‘শিল্প পুলিশ’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূর প্রসারী চিন্তার ফসল -অতিরিক্ত আইজিপি মো. শফিকুল ইসলাম

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এ কে আজাদ মুন্না

মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও বাংলাদেশ পুলিশ ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি। ১৯৯১ সালে এএসপি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন পাবনা জেলার কৃতি সন্তান মো. শফিকুল ইসলাম।

সুদীর্ঘ চাকুরিজীবনে পুলিশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের অসংখ্য উদাহরন আছে বাংলাদেশ পুলিশের মেধাবী এই কর্মকর্তার।

অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-এর অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ পুলিশের এই আইকন।

মো. শফিকুল ইসলাম পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, থেকে অনার্স ও একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

অত্যান্ত মেধাবী ও দক্ষ পুলিশের এই কর্মকর্তা কর্মজীবনের ন্যায়, ছাত্রজীবনেও সকল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।

চাকুরী জীবনে তিনি খুলনা ও মেহেরপুরে সার্কেল এসপি, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুরে দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে।

এছাড়াও পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, গোপালগঞ্জ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, গাজীপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলায়। এআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে বৃহত্তর “ঢাকা রেঞ্জ” দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন।

ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন  শফিকুল ইসলাম।

অতিরিক্ত আইজিপি শফিকুল ইসলাম ১৯৯৭ সালে এ্যাংগোলা এবং ১৯৯৯-২০০১ সাল পর্যন্ত কসোভোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যান্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

দৃষ্টন্তমূলক ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২ বার বাংলাদেশ পুলিশ পদক বিপিএম, একবার রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক পিপিএম ও আইজিপি’স গুড সার্ভিস  সম্মানে ভূষিত হন ২ বার।

এছাড়া লেখক হিসেবেও সু-পরিচিতি আছে, অতিরিক্ত আইজিপি শফিকুল ইসলামের। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লিখা ৪টি বই।

ব্যক্তিগত জীবনে অতিরিক্ত আইজিপি মো. শফিকুল ইসলাম এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জনক। সহধর্মিনী বেগম মালেকা খায়রুন্নেছা অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে।

বাংলাদেশ পুলিশের এই সিনিয়র কর্মকর্তার সাথে তাঁর কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন, ’সময় বিচিত্রা’র নির্বাহী সম্পাদক এ কে আজাদ মুন্না।

 

সময় বিচিত্রা : আপনি কেমন আছেন?

মো. শফিকুল ইসলাম : আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভাল আছি। আমাদের চাকুরীতে কাজের মধ্যেই ভাল থাকতে হয়।

 

সময় বিচিত্রা : বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের গল্পটা শুনতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : আমার মনে হয় ভালো একটি চাকরির স্বপ্ন ছাত্রজীবনে সবাই দেখে থাকেন, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভবিষৎ একটু বেশি ভাবায়। ইচ্ছে ছিল একটি ভালো ক্যাডারে চাকরি করা এবং সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুতও করেছিলাম। যথারীতি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিলাম এবং সৌভাগ্যবশত টিকেও গেলাম। তবে হ্যাঁ, যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে ভালো একটি চাকরির জন্য। আসলে ভালে কিছু পেতে হলে পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। আর পুলিশের চাকরিতো একটু ভিন্নধর্মী, এখানে মানুষের সেবা করার সরাসরি অনেক সুযোগ রয়েছে। ছোটবেলায় পুলিশের একজন এস.আই কে অনেক বড় কর্তা মনে হতো। আর সরাসরি এএসপি হিসেবে চাকরি পাওয়া তো বুঝতেই পারছেন জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল এটি।

সময় বিচিত্রা : ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ প্রকৃতপক্ষে বিগত ৫০ বছরে পুলিশ কতটুকু জনগণের বন্ধু হতে পেরেছেন? এ ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন?

মো. শফিকুল ইসলাম : স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছে, পুলিশ জনগণের প্রকৃত বন্ধু হতে পেরেছে কিনা? উত্তরটি হলো হ্যাঁ আবার কিছুটা না। যদি আমরা ব্রিটিশ শাসনের পুলিশের আচরণ এবং কার্যক্রম বিশ্লেষণ করি তাহলে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেক শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা পুলিশের চাকুরীতে পছন্দ করে যোগদান করে মূলত দেশ সেবার প্রত্যয় নিয়ে। আর আমাদের দেশটি গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে সকল ধরণের মিডিয়া উন্মুক্ত ও স্বাধীন। একই সাথে সোশ্যাল মিডিয়াও বেশ একটিভ। ফলে অপরাধ সহ সকল তথ্য নিমিষেই মানুষ জানতে পারে। এতে করে পুলিশকেও বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পুলিশ এখন গণমুখী পুলিশিংয়ের বিভিন্ন ফর্ম যেমন কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিং, ওপেন হাউজ-ডে সহ বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পুলিশি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে এবং তথ্য প্রাপ্তির জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস, তথ্য ও অভিযোগ বক্স, ফেসবুক পেজ সহ বিভিন্ন আধুনিক এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন মানুষের সাথে পুলিশের দূরত্ব কমছে, একইসাথে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য প্রাপ্তি সহজ হচ্ছে। ফলে মানুষ চাইলেই পুলিশকে বন্ধু হিসাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল বুঝাবুঝি থেকে যায়। পুলিশ ভীতিও পুরোপুরি দূর হয়েছে বলা যাবে না। ফলে শতভাগ না হলেও আমি বলবো বর্তমান পুলিশ জনগণের বন্ধুর মতোই আচরণ করছে এবং মানুষের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। দেশের আভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সফলতার স্বাক্ষর রাখছে এবং সরকারের উন্নয়নমূলক সকল কাযর্ক্রমে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। এতে একদিকে যেমন, আইন-শৃংখলার উন্নয়ন ঘটছে অপরদিকে কাযর্ক্রমও সহজেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সময় বিচিত্রা : আপনি কতটুকু জনগণের পুলিশ হতে পেরেছেন?

মো. শফিকুল ইসলাম : আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে একজন সরকারি কর্মচারী এবং জনগণের সেবক মনে করি। আমার সমুদয় কাযর্ক্রম জনসাধারণকে নিয়েই। আমার উল্লেখযোগ্য কাজ হল আইন-শৃংখলার উন্নয়ন ঘটানো, মানুষের মধ্য হতে পুলিশ ভীতি দূর করা, ভাল কাজে উৎসাহিত করা, খারাপ কাজ হতে নিবৃত্ত রাখা এবং কোন অপরাধ সংঘটিত হলে সেটি উদঘাটন এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাযর্ক্রম গ্রহণ করা। এগুলোর কোনোটিই জনগণের সম্পৃক্ততা এবং সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। সকল শ্রেণী-পেশার জনসাধারণকে সাথে নিয়ে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে আমি চেষ্টা করেছি এবং এখনো করছি। ফলে আমি বিশ্বাস করি, ব্যক্তিগতভাবে আমি জনগণের পুলিশ, একই সাথে আমার অধীনে যাঁরা চাকরি করছেন, তাদেরকেও জনগণের পুলিশ হতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করছি।

 

সময় বিচিত্রা : আমরা জানি, আপনি একজন মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। আপনার চাকুরী জীবনে বেশিরভাগ সময়ই মাঠে ময়দানে কেটেছে। গোপালগঞ্জ, গাজীপুর, ও মুন্সিগঞ্জসহ ৫/৬ টি জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন ঢাকা রেঞ্জ এ্যাডিশনাল ডিআইজি, রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার এবং বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি। এসব জায়গায় চাকুরীকালীন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কিছু অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : আমার চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে মাঠে এবং মূল পুলিশিং এর সাথে। সার্কেল এএসপি, জেলার এ্যাডিশনাল এসপি, জেলার এসপি, রেঞ্জের এ্যাডিশনাল ডিআইজি, এ্যাডিশনাল পুলিশ কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি সহ মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন পদে অনেক বছর চাকরি করেছি। ফলে অভিজ্ঞতার ঝুলি একেবারে ছোট নয়। আসলে মানুষের উপকার করার মধ্যেই আনন্দ। বিশেষ করে অজ্ঞাত কোন ঘটনা উদঘাটন করতে পারলে মনে হয় কিছু করতে পেরেছি।

আমি তখন এএসপি হিসেবে একটা জেলায় কর্মরত। জেলাটির একটি বড় অংশের পাশ দিয়ে অণ্য দেশের সীমান্ত থাকায় ওই সময় অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির মতো কিছু ঘটনা ঘটতো। একদিন সন্ধ্যার পরপরই সীমান্ত এলাকায় একটি ছেলেকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে সীমান্তের জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে স্বজনদের কাছে চাঁদা দাবি করে। খবর পেয়ে আমরা গেলাম, সমস্যা ছিল-সন্ত্রাসীরা যদি বুঝতে পারে পুলিশ এসেছে তাহলে অপহরণের স্বীকার ছেলেটিকে হত্যা করার সম্ভাবনা আছে। ফলে অনেক সতর্কভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিল আমাদের; যাতে সন্ত্রাসীরা আমাদের উপস্থিতি টের না পায়। আমরা সফল হয়েছিলাম এবং খুব কৌশলে অপহ্নত ছেলেটিকে উদ্ধার করে তাঁর স্বজনদের হাতে তুলে দিতে পেরেছিলাম। সেদিন স্বজনদের চোখে-মুখে যে আনন্দ এবং তৃপ্তির অভিব্যক্তি দেখেছি সেটি কখনো ভুলার মত নয়।

এছাড়াও রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন আমি মাদক নিয়ে বিস্তর কাজ করেছি। মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদকাসক্তদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং এক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছি। আমাদের এ প্রচেষ্টায় ৩৫০ জনের অধিক মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। একদিন মাদক থেকে ফেরা এক ব্যক্তি তাঁর মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে আমার অফিসে কৃতজ্ঞতা জানাতে আসেন ঐদিন মাদক থেকে ফিরে আসা ওই ব্যক্তির স্বজন, দুই ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে যে আনন্দ এবং তৃপ্তির অভিব্যক্তি দেখেছি, তাতে সত্যিই মনে হয়েছিল মানুষের জন্য কিছু হলেও করতে পেরেছি। এই ছেলেটির মত মাদক ছেড়ে যাঁরা আমাদের প্রচেষ্টায় পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন, তাদের কথা যখনই ভাবি, নিজের মধ্যে এক অন্যরকম ভাললাগা অনুভব করি।

সব সময় চেষ্টা করেছি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের সমস্যা সমাধান করতে কতটুকু পেরেছি জানি না, তবে চেষ্টার ক্রটি করিনি।

সময় বিচিত্রা : সন্ত্রাস ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বিভাগ ও সাধারণ মানুষের মাঝে আপনার বিশেষ সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে আপনি যখন বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি ছিলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আপনার বহু কর্মতৎপরতা আমরা দেখেছি। সে সম্পর্কে একটু জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : শুধু বরিশালে নয়, আমি কাজটি মূলতঃ শুরু করেছিলাম রাজশাহীতে পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন। তারই ধারাবহিকতায় বরিশালেও মাদক নিয়ে কিছু কাজ করেছি। মাদক ব্যবসা একবার কেউ শুরু করলে  সাধারণত বাদ দিতে পারে না, কারণ এতে লাভ অনেক বেশি। আর মাদক ব্যবসা করতে থাকলে একসময় পুলিশ তাকে ধরবেই অর্থাৎ তাকে জেলে যেতে হয় আর জেলে গেলে বেশ কিছু টাকা ব্যয় হয়। সংসার চালানোর জন্যেও ধারদেনা করতে হয়। জামিন পাওয়ার পর ধার শোধ করার জন্য পুনরায় সে মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়। এভাবে একের পর এক মামলা হতে থাকে আর ক্রমবর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য তাকে ইনকাম এর পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হয়, যেটি তার জন্য সাধারণত মাদক বিক্রি ছাড়া অন্য কোনভাবে সম্ভব নয়। বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় (১) মাদক বিক্রি করা (২) পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হওয়া (৩) জেলখানায় যাওয়া (৪) জামিন/সাজা ভোগ করে জেল থেকে বের হওয়া (৫) অর্থের প্রয়োজনে পুনরায় মাদক বিক্রি শুরু করা। এটিকে ড্রাগ সাইকেল বা মাদকচক্রও বলা যেতে পারে। এই চক্র না ভাঙলে মাদক ব্যবসায়ীকে মাদক থেকে ফিরিয়ে আনা মোটামুটি অসম্ভবই বলা যায়। এজন্যই আমি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করেছি এবং অনেকাংশেই সফল হয়েছি। একইভাবে মাদসেবীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যতীত তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কষ্টসাধ্য। অনেক মাদসেবীকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছি। এভাবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বাস্তবতা বিবেচনায় মাদক চক্র (Drug Cycle) ভেঙ্গে অনেক মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদকসেবী কে সমাজের আর দশজন মানুষের ন্যায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছি। বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি থাকাকালীন মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদকসেবীদের স্বাভাবিক জীবনের ফিরিয়ে আনার সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।

 

সময় বিচিত্রা : পুলিশ শতভাগ আন্তরিক হলে এ দেশ থেকে মাদক দ্রব্য পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব। এ ব্যাপারে আপনার মতামত।

মো. শফিকুল ইসলাম : আমি মনে করি, পুলিশ শতভাগ আন্তরিক হলে এ দেশ থেকে মাদক দ্রব্য পুরোপুরি নির্মূল না হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ নির্মূল হবে, তবে সেক্ষেত্রে অব্যশই সরকারের অন্যান্য সংস্থাকেও আন্তরিক হতে হবে এবং সাধারণ জনগণকে মাদকদ্রব্য গ্রহণের কুফল সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশে মাদক দ্রব্য উৎপাদন হয় না বলা চলে, অধিকাংশ মাদক আসে পাশ্ববর্তী দেশসমুহ থেকে। সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি ও তল্লাশী কার্যক্রম নিশ্চিত করলে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অবাধ প্রবাহ অনেকাংশে বন্ধ হবে। এছাড়াও আপনি জানেন, দেশের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদাভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরো বৃদ্ধি করতে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সময় বিচিত্রা :  আমরা জানি, আমাদের পুলিশ বাহিনী পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশ বাহিনী থেকে অনেক মেধাবী ও দক্ষ। বিভিন্ন মিশনে তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার দায় কতটুকু?

মো. শফিকুল ইসলাম : আপনি ঠিুকই বলেছেন, পুলিশ বাহিনীতে এখন অনেক মেধাবী ছেলে মেয়েরা আসছে। তাঁরা শুধু জাতিসংঘ মিশনেই নয় আমাদের দেশেও অনেক ভালো কাজ করছেন। আর মাদকদ্রব্য নির্মূল শুধুমাত্র একটি বাহিনী দ্বারা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর, বাহিনী এবং সাধারণ মানুষকেও আরো সম্পৃক্ত হতে হবে। আমি বলব অবস্থার অনেক উন্নতি হচ্ছে।

সময় বিচিত্রা : পুলিশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীতে ডোপ টেস্ট-এর মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চাকুরীতে মাদকাসক্ত ব্যক্তি প্রবেশ বন্ধ করতে পারলে তা হবে মাদক নির্মূলে একটি বড় পদক্ষেপ। এতে করে চাকরি প্রত্যাশীরা মাদক থেকে দূরে থাকবে এবং বিষয়টি যখন সবাই জানবে, তখন সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী একটি মুভমেন্ট গড়ে উঠবে, ফলে মাদকের ব্যবহার এবং বিক্রয় নিশ্চিতভাবেই অনেকাংশে কমে আসবে। আমি মনে করি, সকল প্রকার চাকুরীতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। শুধু তাই নয় চাকরিরত অবস্থায় মাঝে মাঝেই ডোপ টেস্ট করা প্রয়োজন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা আবশ্যক।

সময় বিচিত্রা : আমরা জানি, প্রায় চার মাস আগে আপনি বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। বর্তমানে শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে কর্মরত আছেন। শিল্প পুলিশ-এর কর্মপরিধি সম্পর্কে একটু জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : শিল্পাঞ্চল পুলিশ বিধিমালা-২০১৭ অনুযায়ী, শিল্প পুলিশেল অধিক্ষেত্র হবে শিল্পাঞ্চল। অর্থাৎ, সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান, পণ্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান, কারখানা, রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, সরকারি বা বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল হলো শিল্প পুলিশের অধিক্ষেত্র। এছাড়াও শিল্পাঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা নিম্নে উল্লেখিত কার্যক্রমসমূহ করতে পারিঃ

✓ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন, বিপণন, বিনিয়োগের ও কার্যসম্পাদনের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

✓ শ্রম অসন্তোষ নিরসনে অগ্রীম তথ্য সংগ্রহ এবং তা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

✓ শিল্পাঞ্চল এলাকায় বসবাসরত সকল শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

✓ বিদেশী বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের গতিবিধি ও কার্যক্রম গোয়েন্দা নজরদারীতে রাখা, ওয়ার্ক পারমিট ভেরিফিকেশন করা এবং তাঁদের সকল তথ্য হালনাগাদ রাখা;

✓ শিল্প প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সমন্বয় সাধন করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উদ্ভুত কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা সুষ্ঠ সমাধান নিশ্চিত করা;

✓ শিল্পাঞ্চলে গুজব বা শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টিকারী ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

শিল্প পুলিশ শিল্প সংক্রান্ত অনেক মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে আইনের শাসন নিশ্চিত করছে।

সময় বিচিত্রা : নতুন কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা একটু জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : ‘শিল্প পুলিশ’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুদূর প্রসারী চিন্তার ফসল হলো । শিল্পাঞ্চলের আইন-শৃংখলার পরিস্থিতি, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তিনি ২০১০ সালে শিল্প পুলিশ নামে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। শিল্প পুলিশ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিল্পাঞ্চল এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য যথেষ্ট কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে আপনি লক্ষ্য করবেন, বর্তমানে শিল্প সেক্টরে শ্রম অসন্তোষ আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বাড়ছে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা, বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মসংস্থান হচ্ছে অসংখ্য মানুষের, বৃদ্ধি পাচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা। ফলে বাড়ছে রপ্তানি আয়ের পরিমাণও। বর্তমানে দেশের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাঁর জন্য শিল্প পুলিশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে এবং শিল্প পুলিশের প্রত্যেক সদস্যদের ন্যায় আমিও এর জন্য গর্ববোধ করি।

সময় বিচিত্রা : আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখেছি, গার্মেন্টস সেক্টরে সবসময় শ্রমিক অসন্তোষ লেগেই থাকে। বিশেষ করে দুটি ঈদের আগে বেতন ভাতার দাবিতে কলকারখানা ভাংচুরসহ শ্রমিকদেরকে রাস্তা অবরোধ করতে দেখা যায়। আপনি যোগদান করার পর যদিও সেসব ঘটনা বড় আকারে খুব একটা ঘটেনি; এ সম্পর্কে একটু বলবেন।

মো. শফিকুল ইসলাম : অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে আমি ঢাকা রেঞ্জে কাজ করেছিলাম। ফলে শিল্প-কারখানার সমস্যার বিষয়ে আমার কিছুটা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। শিল্প পুলিশে যোগদানের পর ঈদের আগে শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ভাই-বোনদের বেতন-বোনাস সংক্রান্ত পাওনা নিশ্চিত করার জন্য আমি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

সার্বক্ষণিকভাবে সকল শিল্পাঞ্চল জোনের পুলিশ সুপার সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রেখেছি। শিল্প প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্নসংগঠন যেমন বেপজা, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ, কল-কারখানা অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ও নেতৃবৃন্দের সাথে এসংক্রান্তে বিশেষ সভা সহ প্রয়োজনীয় যোগাযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে এ্যাডভান্সড্ ইনফরমেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিটি ফ্যাক্টরির তথ্যাদি সংগ্রহ করে সেটি কাজে লাগিয়েছি। কোথাও সমস্যার সম্ভাবনা দেখা গেলে পুর্ব হতেই তা সমাধানের ব্যবস্থা করেছি। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সময়মত বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তি, এবিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়ে শিল্প পুলিশ কাজ করেছে। আমরা মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষভাবে কাজ করছি, কারণ শিল্প উন্নয়নে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সময় বিচিত্রা : চাকুরী জীবনের দুটি স্মরণীয় ঘটনা জানতে চাই।

মো. শফিকুল ইসলাম : স্মরণীয় ঘটনা তো অনেক আছে তবে মাননীয় প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পুলিশের জন্য সর্বোচ্চ পদক দু’বার বিপিএম এবং একবার পিপিএম পদক প্রাপ্তি আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

সময় বিচিত্রা : সুদীর্ঘ চাকুরিজীবনে নিজের সফলতা ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন করতে বললে, কী বলবেন?

মো. শফিকুল ইসলাম : চেষ্টা করেছি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে মিলে-মিশে কাজ করতে। চেষ্ট করেছি মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে। কাজ করেছি বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং, ওপেন হাউস-ডে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ ভীতি কমিয়ে পুলিশকে মানুষের বন্ধু হিসেবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছি। কখনও অপরাধীদের সাথে হাত মিলাইনি, সন্ত্রাসীদের সাথে আপোষ করিনি, ভালো মানুষের মূল্যায়ন করেছি, অধিনস্তদেরও সেভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছি। কতটুকু পেরেছি জানি না। তবে মনে হয় আরো অনেক কিছুই করার ছিল এবং আছে।

সময় বিচিত্রা : আজ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

মো. শফিকুল ইসলাম : আজ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী হবে উন্নত দেশের পুলিশ। ফলে উন্নত একটি দেশের নাগরিকদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এই সময়ের মধ্যে পুলিশকেও তাদের মানসিকতা, যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা সহ সার্বিক অবস্থার আরো উন্নয়ন ঘটাতে হবে । আমি আশাবাদী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নের্তৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, ইনশাল্লাহ আমরা ২০৪১ সনের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাব এবং বাংলদেশ পুলিশ বাহিনীও দেশের এই উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশও এ দেশের নাগরিক। ফলে তারাও সুনাগরিক হিসেবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে সার্বিক ভুমিকা পালন করবে।

 

সময় বিচিত্রা : আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. শফিকুল ইসলাম : আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *