বিতর্কিত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন | সময় বিচিত্রা
বিতর্কিত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন
মাহবুব মাসুম
17_18

বর্তমান সংবিধান বহাল থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবেপদে থেকেই নির্বাচন করবেন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাসরকারের খাস আমলা অর্থাৎ জেলা প্রশাসকেরা হবেন রিটার্নিং অফিসারনির্বাচনে থাকছে না সেনাবাহিনীঠিক এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের জন্য প্রচারণার সুযোগ দেওয়ার নতুন সিদ্ধান্তও প্রায় চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)আচরণবিধি গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করলেও সংশোধিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে না কমিশননিজেদের ক্ষমতাহীন করে রাজনৈতিক দলগুলোকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অবাধ সুযোগ করে দিচ্ছেএ পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কেমন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে তা সহজে অনুমেয়বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, কোনো দল ক্ষমতায় গেলে সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় নাসবার মুখে গণতন্ত্রের খই ফুটলেও বাস্তবে এসব দলের মধ্যে যে গণতন্ত্রের চর্চা আছে তা প্রশ্নবোধকএক নেতার কথায় চলে দেশ, দল ও রাজনীতিরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজও এ অবস্থায় নির্বাচন না করে এ সংকট থেকে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেতারা বলছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে নামন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা ডিসিরা তাদের কথায় উঠবস করবেনএরকম সাংবিধানিক জটিলতায় রহস্যজনকভাবে নির্বাচন কমিশন আইন ও আচরণবিধি সংশোধন করে নিজেদের ক্ষমতা কমিয়ে ক্ষমতাসীন দলকে নির্বাচনের অবাধ সুযোগ দিতে যাচ্ছেনির্বাচন কমিশনের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরে রাজনৈতিক দলকে অপরাধ করার সুযোগ দিচ্ছেএর ফলে ইসি পরিণত হচ্ছে ঠুঁটো জগন্নাথেবিশিষ্টজনদের মতে, স্বাধীন কমিশনকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরানো হচ্ছেপঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকেগত কমিশনের ভাবমূর্তি সাম্প্রতিক সময়ের কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে ধুলো-মাটিতে মিশেছেতার পরও এই কমিশনের কোনো হুঁশ হচ্ছে না

বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে নির্বাচনী আচরণবিধিতে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছেএ ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেপাশাপাশি মন্ত্রীরা নিজ আসনে প্রচারণা চালাবেনএকই সাথে থাকছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণা করার বিধানঅন্যদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারও সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজাচ্ছেনিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, ওসিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে

সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছেনবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিলসেই অনুযায়ী আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে কমিশনকেসংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে সংসদের অধিবেশন বসার ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকবে না বলে বলা হয়েছেনির্বাচনকালীন ৯০ দিনের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে নাতবে ওই সময়ে সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্বে থাকবেনএমনকি আগের সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন সংসদের নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করতে হবেএ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বারবার বলেছেন, দুই পদ্ধতি মাথায় রেখেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছেরাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছালে ইসির জন্য ভালো হবেতা না হলে সংবিধান অনুযায়ী সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবেতিনি বলেছেন, যে ধরনের সরকারের অধীনেই এ নির্বাচন হোক, এতে ইসির কোনো সমস্যা হবে না

সিইসির কথায় মনে হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের আরও ভালো হয়যেকোনো সরকারের অধীনে তারা নির্বাচন করতে এক পায়ে খাড়াসংকটময় মুহূর্তে নির্বাচনের এত উৎসাহ কেন ইসির? তাঁরা নির্বাচন করতে পারবে তবে সে নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে নাইতোমধ্যে সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী ৫৩ সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনা হয়েছেপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়ে ইউএনডিপির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেছে ইসিপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনাররা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেনএর পরে জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হবেযদি এ অবস্থায় হয় তাহলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে নামন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা সমমানের ব্যক্তিরা প্রটোকল না পেলেও নির্বাচনী প্রচারণায় নিরাপত্তা প্রটেকশন পাবেন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকামাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসিসংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ করেছেবিতর্কিত ধারা বাদ দিয়ে আরপিও সংশোধন, নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়ে তোড়জোড় চলছেএ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছেনির্বাচনের প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়ে ইউএনডিপি কাজ করছেতফসিল ঘোষণার আগেই আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভোটার তালিকার প্রিন্ট কপি মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবেসম্ভাব্য কেন্দ্র, ভোটকক্ষ, কী কী উপকরণ কতসংখ্যক প্রয়োজন এর তালিকা প্রস্তুতইউএনডিপির মাধ্যমে বিদেশ থেকে কালি ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স আমদানি করা হচ্ছে২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই লাখ ৪০ হাজার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করা হয়গত নির্বাচনের ব্যবহৃত ব্যালট বাক্সে কতটা ব্যবহারোপযোগী রয়েছে তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে ভোটার বৃদ্ধির কারণে আরও প্রায় ৪০ হাজার ব্যালট বাক্স আনছে ইসিএগুলো ছাড়াও জাতীয় নির্বাচনের জন্য কয়েক কোটি ফরম ও ম্যানুয়েল প্যাকেট মুদ্রণ, অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিল, ব্রাশ সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, গানি ব্যাগ, হোসিয়ান ব্যাগ, গালাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় শুরু হয়েছেভোটার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক হাজার ভোটকেদ্র বাড়াতে হচ্ছেএ জন্য প্রায় ১২ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার নিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে

স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হারাল কমিশন

স্বেচ্ছায় প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা হারাল নির্বাচন কমিশনবিদ্যমান আইনে নির্বাচনী অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলের যে ক্ষমতা ইসির হাতে রয়েছে তা আর থাকছে নাএর ফলে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কোনো কর্তৃত্বই আর থাকল না ইসিরসাবেক নির্বাচন কমিশনাররা বলছেন, প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা না থাকলে ইসি পরিণত হবে ঠুঁটো জগন্নাথেস্বাধীন নির্বাচন কমিশন শুধু কাগজে-কলমেই স্বাধীন থাকবে, কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে নানির্বাচনে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবেন প্রার্থীরা১৮ জুলাই আরপিও সংশোধনে একটি প্রস্তাবনা চতুর্থবারের মতো আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়এই প্রস্তাবনা দেখে আইন মন্ত্রণালয় জানায়, আরপিওতে বহাল ৯১(ই) ধারা বাদ দিতে হবেএ ধারাতে কমিশনকে নির্বাচনী অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছেসরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কারোর সাথে আলোচনা না করে বর্তমান কমিশন রহস্যজনকভাবে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা নিজেদের হাতে না রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা কমিশনের এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেসাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ও শক্তিশালী করার মূল ধারাটি ছিল ৯১(ই)এ ধারা বাদ দিলে কমিশনের হাতে নির্বাচনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আর কোনো ক্ষমতা থাকবে নাইসি পঙ্গু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবেসুতরাং এটা বাদ দিতে হলে অবশ্যই স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলতে হবেসাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধারা বাদ দিলে নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হবেএটা হবে কমিশনের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

বিএনএফকে নিবন্ধন দিতে মরিয়া ইসি

জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসারী দাবিদার ধানগাছ প্রতীক ব্যবহারকারী বিতর্কিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টকে (বিএনএফ) নিবন্ধন দিতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে ইসিমাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দলের কোনো অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও রহস্যজনকভাবে আবারও কর্মকর্তাদের নতুন করে রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছে কমিশন৬ আগস্টের মধ্যে পুনঃতদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসিনিয়মকানুন ও আইনের তোয়াক্কা না করেই এ দলকে নিবন্ধন দিতে যাচ্ছে কমিশনএ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আপত্তি জানিয়েছেবিএনএফকে নিবন্ধন দিলে ইসির বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনে জাবে বিএনপিবিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এ দলকে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি

নির্বাচনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছেসুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসি বদ্ধপরিকরসরকার বা বিরোধী দল কেউ ইসিকে প্রভাবিত করতে পারবে নানির্বাচনকালীন সরকার-পদ্ধতি নিয়ে ইসির চিন্তার কোনো কারণ নেইএটা রাজনৈতিক বিষয়দলগুলো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ