আশার গোলপোস্ট কত দূরে!

একসময় ঢাকায় মোহামেডান-আবাহনীর মধ্যে খুব উত্তেজনাকর ম্যাচ হতো। যারা ফুটবল খেলা দেখতে পছন্দ করতেন বা ভালোবাসতেন তাদের এসব শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ দেখতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। কখনো প্রিয় দল এগিয়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে সমতা ফিরে আসত; কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার পিছিয়েও পড়ত। অবস্থা এমন দাঁড়াত, এই বুঝি মনে হতো জিতে যাচ্ছি; আবার এই মনে হতো, না, হেরে যাচ্ছি। ধান ভানতে শিবের গীতের মতো প্রসঙ্গটি টানার একটি কারণ আছে। গত চার-পাঁচ মাস ধরে যে রাজনৈতিক সংঘাত আর সহিংসতা তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য কয়েক দফায় আশার আলো দেখা গিয়েছিল। দুই নেত্রীর চায়ের দাওয়াত আর সংলাপের পথ খোলা-দুই দলের রাজনীতিবিদদের এমন মন্তব্যে এ দেশের মানুষের অবস্থাও এখন মোহামেডান-আবাহনীর সেই শ্বাসরুদ্ধকর  ম্যাচগুলোর দর্শকদের মতো। কখনো আমরা হতাশ হয়ে পড়ি তো আবার কখনো ট্যানেলের শেষ প্রান্তে একরাশ আলো দেখতে পেয়ে আশায় বুক বাঁধছি।

 

সাভারের স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ ভবনধস আর মৃত্যুর আহাজারি এবং হেফাজতি তাণ্ডব, মহাসেনের ছোটখাটো চোখ রাঙানির পর আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, দেশে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এর মধ্যে সংসদের চেয়ারের মায়া আর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা বাজেট অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। কয়েক দফা ওয়াকআউট করলেও নিরম্নত্তাপ সংসদে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছেন দুই দলের বর্ষীয়ান কিছু নেতা। এই উত্তেজনায় আদালত অবমাননার দায়ে তিন নেতার শাস্তির প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর হরতাল আহ্বান তেমন কোনো জল ঢালতে পারেনি। আবার প্রমাণিত হলো, বিএনপির সমর্থন ছাড়া জামায়াতের পক্ষে এ দেশে কোনো সহিংস তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়; সে জনসমর্থন ও সাহস কোনোটিই তাদের নেই।

 

এ সবকিছুকে ম্লান করে দিয়ে এখন অনেক বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে চার সিটি করপোরেশন নিবার্চন । নামে স্থানীয় সরকার ও নির্দলীয় নিবার্চন হলেও কাযত এই চার সিটি করপোরেশনের নিবার্চন এখন দুই প্রধান জোটের মুখোমুখি লড়াইয়ের ময়দান। নিবার্চনী আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশন নিবার্চনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু কাজীর গরু তো কিতাবে থাকে, থাকে না গোয়ালে। এই প্রবাদের মতো নির্দলীয় সিটি করপোরেশন নিবার্চন   এখন বাংলাদেশে নয়, স্বপ্নের দেশে পাওয়া যাবে। এই নিবার্চনে প্রার্থীদের যোগ্যতা নয়, দলীয় পরিচিতিই নিয়ামক ভূমিকা পালন করছে। সবকিছু রাজনৈতিক আবরণে ঢাকার প্রবণতা স্থানীয় সরকার নিবার্চনকেও প্রভাবিত করছে। এমন অনিয়ম সত্ত্বেও চার সিটি করপোরেশন নিবার্চনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ আবারও গরম হয়ে উঠেছে। এই উত্তেজনায় দেশবাসী হরতাল থেকে রেহাই পাচ্ছে। এই পাওয়াও কম কিসে!

 

১৮ দলীয় জোট বর্তমান সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি নিবার্চন ও উপনিবার্চন  এর আগে সরাসরি বয়কট করলেও এবারই প্রথম বেশ আঁটঘাঁট বেঁধে নেমেছে। ইতোমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে চার সিটি নিবার্চনে সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও দাবি জানানো হয়েছে। আবার কারচুপি হলে সরকার পতনের লাগাতার আন্দোলনে যাওয়ারও হুমকি দিয়ে রেখেছে দলটি।

 

আগামী সাধারণ নিবার্চনের আগে সরকার ও বিরোধী দলের জনপ্রিয়তার সূচক কোথায় তা অনুমান করা যাবে অনুষ্ঠিতব্য সিটি নিবার্চন  গুলোতে। এ জন্য সংসদ নিবার্চনের ৫ থেকে ৬ মাস আগে চার সিটি করপোরেশনের এই নিবার্চন   দুই দলের জন্যই একটি বড় টেস্ট কেস। সবচেয়ে বড় টেস্ট আওয়ামী লীগের জন্য। কারণ, এই চার সিটি নিবার্চন আওয়ামী লীগের জন্য দ্বিমুখী সংকট তৈরি করতে পারে। প্রথমত, নিবার্চনে কোনো কারচুপি হলে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পযবেক্ষক মহলের কাছে নিবার্চন   সুষ্ঠু বলে প্রতীয়মান না হলে বিএনপির নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠবে। আবার জনপ্রিয়তার মাঠে হেরে গেলেও বিএনপি কারচুপির অভিযোগ তুলতে পারে, এমন আশঙ্কা করাটা অমূলক নয়। কারণ, আমাদের দেশের নিবার্চন  কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, বিজিত প্রার্থী সব সময়ই কারচুপির অভিযোগ তোলেন। দ্বিতীয়ত, জনপ্রিয়তার মাঠে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা হেরে গেলে আসন্ন জাতীয় নিবার্চনের আগে সরকার দলের মনোবলে ভাটা পড়তে পারে। তখন নিবার্চন  মুখী উচ্চাভিলাষী বাজেটে কোনো কাজ হবে না। এতে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের পালে নতুন করে হাওয়া লাগতে পারে।

 

অবশ্য বিএনপির আন্দোলনের কৌশল ও গতিধারা নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ডে সমর্থন এবং হেফাজতের অযৌক্তিক দাবি না মেনেও তাদের তাণ্ডবলীলার ওপর ভর করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কৌশলে অনেকটাই ব্যাকফুটে চলে গেছে দলটি। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের আহ্বানকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ নষ্ট করে এবং ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে দলটি কৌশলের দিক থেকে আরও পিছিয়ে পড়েছে। এর বড় প্রমাণ ছিল হেফাজতের তাণ্ডবের পর বিএনপির দুদিনের নিরম্নত্তাপ হরতাল। রাজনৈতিক কৌশলে মার খাওয়ার কারণে সরকার বিরোধী দলের প্রতি আবারও কঠোর হওয়া শুরু করে।

 

এই লেখা হাতে পৌঁছার পরপরই পাঠক চার সিটি নিবার্চনের ফলাফল জেনে যাবেন। চার সিটি করপোরেশন নিবার্চনের ফলাফল হাতে পাওয়ার পর দুই দলই নতুন করে রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করবে। সেই কৌশল হতে হবে যুক্তিসংগত এবং কাযকর। আগামী নিবার্চনের আগে এই কৌশল হবে দুই দলের জন্যই সবোর্চ্চ পরীক্ষা। এক দল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, আরেক দল অকৃতকায হবে। কিন্তু আমাদের মতো আমজনতার ভয় একটিই সেটি হলো, জনগণ ও দেশের কল্যাণের নামে দুই দলের মারমুখী আচরণ আর ভণ্ডামি ও কপটতা। আগামী নিবার্চন কোন সরকার পদ্ধতির অধীনে হবে, তা নিয়ে দুই দল এখনো দুই মেরুতে অবস্থান করছে। জাতীয় সংসদ নিবার্চনের দিন ঘনিয়ে আসছে। যতই দিন ঘনাচ্ছে, ততই জনগণের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কারণ বিরোধী দলের সংসদে যোগ দেওয়া, বিএনপির  র্যালির অনুমতি দেওয়া এবং চার সিটি নিবার্চনের উত্তাপে জনগণ আবারও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের আশার আলোগুলোর মেয়াদ বড়ই ক্ষণস্থায়ী। সিটি নির্বাচনের উত্তাপ শেষ হলেই বুঝি আবারও হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, ধরপাকড় শুরু হবে-এমন আশঙ্কায় আতঙ্কিত দেশের সাধারণ জনগণ। আশঙ্কাটি যদি অমূলক হয়, তবে তা হবে সবচেয়ে সুখকর। দেশে বিদ্যমান সংসদীয় গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এমন আশঙ্কা অমূলক হওয়া জরম্নরি। সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী উভয় দলেরই দায়িত্ব সমান। ক্ষমতার রাজনীতির জন্য কোনো পক্ষেরই জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো পথ গ্রহণ করা উচিত নয়।

 

আগামী জাতীয় সংসদ নিবার্চন   কোন সরকারের অধীনে হবে-এই সংকট আপাতদৃষ্টিতে সাংবিধানিক মনে হলেও মূলত এটি একটি রাজনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। আর রাজনৈতিক সমাধানের পথ একটাই, খোলা মন নিয়ে আলোচনা। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র থাকলে নিবার্চন   বারবার আসবে। কিন্তু দুই দলের হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য গণতন্ত্রই যদি না থাকে তাহলে তখন কী নিয়ে রাজনীতি করবেন? দুই দলের বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য দাবিগুলো দুই দলকেই আলোচনার মাধ্যমে ফয়সালা করতে হবে। এর জন্য দরকার গঠনমূলক সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত পৌঁছানোর জন্য দরকার নিজেদের অহংকে বধ করে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসা।

 

আওয়ামী ও বিএনপি দুই দলকেই মনে রাখতে হবে, এ দেশের মানুষ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। এগুলো কোনোটিই সমাধানের অযোগ্য নয়। কিন্তু তার পরও এগুলো নিয়ে এ দেশের মানুষ খুব একটা অভিযোগ করেন না। তারা শুধু একটি শান্তি চান, চান নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন ও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা।

 

ফুটবল খেলায় কোনো পক্ষ এগিয়ে না থাকলে শেষ দিকের ৫-১০ মিনিট খুব শ্বাসরুদ্ধকর  হয়ে ওঠে। থাকে টানটান উত্তেজনা। দর্শকেরা জায়গা ছেড়ে উঠতে পারেন না। প্রিয় দলের খেলোয়াড়রা আক্রমণে গেলে দর্শক তখন আশাবাদী হয়ে ওঠেন-এই বুঝি গোল হলো, জিতেই যাব! জাতীয় সংসদ নিবার্চনের আগে তেমনই একটা সময় চলছে। খেলার দর্শকদের মতো আমরাও আশায় বুক বেঁধে আছি-দুই দলের কেউ হারবেন না, জিত হবে জনগণের, সংসদীয় গণতন্ত্রের। জয় হবে শুভবুদ্ধি ও মহত্ত্বের আর প্রজ্ঞার। গোলপোস্ট যত দূরেই হোক গোল জনগণই করবেই।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *