেণীভেদ রয়েছে, তারই একশ্রেণী আরেক শ্রেণীর বিরুদ্ধে। আরেকটি হলো গ্রামের মাতব্বর শ্রেণী নিজেদের স্বার্থে মাওলানাদের সহায়তা গ্রহণ করতেন তালাকের ফতোয়া আদায়ের জন্য। অন্যভাবে বলা যায়, ফতোয়া বলতে বোঝায় ইসলাম ধর্মসংক্রান্ত কিংবা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দেওয়ানি বিষয়সংক্রান্ত আইনগত মতামত। এরকম মত যারা দেন, তাদের বলা হয় মুফতি। ধর্মশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানুষ তারা। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শুধু ইসলামেই নয়, রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টীয় যাজকতন্ত্রে, হিন্দুধর্মসহ প্রায় সব ধর্মেই ছিল। ইসলাম ইতিহাসের প্রথম যুগে এসব মুফতির দায়িত্ব সীমাবদ্ধ ছিল আইনসংক্রান্ত মীমাংসা দেওয়ায়। তবে বিচারের ভার ন্যস্ত থাকত কাজির ওপর। ধীরে ধীরে মুফতির ওপর দায়িত্ব বর্তায় কেবল ধর্মীয় প্রশ্নের মীমাংসা করা। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ফতোয়া কমিটি আছে। যেমন ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান, মরক্কো, মালয়েশিয়া, মিসর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সুদান। বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র বা ব্যক্তিবিশেষ অনুরোধ করলেই কেবল এই কমিটি মতামত প্রদান করে।

 

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় আইন-আদালতকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছেমতো ইসলামের বিধান ব্যাখ্যা করে তা চাপিয়ে দিচ্ছেন অন্যের ওপর। এখন শহরে নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মুরতাদ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হচ্ছে। আর গ্রামাঞ্চলে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এনে নিম্নবিত্ত মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের ওপর করা হচ্ছে নানা শারীরিক নিযার্তন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফতোয়া শুধু মানুষের বিরুদ্ধে নয়, দেওয়া হচ্ছে এনজিওর বিরুদ্ধে, পাঠ্যপুস্তকের বিরুদ্ধে, এমনকি তুঁতগাছের বিরুদ্ধেও।

 

২০১১ সালের ১২ মে ফতোয়া নিয়ে দেওয়া এক রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেওয়া যেতে পারে। যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তিরা ফতোয়া দিতে পারেন। তবে তা মানতে বাধ্য করা যাবে না। শারীরিক ও মানসিক কোনো ধরনের শাস্তিও দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, এমন কোনো ধরনের ফতোয়া দেওয়া যাবে না। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এ রায় দেন।

 

ফতোয়া নিয়ে এ রায়ের এক দশকের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১০ বছর আগে হাইকোর্ট ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন ২০০১ সালে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে কয়েক দফা পর্যবেক্ষণ দিয়ে আপিল বিভাগ রায় দেন ২০১১ সালে। ২০০০ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার কীর্তিপুর ইউনিয়নের আতিথা গ্রামের এক গৃহবধূকে ফতোয়া দিয়ে হিল্লা বিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়। এটা আদালতের নজরে এলে বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। এতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং নারীনেত্রী মালেকা বেগমসহ অন্যরা পক্ষভুক্ত হন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি হাইকোর্ট ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে রায় দেন। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের একমাত্র আদালতই মুসলিম বা অন্য কোনো আইন অনুযায়ী আইনসংক্রান্ত কোনো প্রশ্নে মতামত দিতে পারে। কেউ ফতোয়া দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হবে। এ ছাড়া সব মসজিদের ইমামকে জুমার নামাজের খুতবায় ও স্কুলে এবং মাদ্রাসায় মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা করারও সুপারিশ করা হয়। রায়ের বিরুদ্ধে মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওই বছরই আপিল করেন।

 

দেশের সবোর্চ্চ আদালতের রায়ে ফতোয়া মেনে নেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির স্বেচ্ছানির্ভর বলা হলেও এখনো ফতোয়া দিয়েই যাচ্ছে ধর্মান্ধরা। এ যেন চোরে শুনে না ধর্মের কাহিনি!

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *