দুর্নীতি দমনে আইনী সংস্কার জরুরি

কাগজে-কলমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হলেও এর কাযর্ক্রম নিয়ে সব সরকারের আমলেই প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান এ সংস্থাটি নখদন্তহীন বাঘের সাথেও তুলনা করেছেন বহুবার। সম্প্রতি দুদকের বেশ কয়েকটি বড় বড় অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত করেছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার প্রশ্নে শতভাগ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি। ফলে দুর্নীতি কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়ে আইনি সংস্কার জরুরি বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দুদকের কর্মকাণ্ড। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্য থেকে প্রভাবশালীদের বাদ দিয়ে মামলা করায় সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই মামলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবকে আসামি করে দুদক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু সরকার দলীয় রাজনীতিকদেও নাম বাদ দেয়ায় সবাই অনুমান করতে পারে দুদক কাগজে কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে নয়।

আবার দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনাদের কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ। পদ্মা সেতু নিয়ে করা দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে বিশ্বব্যাংক অসন্তুষ্টি জানালেও, এক কমিশনার গণমাধ্যমে স্বউদ্যোগে জানান, বিশ্বব্যাংক দুদকের কাযর্ক্রমে সন্তুষ্ট। যা নিয়ে সে সময় ব্যাপক বিতর্ক হয়। পরে একই ইস্যুতে কানাডা থেকে দুদকের প্রতিনিধিদল শূন্য হাতে ফিরলেও দুদক চেয়ারম্যান তাদের কায্যর্ক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। এতে আরেক দফা বিতর্কের মুখে পড়ে সংস্থাটি।

পদ্মা সেতু প্রকল্প, রেলের নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে সংস্থাটির প্রধান বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন। আবার বড় বড় দুর্নীতিবাজ সরকার দলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দুর্নীতির প্রশ্নে দুদকের নীরব ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে প্রশংসার চেয়ে নিন্দাই বেশি পেয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার চাপে ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত ঘোষণা করে একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু কেবল নামে পরিবর্তন ঘটে। কাজে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি সংস্থাটি। কারণ এর আইনি কাঠামোর দুবর্লতা।

দুদকের আইনি সংস্কারের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ বিগত ২৩ ফেব্রম্নয়ারি, ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। সেদিনই আইনটি সবর্সাধারণের অবগতির জন্য গেজেটে প্রকাশ করা হয়। ২০০৪ সালে প্রণীত দুদক আইনটিকে পরিপূর্ণ করে তোলার উদ্দেশ্যে কয়েকটি কমিটি তিন বছর ধরে কাজ করে একটি সুপারিশমালা পেশ করে। পরে সুপারিশমালার ভিত্তিতে তা বিল আকারে সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়। বিলটি এখনো সংসদীয় কমিটিতেই পড়ে আছে।

প্রস্তাবিত বিলে এমন কিছু ধারা-উপধারা সংযোজন হয়েছে, যেগুলো কার্যকর করা গেলে দুদক সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে। প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, পুলিশের মহাপরিদর্শক,র্যাবের মহাপরিচালক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ঘোষিত এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুর্নীতি সম্পৃক্ত যেকোনো তথ্য চাইতে পারবে দুদক এবং এসব সংস্থা দুদককে ওই সব তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে। একই সঙ্গে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ যথা সময়ে তথ্য প্রদান না করলে বা তথ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে দুদক।

সংশোধনী প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা ও চার্জশিটে আনীত অপরাধের ধরন হবে আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য ও জামিন অযোগ্য। বর্তমানে দুদক আইনে এ ধারাটি সরাসরি না থাকায় সুবিধা নিচ্ছে আসামিরা। সংশোধিত প্রস্তাবের ধারা ও উপধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয়, এগুলোর ওপর দুদকের স্বাধীনতা ও স্বয়ংক্রিয়তা অনেকটাই নির্ভরশীল।

একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসাবে দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো সরকারের আমলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। দুদক যে স্বাধীন ও কাযর্করভাবে কাজ করতে পারছে না, তার বড় কারণ সংস্থাটির প্রয়োজনীয় আইনি শক্তি নেই।

দুদক আইন ২০০৪-এর ধারা ৩৮-এর পর একটি তফসিল দেওয়া হয়েছে। তফসিলে দুদক আইনের অধীন অপরাধগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৭৪-এর অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধগুলো হচ্ছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০২, দণ্ডবিধির ১৬১-১৬৯; ২১৭, ২১৮, ৪০৮, ৪০৯ এবং ৪৭৭ ক-এর অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধগুলো ইত্যাদি। আবার ধারা ৯-এর উপধারা ১ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অপরাধসমূহ দুদক আইন, ২০০৪-এর অধীন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর তফসিলভুক্ত অপরাধ গণ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন বা কমিশন হইতে তদুদ্দেশ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা দুর্নীতি দমন কমিশন হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য কোন তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্তযোগ্য হইবে। উল্লিখিত তফসিলভুক্ত অপরাধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ধারা হলো দণ্ডবিধির ৪০৮। দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারাটি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গকরণ। দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারাটি দুদক আইন ২০০৪ আগে আপসযোগ্য ছিল। তবে আপস করতে হলে তা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে হতে হবে।

দুর্নীতি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। সম্ভাবনার এ দেশটি যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সূচকে পৌঁছাতে পারছে না, তার মূলে রয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে শুধু দেশের অগ্রযাত্রাই ব্যাহত হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক সূচকে বাংলাদেশ প্রতি বছরই থাকছে শীর্ষদেশের তালিকায়। শুধু নীতিনৈতিকতা জাগ্রত করে দুর্নীতি বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধক শক্তিশালী সংস্থাই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে একটি কমিশনে রূপান্তর ঘটানোর পর সংস্থাটি যখন দুদক নাম ধারণ করেছিল, তখন সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল এই ভেবে যে, এবার একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে দুদক দুর্নীতি দমনে কাযর্কর ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *