বিদায় শচীন, বিদায়। স্যালুট শচীন, স্যালুট।

বিদায়ী মঞ্চে কান্না এড়াতে পারলেন না শচীননিজে কাঁদলেন, অন্যদেরও কাঁদালেন! ক্যারিয়ারের ২০০তম টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন শচীন রমেশ টেন্ডুলকারসেই সাথে সমাপ্তি ঘটল ক্রিকেট ইতিহাসের বড় এক অধ্যায়ের

 

বিদায়ী টেস্টে শচীনের কান্না আনন্দের না দুঃখের তা বলা যাচ্ছে নাতবে তার চোখের জলেও লেখা হলো এক নতুন ইতিহাসযে ইতিহাসের লেখকের নাম শচীন রমেশ টেন্ডুলকার২৪ বছর যে মাঠে স্বপ্ন জয়ের বীজ বপন করেছেন, সেই মাঠ থেকে শেষবারের মতো বেরিয়ে যাওয়ার সময় আবেগে আপ্লুত হবেন, এটাই স্বাভাবিককারণ, শচীনও তো মানুষআবেগ তাকেও ছুঁয়ে যাওয়ার কথাযতই হ্যাট দিয়ে চোখের চল আটকে রাখতে চেয়েছেন, তা এড়াতে পারেনি ক্যামেরার লেন্স! যে উইকেটে দাঁড়িয়ে ২৪ বছর বোলারদের শাসন করেছেন, বিদায়বেলায় সেই উইকেটকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধায়

 

এখানেই শচীন ব্যতিক্রমবিদায়বেলায় শচীন কৃতজ্ঞতা জানালেন তার এই অর্জনের পেছনে যাদের অবদান, তাদের সবাইকেবাবা-মা-ভাই-বোন-স্ত্রী, বন্ধু, টিমমেট, কোচ, ফিজিও, সাংবাদিক, থেকে স্পনসর প্রতিষ্ঠান এমনকি নিজের ব্যক্তিগত ম্যানেজার, বাদ পড়েনি কারও নামসবার প্রতি নিজের এই অর্জনের পেছনে অবদান বলে স্বীকার করে নেন এই লিটল মাস্টার

 

শচীনের বিদায় টেস্ট

 

১৪ নভেম্বর নিজ শহর মুম্বাইয়ে নিজের শেষ টেস্ট খেলতে নামেন শচীনওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটসম্যানদের কল্যাণে সেদিনই ব্যাট হাতে নেমে পড়েন তিনিদর্শকদের উল্লাসে ভাসিয়ে দিন শেষে অপরাজিত থাকেন ৩৮ রানে৬২ রানের অপেক্ষা নিয়ে পুরো বিশ্বের শচীন-ভক্তরা রাত কাটানপরদিন আর মাত্র ৬২ রান দরকার বিদায় টেস্টে শত রান করার জন্যসেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা নায়কের জন্য এ হয়তো বেশি কিছু নয়স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট চালিয়ে সে পথেই যাচ্ছিলেন তিনিকিন্তু মাত্র ২৬ রান দূরে থাকতে শচীনের শেষ ইনিংস থেমে যায়বীরদর্পে ৭৪ রানের এক অসাধারণ ইনিংস খেলে বিদায় জানান বাইশ গজকে

 

শচীনের উইকেট নিয়ে ইতিহাসের অংশ দিওনারিন

 

শচীনের সঙ্গে ক্রিকেট মাঠে নামতে পারা যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই অন্য রকম এক স্মৃতি! হোক সেটা পক্ষে কিংবা বিপক্ষেআর শচীনকে আউট করে তার উইকেট নেওয়া যেকোনো বোলারের কাছে কাক্সিক্ষত ব্যাপার১৯৮৯ সালের ১৬ নভেম্বরটেস্ট অঙ্গনে প্রথম ব্যাট হাতে মাঠে নেমেছিলেন শচীনপ্রতিপক্ষ ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানসেদিনের বালক বীর শচীন টেন্ডুলকারকে প্রথম আউট করেন ওয়াকার ইউনুসওই টেস্টেই শচীনের মতোই যিনি খেলতে নেমেছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টওয়াকারের বলে এলোমেলো হয়ে যায় শচীনের স্টাম্পএরপর শচীন খেলেছেন একে একে আরও ১৯৯ টেস্টশচীনকে আউট করেছেন নামকরা বোলার থেকে শুরু করে তুলনামূলক কম পরিচিত বোলাররাওতবে টেস্ট ক্রিকেটে শচীনকে সবচেয়ে বেশি ৯ বার আউট করার কৃতিত্বটা ইংলিশ বোলার জেমস অ্যান্ডারসনের

 

এর পরই রয়েছেন লঙ্কান অফ স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরণটেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক মাত্র ৮ বার শচীনকে আউট করতে পেরেছেনতার পরই রয়েছেন ক্রিকেট ইতিহাসের আরেক অন্যতম সেরা পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রাতার নামের পাশে শচীনের উইকেট মাত্র ৬ বারআর ৫ বার শচীনকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার ড্যানিয়েল ভেট্টরি

 

ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টে শচীনের উইকেট নিয়েছেন ক্যারিবীয় স্পিনার দিওনারিনশচীনের জীবনের শেষ উইকেটে নিয়ে দিওনারিনও নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেনশচীনের উইকেট নিয়ে তিনিও যে ঢুকে পড়লেন ইতিহাসে! আগামী দিনে কোনো কুইজ প্রোগ্রামের প্রশ্ন যদি হয়; টেস্টে শচীনকে শেষবার কে আউট করেছিলেন; উত্তরটা হবে নরসিংহ দিওনারিন

 

ব্যাট হাতে হয়তো শচীন রমেশ টেন্ডুলকারকে আর কখনো বাইশ গজের উইকেটে দেখা যাবে নাতবে শচীন তার ক্রিকেট-জীবনে যেসব রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন, তা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে আজন্মকারণ, শচীনের মতো ক্রিকেটার জন্ম নেয় শত বছরে একবারআরও একজন শচীনকে দেখতে ক্রিকেট বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে হয়তো শত বছরবিদায় শচীন, বিদায়স্যালুট শচীন, স্যালুট

 

 

 

শচীনের কিছু রেকর্ড

 

* ২৪ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে শচীন টেন্ডুলকার বিশ্বব্যাপী ৯০টি ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুতে খেলেছেন, যা একজন ক্রিকেটার হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভেন্যুতে খেলার রেকর্ড

 

* ওয়ানডে ক্রিকেটে শচীন টেন্ডুলকার একমাত্র ক্রিকেটার, যার ঝুলিতে ১৫ হাজারের বেশি (১৮ হাজার ৪২৬) রানের সঙ্গে রয়েছে ১৫০টির বেশি (১৫৪টি) উইকেট

 

* ওয়ানডে ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বাধিক ১ হাজার ৮৯৪ রান করেছেন শচীন টেন্ডুলকার, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে রেকর্ডএর মধ্যে ৯টি সেঞ্চুরিও ছিল তার

 

* মোট ৬টি বিশ্বকাপ (১৯৯২-২০১১) খেলেছেন শচীন টেন্ডুলকারসব মিলিয়ে তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫৬০ রান করেছেন ৫৬.৯৫ গড়েযেকোনো ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে এটাই ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সংগ্রহ

 

* শচীন টেন্ডুলকার ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে পক্ষে-বিপক্ষে মোট ৯৮৯ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলেছেনএর মধ্যে স্বদেশি (ভারতীয়) ক্রিকেটার ছিলেন ১৪১ এবং প্রতিপক্ষের ছিলেন ৮৪৮ জন

 

* ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বাধিক ৬২ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও সর্বাধিক ১৫ বার ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার জেতেন শচীন

 

* ২৪ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে মোট ৫১টি সেঞ্চুরি করেন শচীন

 

* ওয়ানডেতে ২০১২ সালে এশিয়া কাপে ঢাকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে শচীন করেছিলেন গৌরবের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি, যা ছিল ওয়ানডেতে ৪৯তম এবং ওটাই ছিল ক্যারিয়ারের সর্বশেষ সেঞ্চুরি

 

* টেস্ট ক্রিকেটের ২০০ টেস্ট খেলা একমাত্র ক্রিকেটার হচ্ছেন শচীন টেন্ডুলকার

 

* ২৩ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে শচীন খেলেছেন ৪৬৩টি ম্যাচ, যা যেকোনো ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড

 

 

শচীনের অন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

 

টেস্ট             ইনিংস            রান     সেঞ্চুরি      গড়

 

২০০             ৩২৯             ১৫৯২১৫১         ৫৩.৭৮

 

ওয়ানডে           ইনিংস            রান   সেঞ্চুরি      গড়

 

৪৬৩             ৪৫২             ১৮৪২৬৪৯         ৪৪.৮৩

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *