রাজতন্ত্র আর কত দিন? | সময় বিচিত্রা
রাজতন্ত্র আর কত দিন?
নাজমুল আশরাফ
17_2

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি-বন্দনার বিষয়টা আবারও সামনে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্যকে ঘিরেএরপর যোগ হয়েছে জয়ের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মোরগ-পোলাও রান্নার খবরতারপর মাকে নিয়ে পিতৃভূমি রংপুরে গিয়ে জনসভায় ভাষণ দেওয়াসবশেষ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসএই সব নিয়েই এখন চলছে জয়-বন্দনা, দলে এবং দলের বাইরেযুবলীগের ইফতার পার্টিতে জয় বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে, সংখ্যা আছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবেতার এই বক্তব্যকে ষড়যন্ত্রবলেছে বিএনপিসবকিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজা রাজনীতিবিদদের পুরোনো অভ্যাসতবে এখানে ষড়যন্ত্র খোঁজার একটু সুযোগ আছেসেই সুযোগটা করে দিয়েছেন জয় নিজেই তার ভাষার মাধ্যমেতিনি যখন বলেন তার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে, তখন তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, একটা তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টা তিনি নিশ্চিত করছেনসংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, কী সেই তথ্য? নির্বাচনের আগেই তিনি কীভাবে এটা নিশ্চিত করলেন? তাহলে কি তিনি এমন কোনো ঘটনার তথ্য জানেন, যার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা যায়, আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসবে? সে ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াটা মোটেও অমূলক নয়সেই সুযোগটাই নিয়েছে বিরোধী দলতথ্য আছে বলতে জয় কী বোঝাতে চেয়েছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেএকই কাজ করতে হয়েছে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, দলের মুখপাত্র মাহবুব উল আলম হানিফ এবং যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকেএ ছাড়া জয় নিজেও ব্যাখ্যা দিয়েছেনএত সব ব্যাখ্যার পর জানা গেল, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি জরিপের ফলাফল নিয়ে কথা বলেছেন জয়সেই জরিপ বলছে, আসন জেতার হিসাবে আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে একটু এগিয়ে আছেপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই জরিপ ডিজিএফআই বা এনএসআইয়ের নয়, তাদের নিজস্বআরেকটু খোলাসা করেছেন জয়জরিপটি বিদেশি একটা সংস্থা করেছেএই তথ্য প্রকাশে দুজনের উদ্দেশ্যই পরিষ্কারজরিপটা কত সঠিক বা গ্রহণযোগ্য, সেটা বোঝানোর চেষ্টাএ ছাড়া সরকারি গোয়েন্দা প্রতিবেদন যে সঠিক হয় না, সেটাও স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রীজয় যেহেতু জরিপে পাওয়া তথ্যের কথা বলেছেন, তাই তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে সংখ্যা (আসলে হবে পরিসংখ্যান) থাকার কথাও বলেছেনঅর্থাৎ তিনি যা বলতে চেয়েছেন কিন্তু প্রথমবার পারেননি তা হলো, তার কাছে একটা জরিপের তথ্য ও পরিসংখ্যান আছে, যার ভিত্তিতে তিনি আশা করছেন আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জিতবেবাংলা ভাষা বা রাজনীতির ভাষার ওপর যথেষ্ট দখল না থাকায় এমনটা হয়েছেজয় হয়তো বুঝতে পারেননি, ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কোনো ঘটনার কথা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায় নাবলতে হয়, এটা হতে পারে, হওয়ার সম্ভাবনা বা আশঙ্কা আছে, অথবা আশা করছি, এটা হবে বা সেটা হবে না ইত্যাদিএ ক্ষেত্রে জয়ের জন্য সঠিক ও নিরাপদ বক্তব্যটা হতে পারত এমন: আশা করছি, আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জিতবেকারণ, আমরা জরিপ চালিয়ে দেখেছি, আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেঅথবা হতে পারত এমনও: আমরা জরিপ চালিয়ে দেখেছি আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জিতবেযদিও জিতবে না বলে জিতার সম্ভাবনা আছে বলাটাই বেশি শ্রেয়কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে এত পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার হয় নাআমরা জিতবই, ওরা হারবেই এমন নিশ্চয়তামূলক কথাই বেশি শুনে থাকি আমরাকোনো অভিযোগ বা দাবির বেলায় তো আমাদের রাজনীতিবিদেরা সুপারলেটিভ ডিগ্রিছাড়া কথাই বলতে পারেন নানিজের ভালোটাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠএবং অন্যের খারাপটাকে ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্টবলে থাকেন তারাসঠিক শব্দ ব্যবহার না করে বক্তব্য দিলে কত রকম ঝামেলা বা বিপদ হতে পারে, তা এরই মধ্যে টের পেয়ে গেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন এই রাজারাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অভ্যাস তার খুব বেশি দিনের নয়উচ্চারণ স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ হলেও শব্দচয়নে সমস্যা আছেতা ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্যে যে ধরনের সতর্কতা ও কৌশল দরকার, তা হয়তো রপ্ত করতে পারনেনি এখনোতবে কৌশলের নামে অসততা, হঠকারিতা, ধোঁকাবাজি থেকে দূরে থাকলে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিক হিসেবে তিনি নিশ্চয় অনেক সমাদৃত হবেনরাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বেলায় জয়ের চেয়ে তারেক অনেক বেশি সতর্ক, অনেক বেশি কৌশলীকারণ এই কাজটা তিনি অনেক বছর আগেই শুরু করেছেনএক-এগারোর ধাক্কায় আরও দক্ষ হয়েছেনজয়ের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, জয় এটা বা সেটা বোঝাতে চেয়েছেনঅর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননিতবে ৭১ টিভিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে জয় তার নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছেনসেই ব্যাখ্যায় কোনো বিভ্রান্তি ছিল না, সেই কথার কোনো অপব্যাখ্যাও হয়নিতার মানে রাজনীতিতে নতুন বলে তাকে একটা হোঁচট খেতে হয়েছেএটা দোষের কিছু নয়কিন্তু জয়ের বক্তব্য সমর্থন করতে দিতে আওয়ামী লীগ নেতারা যেভাবে তার বন্দনা করেছেন, সেটাই হলো সমস্যাতারেক-জয়-বন্দনা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তা বোঝা গেল দুই দলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতার মন্তব্য থেকে; মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কথা না-ই বা বললামবিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, তারেক রহমান দেশে এলে আওয়ামী লীগ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবেআওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেছেন, সজীব ওয়াজেদ জয় রাজনীতিতে আসছেন বলে বিএনপির মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে এবং দলটির নেতারা আবোল-তাবোল বলছেনতবে বন্দনা প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীতিনি বলেছেন, জয়ের বক্তব্যটি ছিল বারাক ওবামার নির্বাচনী বক্তব্যের মতো উদ্দীপনামূলকজয়ের বক্তব্য সারা বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে উদ্দীপ্ত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছেযুগে যুগে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের ধ্বংস করেছেন এই তৈলমর্দকেরানিজের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের বন্দনা করেছেন চামচারাআর এভাবেই দল, রাজনীতি ও দেশের বারোটা বাজিয়েছেন তারাতারেক-জয়ের মতো নতুন প্রজন্মের আধুনিকমনা নেতাদের বন্দনা যেভাবে চলছে, তাতে একদিন তারাও এই অপরাজনীতিতে ডুবে যাবেন কি না সেই প্রশ্নই এখন বড় করে দেখা দিয়েছে

নেতা-নেত্রীদের বন্দনা করা আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে খারাপ দিকএই বন্দনাই ব্যক্তিকে দেশ ও দলের ওপরে জায়গা করে দিয়েছে, গণতান্ত্রিক সমাজেও রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেমুজিব-জিয়া- হাসিনা-খালেদার বন্দনা অনেক দিনের পুরোনোজীবিত ও মৃত নেতা-নেত্রীদের বন্দনার কারণেই আমাদের রাজনীতিতে দেশ, জনগণ এমনকি দলীয় কর্মীদের গুরুত্বও হারিয়ে যায়নেতা-নেত্রীদের তুষ্ট করতে না পারলে কর্মীদের রাজনৈতিক জীবনও ধূসর হয়ে যায়একইভাবে শীর্ষ নেতৃত্বকে বন্দনা না করলে পরের কোনো নেতৃত্বই টিকে থাকে নাআর তাই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন নেতা-নেত্রীদের মন জোগাতে, মন রাঙাতেকেবল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাই নন, সামরিক-বেসামরিক আমলা, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি বিচার অঙ্গনের মানুষও বাদ যান নাকেউ স্বেচ্ছায়, কেউ অনিচ্ছায়, বন্দনা তারা করেই যাচ্ছেননইলে পিছিয়ে পড়ছেন বা ক্ষতির মুখে পড়ছেনজনই বা ক্ষতিটা মানতে পারছেন?

বাংলাদেশের রাজনীতির দুই কীর্তিমান পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের বন্দনা হয়তো চলতেই থাকবেতাদের উত্তরসূরি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বন্দনা চলছে তিন দশক ধরেএটাও নিশ্চয় চলবে আরও অনেক বছরএরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে মুজিব-জিয়ার তৃতীয় প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সজীব ওয়াজেদ জয় ও তারেক রহমানের বন্দনাগণতন্ত্রের আবরণে এই রাজতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্র সহজে শেষ হবে বলে মনে হয় নাকারণ, বড় দুটি দল ও তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা তারেক-জয় বন্দনাও শুরু করে দিয়েছেনতারেক-বন্দনা অবশ্য শুরু হয়েছে এক যুগ আগেই, যখন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হনএই এক যুগে তারেক-বন্দনা কখনো কখনো জিয়া-খালেদা-বন্দনাকেও ছাড়িয়ে গেছেযদিও এক-এগারোর পর তাতে অনেক ভাটা পড়েছিলভাটা শেষে জোয়ারও এসে গেছেকারণ, বন্দনাকারীরা বুঝে গেছেন, আগামীর রাজা তিনিই, বন্দনা তাকেই বেশি করে করতে হবেতাতেই কপাল খুলবেআর তাই তারেক বন্দনায় ঝাঁপিয়ে পড়ছেন দলের সবাইদলের বাইরে থেকে যোগ দিচ্ছেন দালাল-চামচা-সুবিধাবাদীরাওএর আগে কালেভদ্রে রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটত আরেক ভাবী রাজা জয়েরএবার তিনি নিয়মিতই থাকবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছেসে জন্য তার বন্দনাও শুরু হয়ে গেছে জোরেশোরেআর নতুন বলে জয়-বন্দনা একটু বেশিই হচ্ছেআমাদের নব্যরাজতন্ত্রের ইতিহাসটা কিন্তু মজারপ্রথমে দুই রাজা, তারপর দুই রানি, তারপর আবার দুই রাজাএই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে আবারও আসবেন দুই রানিকারণ, তারেক-জয় দুজনকেই আল্লাহ কন্যা-সন্তান দিয়েছেনবাপ-দাদিদের ইতিহাস জেনে জাইমা-সুফিয়ারাও নিশ্চয়ই সিংহাসনের স্বপ্ন দেখছে


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ