টেলিকম গ্রাহক বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি | সময় বিচিত্রা
টেলিকম গ্রাহক বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি
ইয়াসমিন আরা
17_31

দেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫৩ শতাংশ ছাড়িয়েছেএর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে টেলিকম খাতইতিমধ্যেই ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ কোটির হাতে পৌঁছেছে গেছে মোবাইল ডিভাইসএ খাতের পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর হাতেইটেলিকম খাত এখন দ্বিতীয় (টুজি) থেকে তৃতীয় প্রজš§ (থ্রিজি) প্রবেশের অপেক্ষায়যদিও উন্নত দেশগুলোতে মোবাইলে থ্রিজির পরবর্তী ধাপ ফোরজিসহ নতুন ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ আগেইখুব দ্রুত পরিবর্তনশীল এ খাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি এর প্রায়োগিক দিকেও দ্রুত পরিবর্তন আসছেমোবাইল প্রজš§ এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত তাল মেলাতে পারলেও এ খাতের নীতিনির্ধারকেরা এখনো এনালগ পর্যায়ে পড়ে আছেন

তার পরও বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত একটি দেশের থ্রিজি যুগে প্রবেশ হবে টেলিকম ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনাপ্রযুক্তির পরিবর্তন এবং ব্যবহারে টেলিকম উন্নতির পথে থাকলেও গ্রাহক-সেবা এবং সন্তুষ্টির প্রশ্নে খাতটির অবস্থান বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়েগত দেড় দশকে গ্রাহক বাড়াতে টেলিকম কোম্পানিগুলো যে খরচ করেছে এবং লোভনীয় প্রস্তাবের জাল ফেলেছে, তাতে গ্রাহক বাড়লেও তাদের চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগ সফল নয়এ অভিযোগ প্রতিটি অপারেটরের গ্রাহকদেরঅর্থাৎ সেবার মানের দিক দিয়ে ক্রমেই সামনের দিকে হাঁটছে গ্রামীণ, বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল, সিটিসেলসরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটকের কথা না হয় বাদই গেলযদিও সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাড়তি সুবিধা পেয়েছে সেবার মানে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানঅবকাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও থ্রিজি সেবা নিয়ে বাজারে আছে টেলিটক

মোবাইল ছাড়া এখন জীবন কল্পনা করাই কঠিনমোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তাদের অভিযোগও বেড়েছেছয় অপারেটরের গ্রাহকদের হাজার রকম অভিযোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপক্ষেএ বিবেচনায় সেবার ক্ষেত্রে পেছনের দিকে হাঁটছে বিনিয়োগকারীরাঅবশ্য পিএসটিনের গ্রাহকদের এ লেখার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়নিগ্রাহকদের এখন বেশি অভিযোগ ফোন কেটে যাওয়া বা কল ড্রপ নিয়েএরপর কলরেটের মারপ্যাঁচে প্রতিমুহূর্তে নাকাল হতে হচ্ছে গ্রাহকদেরনিত্যনতুন বিজ্ঞাপন আর লোভনীয় অফারে এত সব গভীর গর্ত থাকে যে, সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তা খুঁজে দেখা সম্ভব হয় নাএর মাধ্যমে অপারেটরদের বাণিজ্যের কদর্য রূপটা ফুটে উঠলেও উপায়হীন গ্রাহককে অর্থের বিনিময়ে দুর্বল সেবা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে

রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থার দুর্বলতাও অপারেটরদের এমন কাজে উৎসাহিত করছে বলেও অভিযোগ সাধারণ গ্রাহকদেরপাশাপাশি খোলামেলা দুর্নীতিও অপারেটরদের শতভাগ সেবাদানে বাধ্য করার চেয়ে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক দানবে পরিণত হতে প্রলুব্ধ করছেখাতটি নিয়ে সাধারণ মানুষের গর্বের অনেক কিছু আছে সত্য, আবার প্রবঞ্চনাও আছে অনেকসরকার এই খাতটিতে বেশ কিছু বড় সিদ্ধান্ত নিলেও এর সুফল পাচ্ছে না গ্রাহক

কল ড্রপ বেড়েছে তিরিশ ভাগ

টেলিকম খাতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম কল ড্রপএকজন গ্রাহক কারও সঙ্গে কথা বলছেন কিন্তু মাঝপথে বারবার লাইন কেটে যাচ্ছেএই ভোগান্তিতে একদিকে গ্রাহকের মানসিক বিড়ম্বনা বাড়ে, অন্যদিকে অপচয় হয় সময় আর অর্থেরমূলত অতি মুনাফালোভী মানসিকতা থেকে নিম্নমানের ও কম দামি প্রযুক্তি গ্রহণই এর বড় কারণ বলে জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানির হিসাবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কল ড্রপের হার বেড়েছে ৩০ ভাগঅবশ্য তাদের দাবি, নেটওয়ার্কের এবং প্রত্যাশার তুলনায় গ্রাহক বেড়ে যাওয়াই কল ড্রপ বাড়ার কারণকিন্তু বিশেষজ্ঞেরা সময় বিচিত্রাকে জানিয়েছেন, প্রায় সব অপারেটর শুধু গ্রাহক বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে বেশি, সেই তুলনায় বাড়েনি তাদের নেটওয়ার্ক-সামর্থ্যএর মধ্যে গ্রামীণফোন সারা দেশে তাদের নেটওয়ার্কের সামর্থ্য বাড়াতে সক্ষম হলেও কল ড্রপ কমাতে সক্ষম হয়নিনেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের খরচ কমাতে গিয়ে গ্রামীণফোনের নিম্নমানের সামগ্রী ও প্রযুক্তি ব্যবহারই তাদের কল ড্রপ বাড়ার একমাত্র কারণএতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রাহককিন্তু অভিযোগ জানানোর জায়গা না থাকায় গ্রাহকের ক্ষোভ-বঞ্চনা এবং হতাশার বেশির ভাগ থাকে অপ্রকাশিততবে ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিযোগ হরহামেশাই চোখে পড়ে

নেই টোল ফ্রি নম্বর

গ্রাহক-সেবায় প্রতিটি অপারেটরের একটি টোল ফ্রি নম্বর থাকার কথাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা চালু আছেএমনকি ভারতেও অনেক বছর আগে থেকেই টোল ফ্রি নম্বর চালু আছেযে নম্বরে ফোন করে গ্রাহক তার অভাব-অভিযোগ জানাবে এবং প্রতিকার পাবেনিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির এমন নির্দেশনা আছেকিন্তু কোনো অপারেটরই এই নির্দেশনা মানে নাঅপারেটরদের ১২১ বা অন্য এমন কোনো নম্বর থাকবে যেখানে গ্রাহক ফোন করে সমস্যা তুলে ধরবেএর মাধ্যমে অপারেটর নিজেদের দুর্বলতাগুলো সারাইয়ের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে গ্রাহকের সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে সমাধান দেবেতা তো ঘটছেই না, বরং গ্রাহক তার সমস্যা নিয়ে গ্রাহক-সেবানম্বরে ফোন করলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখা, সমস্যার সমাধান না পাওয়া, সেবা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় শেষ পর্যন্ত লোকসান হয় গ্রাহকেরইসবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করলেও গ্রাহককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে তার জন্য অর্থ আদায় করাটেলিকম সেবা খাত হলেও সেবাদানে ব্যর্থতাই গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এ খাতের জন্য বড় বাধাবিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে মোবাইল সেবা চালুর গৌরবের পাশাপাশি এই ত্রটি অমার্জনীয়মূলত দুর্বল তদারক-ব্যবস্থা অপারেটরদের অতিমাত্রায় অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করছে

সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতায় অন্ধকার

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই তরুণ-তরুণীএরাই মোবাইল ব্যবহারকারীদের অন্যতম অংশএই তরুণদের নিজেদের নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ফোন কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে অসুস্থ প্রতিযোগিতাতরুণ-তরুণীদের প্রলুব্ধ করতে এই প্রতিযোগিতায় এমন সব প্যাকেজ, অফার চালু বা সুযোগ-সুবিধা অপারেটররা চালু করেছে, যা কোনোভাবেই দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যায় নামূলত এসব প্যাকেজের মাধ্যমে অপারেটররা তরুণ প্রজন্মকে পরোক্ষভাবে এমন এক সংস্কৃতি ও লোভনীয় জীবনের গল্প শোনায় যা কোনোভাবেই সত্যিকারের জীবন নয়উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, রাত ১২টার পর মাত্র ২৫ পয়সায় রাতভর কথা বলার সুযোগ বা রাত জেগে কথা বললে একটার বদলে অন্যটা ফ্রি ইত্যাদি প্যাকেজের মাধ্যমে তরুণদের ঘুমহীন এক প্রজন্মে রূপান্তর করছে তারা

কম পয়সার চেয়েও রাতভর জাগিয়ে রাখার জন্য যে সময়টা দেওয়া হয় সেটি গুরুত্বপূর্ণগভীর রাতে কম পয়সার কলরেটের সঙ্গে তরঙ্গের মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়ছে অসভ্য, অশালীন, অসুস্থ এক সমাজএর মনস্তাত্ত্বিক এবং দর্শনগত অনেক ব্যাখ্যা আছেসেদিকে না গিয়েও বলা যায়, অপারেটররা দিনভর ঝিমানো এক তরুণ সমাজ বিনির্মাণে নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেরাতের ঘুমের অভাব পূরণ হচ্ছে না দিনে, ঘুমহীনতা তৈরি করছে অমনোযোগী, ভঙ্গুর প্রজš§যারা দিনের আলোর চেয়ে রাতের অন্ধকারই বেশি পছন্দ করে

একজন মনস্তাত্ত্বিক বলছিলেন, মোবাইল কোম্পানিগুলোর রাতের প্যাকেজের সবচেয়ে ক্ষতির শিকার তরুণরাইএদের মনোজগতে এমন এক প্রভাব ফেলছে তা কোনোভাবেই পূরণীয় নয়রাতে কম পয়সার কলরেটে মোবাইল কলের সঙ্গে একটি কিশোরীর বেডরুমে এক রাতে ঢুকছে একাধিক কিশোর বা তরুণআবার সদ্য তরুণের বিছানায় ঢুকে যাচ্ছে বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুরাএর সামাজিক প্রভাব ভয়ানককারণ যেকোনো কিছু সম্পর্কে মানুষকে জানার এবং আবিষ্কারের ব্যাপার থাকেসম্পর্কের মজাটাই এখানেকিন্তু মোবাইল সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণ-তরুণীরা সঠিক সময়ের আগেই অনেক বেশি জেনে যাচ্ছে, বুঝে যাচ্ছেএতে মানবিক সম্পর্ক অনেক বেশি কাগুজে হয়ে পড়ছেসামাজিক অন্যান্য সমস্যার কথা না হয় নাই উল্লেখ করা হলোএ প্রসঙ্গে মাহবুবুর রহমান নামক গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক বলছিলেন, ব্যবসায় শুধু মুনাফা নয়, দেশ-সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয় আছে, সে বিষয়টি অপারেটররা ভুলতেই বসেছে

গ্রাহককে না জানিয়ে এক নম্বর অন্যত্র বিক্রি

সাধারণত নিয়ম হলো, পোস্ট পেইড গ্রাহকের ক্রেডিট লিমিট পার হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট নম্বরের আউটগোয়িং-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়তবে ওই নম্বরে পরবর্তী এক মাস ইনকামিং বা বাইরের কল গ্রহণ করা যায়এ সময়ের মধ্যে ওই নম্বরের বিপরীতে টাকা রিচার্জ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়এর তিন মাস নো সাবস্ক্রাইবার হিসেবে রাখা হয়এর মধ্যে রিচার্জ না করলে দুই মাসের মাথায় নম্বরটি অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে দিতে পারে অপারেটরঅর্থাৎ একটি নম্বর অন্যত্র বিক্রি করতে হলে অপারেটরকে ন্যূনতম ছয় মাস সময় লাগেআইন অনুযায়ী সব অপারেটরেই একই নিয়ম অনুসরণ করার কথাকিন্তু অপারেটররা তা মানছে নাসম্প্রতি রবির একজন গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে তাকে না জানিয়ে নম্বর অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ায়। (নিরাপত্তার স্বার্থে এই গ্রাহকের নাম প্রকাশ করা হলো না)নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রাহক জানান, মাত্র এক মাসের মতো তিনি তার নম্বর বন্ধ রেখেছিলেনএর মধ্যেই রবি তার নম্বরটি অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে দেয়এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি দক্ষিনখান থানায় গত ১৩ জুন একটি জিডি করেনজিডি নং ৬৫৫পরে জিডিটি মামলায় রূপান্তর হয়থানার সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল মোতালেব মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা

জানা গেছে, এই গ্রাহকের নোটিশ পেয়ে রবি তড়িঘড়ি করে নম্বরটি বন্ধ করে দিয়েছেকিন্তু তাকে না জানিয়ে নম্বরটি কেন বিক্রি করা হলো তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি প্রতিষ্ঠানটিশুধু রবি নয়, প্রায় সব অপারেটরের বিরুদ্ধেই এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ আছে, যা নিয়ে একাধিক মামলা, জিডি ও উকিল নোটিশ পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে

কল রেটে নাকাল গ্রাহক

১০ সেকেন্ড পালস চালু হওয়ার পর গ্রাহকের কলরেট নিয়ে নতুন ভোগান্তির শুরুপালস ১০ সেকেন্ডের হলেও ন্যানো সেকেন্ডের হিসেবে এই পালসকে ১১ সেকেন্ড হিসাব করা হয়ফলে গ্রাহকের অজান্তেই সিস্টেম ২০ সেকেন্ডের বিল কেটে নেয় অপারেটররাঅথচ অপারেটরদের সামান্য সচেতনতাই গ্রাহককে বাড়তি বিলের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারেকিন্তু অভিযোগ জানানোর পরও শোনার বা সমাধানের কেউ নেই

আবার কাস্টমার কেয়ারের ফোন দিলে বেশির ভাগ সময় পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানাতে পারে না সেখানে কর্মরত কর্মীরাদেশের শীর্ষস্থানীয় এক অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করে সময় বিচিত্রাকে বলেন, ‘আমাদের কোনো সময় পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা হয় নাগ্রাহকেরা এমন সব তথ্য চায় যা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে বন্দী

ইন্টারনেট ব্যবহার না করেও বিলের ভোগান্তি

ইন্টারনেটের পুরো প্যাকেজ ব্যবহার না করেও অনেক সময় পুরো বিল প্রদান করতে হয়আর নেটের বিল বেড়ে যাওয়া নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেজানা গেছে, বর্তমানে কাস্টমার কেয়ারে সবচেয়ে বেশি ফোন আসে ইন্টারনেট-সংক্রান্তগ্রাহক-সেবা দেওয়ার জন্য কাস্টমার কেয়ারে যারা বসেন, তারা সমাধান দিতে ব্যর্থ হলেও ভোগান্তিটুকু মেনে নেওয়া ছাড়া গ্রাহকের আর কিছুই করার থাকে নাঅপারেটদের দোষে এ ঘটনা ঘটে থাকলে মাঝে মাঝে নাছোড়বান্দা গ্রাহককে রিবেট সিস্টেম প্রদান করে নিজেদের ভুল স্বীকার করে দায় মেটায়কিন্তু নেট-বিষয়ক বিড়ম্বনার কোনো সমাধান মেলে না

মূল্য সংযোজন সেবায় ভোগান্তি

কাস্টমার কোনো সেবার জন্য সিম অ্যাক্টিভ না করলে অটোমেটিক্যালি অপারেটররা সংশ্লিষ্ট সেবাটি চালু করে ব্যালান্স কেটে নিচ্ছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেনএমন একাধিক অভিযোগ প্রতিনিয়ত অপারেটরদের গ্রাহক-সেবা কেন্দ্রেও জমা হচ্ছেকখনো কখনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যালান্স সমন্বয় করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রাহকের অজান্তে অপ্রয়োজনীয় সেবা নিজ থেকেই চাল করে দিচ্ছে অপারেটররানা জানিয়ে যেকোনো বিশেষ সেবা চালু করা গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার শামিলতার চেয়েও বড় অপরাধ এই সেবার বিনিময়ে কোনো তথ্য না দিয়ে ব্যালান্স থেকে টাকা সমন্বয় করানিয়মিত এমন অপরাধ ঘটছেকিন্তু বেশির ভাগ গ্রাহক সচেতনতার অভাবে বুঝতেই পারেন না মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো কীভাবে তার টাকা নিজের করে নিচ্ছে

এমন ঘটনার চমৎকার একটি উদাহরণ পাওয়া গেল ২৪ জুন ফেসবুকে একজন এয়ারটেল গ্রাহকের স্ট্যাটাসেপাঠকের সুবিধার্থে হাসিবুর রেজা কল্লোল নামক ওই তরুণের স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলোএকসময়ের ওয়ারিদ এখন এয়ারটেলএদের মতো ডিজিটাল প্রতারক আর খুঁজে পাওয়া যাবে কি না আমার সন্দেহটাকা অ্যাকাউন্টে থাকলেই হলো, যেকোনো অজুহাতে টাকা কেটে নেবে! আর সার্ভিস-যা তা! মনের দুঃখে আমি গতকাল থেকে ফোন টাকাশূন্য করে রেখেছিলামআজকের এই শব-ই-বরাতের রাতে যেই টাকা লোড করলাম সাথে সাথে ২ টাকা ৩০ পয়সা নাই হয়ে গেল কোনো কারণ ছাড়াইএইটা এখন চোরের কোম্পানিভাবছি এয়ারটেল সিমটা আর ব্যবহার (ইউজ) করব না!এক কোম্পানির সিম বদলে অন্য কোম্পানির কাছে গেলে এর থেকে মুক্তি মিলবে এমন কোনো নিশ্চয়তা অবশ্য কল্লোলের স্ট্যাটাসে নেইনম্বর বদলের সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবে সেটা কতখানি সম্ভব, সেটাও একটা বড় প্রশ্নআর এ সুযোগটাই পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে অপারেটররা

ভিআইপি সিম বিক্রির রমরমা ব্যবসা

প্রায় সব অপারেটর ভিআইপি সিম বিক্রির রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছেনপছন্দের নম্বর নিতে হলে গুনতে হবে বাড়তি অর্থকাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়েও এ তথ্যের সত্যতা জানা গেছেভিআইপি সিমের সর্বনিম্ন দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকাঅথচ বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় অপারেটররা এ কাজ করছেতবে কেউ যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে এবং প্রমাণ মেলে তবে অপারেটরদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে

বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব আবু সাইদ খানের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির ব্যর্থতার কারণেই অপারেটরদের সেবার মান নিম্নমুখীতিনি বলেন, মোবাইল সেবা চালুর ২০ বছর পেরিয়ে গেছেএর মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবার ক্ষেত্রে কোনো মানদণ্ড তৈরি করে দিতে পারেনিআর সেবার মানের পরিধি ঠিক করে দেওয়া না হলে কিসের ভিত্তিতে অপারেটরদের কাছ থেকে মানসম্পন্ন সেবা পাওয়া যাবে? এটা আশা করাও ভুলমান নির্ধারিত থাকলেই না নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসেপ্রতিষ্ঠার পর থেকে বিটিআরসি কাজের কাজ কমই করেছেতারা যদি একটু সিরিয়াস হয় গ্রাহকদের সুরক্ষায়, তবে অবশ্যই সাধারণ গ্রাহকেরা উপকৃত হবে

সার্বিক বিষয়ে একাধিকবার বিটিআরসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তাকে পাওয়া যায়নিফলে জানা যায়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তারা সেবার মান উন্নয়নে কী পরিকল্পনা নিচ্ছে

বিপ্লবের দুই দশক

যোগাযোগ খাতকে বদলে দেওয়া মোবাইল ফোনের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ২০ বছর আগেদক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই প্রথম ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে এএমপিএস (অ্যাডভান্সড মোবাইল ফোন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল ফোন সেবা শুরু হয়১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিকম লি. (বিটিএল) মোবাইল সেবার অনুমোদন পায়হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (এইচবিটিএল) বিটিএলের সাথে যৌথভাবে বিনিয়োগ শুরু করেপরে ১৯৯৩ সলে হাচিসন প্রথম অপারেটর হিসেবে ঢাকা শহরে এএমপিএস মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোন সেবা শুরু করেপরের বছর প্যাসিফিক মটরস বিটিএলের ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়১৯৯৬ সালে এইচবিটিএল প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি. নাম ধারণ করে ব্যবসা শুরু করেসে সময় সিটিসেল ডিজিটাল ব্র্যান্ড নাম দিয়ে তাদের মোবাইল পণ্য বাজারে বিপণন শুরু হয়সিটিসেলই দেশের একমাত্র সিডিএমএ মোবাইল সেবা প্রধানকারী অপারেটর

১৯৯৬ সালে গ্রামীণফোন, একটেল ও সেবা টেলিকম (বর্তমানে বাংলালিংক) তিনটি জিএসএম লাইসেন্স অনুমোদন পায়১৯৯৭ সালে একটেল (বর্তমানে রবি) প্রথম জিএসএম মোবাইল সেবা প্রদান শুরু করেআজিয়াটা (বাংলাদেশ) লিমিটেড (পূর্বের টিএম ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড) একটা যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি২০০৮ সালে এ কে খান কোম্পানি তাদের অংশ (৩০%) বিক্রি করে দেয় ইটিসালাট এবং এনটিটি ডোকোমোর কাছেএ প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ টেলিকম মালয়েশিয়া এসডিএস, বিএইচডি ও ৩০ শতাংশ এনটিটি ডোকোমোররবি ব্যবহারকারী ও আয়ের দিক থেকে দেশের ৩য় বৃহত্তম মোবাইল ফোন কোম্পানি

গ্রামীণফোন ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যক্রম শুরু করেগ্রামীণফোন বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজারের ৫০ শতাংশের বেশি অংশ দখল করে আছে

বাংলালিংক বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম জিএসএম-ভিত্তিক মোবাইল ফোন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানপ্রতিষ্ঠানটি ওরাসকম টেলিকমের মালিকানাধীন একটি কোম্পানি২০০৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলালিংক বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি মোবাইল ফোন সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিটিবি সংযোগ থেকে মোবাইল ফোনে বিনামূল্যে টেলিফোন রিসিভের সুযোগ করে দেয়১৯৮৯ সালে সেবা টেলিকম (প্রা.) লিমিটেড ১৯৯টি গ্রামীণ উপজেলায় টেলিফোন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে নিবন্ধীকরণ করেপরবর্তীকালে তারা সেলুলার রেডিও-টেলিফোন সেবার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম বর্ধিত করে২০০৪ সালের জুলাই মাসে ওরাসকম টেলিকম সেবা টেলিকমের মালয়েশিয়ান অংশীদারি কিনে নেয়২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওরাসকম টেলিকম সেবা টেলিকমের ১০০% শেয়ার কিনে নেয়এরা ৬০ মিলিয়ন ডলার মূলধন বিনিয়োগ করে এবং টেলিফোন ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে রাখে বাংলালিংক২০০৫ সালের ফেব্রয়ারিতে বাংলালিংক নামে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় যাত্রা শুরু করে

টেলিটক বাংলাদেশের সরকারি মালিকানাধীন মোবাইল ফোন কোম্পানি২০০৪ সালে টেলিটককে জিএসএম লাইসেন্স প্রদান করা হয়২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক বিপণন শুরু করে

এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড ভারত-ভিত্তিক ভারতী গ্রপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানজিএসএম-ভিত্তিক মোবাইল টেলিকম সেবা দিচ্ছে এই অপারেটর২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সমঝোতা স্মারক সই করার মাধ্যমে দেশে ওয়ারিদের যাত্রা শুরুপরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে এ প্রতিষ্ঠান ৭০% শেয়ার গ্রহণ করে এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড নাম ধারণ করেএকই বছরের ২০ ডিসেম্বর তা এয়ারটেল নামে সেবা প্রদান শুরু করে২০০৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়ারিদ টেলিকম ইন্টারন্যাশনাল এলএলসি ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে বিটিআরসি থেকে বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ জিএসএম মোবাইল অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স পায়

এত কিছুর পরও মোবাইল সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছেইউটিলিটি বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে ট্রেনের টিকিট পরীক্ষার রেজাল্ট-সবই জানা সম্ভব হচ্ছে মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমেশুধু প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সেবার দিকে সামান্য নজর দিলেই এই খাত আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ