আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সঙ্গে চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ:‘স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য গর্ব বোধ করি’ | সময় বিচিত্রা
আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সঙ্গে চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ:‘স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য গর্ব বোধ করি’
Somoy Bichitra

বরেণ্য চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষার একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, যে দেশে একুশে ফেব্র“য়ারি পালিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আমি গর্ব বোধ করি। বিশ্বব্যাপী আজ বাঙালিরা ছড়িয়ে পড়েছে। দুই বাংলা ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশে বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, দুবাইÑযেখানেই যাই বাঙালির পদচারণ দেখে মুগ্ধ হই। মনটা ভরে যায়। বাংলা ভাষায় কথা শুনলে আপ্লুত হয়ে পড়ি।’

গত ৪ মে নিউ ইয়র্কে জ্যামাইকায় একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে গৌতম ঘোষ এসব কথা বলেন। প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক দর্পণ কবীর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এখন সময় পত্রিকার সম্পাদক কাজী শামসুল হক, এনটিভির বিশেষ প্রতিনিধি ফরিদ আলম, এটিএন বাংলা ইউএসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফখরুল আলম, বার্তা সম্পাদক ফকির সেলিম ও কানু দত্ত, বৈশাখী টিভির প্রধান প্রতিবেদক হাসানুজ্জামান সাকী, দৈনিক ইত্তেফাক ও বাঙালীর বিশেষ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম, আজকাল পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ, বিশেষ প্রতিনিধি সৈয়দ ওয়ালিউল আলম ও কূটনৈতিক রিপোর্টার কাউসার মুমিন, বাংলা টিভির মহাপরিচালক মীর শিবলী, ফোকাস বাংলার নিহার সিদ্দিকী, সাপ্তাহিক ২০০০-এর নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি আকবর হায়দার কিরণ, জাস্ট নিউজ ২৪-এর বিশেষ প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান হাসান, এবি টিভির রিজু মোহাম্মদ, শর্টফিল্ম নির্মাতা জাহেদ শরীফ, ইঞ্জিনিয়ার নির্মল পাল, ফরহাদ আহমেদ প্রমুখ।

গৌতম ঘোষ বলেন, ‘বাংলা ভাষায় মিশ্রণ আছে, বাঙালির মধ্যেও মিশ্রণ আছে। আমাদের রক্তে মিশ্রণ, সংস্কৃতিতে মিশ্রণ। বাঙালির জাতির মধ্যে সৃষ্টিশীলতার উন্মাদনা আছে। তবে বাঙালিরা কেমন যেন ছোটখাটো স্বার্থ নিয়ে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। বাঙালিকে এই আগল ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে।’ বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ লগ্নি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবছর ছবি বানানোর অনেক প্রস্তাব পাই। বিত্তশালীরা আমাকে দিয়ে ছবি বানাতে চান। আমি জানি, ফিল্মমেকার হিসেবে আমার একটি পরিচিতি আছে। তাই বলে যে কেউ বললেই আমি ছবি বানাতে পারি না। কাঁচা টাকার মালিকেরা গ্ল্যামারের জন্য ছবি বানাতে চান। সত্যিকারের এন্টারপ্রাইজার লোকের বড় অভাব। বাংলা ভাষা মিশ্র ভাষা। বাংলা ভাষার মাধুর্যতা আছে। বাংলা ভাষায় অনেক গল্প আছে, অনেক সুলিখিত উপন্যাস আছে। সবচেয়ে বেশি হলো অনেক জীবন আছে। এই জীবনের গল্প নিয়েই অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়।’

আমাদের চোখ খুলতে হবে। বিশ্ব যে গতিতে এগোচ্ছে, সেই গতির সঙ্গে গতি মেলাতে হবে। বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতে হবে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে। ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। যৌথ প্রযোজনার ছবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের প্রযোজনায় দুটি ছবি বানিয়েছি। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘মনের মানুষ’। এ কাজের অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলব না। দুই দেশের যৌথ প্রযোজনার ছবি তৈরির কাজ বাড়াতে হবে। বাংলা ছবির বাজার বাড়াতে হবে। বাংলা চলচ্চিত্রের বিশ্বব্যাপী বাজার সৃষ্টি করতে হলে দুই বাংলার ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ দরোজা খুলে দিতে হবে। দুই বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ওপেন করে দিতে হবে। কোনো কিছু খুলে দিলেই বিপদে পড়া নয়। বাংলা ছবির বাজার না বাড়ায় অর্থ বিনিয়োগ সেরকম হচ্ছে না। ফলে, ছবির মান প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মতো হচ্ছে না। আমাদের একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। চেইন সৃষ্টি করতে হবে। বাজার বড় করতে হবে। দুই বাংলা এবং বহির্বিশ্বে যে পরিমাণ বাঙালি থাকেন, এটা অনেক বড় বাজার। আমরা বিভক্ত হয়ে আছি। দুটো ইন্ডাস্ট্রিকে মেলাতে পারিনি। দুই দেশের চলচ্চিত্রের মানের পার্থক্য সমতায় আনতে দুই দেশের যৌথ প্রযোজনার ছবি বেশি করতে হবে। ঢাকার শিল্পীদের কলকাতায় এবং কলকাতার শিল্পীদের ঢাকায় কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ঢাকার ফিল্ম কলকাতার বাজারে চালাতে হবে।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ছবির চাহিদা বা মর্যাদা এখন নেই কেনÑএই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের দর্শক আছে। একসময় বাংলা চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা পেত। সত্যজিৎ রায় তাঁর চলচ্চিত্র দিয়ে বাংলা ছবিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা সৃষ্টি করেছিলেন। এখন সে অবস্থা নেই। আমাদের যে ভালো ছবি নির্মিত হচ্ছে না, তা নয়। আমরা ছবি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্থান করে নিতে সচেষ্ট হই না। আবার করপোরেট ওয়ার্ল্ডের নানা জটিলতার কারণে অনেক ভালো ছবি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। অস্কারসহ আরও অনেক মর্যাদার পুরস্কারপ্রাপ্তিতে অনেক ভালো ছবি চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্তও আসতে পারে না। অনেক ভালো ছবির খবর বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ পায় না। বাংলা ছবি নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি ভাবে না। এখন দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের ছবি আলোচিত হয়। যেমন ইরানের ছবি, দক্ষিণ কোরিয়ার ছবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়। বাংলা ছবির ইতিহাস ওই সব দেশের চেয়ে পুরোনো। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।’ গৌতম বলেন, ‘ভালো ছবি নির্মাণ করতে হলে ছবির বিষয়বস্তু এবং ছবি নির্মাণে যথেষ্ট অর্থ লগ্নি করতে হবে। দুর্বল প্রযুক্তির ব্যবহারে ছবি তৈরি হলে ছবি চলবে না। বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা আছে। এই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।’

‘মনের মানুষ’ ছবিটি নির্মাণের পেছনের গল্প কীÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংস্কৃতির অসহিষ্ণুতা দেখে লালনের কাছে ফিরে যাই। লালনের ছবি বানাই ‘মনের মানুষ’।’ তাঁর ছবি মনের মানুষ এবং তানভীর মোকাম্মেলের ছবি ‘লালন’ প্রসঙ্গে কোনটি ভালো ছবি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুটি ছবিই ভিন্ন। আমি ‘মনের মানুষ’ বানিয়েছি লালনের দর্শনকে উপজীব্য করে। আর তানভীর মোকাম্মেল ‘লালন’ বানিয়েছিলেন লালনের জীবনীকে কেন্দ্র করে। কোনটি ভালো ছবি, তা আমি বলতে পারব না।’


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ