তথ্য অধিকার, না হুমকি

কালজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির একটি দৃশ্য দিয়েই লেখাটির সূচনা করা যেতে পারে। ছবিটির একটা পর্যায়ে পাঠশালা বন্ধ করা হচ্ছে। রাজা বলছেন ‘যত জানবে, তত কম মানবে’। মানবচরিত্রের এ দুবর্ল দিকটা নিপুণভাবেই তুলে এনেছেন সত্যজিৎ রায়। কারণ, সত্যি কথাটা জেনে গেলে তো মুশকিল। বলতে গেলে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে। কারণ, এই সহজ কথা বা তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে মিশে থাকে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের দুবর্লতা। তথ্যের প্রবাহে সমাজের বিশাল একটি অংশ যেমন লাভবান হয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হয় একটি অংশ। আর ক্ষতিগ্রস্ত যারা হচ্ছেন, তারাই যুগে যুগে ক্ষমতাবান। সে রাজনৈতিকভাবেই হোক আর সামাজিক প্রেক্ষাপটেই হোক। এ কারণেই সাংবাদিকেরা যখন সাধারণ মানুষের কাছে এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অপকর্ম, দুর্নীতি অথবা কোনো অন্যায় বা অন্যায্যের খবর পৌঁছাতে যান, রোষানলের শিকার হন। পঙ্গুত্ব বরণ করেন, দেশ ছাড়েন অথবা নির্মমভাবে নিহত হন। এ ধরনের উদাহরণ তো ভূরি ভূরি। কাজেই তথ্য মানুষের অধিকার, নাকি কারও কারও ক্ষেত্রে হুমকি, সে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করা অনেক জটিল এবং দুরূহ একটি বিষয়।

তথ্যপ্রাপ্তি মানুষের অধিকার। সেই আদিকাল থেকে আধুনিক বা উত্তরাধুনিক সভ্যতায়ও এ কথা এক বাক্যে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি দেন সবাই। কিন্তু যখন এই তথ্যই হুমকি হিসেবে দাঁড়ায়, তখনকার বাস্তবতা ভিন্নরকম। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাশ্চাত্য সভ্যতা যেখানে মানবাধিকার, তথ্য অধিকার নিয়ে সারা দুনিয়াকে ছবক দিয়ে কোটি কোটি ডলার খরচ করছে, সেই পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়েই অ্যাসাঞ্জকে নাকানি-চুবানি খেতে হচ্ছে। এ তো গেল পাশ্চাত্যের কথা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্যের অবাধ বিকাশ কতটা হয়েছে বা কতটা মুক্ত সাংবাদিকতা হচ্ছে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের পর দেশে যখন গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস চলছে, সে সময় থেকে আজ অবধি কতজন সাংবাদিক নিগৃহীত, নিযার্তিত ও নিহত হয়েছেন, সেই ফর্দ বেশ লম্বা। প্রতিটা রাজনৈতিক দলই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মুক্ত মত প্রকাশের পরাকাষ্ঠা হিসেবে নিজেকে জাহির করলেও বাস্তবতা অনেক কঠিন এবং এই কঠিনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই চলছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম। অবশ্য মুক্ত মত প্রকাশের বৈশ্বিক যে পরিস্থিতি, তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট যে খুব বেশি বেমানান তা মোটেও বলা যায় না। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন হয়েছে, তথ্য কমিশন হয়েছে। বছর বছর নতুন সংবাদপত্র আর টেলিভিশন আসছে। গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ সাইট ও অনলাইন তথ্যপ্রবাহের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই মাধ্যমে বস্নগার বা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন তথ্যপ্রবাহে। প্রত্যেকটি টেলিভিশন চ্যানেলে মধ্যরাতের টক শোতে নতুন নতুন বিশেষজ্ঞ আলোচক তৈরি হচ্ছেন। চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এসব অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা হচ্ছে না তা বলা যাবে না। নীতিমালা লঙ্ঘন করার অপরাধে দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকায় তালা ঝুলছে। মানছি যে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা বা এথিকস ছাড়িয়ে এসব প্রতিষ্ঠান বা চালু অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলে নিজেদের ভাবা শুরু করেছেন। নতুন নতুন টেলিভিশন চ্যানেলে ১/২ বছর সাংবাদিকতা করে অনেকে নিজেকে বিশেষজ্ঞ এবং তারকা ভাবতে শুরু করেছেন। তিন বছর না পেরোতেই সিনিয়র রিপোর্টার এমনকি পাঁচ টিভি চ্যানেলে চাকরি পরিবর্তনের সুবাদে কেউ কেউ বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন। সবই হচ্ছে। যে দেশে সম্পাদকের যোগ্যতা নির্ধারণের দাবি উঠছে, সেখানে রিপোর্টার বা নবিশ সাংবাদিকেরা এমন আশকারা পেতেই পারেন। আর নিজেদের এই অধঃপতন অথবা নিজেদের দুবর্লতার সুযোগ তো রাষ্ট্র, সমাজ, সরকার, ব্যক্তি আর রাজনৈতিক দলগুলো নিতেই পারে। সেখানে দোষের কিছু নেই।

অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও মুক্ত সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে বলতে গেলে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের বাজার ও বিজ্ঞাপনদাতাদের অবস্থানও অবশ্যই আলোচনায় আসবে। কারণ, ছোট এই বিজ্ঞাপনী বাজারে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের সংখ্যা তো কম নয়। এখানে অসুস্থ প্রতিযোগিতা যেমন থাকা স্বাভাবিক, তেমনিভাবে কালোটাকার মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে সাংবাদিকদের জিম্মি হওয়ার প্রবণতাও স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনদাতাদের বড় একটি অংশ হচ্ছে রিয়েল এস্টেট খাত। আর এর বেশির ভাগই ভূমিদস্যু হিসেবে সমাজে পরিচিত হলেও মিডিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ কারণে কোনো ধরনের অনুমোদন না থাকলেও, এমনকি নিজের জমি না থাকলেও অন্যের জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে টিভিতে বাহারি গ্রাফিঙ্ এনিমেশন চালিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছেন তারা। এরাই বছরে কয়েক লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের কুলুপ এটে মুখ বন্ধ করেছেন মুক্ত সাংবাদিকতার। এদের তথ্য সমাজে জানাতে গিয়ে নিগৃহীত সাংবাদিক যে একেবারে নেই তা-ও নয়। আশিয়ান সিটিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা কাভার করতে গিয়ে বৈশাখী টেলিভিশনের সাবেক রিপোর্টার ইউসুফ খালেদ চরম শারীরিক নিযার্তন হলেও খবরটি প্রচার তো দূরের কথা স্ক্রলেও দেওয়ার সৎসাহস দেখাতে পারেননি বৈশাখী কর্তৃপক্ষ। দেশের খ্যাতিমান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুলের একজন সহকর্মী যখন এমন নিগ্রহের শিকার আর এ ব্যাপারে তার অক্ষমতায় আর প্রমাণ করার দরকার নেই যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বা মুক্ত তথ্যপ্রবাহ কোথায় নেমেছ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণ-এর ৯০ টন আমে ফরমালিন পাওয়ার ঘটনা সাহস করে দু-একটি জাতীয় পত্রিকা ছাপতে পেরেছে। কারণ, প্রাণ কর্তৃপক্ষ এই তথ্যকে তাদের দায়িত্বহীন মুনাফার ক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে দেখছে আর সেই হুমকি পাল্টা ফেরত দিয়েছে সম্পাদক, মালিক অথবা বার্তা প্রধানদের। এখন নোংরা বিষমিশ্রিত জুস খেয়ে হাজারটা শিশু মরলেও হয়তো সাংবাদিকদের ‘আহা উহু’ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

তথ্য কী? তথ্য অধিকার কী? সভ্যতার বিকাশে তথ্যপ্রবাহের ভূমিকা কী, তা নিয়ে হয়তো মহাকাব্য লেখা সম্ভব। কয়েক কেজি অথবা দু-এক মণ ওজনের গবেষণাপত্র লিখে ফেলা সম্ভব। কিন্তু আসল কথাটা কেউ বলবেন না। কেউ লিখবেন ও না। কারণ ভাশুরের নাম মুখে আনতে নেই। যারা তথ্য দেবেন, তাদের নিজেদের দুবর্লতা তো নিজেদের কাছেই বিশাল হুমকি, এখানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষের কাছে তথ্য হুমকি হওয়ার কোনো কারণই নেই। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এই তো কিছুদিন আগেই বললেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই পাহাড়প্রমাণ গোপনীয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।’ এ কথা আমরা সবাই জানি, মানি কিন্তু এই সত্যগুলো বলার সৎসাহস আছে কজনের। অথবা সাহস করলেও সেগুলো প্রকাশের জায়গাই বা কোথায়? বিকল্প গণমাধ্যম? অনলাইন? সেখানেও বিপদ। সেখানেও তো ছাঁকনি, নজরদারির মুখে হা-পিত্যেশ করছেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন ব্লগারের জেল-জরিমানার নজির তো সবারই জানা। তার পরও জোর দিয়ে বলি, তথ্যপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকারই মানুষকে অনেক এগিয়ে যেতে রসদ জোগায়।

বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটস তার নোবেল পুরস্কারটিই পেয়েছেন তথ্যের ওপর কাজ করে। ‘অ্যাসিমেট্রিক ইনফরমেশন’ বা ‘তথ্যের অ-সমানতার’ তত্ত্বে তিনি ও তার সহযোগী তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, ‘যারা শাসন করে এবং যাদের শাসন করা হয়, এই দুপক্ষের মধ্যে তথ্যের যে অ-সমানতা থাকে, তাই কিন্তু প্রশাসকদের হাতে তুলে দেয় বিশাল ক্ষমতা।’ ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যেতে চাওয়ারা তাই সাধারণ মানুষকে কখনোই কিছু জানতে দিতে চায় না। মানুষকে অন্ধকারে রেখেই তারা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস-কয়লার উৎপাদন বণ্টন চুক্তি করে বা বিশ্বব্যাংক/আইএমএফের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, আদিবাসীদের না জানিয়েই মধুপুরে ইকো পার্কের মাস্টারপ্ল্যান করে কিংবা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে। মুশকিল তাই হয়ে উঠে তখন, তথ্যের একচ্ছত্র মালিকানা যখন থাকে কেবল সরকার, মন্ত্রী, আমলা, পুলিশের হাতে; মালিকানার তৈরি করা এই ‘কৃত্রিম সিন্ডিকেট’ ভাঙা দরকার। দরকার মালিকানায় পরিবর্তন আনা। রাষ্ট্রের মালিক কে? জনগণ। তথ্যের অবাধ মালিকানাও তাহলে জনগণের কাছে দিতে হবে। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাই বিদ্যমান অসম ও অমানবিক ক্ষমতাবিন্যাসকেও অনেকখানি বদলে ফেলা সম্ভব। ধরা যাক নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দেয়। এখন জনগণ যদি না-ই জানে যে সংবিধানে কোন কোন নাগরিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে; যদি তাদের জানানো না হয়, তাদের যদি জানার সুযোগ না থাকে, তাহলে নাগরিক অধিকার কোথায় কখন কাদের দ্বারা কেমন করে লঙ্ঘিত হচ্ছে, মানুষ তা বুঝবে কীভাবে? এর প্রতিকারই বা চাইবে কীভাবে? এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তথ্য অধিকার আইন। যদি সেটি শক্তিশালী ও সত্যিকারের কার্যকর করা সম্ভব হয়। জনগণের ক্ষমতায়ন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে ২৯ মার্চ ২০০৯ জাতীয় সংসদে ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ পাস করা হয় এবং ০১ জুলাই ২০০৯ থেকে আইনটি কার্যকর হয় এবং ওই তারিখেই প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুজন তথ্য কমিশনারের সমন্বয়ে তথ্য কমিশন বাংলাদেশ গঠিত হয়। ৮টি অধ্যায় ও ৩৭টি ধারাসংবলিত এই আইনের উদ্দেশ্য নিছক তথ্যপ্রাপ্তির জন্য তথ্যপ্রাপ্তি নয় বা কেবল তথ্যে জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা নয়, বরং এর উদ্দেশ্য জনগণের পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার চর্চা করে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি/বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার কাজের স্বচ্ছতা আনা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি হ্রাস এবং সবোর্পরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনক। তথ্য কমিশন ২০০৯ সালের ০১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১০ পযর্ন্ত তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের চিত্র নিয়ে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১০ প্রকাশ করেছে। অন্য দিকে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক পযার্লোচনা করে এর একটি সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করেছে রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ। এসব প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় সারা দেশে ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পযর্ন্ত জনগণের পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার আইনের নির্ধারিত ফরম ব্যবহার করে সরকারি সংস্থা ও এনজিওদের কাছে আবেদন পড়েছে ২৫,৪১০টি। এর মধ্যে সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলকৃত আবেদন ২২,৯৬৯টি, শতাংশের হিসেবে ৯০.৩৯%; এনজিওদের কাছে আবেদন পড়েছে ২,৪৪১টি, যা মোট আবেদনের ৯.৬১%। আবেদনকৃত তথ্যচাহিদার ৯৯.৭% তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে মাত্র ৭৫টি আবেদন (০.৩%)। আপাতদৃষ্টিতে একে খুবই আশাব্যঞ্জক মনে হয়; কারণ, তথ্য আইন জারি করার শুরুর বছরেই মোট আবেদনের ৯৯.৭% তথ্য সরবরাহ করতে পারা বিশাল সক্ষমতা। কিন্তু সমস্যাটি যেখানে তা হলো, জনগণ যেসব তথ্যের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে, তার বেশির ভাগই তথ্য অধিকার আইনের যে উদ্দেশ্য, সরকার ও এনজিওদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি করা, দুর্নীতি হ্রাস করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেমন বিপুলসংখ্যক আবেদন পড়েছে কীভাবে বন্দুকের লাইসেন্স পাওয়া যায়, কীভাবে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরে কী ধরনের নাগরিক সেবা পাওয়া যায় ইত্যাদি। এসব কোনো গোপন তথ্য নয় বা এর সঙ্গে দুর্নীতি বা জবাবদিহির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এ তথ্য পাওয়ার জন্য তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারেরও প্রয়োজন পড়ে না। যেসব তথ্য কর্তৃপক্ষ আটকে রাখতে চায় বা দিতে চায় না এবং যেসব কাজের সঙ্গে আর্থিক বিষয়াদি তথা দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে, সেই সব তথ্য চাওয়ার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাজকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতি জেলায় বা থানায় ত্রাণ বরাদ্দ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ ইত্যাদি বিষয়ে জানার সুযোগ থাকলে দুর্নীতি না কমলেও হয়তো বা একটি স্বচ্ছ ধারা তৈরির প্রবণতা তৈরি হতো।

বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান নিজেরা করি জুলাই ২০১০ থেকে ভূমিহীন নারী-পুরুষদের তথ্যপ্রাপ্তির আবেদন পর্যালোচনা করে একটি রিপোর্ট উপস্থাপন করে। তাদের পযালোচনায় বলা হয়েছে: স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে ১৪টি আবেদনের মধ্যে তথ্য মিলেছে ৩টির; সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-বিষয়ক ৩১টি আবেদনের মধ্যে তথ্য মিলেছে ১০টির; স্থানীয় সমবায়-সংক্রান্ত ০৩টি আবেদনের ক্ষেত্রে কোনো তথ্যই নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যায়নি; খাসজমি ও জলা-সংক্রান্ত ২৫টি আবেদনের মধ্যে ৫টির তথ্য মিলেছে। তাদের পযবেক্ষণ হচ্ছে, যেসব তথ্যের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়, অনিয়ম, দুর্নীতির সংশ্লেষ থাকার আশঙ্কা থাকে সেসবের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তৃণমূল মানুষেরা তথ্য পায়নি। আরেকটি পযবেক্ষণ হলো, এককভাবে আবেদন না করে দলগতভাবে আবেদন করলে তথ্যপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে।

তথ্য অধিকার বা তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অজুহাত, অজ্ঞতা এবং অসহযোগিতার দৃষ্টান্ত্মই সবচেয়ে বেশি। চাওয়া মাত্র কোনো তথ্যপ্রাপ্তির ঘটনা খুব বিরল, সে সাংবাদিক বা তথ্যকর্মী চান অথবা একজন সাধারণ মানুষই চান। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জানেন বা এর ধারা, নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে জানেন এমন কর্মকর্তার সংখ্যাও হাতেগোনা। বসের নিষেধ আছে অথবা আমার কথা বলার অনুমতি নেই, এরকম কথা হরহামেশাই শুনতে হয় সংবাদকর্মীদের। এমনকি প্রশাসনের সবোর্চ্চ কর্মকর্তা সচিবও মন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া খুব কম সময়ই সাধারণ যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলেন বা মুখ খোলেন। এটি যেন আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কলোনিয়াল মানসিকতায় অফিশিয়াল সিক্রেটস বা সিক্রেসি অ্যাক্ট না থাকলেও এর ভূত তো চেপে আছে সরকারি কর্মকর্তাদের মাথায়। নতুন তথ্য অধিকার আইনে স্পর্শকাতর তথ্যের কিছু বিধিবিধান যোগ করায় গ্রামে রাস্তা সংস্কারে গম বরাদ্দের পরিমাণকেও স্পর্শকাতর বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে উপজেলা খাদ্য ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের মধ্যে।

তথ্য অধিকার আইন কতটা বাস্তবায়ন হলো বা মানুষ কতটা তথ্য পেল, সে দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে তথ্য কমিশন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ মনে করছেন, তথ্য কমিশনের কাজে গতির অভাব রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে তথ্য কমিশনের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই সাবেক আমলা। আমলারা গোপনীয়তার সংস্কৃতির মধ্যে থেকে কাজ করে অভ্যস্ত। আমলাদের পক্ষে ব্রিটিশের ‘ঔপনিবেশিক’ আর পাক সামরিক শাসনের ‘বদ্ধ/আটকে রাখা’র সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যমুক্তির বিষয়টিকে খোলা হাওয়ায় খোলা বাস্তবতায় চিন্তা করাটা আকাশকুসুম কল্পনা হতেই পারে। গেল প্রায় দুশো বছর ধরে আমলারা জনগণের কাছ থেকে তথ্য লুকিয়ে রাখার সংস্কৃতি চর্চা করে গেছে। সেই আমলাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনগণের কাছে অবাধে তথ্য সরবরাহের বিষয়টি বাস্তবায়ন করার। তথ্য কমিশনে আমলা-নির্ভরতার বিষয়টি দার্শনিকভাবে, ঐতিহাসিকভাবে ও চর্চাগতভাবে স্ববিরোধী। তাই তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের সময় কমিশনে মুক্তচিন্তা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের চর্চায় অভ্যস্ত মানুষ যেমন সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, মিডিয়া বিশেষজ্ঞ কিংবা সাংবাদিকতা, তথ্যবিজ্ঞান, আইনজ্ঞদের যুক্ত করা দরকার। তা না হলে, তথ্য অধিকার নয়, হুমকি হিসেবেই বিবেচিত হবে। সাংবাদিক বা তথ্যকর্মীরা পেশাদারির খাতিরে বারবার নিগৃহীত হবেন, নিযার্তিত হবেন অথবা শামসুর রহমান, হুমায়ুন কবির বালুর মতো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। জনগণ পিছিয়ে পড়বে সভ্যতার আলো থেকে। অবাধ ও মুক্ত তথ্যপ্রবাহের পথ এমন করেই রুদ্ধ থাকলে দুর্নীতির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচের দিকেই নামতে থাকবে। মাদকে ভাসবে দেশ। কালোটাকার মালিকেরা সেলাই করবেন সম্পাদকদের মুখ। এ অবস্থা কি চলতে দেওয়া যায়? যায় না। তাই এখনই ভাবতে হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক এই অধিকারটির সর্বোর্চ্চ বাস্তবায়নের। না হলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসহিষ্ণুতা, অশিক্ষার গ্রাসে হারিয়ে যেতে থাকবে সাধারণ মানুষ। বিপরীত মেরুতে কালোটাকা, পেশিশক্তি, অস্ত্রবাজ আর নীতিহীন রাজনীতিকদের জয় হবে। যা কোনো দেশ, সমাজ ও কালের জন্য কোনোমতেই মঙ্গলজনক হতে পারে না।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *