দল ভাঙার রাজনীতি: কে কী পেয়েছেন? | সময় বিচিত্রা
দল ভাঙার রাজনীতি: কে কী পেয়েছেন?
ফরিদ আলম
17_32

২০০৭ সালে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বা ভাঙার জন্য অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েনতাদের কেউ দলের ভেতরে কোণঠাসা ছিলেন, কেউ কাক্সিক্ষত পদ না পেয়ে, আবার অনেকে গোয়েন্দা বাহিনীর চাপে পড়ে এমন কাজে জড়িত হয়েছিলেনকেবল রাজনৈতিক দলের নেতারাই যে নিজেদের দল ভাঙার জন্য কাজ করেছেন, তা-ই নয়দলের বাইরে থেকে গোয়েন্দা বাহিনীও একই কাজ করেছে সমান তালেকিন্তু তার ফলাফল কী হয়েছিল? বলা যায়, তারা পুরোপুরি সফলও হননি, আবার ব্যর্থও হননিতবে মূল স্রোতের বাইরে গিয়ে কেউই তেমন কিছু করতে পারেননি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা বারবারই প্রমাণিত হয়েছে

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিকে টুকরো করার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছেদলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ অনেক নেতাই চেষ্টা করেছেন, বিএনপি ভেঙে নতুনভাবে প্রায় একই নামে বিএনপি করা যায় কি নামান্নান ভূঁইয়ার সাথে ছিলেন দলের একাধিক নেতাতারা অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননিতবে দলের অনেক ক্ষতি যে তারা করতে পেরেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেইএখনো তাদের কেউ কেউ বিএনপিকে আবারও টুকরো করার জন্য ওত পেতে আছেকেবল সুযোগের অপেক্ষানির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা আবারও সক্রিয় হচ্ছে

বিএনপির মতো আওয়ামী লীগকেও ভাঙার চেষ্টা হয়েছে একই কায়দায়কিন্তু এখানেও সফল হয়নি তারাসব বাধা পেরিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কারণে যারা দল ভাঙার প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েনএখনো তারা কোণঠাসাই আছেন২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে যারা দল গঠন করে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে ভেঙে টুকরো করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই এখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে দিন কাটাচ্ছেনতাদের অন্যতম একজন বিএনপির একসময়ের নেতা ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর পিডিপি নামে একটি দল গঠন করেনএখন সেই দলের কোনো অস্তিত্বই নেইবর্তমানে বিএনপিতে ফিরে আসার জন্য তিনি অনেক চেষ্টা করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন

 তার মতো আরও কয়েকটি দল গঠন করা হয় তখন, যেগুলো কিংস পার্টি নামে পরিচিতি পায়

মেজর জেনারেল ইব্রাহীমও একটি দল গঠন করেছিলেন তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে সাইজ করার জন্যতিনি এখন আবার ছাতা ঘুরিয়ে ধরেছেন

দলের বিরুদ্ধে গিয়ে কে কী পেয়েছেন?

বিএনপির প্রয়াত নেতা একসময় দলের প্রভাবশালী মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়কিন্তু সাবেক স্বৈরাচার এরশাদের সাথে আঁতাত করার চেষ্টার অভিযোগে তাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়তিনি বের হয়ে গিয়ে একটি দল গঠন করলেও বিএনপির ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেননিবরং তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তখন বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে গিয়েছিল

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী সংবিধান-প্রণেতা ড. কামাল হোসেন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজনদেশ-বিদেশে তার অসংখ্য গুণগ্রাহী থাকলেও রাজনীতির মাঠে তিনি তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন আওয়ামী লীগ ছাড়ার পরএকাধিকবার নির্বাচনে দাঁড়ালেও কখনোই জিততে পারেননি খ্যাতিমান এই আইনজীবী আজও তার দলের অবস্থা ওয়ান ম্যান শোতিনিই নেতা তিনিই কর্মী

 

বঙ্গবন্ধুর আরেক সহচর আবদুর রাজ্জাকআওয়ামী লীগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন সময়েদল থেকে বের হয়ে গিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বাকশাল গঠন করেনবঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যে বাকশাল আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল, আবারও সেই বাকশাল গঠন করেছিলেন রাজ্জাককোনোভাবেই সেই বাকশাল এগিয়ে না নিতে পেরে তিনি আবারও ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে২০০৭ সালে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে বিরাগভাজন হন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনারকোণঠাসা ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্তরাজ্জাকের সাথে যাওয়া আরেক বাকশাল নেতা মহিউদ্দীন আহমদের অবস্থাও শেষ দিন পর্যন্ত সুখকর ছিল না

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে আওয়ামী লীগের আরেক নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরীও আলাদা আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেনসেই দলের অবস্থাও ছিল শোচনীয়পরে তিনি এরশাদের জাতীয় পার্টিতেও যোগ দিয়েছিলেন ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবেপরে তিনি আবারও আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন

 

আওয়ামী লীগের আরেক নেতা আবদুল মালেক উকিলও দল ভেঙে নতুন দল গঠন করেছিলেনতিনিও সুবিধা করতে পারেননি নতুন দল গঠন করে

 

বিএনপির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা কর্নেল অলি আহমদ বিএনপি থেকে সরে গিয়ে এলডিপি নামে নতুন দল গঠন করেছিলেনসেই দলের অবস্থাও একই রকমএখন আবারও তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই রাজনীতি করছেন

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের অন্যতম নেতা সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপি থেকে বের হয়ে বিকল্পধারা নামের রাজনৈতিক একটি দল গঠন করেনবিগত জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি হয় দলটিরবিএনপির একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই নেতা ফেল করেন নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জের আসনটিতেওগত নির্বাচনে একটি আসনেও জিততে পারেনি বি চৌধুরীর গড়া বিকল্পধারার প্রার্থীরাবি চৌধুরী ও তার দল বর্তমানে বিএনপির পাশে থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলন করছেশোনা যাচ্ছে, দল বিলুপ্ত করে আবারও বিএনপিতে ফিরে যাবেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি

জাতীয় পার্টির নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদের (জাতীয় পার্টি) কাছ থেকে সরে এসে নতুন দল গঠন করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)নামেকিন্তু এই দলও কোনো রকমে টিকে আছে

এরশাদের দলের আরেক নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুরও সরে এসে নতুন দল গঠন করেছিলেনদলের নাম দেন বিজেপিমানে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিএর ফলে এরশাদের জাতীয় পার্টি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েকিন্তু এত কিছুর পরও এরশাদের জাতীয় পার্টির তেমন কোনো ক্ষতি হয়নিমঞ্জুর মারা যাবার পর তার ছেলে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ কোনো রকমে দলের হাল ধরে আছেন

 

আওয়ামী লীগের একসময়ের নেতা বঙ্গবীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগনামে নতুন দল গঠন করেছিলেন অনেক দিন আগেকাদের সিদ্দিকীর দলের অস্তিত্ব কেবল এখন তার মুখেই টিকে আছে

 

ডাকসুর একসময়ের ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না সম্প্রতি নাগরিক ঐক্যনামে একটি দল গঠন করেছেনযদিও মান্না আওয়ামী লীগ থেকেও পদত্যাগ করেননি, আওয়ামী লীগও তাকে বহিষ্কার করেনি এখনোইতিমধ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি আসনে কে কে নির্বাচন করবেন তার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেনএটা আসলে রাজনৈতিক দল নাকি সামাজিক সংগঠন, সেটাও এখনো স্পষ্ট নয়কিন্তু তার পরও মাহমুদুর রহমান মান্নাই এই দলের কর্তা

বিভিন্ন দলের একসময়ের ডাকসাইটে এসব নেতার অনেকেই ক্ষমতার লোভে, স্বেচ্ছায়, কারও প্ররোচনায় বা স্বার্থহানির প্রতিবাদে দলত্যাগ করলেও তারা এক প্রকার ফাঁদেই ধরা দিয়েছেনব্যক্তিকে তুলে ধরতে, ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে, নিজের হাতে একটি দলের নেতৃত্ব আছে, সেই সুখানুভূতি পেতেই বেশির ভাগ নেতা দলত্যাগ করেছিলেন বলেই ধারণা করা হয়

সর্বশেষ বিএনপির একসময়ের তুখোড় নেতা, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সেই একই ধরনের ফাঁদে ধরা দিয়েছেনবারবার নাটক করে একবার তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন, আবার দলে ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় করেননির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া যদি শেখ হাসিনার কাছে আলোচনায় বসার প্রস্তাব না দেন, তাহলে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেনএটা যে একধরনের ফাটকাবাজি ছিল, সেটা আগেই বোঝা গিয়েছিলতিনি পদত্যাগ করে আবারও ফিরে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা দলের আর কেউ মেনে নেয়নিকারণ, এর আগেও তিনি একইভাবে পদত্যাগ করলে তার অনুরোধে আবারও তাকে সাধারণ সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিলতার পরিকল্পনা ছিল, তাকে আবারও দলে ফিরিয়ে নিলে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আবারও পদত্যাগ করারসেটা বুঝতে পেরেই হয়তো বিএনপি তাকে আর ফেরত নেয়নিতবে এ দেশের রাজনীতিতে এটা পরিষ্কার যে মূল স্রোতের বাইরে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিই নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ