ঈদের তালা | সময় বিচিত্রা
ঈদের তালা
সুলতানা রহমান
17_15

ঈদের দিনবেলা ১১টাবন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে একটু পরপর বাইরে উঁকি দিচ্ছে শর্মিকারও জন্য অপেক্ষা নেই, তবু ঈদের দিনে বাইরের পৃথিবীটা যদি একটু বেশি রঙিন হয়ে থাকে, সেই রঙের ছিটেফোঁটা জানালার ফাঁক দিয়ে যদি দেখা যায়, যদি তাদের ঘরেও যদি একটু আসে! দরজা দিয়ে আসার সুযোগ নেইকাকডাকা ভোরেই গেটে লাগানো হয়েছে বিশাল তালা, যেন কোনো অতিথি আসতে না পারেযেন ভাবে, বাসায় কেউ নেইমায়ের বুদ্ধিতেই এই তালার ব্যবস্থাশর্মির দুই বছরের বড় ভাই জশ বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পাশের বরইগাছ বেয়ে সোজা উঠে গেছে ছাদেসিঁড়িঘরে আগেই অপেক্ষায় ছিলেন মা রেনুসিঁড়িঘরের ছোট দরজায়ও ঝুলেছে তালাসব কটি জানালা একেবারে বন্ধদূর থেকেও যেন কারও নজরে না আসে এ বাড়িতে মানুষের উপস্থিতিনয়টার দিকে প্রথম পাখির ডাকের কলিংবেল বেজে উঠলবিড়ালের মতো নিঃশব্দে দরজার দিকে একটু এগিয়েও থমকে গেল জশসবাই একযোগে স্থির হয়ে আছেকান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে কে এসেছেকথা বলা তো দূরের কথা, নড়াচড়াও নিষেধঅতিথিরা যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে যে ভেতরে মানুষ আছেতারা কিছুক্ষণ কলিংবেল বাজিয়ে একটু পরই বুঝতে পারে, ঈদের দিন বাসায় তালা দিয়ে সবাই কোথাও বেড়াতে গেছেতারা ফিরে যায়আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর যে যার মতো অহেতু ব্যস্ত হয়ে পড়েশর্মি পুতুলের গায়ের নতুন শাড়িটি খুলে আবার কুচি দেয়, আঁচল ঠিক করেটেইলরের দোকান থেকে টুকরো কাপড় জোগাড় করেছিল শর্মিসেগুলো কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে কিন্তু ঈদের দিন কি আর পুতুল খেলায় মন বসে! বারান্দায় যেতেও মায়ের কড়া বারণবড় বোন প্রমি বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেজশ আর ছোট চাচা প্রায় নিঃশব্দে ক্যারাম খেলছেএকটু আওয়াজ হলেই মা জায়নামাজে বসেই মুখ ঘুরিয়ে তাকায় কটমট করেপাখির ডাকের কলিংবেলটি বেজে উঠলেই খেলা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেসেই সাতসকাল থেকেই বাড়িতে এই ব্যবস্থা

তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় প্রমিক্লাস নাইনে পড়েস্কুলের বান্ধবীরা প্ল্যান করেছিল, সবাই একসঙ্গে রিকশায় ঘুরবে আর সব বান্ধবীর বাসায় গিয়ে ঈদের সালামি নেবেপ্রমি মন খারাপ করে বলেছে, ‘তোরাই মজা করিসআমি তো থাকতে পারব নাএবার আমরা নানাবাড়ি ঈদ করতে যাবসবাই চেপে ধরল, আন্টিকে রাজি করাব, যেন ঈদের পরের দিন যায়প্রমি তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে, ‘নারে, যেতে হবে, নানাভাই আমাদের দেখতে চেয়েছেঅনেক দিন তো যাই না, আর নানাভাই নিজে পছন্দ করে আমাদের ঈদের জামা কিনে রেখেছেখুব সুন্দর একটা লাল জামা কিনেছে আমার জন্য’, প্রমি খুশি খুশি ভাব ধরে

প্রমির নানাভাই মারা গেছেন বহু আগে, ওর জন্মের আগেইনানাভাইয়ের নামে যদি এবার কোনো রকম বান্ধবীদের আগমন ঠেকানো যায়, পরের ঈদ পরে দেখা যাবে, ভাবে প্রমিআর যদি সত্যি সত্যিই সবাই মিলে মায়ের কাছে যায় অনুরোধ নিয়ে, তাহলে তো আর লজ্জার সীমা থাকবে না, উল্টা মিথ্যা কথা বলার জন্য মায়ের মারও খেতে হবে

ঈদের সকাল থেকে কাঁদছে মেয়েটা, কাঁদতে কাঁদতে বালিশের এক কোনা ভিজে গেছেমুখে টুঁ শব্দটিও নেইকোনো অভিযোগ নেইএই তো ছয় বছর আগের কথাওদের দোতলা বিল্ডিং, উঠোন, বাগান, ঘর কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না, লোকে লোকারণ্যকেউ ঠিক করছে, কোথায় গোসল হবে, কোথায় দাফনআত্মীয়স্বজনদের দেখার জন্য লাশ কি হিমঘরে রাখা হবে? এত ভালো মানুষ, এভাবে চলে গেল! এই সব আলোচনায় ব্যস্ত আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী চেনা-অচেনা মানুষেরাসব কথা ঠিকমতো বুঝতেও পারে না আট বছরের প্রমিশুধু বুঝতে পারে, বাবা নেইচলে গেছে অনেক দূরে, আর কোনো দিন আসবে নাএত মানুষ দেখে ছয় বছরের শর্মি জিজ্ঞেস করে, ‘আপুনি, আজকে কি ঈদের দিন?’ ভুল তো কিছু বলেনি ছোট্ট শর্মি! ঈদ কোরবানিতে জাকাতের কাপড় নিতে আসা মানুষের ভিড়ে এমনই লোকারণ্য হয়ে যায় ওদের উঠোন, বাগান, ঘর

জায়নামাজে চুমু দিয়ে উঠে দাঁড়ান রেনুগুছিয়ে রাখেন আলমারির তাকেসবচেয়ে ওপরের তাকে রাখা পলিথিন মোড়ানো প্যাকেটটি নামিয়ে আনেনবড় মেয়ের এলো চুলে হাত রেখে নরম স্বরে রেনু বলেন, দেখ তো এর মধ্যে কী আছে? যেন কোনো সারপ্রাইজরেখে দিয়েছিলেন মেয়ের জন্যপ্রমি আগের মতোই ফুঁপিয়ে কেঁদে যায়রেনু পলিথিনের গিঁট খুলে বের করেন টুকটুকে লাল জামাভেসে আসে ন্যাপথলিনের গন্ধদেখ তো মা, কী সুন্দর জামাটা!

মা, জামাটা কি আমার গায়ে লাগবে? একটু পরে দেখি?’ পুতুল খেলা ফেলে ছুটে আসে শর্মিমায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ায় আহ্লাদী বিড়ালের মতোরেনুর দৃষ্টি তখন দরজার ওপর ঝোলানো প্রমির বাবার সাদাকালো ছবিটির দিকেছবির চোখে চোখ রেখে রেনুর দুচোখ ভিজে যায়গলায় আটকে থাকা কান্নাটা গিলে ফেলেন, চোখের কোণে টলটল করা পানি ফিরিয়ে নেন চোখের গভীরে

এ তো তোমার আপুনির জামাওকে জিজ্ঞেস করো, তোমাকে পরার অনুমতি দেবে কি না’, চেহারায় স্বাভাবিকতা রেখে বলেন রেনুজামার দুই কাঁধ ধরে নিজের কাঁধে লাগিয়ে শর্মি ব্যস্ত হয়ে গেছে দেখতে লাগে কি নামা, এটা তো আমারই হয়, দেখোআপুনির ছোট হয়ে গেছে’, বলে শর্মিপ্রমি মাথা তোলে, ফোলা চোখে দেখে ছয় বছর আগে বাবার কেনা সেই ঈদের জামাটি!

পাখির ডাকের কলিংবেলটি বেজে ওঠেপ্রমি-শর্মি কেউ একজন জোরে জোরে ডাকতে থাকেভেতরে সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাদের চলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেপ্রমির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে চায়ঘুমের মধ্যে ধড়ফড় করে উঠে বসেঘেমে ভিজে গেছে বালিশবিছানার ওপর পড়ে আছে নতুন কেনা সালোয়ার কামিজ, দুটি হালফ্যাশনের ফ্রকআড়ংয়ের ব্যাগে মায়ের সিল্ক শাড়ি, ভাইয়ের পাঞ্জাবিঈদের বাকি মোটে দুই দিন, কেনাকাটা এখনো বাকি অনেকসারা দিন শপিং শেষে ক্লান্ত হয়ে বিকেলে ফিরেছে দুই বোনকখন যে দুজনই ঘুমিয়ে গেছে! মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলমা, তুমি একবার ঈদের দিন বাড়িতে বাইরে দিয়ে তালা লাগিয়েছিলে যেন কেউ আমাদের বাসায় না আসে!

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া রেনু চমকে ওঠেনরেনুর দুই চোখ জলে ভরে যায়চোখের কোণে টলটল করা কান্নার জল চোখের গভীরে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো তাড়া নেই রেনুর! দুই বোন জড়িয়ে ধরে রাখে মাকে


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ