উইম্বলডনের নতুন রাজা মারে, রানি বারতোলি | সময় বিচিত্রা
উইম্বলডনের নতুন রাজা মারে, রানি বারতোলি
সাহাদাৎ রানা
22

অবশেষে দীর্ঘ ৭৭ বছরের অপেক্ষার অবসান হলো ব্রিটিশদের৷ ১৯৩৬ সালে প্রথম ব্রিটিশ হিসেবে উইম্বলডনের পুরুষ এককের শিরোপা জিতেছিলেন ফ্রেড পেরি৷ এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়৷ ক্রীড়াঙ্গনে অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য পেলেও উইম্বলডনের শিরোপা খরা থেকেই যাচ্ছিল৷ অবশেষে সেই খরা কাটালেন অ্যান্ডি মারে৷ ফ্রেড পেরির পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ব্রিটিশদের হয়ে উইম্বলডনে পুরুষ এককে শিরোপার দেখা পেলেন তিনি৷

অ্যান্ডি মারের সাফল্যের জয়যাত্রা অবশ্য শুরু হয়েছে গত বছর থেকে৷ গত বছর ইউএস ওপেনে পুরুষ এককে শিরোপা ঘরে তোলেন তিনি৷ আর এই শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের ৭৬ বছরের গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা খরা কাটান মারে৷ এ ছাড়া অলিম্পিকের সোনা জয়ও তার সাফল্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে৷ তাই এবারের উইম্বলডন শুরুর আগেই তাকে আলাদা করে হিসাবের খাতায় রেখেছিল সবাই৷ ফাইনালে উঠে তার যথার্থতার প্রমাণ দেন মারে৷ যেখানে তিনি প্রতিপক্ষ হিসেবে পান সার্বিয়ান তারকা নোভাক জোকোভিচকে৷ প্রতিপক্ষ হিসেবে জোকোভিচ যথেষ্ট শক্তিশালী৷ আর রেঙ্কিংয়ের হিসাবে অবশ্য পার্থক্যটা খুব একটা বেশি ছিল না দুজনের মধ্যে৷ রেঙ্কিংয়ের এক নম্বর তারকা নোভাক জোকোভিচ৷ আর এর পরের নামটিই অ্যান্ডি মারের৷ তাই বলা মুশকিল ছিল কে জিতবে শিরোপা৷ সবশেষ মুখোমুখি লড়াইয়ে অবশ্য জয়টা ছিল জোকোভিচের৷ গত জানুয়ারিতে জোকোভিচের কাছে হেরে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা হাতছাড়া করেন মারে৷ বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্লামটা হারিয়ে কিছুটা হতাশ ছিলেন মারে৷ তবে ব্রিটিশরা তাকে ঘিরে দেখেছিলেন অন্যরকম স্বপ্ন৷ যে স্বপ্ন জয়ের জন্য তাদের অপেক্ষা দীর্ঘ ৭৭ বছর৷ সবার মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল বারবার৷ মারে কি পারবেন ব্রিটিশদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে!

সাম্প্রতিক সময়ে মারের পারফরম্যান্স অবশ্য আশা জাগিয়েছে ব্রিটিশদের মনে৷ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ব্যর্থ হলেও গত বছর ইউএস ওপেন এই জোকোভিচকে হারিয়ে ব্রিটিশদের ৭৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটান তিনি৷ তাই তাকে ঘিরে আলাদা স্বপ্ন দেখা কোনো অন্যায় ছিল না ব্রিটিশদের জন্য৷ গত বছর অলিম্পিকে গেমসেও সোনার পদক গলায় জড়ান মারে৷ যেখানে ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন এই জোকোভিচ৷ তাই উইম্বলডনে এই ফাইনালের আগে কাউকেই এগিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না৷ তবে একটি দিক দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন মারে৷ নিজের পরিচিত কোর্ট বলে কথা৷ তবে এটা যে মনের ভেতরে বাড়তি একটা চাপ, এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না৷ কেননা, তার দিকেই যে সবার দৃষ্টি৷ যেখানে হাজির ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজপরিবারের অনেক সদস্যও৷

সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে অবশ্য বেশি সময় নেননি অ্যান্ডি মারে৷ ফাইনালের মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নোভাক জোকোভিচকে কোনো পাত্তাই দেননি দুই নম্বর তারকা অ্যান্ডি মারে৷ শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল মারের হাতে৷ জোকোভিচের দুটো সার্ভিস ব্রেক করে, দাপটের সঙ্গে প্রথম সেট জিতে নেন মারে৷ তবে দ্বিতীয় সেটে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেন জোকোভিচ৷ দারুণভাবে শুরু করে ৪-১ গেমে এগিয়ে যান তিনি৷ তবে এখানেই শেষ৷ এর পরই অবশ্য ঘুরে দাঁড়ান মারে৷ সার্বিয়ান প্রতিপক্ষের দুটো সার্ভিস ব্রেক করে ২-০ সেটে এগিয়ে যান তিনি৷ দ্বিতীয় সেট জিতে নেন ৭-৫ গেমে৷ তৃতীয় সেটের প্রথম গেম হারলেও পরপর দুটো ব্রেক করে ৪-২ গেমে এগিয়ে যান জোকোভিচ৷ কিন্তু খেলা চতুর্থ সেটে নিয়ে যেতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন৷ ৫-৪ গেম এবং ৪০-০ পয়েন্টে এগিয়ে শিরোপার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান মারে৷ ৬-৪ গেমে সেট জিতে শিরোপা উল্লাসে ভাসেন এই ব্রিটিশ৷ শেষ হয় যায় ৩ ঘন্টা ৯ মিনিটের লড়াই৷ যে লড়াইয়ে শেষ নায়ক মারে৷ আর এমন এক নায়কের জন্য ব্রিটিশদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৭৭ বছর৷

দীর্ঘ ৭৭ বছর পর ব্রিটিশদের আনন্দে ভাসিয়ে শিরোপা উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি৷ এমন এক সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই অনেক উল্লসিত ছিলেন অ্যান্ডি মারে, যা প্রতিফলিত হয়েছে মারের কন্ঠে৷ জানিয়েছেন নিজের অনুভূতি, ‘আমি জানি, উইম্বলডনে ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়ন দেখার জন্য সবাই অনেক মুখিয়ে ছিল৷ আর আমার হাত দিয়ে তাদের দীর্ঘ দিনের অপেক্ষার অবসান হওয়ায় নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছি৷ আশা করছি, সবাই এটা উপভোগ করেছে৷’ সত্যিই ব্রিটিশরা মারের এই সাফল্য উপভোগ করেছে৷ আর পাশাপাশি এটাও নিশ্চয় প্রত্যাশা করেছে, আরেকটি উইম্বলডনের জন্য যেন তাদের এত দিন অপেক্ষা করতে না হয়৷

এদিকে উইম্বলডনে নারীদের এককে এবারের আসরকে বলা যেতে পারে অঘটনের আসর৷ সেমিফাইনালের আগেই ছিটকে পড়েছেন সেরেনা উইলিয়ামস, মারিয়া শারাপোভা, পেত্রা কেভিতোভার মতো তারকা খেলোয়াড়রা৷ চতুর্থ বাছাই আগি্নয়েস্কা রাদওয়ানস্কাকে নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখছিলেন, তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে সেমিফাইনালে৷ সেন্টার কোর্টের ফাইনালের জাঁকজমকতা তাই আগেই অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে৷ তবে দেখার বিষয় ছিল কে জিতবেন অঘটনের এই শিরোপা৷ সেমিফাইনালে জার্মানির লিসিস্কি রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ৬-৪, ২-৬ ও ৯-৭ গেমে পোলিশ টেনিস তারকা আগি্নয়েস্কা রাদওয়ানস্কাকে হারিয়ে সেই দৌড়ে খুব ভালোভাবেই টিকে ছিলেন৷ যদিও তাকে নিয়ে কেউ সেভাবে মাতামতি করেননি৷ কিন্তু তিনিই উঠে যান প্রথমবার কোনো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালের মঞ্চে৷
এদিকে ২০০৭ সালের পর আবারও ফাইনালে ওঠেন ফরাসি টেনিস খেলোয়াড় মারিও বারতোলি৷ সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের ক্রিস্টিন ফ্লিপকেসকে ৬-১ ও ৬-২ গেমে হারান রেঙ্কিংয়ে ১৫ নম্বরে থাকা বারতোলি৷ ক্যারিয়ারে প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের জন্য নিজের সেরাটা দিতে প্রস্তুত ছিলেন তিনিও৷ একজন প্রথমবার কোনো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে অন্যজন দ্বিতীয়বার৷ তারকা দু্যতি ছাড়াই এবারের উইম্বলডন নারী এককের ফাইনাল৷ উইম্বলডন দূরে থাক, দুজনের কেউই এখনো কোনো গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপায় চুমো অাঁকতে পারেননি৷ তাই তাদের লড়াইটা দেখার জন্য অপেক্ষা ছিল অনেকের৷ কেননা, উইম্বলডনে নতুন রানির দেখা পাবে এবার৷
২০০৭ সালে যা পারেননি বারতোলি, তাই এবার করে দেখিয়েছেন তিনি৷ ২৮ বছর বয়সী বারতোলি ফাইনাল জিততে সময় নেন মাত্র এক ঘন্টা ২১ মিনিট৷ খুব সহজেই ৬-১, ৬-৪ গেমে জার্মান তারকা লিসিস্কিকে হারিয়ে শিরোপা উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি৷ আর এর মধ্য দিয়ে ২০০৭ সালে ভেনাস উইলিয়ামসের কাছে শিরোপা হাতছাড়া করার আক্ষেপ ঘুচান বারতোলি৷ আর ২০০৬ সালের পর প্রথম ফরাসি নারী হিসেবে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতলেন তিনি৷ এর আগে এমিলি মরেসমো জিতেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও উইম্বলডন৷


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ