ঘর বেঁধেছে মঠের চূড়ায়

শরীরের রং লাল ও সবুজশুধু রঙের কারণে নয়, কথা বলতে পারার কারণেও টিয়া সবার প্রিয়এরকমই একঝাঁক টিয়া থাকে আরাকুল মঠেমঠের ৫৪টি কোটরে তাদের বসবাসঝাঁক বেঁধে থাকে বলেই মঠটিকে সবাই ডাকে টিয়াবাড়িগাছগাছালিতে ভরা সে বাড়িতেঁতুল, চালতা, কদম, তাল, আম, লিচু, বরই ও নারকেলসব গাছেই এদের অবাধ বিচরণটিয়াগুলো ঝাঁক বেঁধে মঠের চূড়ায় উড়ে বেড়ায়এক গাছ থেকে অন্য গাছে গিয়ে বসেখাবারের খোঁজে উড়ে যায় অনেক দূরের ধান, সরষে কিংবা কোনো ফসলের মাঠেএদের খুনসুটি, ওড়াউড়ি আর কলকাকলিতে সর্বদা মুখর থাকে আরাকুল গ্রাম

 

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে এ গ্রামের অবস্থানএখানেই আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মঠটিএর উত্তরে আরাকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়পশ্চিমে জিন্দাপীরের মাজারপাশে মসজিদ ও ঈদগাহদক্ষিণে কবরস্থানমঠের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নয়ামাটি খালমঠটি কবে নির্মিত গ্রামবাসী সে কথা বলতে পারে নাগায়ে শিলালিপি না থাকায় স্থানীয় মানুষের ভাষ্যই ভরসাজনশ্রতি, জনৈক ঈশান দত্ত তার মায়ের স্মৃতি ধরে রাখতেই গড়ে তুলেছিলেন এই মঠএকসময় এখানে পূজা-অর্চনা হতো, এখন পরিত্যক্ত দেবোত্তর সম্পত্তিসবুজে ঘেরা নিরিবিলি মঠটি এখন কেবল টিয়াদের অভয়াশ্রম

 

আরাকুল মঠে টিয়াগুলো সারাক্ষণ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেসকাল ও বিকেলবেলা মঠের সব গর্তে টিয়াগুলো ঢুকে মাথা বের করে রাখেএক একটা গর্তে দু-তিনটা টিয়াকেও দেখা যায়টিয়াবাড়ির কাছেই থাকে অনন্ত ও সুজনদুজনই পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েপাঁচটি টিয়াকে ধরে ওরা খাঁচায় বন্দী করে রেখেছিলকথাও শিখিয়েছিলমিঠুবলতে পারতশাওনকে ডাকত ছাওনএকদিন হঠাৎ টিয়াগুলো খাঁচা কেটে উড়ে যায়বনের পাখি খাঁচায় রাখা অপরাধএটা জেনে ওরা প্রতিজ্ঞা করেছে, আর কখনো পাখি ধরবে নাকাউকে ধরতেও দেবে না

 

টিয়াবাড়ির সবচেয়ে কাছের বাসিন্দা তিন সন্তানের জননী সেলিনা আক্তারবারো বছর আগে বউ হয়ে এসেছেন এই গ্রামেটিয়াগুলো মাঝেমধ্যে সেলিনার ঘরের টিনের চালে এসে বসেকখনো গাছের ডালে মাথা নিচু করে ঝুলে থাকেআবার যখন মন চায়, চলে যায়তার বাচ্চারা কান্নাকাটি করলে টিয়া দেখিয়ে ছড়া বললে ওরা শান্ত হয়ে যায়

 

আরাকুল মঠে যে টিয়াগুলো থাকে এগুলো গোলাপিকণ্ঠী টিয়াএরাই হচ্ছে আমাদের সুলভ টিয়াখুবই সুদর্শন পাখিগোলাপিকণ্ঠী টিয়ার ইংরেজি নাম Rose-ringed Parakeetবৈজ্ঞানিক নাম Psittacula krameriকথা বলতে পারে বলে জনপ্রিয় পাখি হিসেবে পাহাড়ি ময়নার পরই তাদের স্থানসারা দেশেই কমবেশি টিয়া আছেআমাদের দেশে পাঁচ থেকে সাত প্রজাতির টিয়ার দেখা মেলেনিজেরা গর্ত করতে পারে না বলে গাছের প্রাকৃতিক খোঁড়ল কিংবা পাকা দালানকোঠার কোটরে বাসা বেঁধে থাকেগ্রামে আবাসস্থল কমে যাওয়ায় টিয়ারা এখন শহরমুখী

 

ঢাকা শহরে অসংখ্য টিয়া ডেরা বেঁধে থাকেখাবারের সন্ধানে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়সন্ধ্যায় আবার ঘরে ফেরেএরা খোলা বনভূমি, পাতাঝরা বন, বাগান, আবাদি জমি ও লোকালয়ে বিচরণ করেযেকোনো জায়গায় ঝুলতে বা দুলতে এদের জুড়ি নেই! ঠোঁটে ভয়ানক ধার! লোহার খাঁচা বাদে আর যেকোনো খাঁচাই কেটে উড়াল দিতে পারেপা দুটোকে ঠিক হাতের মতোই ব্যবহার করতে জানেধান, গম, পাকা মরিচের পাশাপাশি নানা রকমের শস্যদানা, কামরাঙা, কুল, শিমুলের মধু এবং সব ধরনের ফল টিয়াদের প্রিয় খাবারবাচ্চা ফোটায় বসন্ত থেকে গ্রীষ্মকালের মধ্যেমেয়ে টিয়া একাই ডিমে তা দেয়মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বায় এরা ১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকেগলায় লাল রঙের বন্ধনী দেখে পুরুষ টিয়া চেনা যায়

 

আরাকুলের মঠে বেশ ভালোই আছে টিয়াগুলোদেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়বিকেল গড়িয়ে এলে আরাকুল মঠ ছেড়ে চলে আসতে হয়পেছনে পড়ে থাকে একঝাঁক স্বাধীন টিয়া

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *