বিস্মৃতির সঙ্গে স্মৃতির লড়াই

তাহলে কি স্মৃতি-আতঙ্কে ভুগছেন আমাদের রাজনীতিবিদেরা? না হলে স্মৃতিকে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা কেন তাদের? জনগণের স্মৃতিশক্তি না হয় খুব দুবর্ল, কিন্তু রাজনীতিবিদদের স্মৃতি এত দুবর্ল হবে কেন? অবশ্য তাদের কথাবার্তায় স্মৃতির পুনরুজ্জীবনের একটা চেষ্টা আছে। যে চেষ্টার সময় তারা ভুলে যাচ্ছেন তাদের কিছু স্মৃতি জনগণ ভুলে যায়নি। জনগণের স্মৃতিশক্তি খুব দুবর্ল। তাই আমাদের রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ইচ্ছামতো স্মৃতিজাগানিয়া কথাবার্তা বলে যেতে পারছেন। ভঙ্গুর করে রাখতে পারছেন আমাদের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে। অথচ এই গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের কত বেদনা আর উচ্ছ্বাসের স্মৃতি! এ দেশের মানুষ এখনো সেই স্মৃতি জাগরূক রাখতে উৎসুক। তাই এখনো আমরা অহংকার করি আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কারণ, গণতন্ত্রের জন্য আমাদের লড়াই তো স্বাধীনতার লড়াইয়েরও আগের। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া আমাদের রক্তস্নাত স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতার পর আমাদের গণতন্ত্রও রক্তভেজা। দুবর্ল স্মৃতিশক্তি নিয়েও আমরা ভুলতে চাই না রক্তভেজা সেই সব গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের কথা। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদেরা! তারা যে দিব্যি ভুলিয়ে দিতে চান আমাদের সেই সব স্মৃতি!

আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল হলো নব্বই দশকের গোড়ায়। মুক্তি পেল আমাদের গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের মুক্তি নিয়ে আমাদের কী উচ্ছ্বাস! আমরা ভাবতে শুরু করলাম, স্বৈরাচারের সঙ্গে লড়াইয়ে গণতন্ত্র জয়ী। এক ব্যক্তির শাসনব্যবস্থা থেকে আমার ফিরলাম সংসদীয় গণতন্ত্রে। স্বপ্ন দেখতে শুরু  করলাম, এবার আমাদের গণতন্ত্র হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠবে। কারণ, সব রাজনৈতিক জোট মত-পথ ভুলে সংসদীয় গণতন্ত্রকেই সুসংহত করতে চাইল। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার সেই স্মৃতি ভুলতে চাইলেও কি আপনি ভুলতে পারবেন? বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াত-সবাই সংসদীয় গণতন্ত্র চাইল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এরা কেউ গণতন্ত্রকে লালন করার দায়িত্ব নিল না! তাই সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর প্রায় দুই যুগ পার করেও আমাদের গণতন্ত্র ‘অপুষ্টিতে’ ভুগছে! আর স্বৈরাচার মিটমিট করে হাসছে! গণতন্ত্রের সেই লড়াইকে বিস্মরণের অতলে তলিয়ে দিতে তিনিও মাঝেমধ্যে গণতন্ত্রের ছবক দিচ্ছেন! কারণ, গণতন্ত্রের হেফাজতের দায়িত্ব যাদের, তারা দায়িত্বটা ঠিকমতো পালন করেননি। পালন করার ইচ্ছাও দেখাচ্ছেন না। তারাও জনগণকে বিস্মরণের অতলে ডুবিয়ে দিতে চান। কিন্তু জনগণ যদি স্মৃতির মধ্যে উঁকি দেন, তাহলে দেখবেন, আমাদের রাজনীতিকেরা কত অনায়াসে ভুলে যেতে পারেন তাদের পুরোনো কথাবার্তাগুলো! আমাদের রাজনীতির মাঠে এখন লড়াই ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা’ বনাম ‘অন্তবর্তীকালীন সরকার-ব্যবস্থা’ নিয়ে। এখানে যদি কোনো ওয়াকওভার হয়, তাহলে স্ট্যান্ডবাই হিসেবে আছে-‘ নিবার্চনকালীন সরকার-ব্যবস্থা’। রাজনীতির মাঠে এসব ব্যবস্থা কেন আজ? থাকার কথা তো ছিল শুধু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

একটু স্মৃতি হাতড়ে দেখুন; গণতন্ত্র মুক্তি পাওয়ার পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হোঁচট খেলো নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে। এক মাগুরা উপনিবার্চনের গর্ভে জন্ম নিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার দাবি। তারপর আবার সেই আন্দোলন। সেই সময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ-জামায়াত-জাতীয় পার্টি মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার আন্দোলন চালাল। তাদের যুক্তি ছিল, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু নিবার্চন সম্ভব নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হলো, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। শেষ পযন্ত হরতাল-অবরোধ-অবস্থান কর্মসূচির মধ্যে অনেক আর্থিক ক্ষতি আর প্রাণহানির পর বিএনপি সরকার মেনে নিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থাকে আওয়ামী লীগ দাবি করত তাদের আন্দোলনের ফসল। পর পর গোটা তিনেক নির্বাচন হলো সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর সংসদ নিবার্চনে জিতে ক্ষমতায় এসেই বাতিল করল সেই ব্যবস্থা। এর পর আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট। তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা ছাড়া নিরপেক্ষ নিবার্চন সম্ভব নয়! তাহলে সেই সময় ভুলটা কার ছিল, আওয়ামী লীগ না বিএনপির? বিএনপি এখন যখন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে, তখন কি তাদের স্মৃতিতে ‘৯৬-এর আগে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা ভেসে ওঠে? মনে কি প্রশ্ন জাগে, পাগল আর শিশু ছাড়া নিরপেক্ষ লোক এই সমাজে আছে? আসলে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চান না কেউ। সবাই প্রশ্ন করতে চান। প্রশ্ন রাখতে চান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এখন প্রায়ই বলেন, বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নন। তিনি কি সেই পাগল আর শিশুদের নিয়ে গড়া সরকারের অধীনে নিবার্চন চান? তিনি কি ফিরে যেতে চান মঈনউদ্দীন-ফখরুদ্দীন-ইয়াজউদ্দীনের জামানায়? প্রধানমন্ত্রীর মুখে প্রশ্নগুলো শুনতে খারাপ লাগে না। টেলিভিশনের পর্দায় সেটা দেখতেও খুব খারাপ লাগে না। কিন্তু খারাপ লাগে ভাবতে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিশক্তি কি এতই দুবর্ল! দুবর্ল যদি না হবে তাহলে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে ভুলে যান, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তিনি নিজে একসময় আন্দোলন করেছেন। তার আন্দোলনের বলি হয়েছে কিছু প্রাণ। ক্ষতি হয়েছিল কত রাষ্ট্রীয় সম্পদের! তার নিজের দাবি অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা তাদের আন্দোলনের ফসল। এখন ক্ষমতার জোরে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে, সেটাকে বাতিল করা হলো। ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আদালতের রায়। বলা হচ্ছে, গণতন্ত্রেও ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। কোথাও না কোথাও থেকে সেটা শুরু  করতে হবে। ভালো কথা। কিন্তু এখন যদি জনগণ প্রশ্ন করে, এতই যদি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার কথা ভাবেন, তাহলে সেদিন আন্দোলন করেছিলেন কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার জন্য? তখন গণতান্ত্রিক চেতনা আর তার ধারাবাহিকতার বোধটা কোথায় ছিল? এখন রাজনীতিবিদদের বাইরে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন, তাদের সমালোচনায় শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, তার দলের নেতানেত্রী সবাই। এবং সেই সমালোচনাটা একেবারে রুচিহীন পর্যায়ে চলে গেছে ব্যক্তিগত আক্রমণে! প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, ‘সুশীল সমাজের যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন, তারা তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থেকে একটা নিবার্চন পযর্ন্ত করতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করে চলে এসেছিলেন।’ ভালো কথা। কিন্তু কখনো কি মনে হয় না, তাদের ব্যর্থতাই ছিল আপনাদের সাফল্যের ভিত্তি। সেই সময় ড. আকবর আলি খান, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সফি সামি, লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী ২০০৭ সাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ, তারা মনে করেছিলেন, ইয়াজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নিবার্চন করা সম্ভব নয়। তারা তো পদত্যাগ করেছিলেন বিবেকের তাড়নায়। ক্ষমতার লিপ্সায় নয়। আর তারা পদত্যাগ করেছিলেন বলেই ২২ জানুয়ারির নিবার্চন সম্ভব হয়নি। আর সেই নিবার্চন হয়নি বলেই আজকের প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল ক্ষমতায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেদিন যারা পদত্যাগ করেছিলেন, আজ তাদের নিয়ে রসিকতা করেন প্রধানমন্ত্রী! আসলে এটা আমাদের রাজনীতির বড় রসিকতা; প্রধানমন্ত্রী নিজেই ভুলে গেছেন, সেদিন ওই চার উপদেষ্টার পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়েছিল তার দল আর জোট। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক মরহুম আব্দুল জলিল ওই চার উপদেষ্টাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন। এরপর ইয়াজউদ্দীন-মঈনউদ্দীন-ফকরুদ্দীনের যে সরকার গঠিত হলো, তাকে স্বাগত জানাতে আজকের প্রধানমন্ত্রী দলবল নিয়েই বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন ফখরুদ্দীনের শপথ অনুষ্ঠানে। শপথ-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছিলেন, ‘এই সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল।’ আর সেই সরকারের অধীনে নিবার্চন করেই তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এত তাড়াতাড়ি স্মৃতিভ্রম ঘটল আওয়ামী লীগ নেতাদের! তত্ত্বাবধায়ক সরকার, অন্তবর্তীকালীন সরকার, নির্বাচনকালীন সরকার-এর যেকোনো একটা ছাড়া নিবার্চন হবে না, এটা সরকারি দল, বিরোধী দল-দুপক্ষেরই জানা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মেনে নেওয়া। আর মেনে নেওয়ার কথা যখন উঠছে, তখনই আমাদের রাজনীতিবিদদের স্মৃতিতে অনেক কিছু উঁকি দিচ্ছে। সেটা তারা প্রকাশ করছেন না। এবং সেটা স্ট্র্যাটেজির কারণে। রাজনীতিও একটা বড় মাইন্ড গেম। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামে কোনো সরকারের অধীনে নিবার্চন হলে বিএনপি জনগণের কাছে বার্তা দিতে চাইবে তাদের আন্দোলনে সরকার বাধ্য হয়েছে ওই ব্যবস্থায় ফিরতে। এটা তাদের আন্দোলনের ফসল। এটা তাদের নৈতিক জয়। আর সরকারও চাইছে জনগণকে সেই নৈতিক জয়ের বার্তা দিতে। বিরোধী দল আন্দোলন-সংগ্রাম করে কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। তাই নিবার্চনকালীন সরকারের অধীনেই তারা নিবার্চন করছে। এটা আওয়ামী লীগ এবং তার জোটের নৈতিক জয়। অতীতের নিবার্চনী ফলাফলও বলে, নৈতিক জয় একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটের মাঠে। এবারও শেষ পযর্ন্ত নৈতিক জয় যারই হোক, তাতে কি জিতবে আমাদের গণতন্ত্র? ভোটের লড়াইয়ে যারাই জিতুক, তাতে জনগণের কি কোনো জয় হবে? নাকি জনগণকে বিস্মৃতির সঙ্গে স্মৃতির লড়াই চালিয়ে যেতে হবে? বিস্মৃতি বনাম স্মৃতির লড়াই মানে তো স্বৈরাচার বনাম গণতন্ত্রের লড়াইয়ের রকমফের।

 

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *