লা রনদে একদিন | সময় বিচিত্রা
লা রনদে একদিন
শিপ্রা রায়
17_19

আকাশ পানে তাকিয়ে দেখে রং-বেরঙের ছবি

কল্পনার রংতুলিতে হলাম নতুন কবি

পার করে সব স্মৃতির পাহাড়

 এলোমেলো ঝড়ের প্রহার-

নীরব সবুজ মনের ঘাসে পাল তুলে নাও চলি,

মেঘ চঞ্চল কলির রাগে আত্মস্বরূপ ভুলি

 

 

মানুষের অজস্র বৈচিত্র্যের মাঝে শৈশবস্মৃতির রোমন্থন এক অনন্য সেতুবন্ধনস্তরে স্তরে সাজানো বাহ্যিক জটিলতার আবর্তে আবদ্ধ মানুষ এক মুহূর্তের মুক্তির স্বাদ পেতে আশ্রয় নিতে চায় ছেলেবেলার দুরন্তপনায়চিরন্তন আনন্দের খোঁজে সব দেশের সব জাতিবর্ণের মানুষ শিশুর বাঁধনহীন উন্মাদনার কোলাহলে ভেসে যেতে চানএই আকুতিকে অবলম্বন করেই দেশে দেশে গড়ে উঠেছে অজস্র থিম পার্ককানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মন্ট্রিয়ালের অন্যতম আকর্ষণ সেন্ট লরেন্স নদীনদীর সেন্ট হেলেন দ্বীপের পূর্ব প্রান্তে বিনোদন পার্ক লা রনদে১৪৬ একর এলাকাজুড়ে বিশাল পার্কটিতে রয়েছে রোলার কোস্টার, ওয়াটার কোস্টারসহ ৪০টি আধুনিক রাইডসমে মাসের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত খোলা থাকে পার্কটি

গত ২২ জুন বন্ধুদের নিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম লা রনদেআমাদের টিকিট আগেই কাটা ছিলআমরা প্রথমেই চড়লাম সবচেয়ে উঁচু, দ্রুততম ও বৃহত্তম রোলার কোস্টারে, যেটি গোলায়েথ নামে পরিচিত এবং লা রনদের সবচেয়ে বিখ্যাত ও ব্যয়বহুল রাইডজানা গেল, এই রাইডের জন্য খরচ হয়েছে ১৮ মিলিয়ন ক্যানাডিয়ান ডলারবিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে ১৫-২০ মিনিট পর আমরা রাইডের সিটে বসলামপার্থের (আমার স্বামীর বন্ধু) কিছুটা অ্যাক্রফোবিয়া থাকলেও সাহস করে উঠল আমাদের সঙ্গেআমি ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে রোমাঞ্চিতও হলাম৪০৩৯ ফুট দীর্ঘ ও ৯৬ সেকেন্ড স্থায়ী রাইডটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৭৫ ফুট, সর্বোচ্চ পতন ১৭১ ফুট ও গতিবেগ ১০৯.৯ কিলোমিটারসর্বোচ্চ পতনবিন্দু থেকে পড়ার সময় মনে হলো যেন শূন্যে ভাসছি আর অতলে তলিয়ে যাচ্ছিপ্রতিটি মুহূর্তে হৃদয়ে মথিত হলো পরিণতির আকুতিরোমাঞ্চিত কম্পনে শেষ হলো যাত্রানিচে নেমে কম্পিউটারে বিশেষ ক্যামেরায় তোলা নিজেদের ছবি দেখে হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হলো সবারকেউ কেউ নিজেদের ছবি সঙ্গেও নিয়ে নিলঅন্যরা এরপর ভ্যাম্পায়ার, কোবরা, বুমেরাং নামে আরও কয়েকটি থ্রিল রাইডে উঠলেও আমি, পার্থ আর স্প্যানিশ একটি মেয়ে সেগুলোতে উঠলাম নাসেই সময় আমি একাই ট্যুর দে ভিলআর পার্থের সঙ্গে ল্যা ঘন্ড অভুলিনামে রাইডে উঠলাম, যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় যথাক্রমে শহর পরিভ্রমণআর বিশাল উড্ডয়নএরপর সবাই মিলে গেলাম স্প্ল্যাশ নামের ওয়াটার রাইডেএকটি বোটে ২০ জনকে নিয়ে ১৫ মিটার বা ৫০ ফুট উঁচু ঝরনা থেকে ছিটকে পড়ে ৫ মিটার বা ১৬ ফুটের জলোচ্ছ্বাসে ভিজে গেলাম আমরা সবাইভালো লাগার কারণে যে চারবার সেই জলের তোড়ে ভাসলাম আমরাবৃষ্টির জন্য গরম কম ছিল সেদিন, তাপমাত্রা ছিল ২০০ সেলসিয়াসপরে সবাই মিলে ইলেকট্রিক বাম্পার কারে চড়লাম পরপর তিনবারদুপুর ১টার দিকে সাবওয়েতে লাঞ্চ করলামলাঞ্চ শেষে আমরা চড়লাম টাবগান নরডিক নামে আরেকটি রোলার কোস্টারেএটিতে চারজনের একটি কার হেয়ার পিনের মতো ঘোরেএরপর গেলাম অ্যাকুয়া টুইস্টেনিজে ভিজতে আর অন্যকে ভেজাতেএই রাইডে একটি ছোট লেকে নয়টি গোলাকার ইলেকট্রিক বোট আছে, যার প্রতিটিতে ছয়জন করে বসতে পারেরাইড চালু হওয়ার পর বোটের নিচের অংশ জলে ডুবে যায় এবং ঘূর্ণাকারে ঘুরতে থাকেপ্রতিটি বোটে ছয়টি করে ওয়াটার গান আছে, যাতে এক বোটের যাত্রী অন্য বোটের যাত্রীকে ওয়াটার হিট করতে পারেআমি কাউকে ভেজাতে পারলাম কি না জানি না, কিন্তু নিজে পুরোই ভিজে একাকারআর তাই আবার গেলাম স্প্ল্যাশ রাইডেআরও দুবার ওয়াটার স্প্ল্যাশড হলামএকটু ভেজা ভাব কাটাতে ইলেকট্রিক বাম্পার কারে চড়লাম পরপর দুবারএই বাম্পার কারে ওঠার জন্যই প্রতিবার সবচেয়ে বড় লাইনে দাঁড়াতে হলোসকাল থেকে বৃষ্টি পড়লেও লোকসংখ্যা কম ছিল না, বরং বিকেলের দিকে আরও বাড়তে লাগল মানুষের সংখ্যাআমাদের গ্রুপের ১২ জনের মধ্যে চারজন স্প্যানিশ, দুজন স্লোভাক, দুজন ইরানি, একজন ফ্রেঞ্চ, একজন মরক্কান, একজন ইন্ডিয়ান বাঙালি (পার্থ) আর আমি বাংলাদেশেরতাই সবার সঙ্গে ইংরেজিতে আর নিজেদের সঙ্গে একেকজন একেক ভাষায় কথা বলছিলামবেশ মজার ব্যাপার ছিল সেটা

 

লা রনদের আরও একটি বিশেষত্ব হলো ইন্টারন্যাশনাল পাইরোমিউজিক্যাল ফায়ারঅর্ক কম্পিটিশন, ২০১৩এটি প্রতিবছর লা রনদেতেই আয়োজিত হয়মন্ট্রিয়াল শহরের ওল্ড পোর্ট থেকেও ফায়ারঅর্ক কম্পিটিশন দেখা সম্ভব, কিন্তু শুধু এখানেই এই আর্ট ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে উপভোগ করা যায়দিনটি ছিল ২৯তম মন্ট্রিয়াল ফায়ারঅর্ক কম্পিটিশনের উদ্বোধন প্রহর আর একে সফল করার ভার পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ার উদীয়মান শিল্পী আয়ান রিদেল ও তার ডিজাইনার রবার্ট ফেয়ারব্যাংকের ওপরম্যাজিক অব দ্য মুভিজশিরোনামের সেই পাইরোমিউজিক্যাল ফায়ারঅর্ক আমার জীবনে স্বচক্ষে দেখা প্রথম শৈল্পিক আতশবাজিরাতে গানের সুরে আগুনের হলকা, চিত্র-বিচিত্র অগ্নিশিখার ফুলঝুরি, আকাশে জ্বলে ওঠা সহস্র তারার বাতি আর হাজার হাজার মন্ট্রিয়ালবাসীর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের তীব্র কোলাহল আমাকে নিয়ে গেল অন্য কোনো জগতেশিল্পকর্মের এই নতুন ধারায়, এই সজীব উন্মোচনে আমি জানলাম কলানৈপুণ্যের অনন্ত বিস্তারকেমনের মধ্যে সংজ্ঞায়িত শিল্পের গণ্ডিকে পেরিয়ে জানার পিপাসায় কয়েক বিন্দু নতুন স্বাদের অমৃত নিয়ে শেষ হলো আমার শৈশবে ফেরার ক্ষুদ্র প্রয়াসজীবনের খাতায় যোগ হলো কিছু নতুন স্মৃতি, পথ চলায় নতুন ছন্দআর তাই নিয়ে সবাইকে বিদায় জানিয়ে রাত্রি প্রায় ১২টায় ফিরে এলাম আমার চেনা নীড়ে


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ