বর্ষার অঝোর বৃষ্টিমালা

এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বর্ষা। গাছে গাছে ফুটেছে কদম ফুল। দিন কয়েক বিরতি নিয়ে মাঝেমধ্যেই অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। কী দারুণ! কী মজা! শুরু হলো ওই আলতা পায়ে নূপুরের রিমঝিম শব্দের ছন্দে মনমাতানো-প্রাণজুড়ানো বৃষ্টি। বর্ষাকাল তাই প্রকৃতির এই মধুছন্দ আয়োজন। গ্রীষ্মের দাবদাহকে ম্লান করে দিতেই নামে অঝোর বৃষ্টিমালা। বৃষ্টির ফোঁটা ও তার স্নেহমাখানো স্পর্শে তরুলতা সজীব হয়ে ওঠে। গাছের পাতায়, টিনের চালে কিংবা ছাদের রেলিং ছুঁয়ে খোলা প্রান্তরজুড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ার ঋতু বর্ষায় কদম ফুল আরও ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। আষাঢ়ে শাপলা, পদ্ম, চালতা, কেতকী ফুলের পাশাপাশি আরও নানা ফুল প্রকৃতিকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। তাই ‘ছন্দের জাদুকর’খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বর্ষাবিষয়ক কবিতায় লিখেছেন-‘বর্ষা’, ‘ইলশেগুঁড়ি’ ও ‘বর্ষা নিমন্ত্রণ’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ণনা করেছেন-‘রিম রিমঝিম রিমঝিম নামিল দেয়া/ দেখি শিহরে কদম বিদরে কেয়া/ নামিল দেয়া/।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ষাপ্রীতি তো রীতিমতো প্রবাদতুল্য। পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন বর্ষাকে তার সাহিত্যকর্মে উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে।

‘বাদল মেঘে মাদল বাজে’ কিংবা ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘন ঘোর বরিষায়’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এ বাণীর মতোই বাঙালির মন বর্ষায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বিরহী প্রেমিক বর্ষায় ফোটা প্রেমের প্রতীক প্রথম কদম ফুল হাতে প্রেম নিবেদন করতে চায় প্রেমিকাকে। মনে হয়, এ যেন মাহেন্দ্রক্ষণ। বর্ষাকাল এভাবেই শত শত বছর ধরে আকুল করে এসেছে বাঙালিকে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পর বর্ষা আসে তৃষিত হূদয়ে বারির ধারা নিয়ে। শুধু হূদয়েই নয়, প্রকৃতিতেও বৃষ্টির ধারা ছড়িয়ে দেয় সবুজের পরশ। গাছে গাছে সবুজ কিশলয় গজিয়ে ওঠে, করে প্রকৃতি-বন্দনা। বাংলার সবুজ শ্যামল রূপের যে উপমা-এই বর্ষাতেই তা সার্থকতা পায়। বর্ষাকালে বৃষ্টি যেভাবে মানুষকে আকুল করে তা বোধ হয় অন্য কোনো ঋতু করে না।

যত দূর চোখ যায় দিগন্তজোড়া ঘন কালো মেঘ নেমে আসে মাথার ওপরে। খোলা প্রান্তরে মেঘের ডাকাডাকি, প্রচণ্ড বেগে নেমে আসা বৃষ্টির রূপ আজও অবাক বিস্ময়ের সৃষ্টি করে মানুষের হূদয়ে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের এ বর্ষা যেন বাংলার প্রাণ। বর্ষায় বাংলার মাঠে মাঠে শস্য বোনার উৎসব শুরু হয়। কবি, সাহিত্যিকদের লেখায় এই বর্ষা ধরা দিয়েছে নানা মাত্রায়। গুঁড়ি গুঁড়ি মেঘের মাদল বাজিয়ে রিমঝিম বৃষ্টি বাঙালির মনে ছড়িয়ে দেয় নানা মাত্রার অভিব্যক্তি। এই বর্ষা কখনো বিরহ যাতনার উপলক্ষ, কখনো সর্বনাশী কিংবা সর্বগ্রাসী। মানুষের জীবনের মানচিত্র পাল্টে দিয়ে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায় বর্ষার প্রচণ্ড রূপ। কিন্তু প্রতিবছর রুদ্ররূপ ছাপিয়ে প্রতিটি মানুষের মনে এক অমোঘ টানে বর্ষা নিয়ে আসে নতুন দিনের গান। সে কারণেই বৃষ্টির ছন্দে সবাই গুনগুন করে গেয়ে ওঠে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সেই চিরসবুজ গান ‘আকাশ এত মেঘলা/ যেয়ো নাকো একলা’।

বিরহ ও বর্ষা কাব্যে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান স্থান দখল করে আছে। বুদ্ধদেব বসু তার এক রচনায় এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “এর প্রধান কারণ বোধহয় কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের সর্বগ্রাসী প্রতিপত্তি। এর উৎসস্থল বাল্মীকী নিশ্চয়ই।… পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবিরা বর্ষা-বিরহ সমন্বয়টিতেই অর্পণ করলেন তাঁদের মুগ্ধতা ও সৃষ্টিকল্পনা-কেমন আশ্চর্য সফলতার সঙ্গে।…বৈষ্ণব কবিদের রাধিকা, উজ্জয়িনীর মেয়েদের মতোই, বর্ষার রাত্রে অভিসারে বেরোন; আকাশে মেঘ উঠলে নায়ক-নায়িকার সঙ্গলিপ্সা বর্ধিত হয়; চণ্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, বর্ষার সঙ্গে প্রেম ও বিরহের একটি অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ স্থাপিত হয়ে গেছে। এই যে সাহিত্যিক ঐতিহ্য যুগ-যুগ ধ’রে গ’ড়ে উঠলো, তাঁর মধ্যে ‘মেঘদূতে’র প্রভাব অনস্বীকার্য।”

বিশ্ব চরাচরজুড়ে অঝোর ধারার বৃষ্টি মানুষকে মোহগ্রস্ত করে তোলে। নিঃসঙ্গতা বোধকেও করে তোলে তীব্র। বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি লিখেছেন, ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/ এ ভরা বাদর/ মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর/।’ কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষায় বিরহবেদনা নিয়ে লিখেছেন-‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে’। কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন-‘বৃষ্টির কথা থাক, বিরহের কথা বলি/ শুনাই দুজনে বিদ্যাপতির বিষণ্ন পদাবলী,/ বর্ষার কথা থাক, বকুলের কথা বলি/ ঝরা বকুলেই ভরে রাখি এই প্রশস্ত অঞ্জলি। আকাশের কথা থাক, হূদয়ের কথা শুনি/ যদিও বিরহ তবু মিলনের স্বপ্নজালই বুনি।’

বেশ কয়েক দিন বজ্র-বিদ্যুৎসহ প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ছিল বর্ষাকাল। সব রুক্ষতাকে বিদায় জানিয়ে নরম-কোমল হয়ে উঠছে বাংলার মাটি। নতুন প্রাণের আনন্দে অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে গাছপালা। মাঠে মাঠে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। বৃষ্টির রিমঝিম ধ্বনিতে পেখম মেলবে ময়ূর। নাগরিক জীবনে বর্ষা উপভোগ বলতে ফ্ল্যাটের বারান্দায় আসা বৃষ্টির পানির ছিটেফোঁটার স্পর্শ। বড়জোর ছাদে একপশলা বৃষ্টিতে ভিজে আসা। তবে এই নগরে বৃষ্টি বরং বিলাসের চেয়ে কষ্টই বাড়ায় বেশি। ফুটপাতের অসহায় মুখগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। পলিথিনে মোড়ানো তাদের বসত ঝড়-বৃষ্টিতে উড়ে যায়। কাঁথা-বালিশ ভিজে জবুথবু। তবু এই নগরে সুখের জন্য আসা মানুষ সব সয়ে নেয়। অন্য দিকে গ্রামের চিত্র ঠিক এর উল্টো। পুকুর, দিঘি, খালগুলোও বর্ষায় কানায় কানায় ভরে ওঠে। নতুন পানিতে মাছ ধরার ধুম পড়ে। বর্ষার অফুরন্ত জলে কৃষক ধান বুনতে বুনতে দেখেন নতুন দিনের স্বপ্ন। বর্ষার অকৃত্রিম দান কৃষকের সেচের খরচ বাঁচিয়ে দেয়। তবে বর্ষায় অতিবৃষ্টি বন্যাও নিয়ে আসে। আনন্দের মধ্যে নিয়ে আসে বেদনা। তাই বর্ষা তৈরি করে আনন্দ-বেদনার কাব্য।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *