মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অসংগতি
অর্থায়ন-সংকট না রাজনৈতিক অপরিপক্বতা

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করতে অবকাঠামো খাতে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। একসঙ্গে এতগুলো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম। এর মধ্যে সরকারের বর্তমান মেয়াদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বাকিগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশও চলতি মেয়াদেই শেষ করে অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়াই ছিল সরকারের লক্ষ্য। তবে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবে কোনো অগ্রগতিই হয়নি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল বা গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো শুরুই করা যায়নি। আর নানা জটিলতায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে নির্মিতব্য ঢাকা এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ের কাজও শুরু হয়নি। পিপিপির আরেক প্রকল্প গুলিস্ত্মান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের উদ্বোধনের তারিখ পেছানো হয়েছে চার দফা।

অথচ সবই ছিল সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। নিবার্চনী প্রতিশ্রুতি ও পরবর্তী সময়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার ২০১২ সালে, এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন চলতি বছরের মধ্যে, মেট্রোরেল ২০১৪ এবং পদ্মা সেতু ২০১৫ সালে চালুর ঘোষণা দিয়েছিল সরকার।

মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কী সমস্যা তা অনেক সরকারই নির্ধারণ করতে পারছে না। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে অর্থ দিলাম, কিন্তু কেন যে এটা হলো না তা নিশ্চিত নয়। তাই অর্থায়ন-সংকট নাকি দক্ষতার অভাব, কী কারণে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সার্বিক পর্যালোচনায় যে বিষয়টি দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কোনো সরকারেরই তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। প্রায় ১৫ বছর আগে নির্মিত হয় বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু। তা-ও আবার দুই সরকারের মেয়াদে। সেটা ছাড়া নিকট অতীতে কোনো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নও করা হয়নি। তাই একসঙ্গে এতগুলো মেগা প্রজেক্ট শুরু করতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট খেয়েছে সরকার।

পদ্মা সেতু : মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রথম দফা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০০১ সালের ৪ জুলাই (২৮ মে, বণিকবার্তা)। নিবার্চনে জয় লাভ করলে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে বলে সে সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর চারদলীয় সরকার, তত্ত্বাবধায়ক ও বর্তমান সরকারের মিলিয়ে ১২ বছর কেটে গেছে। এখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই কথা বলছেন। গেল সপ্তাহেই তিনি বলেছেন, আগামী নিবার্চনে  জয়ী হলে তার সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ সেতু নির্মাণ করবে।

এদিকে সরকার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ রেখেছে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অথচ ২০১০-১১ অর্থবছরেই এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার কথা রয়েছে ৭ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫ হাজার ৯৫ কোটি টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা; যা ২০১১-১২, ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়ার কথা। অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্মাণ শেষে উদ্বোধন করা হবে। অর্থাৎ সরকারের ঘোষিত সময়সীমার চেয়ে তিন বছর পিছিয়ে আছে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন।

এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বৈশ্বিক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ক্রমশ সঞ্জীবনী শক্তি হারাচ্ছে। অথচ ২০১০-১১ অর্থবছরে অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী ছিল। ফলে দুর্নীতির দোহাই তুলে দাতাদের ঋণসহায়তা বন্ধ করে দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সরকার সে সময়ই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ শুরু করতে পারত। সেটাই বরং ছিল বেশি যুক্তিযুক্ত। তা না হওয়ার পরের গল্পটা সবারই জানা। নিবার্চনী বছরে এসে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত সব মহল।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু : মাওয়া-জাজিরা প্রান্তের ১ম পদ্মা সেতুর অনিশ্চয়তার মধ্যে চমক হিসেবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণ শুরু করতে চেয়েছিল সরকার। পিপিপির ভিত্তিতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

জাতিকে চমক দেখাতে তড়িঘড়ি ২০১১ সালের অক্টোবরে অর্থনীতি-সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের পর নভেম্বরেই আহ্বান করা হয় প্রাথমিক দরপত্র। পিপিপিতে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে এঙ্প্রেশন অব ইন্টারেস্ট বা ইওআই আহ্বানের আগের তৈরি করা হয়নি প্রকল্পটির প্রজেক্ট ডকুমেন্ট। সাধারণ দরপত্রের সঙ্গে পিপিপির দরপত্রের পার্থক্য বুঝতে সরকারের খুব বেশি সময় লাগেনি।

কোনো ধরনের প্রস্তুতি এমনকি বিস্তারিত নকশা (ডিটেইল ডিজাইন) ছাড়া শুধু সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ইওআই আহ্বান করে বিপাকে পড়ে সরকার। প্রথম দফায় দুই মাস ও পরে আরও দুই মাস সময় দিয়ে আবেদন জমা পড়ে মাত্র তিনটি। অথচ প্রাথমিক দরপত্র আহ্বানের পর অন্তত ১২টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি এ সেতু প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল।

কারণ খুঁজতে গিয়ে সরকার দেখে, বিনিয়োগ থেকে বছরে কী পরিমাণ রিটার্ন (মুনাফা) পাওয়া যাবে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। ফলে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঝুঁকি কেউ নিতে যাবে না। ফলে, দেড় বছর ধরে পড়ে আছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের চমক।

মেট্রোরেল : ২০১১ সালে মেট্রোরেলের নকশা প্রণয়ন ও ২০১৩ মূল কাজ শুরুর কথা ছিল। তবে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া ও বিমানবাহিনীর আপত্তিতে দুই দফা রুট পরিবর্তন করতে গিয়ে পেরিয়ে গেছে দুই বছর। গত বছর ডিসেম্বরে প্রকল্পটির অনুমোদনের পর মার্চে ঋণদাতা সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়। বর্তমানে চলছে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের কাজ।

এর পর শুরু করা হবে প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন ও জমি অধিগ্রহণ। এতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর। ফলে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ পিছিয়ে গেছে তিন বছর। ২০১৬ সালের আগে এর কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না। যদিও ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সরকার নিবার্চনের আগে লোকদেখানো ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

এক ঘণ্টার মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিলে পৌঁছানো আর ভয়াবহ যানজট থেকে মুক্তি পেতে রাজধানীবাসীকে অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। প্রথম ধাপে সে বছর পল্লবী থেকে সোনারগাঁও হোটেল পযর্ন্ত চালু করা হবে মেট্রোরেল। এর পরের বছর শেষ হবে সোনারগাঁও থেকে মতিঝিল পযর্ন্ত । আর শেষ ধাপে ২০২১ সাল নাগাদ উত্তরা থেকে পল্লবী অংশ চালু হবে।

প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে এ পযর্ন্ত মাত্র ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে তা এখনো ব্যয় হয়নি। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ শুরু না হলে এ অর্থও পুরোটা ব্যয় হবে না।

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন : বাণিজ্যিক নগর চট্টগ্রামের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ ও দ্রুত করতে অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেন করার কথা বলা হচ্ছে দুই দশক ধরে। ১৯৬৭ সালে এ জন্য জমি অধিগ্রহণ করে রাখা হলেও মহাসড়কটি চার লেন করা এখনো রয়ে গেছে সুদূর পরাহত।

সময়ের পরিক্রমায় বেদখল হয়েছে সরকারের এসব জমি। বসতবাড়ি ছাড়াও ওই জমিগুলোতে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা, মসজিদ, কবরস্থান, মন্দির আর স্কুল। মহাসড়কটি চার লেন করতে গিয়ে এগুলো স্থানান্তরের জন্য সরকারকে এখন উল্টো ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে।

সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ ঠিকাদার নিয়োগের ৩ বছরে প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তিন দফা লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিলেও তা অর্জনে ব্যর্থ হয় সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর (সওজ)। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এক বছর।

বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় প্রকল্পটির ব্যয়ও বেড়েছে দুই দফা। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি আর ডিজাইন পরিবর্তনের অজুহাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের ব্যয় ফেব্রুয়ারিতে বাড়ানো হয় ৯২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই প্রকল্প-ব্যয় ২১৫ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। সে সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ৩ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। ২০০৬ সালে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি যথা সময়ে বাস্তবায়নে তিন বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এক হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে শেষ ছয় মাসে দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ এ প্রকল্প আরও পিছিয়ে যাবে। এ ছাড়া নিবার্চনী বছরে উন্নয়নকাজের স্বাভাবিক গতি সব সময়ই কমে যায়। এ অবস্থায় কবে নাগাদ প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।

গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার : পিপিপির প্রথম প্রকল্প গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী (মেয়র মোহাম্মদ হানিফ) ফ্লাইওভার নিয়ে বিপাকে আছে সরকার। এ পযর্ন্ত চার দফা পেছানো হয়েছে প্রকল্পের উদ্বোধনের তারিখ। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো প্রকল্পটির ৩০ ভাগ কাজ বাকি রয়ে গেছে। যেকোনো মূল্যে আগামী জুলাইয়ের মধ্যে আংশিক কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। নিবার্চন সামনে রেখে আগস্টের কোনো এক সময়ে ফ্লাইওভারটির আংশিক উদ্বোধন করা হবে।

২০১০ সালের জুনে উদ্বোধনের সময় আড়াই বছরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা ছিল। বিজয় দিবসের উপহার উপলক্ষে গত ১৬ ডিসেম্বরে এটি উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারায় তা পিছিয়ে জানুয়ারির শেষ দিকে নির্ধারণ করা হয়। ইংরেজি নতুন বছরে রাজধানীবাসীকে উপহার হিসেবে এ ফ্লাইওভার খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

এতেও ব্যর্থ হওয়ায় স্বাধীনতা দিবসের উপহার হিসেবে উদ্বোধনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৬ মার্চ। কিন্তু মার্চের মধ্যে মাত্র ৬৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে ৩০ জুন নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হতে বর্তমান সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে। তাই জুনের মধ্যে পুরো ফ্লাইওভারের পরিবর্তে আংশিক উদ্বোধনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হয় তারা।

দফায় দফায় সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে ফ্লাইওভারের নির্মাণ-ব্যয়। বর্তমানে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে সরকার দুই হাজার ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় অনুমোদন করেছে। আর ৩০০ কোটি টাকা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। যদিও নির্মাণকাজ পরিচালনাকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যয় হবে ৭৮৮ কোটি ৯০ হাজার ৩৮১ টাকা। আর ২০০৪ সালে নির্মাণ-উদ্যোগ নেওয়ার সময় ব্যয় ধরা হয় ৩৩৭ কোটি টাকা।

ঢাকা এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ে : পিপিপির আরেক মেগা প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ে বাস্তবায়নের শুরুতেই হোঁচট খায় সরকার। এটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়। সে বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী এঙ্প্রেসওয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পটির অগ্রগতি সেই পযর্ন্তই। ২০১১ সালের জুলাইয়ে নির্মাণকাজ উদ্বোধনের কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি।

এর পর রুট জটিলতা, দৈর্ঘ্য কমানো-বাড়ানো, ডিজাইন পরিবর্তন-এসব নিয়ে পেরিয়ে গেছে দুই বছর। অর্থ জোগাড় করতে না পারায় দুই দফা নির্মাণ শুরুর তারিখ পেছায় ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। পরে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এড়াতে গত বছর ১৭ মে প্রধানমন্ত্রী এর দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার কমিয়ে দেন। আয় ৩৫ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এতে আগ্রহ হারায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

রুট পরিবর্তন করে আগে এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে এঙ্প্রেসওয়েটি নির্মাণ করতে আগ্রহী ইতালিয়ান-থাই কোম্পানি। এ জন্য নতুন নকশা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছর ডিসেম্বরে উদ্বোধনের কথা থাকলেও কবে নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে তা অনিশ্চিত।

গভীর সমুদ্রবন্দর : এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা বেশ কয়েক বছর আগে নেওয়া। তিন পর্যায়ে এ বন্দরের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ‘গভীর সমুদ্রবন্দর সেল’ নামের একটি সেলও উদ্বোধন করা হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রথম পযার্য় সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়। সে পযর্ন্তই সীমাবদ্ধ সমুদ্রবন্দর নির্মাণ-প্রক্রিয়া।

গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে বিনিয়োগে বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখালেও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পায়নি সরকার। পিপিপির ভিত্তিতে বিনিয়োগ প্রস্তাব দেওয়ার জন্য আগ্রহী সাত দেশকে চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বিনিয়োগকারীর অভাবে আটকে গেছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ।

কর্ণফুলীতে টানেল নির্মাণ : ২০১০ সালে চট্টগ্রামে টানেল নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এর আগে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নিবার্চনে র আগে লালদীঘি ময়দানে জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে গত ডিসেম্বরে। চীন, কুয়েতসহ কয়েকটি দেশ এ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে চাইলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি। এ ছাড়া টানেলের বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়নি। এতে বছর খানেক সময় লাগতে পারে। ফলে কবে নাগাদ দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ শুরু হবে তা কারোর জানা নেই।

অনিশ্চয়তার পথে পিপিপির প্রকল্প : পিপিপিতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা ২০১১ সালের মার্চে। প্রকল্প সম্ভাবনা যাচাই ছাড়াই দরপত্র আহ্বান করে তেমন সাড়াই পায়নি সরকার। প্রকল্প ডকুমেন্ট আর পরামর্শক নিয়োগ ছাড়া আহ্বান করা দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র দুই প্রতিষ্ঠান। পরে তা বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু এতেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থার পরও পিপিপিতে বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু চার লেন প্রকল্প ও তৃতীয় সমুদ্রবন্দর প্রকল্প রাখা হয়েছে। বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তৃতীয় বিশ্বের দেশে পিপিপিতে বিনিয়োগ করে তা তুলে নেওয়ার সুযোগ কম থাকলেও এ খাতে বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রকল্পের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

২০১০-১১ অর্থবছরে পিপিপির প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ১৬টি ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৬টি। আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে প্রকল্প রাখা হচ্ছে ৪৪টি। এর মধ্যে সড়ক বিভাগের ১৬টি, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ৪টি, বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৭টি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৪টি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ২টি, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২টি, কৃষি খাতের ১টি এবং পল্লী উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের ২টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এগুলো বাস্তবায়নে সরকার পিপিপি খাতে চার অর্থবছরে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছর আরও ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় এ অর্থ অলস পড়ে থাকছে।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *