পরি | সময় বিচিত্রা
পরি
রকিবুল ইসলাম মুকুল
17_24

অনেক রাতদেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটা থেকে টিকটিক শব্দ আসছেঘুরছে সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টাঘর অন্ধকার বলে সময় দেখার সুযোগ নেইইচ্ছেও করছে না উঠে বাতি জ্বালিয়ে সময় দেখারবারান্দার দরজা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছেপতপত শব্দে পর্দা উড়ছেফাগুনের এই মাতাল হাওয়ায় খানিকটা শীত শীত করছে সেকান্দার সাহেবেরআকাশে অর্ধচন্দ্রআলো-ছায়ার আঁধারিতে ষোলোতলার এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ভুতুড়ে নগরীর বেশ খানিকটাই দেখা যাচ্ছেবেশির ভাগ বাড়ির লাইট নেভানোডিম লাইটের মিটিমিটি আলো ছাপিয়ে উঠছে স্ট্রিট লাইটগুলোকেমন যেন এক রহস্যময়তা আর নির্জনতা চারপাশে

পাশের ঘরে ছোট্ট বিছানায় মাকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে ইহাননিষ্পাপ সৌম্য চেহারা যেন জ্বলজ্বল করছে হলুদ মিটিমিটি ডিম লাইটের আলোয়পর্দা সরিয়ে এক পলক দেখে আবার জানালার গ্রিলে হাত রাখলেন সেকান্দার সাহেববুকের ঠিক বাম দিকটায় চিনচিনে ব্যথা হচ্ছেসেই রাত ১২টা থেকে একটি চিঠি লেখার চেষ্টা করছেনপারছেন নাকিছুই মাথায় আসছে না, কী লিখবেনযত ভাবছেন, কিছু লিখতে পারছেন না…ততই জেদ বাড়ছেরাগ লাগছেমনখারাপের পরিমাণটা বাড়ছেডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছে

জানালা লাগোয়া টেবিলে রাইটিং প্যাডকলমআবছা অন্ধকারে টেবিলে এসে বসলেন সেকান্দার সাহেবগোটা দশেক কাগজ দুমড়ানো-মোচড়ানো টেবিলেকিছুতেই যে লেখা হচ্ছে নাসেই সন্ধ্যায় ঠিক করেছেন, অন্ধকারে চিঠি লিখবেনকিন্তু এখন যে আর মাথায় কিছু আসছে নারাইটিং প্যাডে আলো-আঁধারিতে অনবরত লিখে চলেছেন প্রিয় উমামা, আমার উমামা, উমামা…সম্ভাষণই তো ঠিক করা যাচ্ছে নাএকেক পাতায় একেক সম্ভাষণ লিখছেন আর মনের মতো হচ্ছে না বলে দুমড়েমুচড়ে ছুড়ে ফেলছেন টেবিলে

দমকা হাওয়ার তোড়ে ঘরময় ছড়িয়ে গেল দোমড়ানো কাগজগুলোটেবিলে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন সেকান্দার সাহেবকীভাবে লিখবেন চিঠিটিআজ রাতেই যে পৌঁছাতে হবে উমামার কাছে

হঠাৎ শীতল একটি হাতের স্পর্শে গায়ে কাঁটা দিলপেছন ফিরে তাকাতেই বাকরুদ্ধ হলেন সেকান্দার সাহেবপেছনে যে ছোট্ট একটি পরিফুটফুটে পরিআলোয় ভরে গেছে চারপাশবিস্ফারিত চোখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন সেকান্দার সাহেবএ-ও কি সম্ভব?

ছি বুড়ো খোকা, কাঁদছ কেন? বড়রা কখনো কাঁদে?

আমি যে কিছু লিখতে পারছি নাআমার মাথায় কিছু আসছে না কী লিখব? বিস্ময় কাটিয়ে সহজ উত্তর সেকান্দার সাহেবের

ছোট্ট পরি এগিয়ে এললাফিয়ে কোলে উঠে জড়িয়ে রাখল সেকান্দার সাহেবকেগোটা গোটা হাতের আঙুলে চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রুবিন্দু মুছে দিলপরিকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন সেকান্দার সাহেব

অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে গেল মনকষ্টের স্রোত বেয়ে যখন এক মুঠো ভালো লাগা আসে, তখন সেটিই মানুষের কাছে মূল্যবান হয়ে ওঠে, বহু মূল্যবানমানুষের জীবনে কত ঘটনাই না ঘটে, যার কোনোটির ব্যাখ্যা থাকে আর কোনোটি হয়তো ব্যাখ্যাতীত হয়েই থেকে যায়, যার খবর কেউ জানে না বা জানা সম্ভবও হয় নাআজ যেমন বিকেল থেকে বুকের ভেতর জমাট বাঁধা সব কষ্টরা যেন ঝরনাধারা হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে সেকান্দার সাহেবের চিবুক বেয়েফুটফুটে পরি শক্ত করে জড়িয়ে রাখে সেকান্দার সাহেবকেপরিরও যে মন খারাপ

পরি কোল থেকে নেমে সারা ঘর হেঁটে বেড়ায়দুমড়ানো-মোচড়ানো কাগজ বুকে তুলে নেয়এই তো চিঠি…এই তো লিখেছ তুমি…

কাগজের টুকরোগুলো এগিয়ে নিয়ে যায় সেকান্দার সাহেবের কাছেএকেকটা খুলতে থাকেখিলখিলিয়ে হেসে ওঠেহাসির এই রিনিঝিনি যেন কত দিন, কত মাস, কত বছর পর নূপুরের শব্দ হয়ে কানে বাজে সেকান্দার সাহেবেরযেন যুগজনমের চেনা এই হাসিবড় আপন, বড় মধুর এই হাসিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকেন সেকান্দার সাহেবজাগরণ, তন্দ্রা, বাস্তব আর পরাবাস্তবের এক বিশাল জগৎ যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে তাকেষোলোতলার এই অ্যাপার্টমেন্টের মেঝে ফুঁড়ে যেন নিচে নামতে থাকেন তিনিউল্টো ঘুরতে থাকে ঘড়ির কাঁটাথিতু হতে থাকে ধীরে ধীরেএক বছর আগের এই দিনে এসে থেমে যায়নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশযেদিন আঁধার গ্রাস করেছিল এই পৃথিবীটাকেসবকিছু যেন উল্টো দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সেকান্দার সাহেবকে

টানা বেজে চলেছে টেলিফোন সেটটাদুপুরে খাওয়ার সময়ও পাননিঅফিসের জরুরি মিটিং বলে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট সেই সকাল থেকেসাড়ে ৫ কোটি টাকার একটা অর্ডার সামান্য ভুলে বাতিল হতে বসেছেমন-মেজাজ এমনিই খিঁচড়ে আছেতার ওপর একনাগাড়ে বেজে চলা ফোনে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠলেন সেকান্দার সাহেবঅনেকটা বিরক্তি নিয়েই ফোন তুললেন তিনি

হ্যালো

ওপাশে কান্নার শব্দফুঁপিয়ে কাঁদছেন সেকান্দার সাহেবের স্ত্রী শ্যামলী নাসরীন

হ্যালো, কী হয়েছে, বলো

ওপাশে কান্নার শব্দ

আচ্ছা বাবা, বলতে তো হবে কী হয়েছেআমি বুঝব কীভাবে তুমি কোথায়?

অনেক কষ্টে দুটি শব্দ বুঝতে পারলেন সেকান্দার সাহেবউমামালাইফটাইম হসপিটাল

কখন চেয়ার ছেড়েছেন, অফিস থেকে কীভাবে ছুটে গাড়ির কাছে এসেছেন মনে নেইসময় ওলটালেও কিছু খণ্ডিত অংশের কোনো রেকর্ড থাকে না হয়তোএই সময়টারও কোনো রেকর্ড মুছে গেছে হয়তোড্রাইভার মনিরকে চালাতে বললেন লাইফটাইম হসপিটালমতিঝিলের ব্যস্ততম এই সড়কে এখন অফিসফেরত মানুষের জটলাটাইট করে আঁটা জানালা ভেদ করে সেকান্দার সাহেবের মাথায় ভোঁ ভোঁ করছেভেঁপু সাইরেনের শব্দ গ্রাস করছেদুহাতে কান চেপে রাখছেনএসির ঠান্ডা বাতাসেও দরদর করে ঘামছেনবিশ্রী রকমের যানজটে আটকে আছে সব পথঘাটমতিঝিল থেকে বারিধারার লাইফটাইম হাসপাতাল যেন যোজন যোজন দূরদুহাতে দুই ফোনে সমানে ডায়াল করতে থাকেন সেকান্দার সাহেবকললিস্ট থেকে বউ, আম্মা, ফারুক, সৌমিক-সব নাম্বারে ডায়াল করেনকারওটা ব্যস্ত, কারও ফোনে দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে নাঅজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে ওঠেনবুকের ভেতর কেমন জানি করে ওঠেডায়াল চাপতে থাকেন পাগলের মতোখুব ইচ্ছে হচ্ছে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিতে দামি স্মার্টফোন দুটোঅর্থহীন মনে হচ্ছে দুনিয়াটাকেব্যবসা, জরুরি মিটিং, রপ্তানি অর্ডার-কত কিছুই মাথা থেকে উবে যাচ্ছে ধোঁয়া হয়ে, ঠিক বুঝতে পারছেন সেকান্দার সাহেববুকের চিনচিনে ব্যথাটা বাড়তে থাকেদ্রুত হাতব্যাগ হাতড়ে জিবের নিচে স্প্রে করেনপথ যেন আর ফুরোয় না

লাইফটাইম হাসপাতালে এসে যখন পৌঁছান সেকান্দার সাহেব, সন্ধ্যা গড়িয়ে আঁধার নেমেছেবারিধারার অত্যাধুনিক এই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে কতগুলো নির্বাক মুখশঙ্কাচ্ছন্ন এই মানুষগুলোকে বড় অচেনা মনে হতে থাকে সেকান্দার সাহেবেরছুটে এসে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন শ্যামলী নাসরীন

কী হয়েছে আমার উমামার? অপারেশন থিয়েটারের সামনের লনেই সংজ্ঞা হারান সেকান্দার সাহেব

বেলা ঠিক দুটোয় স্কুল ছুটি হয় উমামারগুলশানের বাসা থেকে আনা-নেওয়া করে প্রায় দেড় যুগের বিশ্বস্ত গাড়িচালক কবিরনিয়ম করে সকাল ৮টায় বের হয়দুটোয় বেরিয়ে কোনো দিন তিনটা বা সাড়ে তিনটায় বাসায় ফেরেবেশির ভাগ দিন মেয়েকে স্কুলে দিয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে পড়েন শ্যামলী নাসরীনইহান ধানমন্ডির ম্যাপল লিফ এ পড়েতাকে নিয়েও ব্যস্ততা কম যায় না শ্যামলী নাসরীনেরব্যবসার কারণে সেকান্দার খুব ব্যস্ত থাকেন বলে এই আনা-নেওয়ার কাজটা হয় স্ত্রী, না হয় ড্রাইভার কবিরকে দিয়ে করান

স্কলাসটিকার প্লে গ্রুপে মর্নিং শিফটের সবার প্রিয় মুখ উমামাক্লাসের আর দশজন স্কুলড্রেসের বাচ্চাদের থেকে সহজেই খুঁজে নেওয়া যায় তাকেকালো জ্বলজ্বলে বড় চোখমাথার বড় চুলের ঝুঁটিহাসি ঝুলে থাকা মুখক্লাসটিচারদেরও খুব প্রিয় আর আদরের উমামাস্কুল শেষে তাইতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো কোনো টিচার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন উমামাকে

দুটোর দশ মিনিট আগে কবিরকে ফোন করেছিলেন শ্যামলী নাসরীনআর আড়াইটায় ফোন এল অপরিচিত নম্বর থেকে

হ্যালো, শ্যামলী নাসরীন বলছেন?

জি বলছি

লাইফটাইম হাসপাতাল থেকে বলছি

বুকটা ধড়াস করে ওঠে শ্যামলী নাসরীনেরজি বলুন

জি ম্যাডাম, আসলে…খারাপ খবর আছেআপনার গাড়িটা খিলক্ষেতে অ্যাকসিডেন্ট করেছিল…

চারপাশে অন্ধকার দেখতে থাকেন শ্যামলী নাসরীনমনে হয়, মাথা ঘুরে এখনই পড়ে যাবেনঅনেক কষ্টে সামলে নেন নিজেকে

আপনার ড্রাইভারকে আমরা বাঁচাতে পারিনিআপনার মেয়ের ব্যাগে ইমার্জেন্সি নম্বর ছিল আপনারসেখান থেকে ফোন করলামপ্লিজ, আসুন

হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেলউদ্ভ্রান্তের মতো হাসপাতালে ছুটলেন শ্যামলী নাসরীন

টানা ৫ ঘণ্টার চেষ্টাতেও বাঁচানো গেল না উমামাকেসরি

অপারেশন থিয়েটার-ফেরত ডাক্তারদের সিনিয়র মাথা নিচু করে এ কথা বলেই চলে গেলেন

কেঁদে উঠল আকাশ-বাতাসদপ করে যেন আজ নিভে গেল সব আলোহাসিমুখগুলো যেন হারিয়ে গেল মেঘেদের দেশেচারপাশে শুধু হাহাকার, শূন্যতাহাসপাতালের কাচঘেরা দেয়াল ভেদ করে কান্নার ঢেউ এসে মিশে গেল জনসমুদ্রে

সেই জনসমুদ্রের ভিড়ে ছুটে চলেছেন সেকান্দার সাহেবহাতে এক তোড়া ফুল, বুকপকেটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠিকিছুতেই ধরতে পারছেন না উমামাকেখিলখিলিয়ে হেসে ছুটে চলেছে নগরীর অলিতে-গলিতেপেছন পেছন ছুটছেন সেকান্দার সাহেবআজ যে উমামার জন্মদিন

উমামা থাকলে আজ পাঁচে পা দিতসেই দুপুরের পর বেরিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে উমামার জন্য জামা কিনেছেন সেকান্দার সাহেবফুল কিনেছেনপাঁচ পাউন্ডের কেক কিনেছেনসন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ড্রয়িংরুমে সব সাজিয়েছেনমোমবাতি জ্বলেছেতারপর ডুকরে কেঁদেছেনপরিবারের সবাই কেঁদেছেআজ যে বেদনার দিনসব হারানোর দিন

কিন্তু এখন মনটা ভালো সেকান্দার সাহেবেরউমামা ফিরে এসেছেসেই যে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে, কিছুতেই ছাড়ছে নাআবার নিজেই নেমে সারা ঘর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেঘরের কোণে সযতেœ সাজিয়ে রাখা খেলনাগুলো নিয়ে দুর্বার খেলছেবড় ভালো লাগছে সেকান্দার সাহেবেরএ ভালো লাগার মূল্য যে কতটা, যার ভালো লাগা নেই সেই তো বুঝতে পারে

রাত ক্রমশ বাড়তে থাকেঝিরিঝিরি বাতাসে হলদে আভায় ছেয়ে ওঠে পুবাকাশটেবিলে মুখ গুঁজে উমামাকে প্রাণভরে দেখতে থাকেন সেকান্দার সাহেবউমামা এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মাথায়বাহুতে শক্ত করে মেয়েকে জড়িয়ে রাখেনছোট্ট তুলতুলে মুখে হাত বুলিয়ে দেনবহুদিন পর আজ কানায় কানায় ভরে ওঠে সেকান্দার সাহেবের এই বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টএত সুখ আর অনাবিল শান্তি যেন এক স্বপ্নের বাগানে ছুটে চলেছেন অবিরামছোট্ট হাতে বাবার মাথায় বিলি কাটতে থাকে পরিসেকান্দার সাহেব তলিয়ে যেতে থাকেন গভীর ঘুমের রাজ্যে


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ