হিজাব এবং নারীর আত্মপরিচয়ের সংকট | সময় বিচিত্রা
হিজাব এবং নারীর আত্মপরিচয়ের সংকট
সময় বিচিত্রা
8

সুলতানা রহমান

চেনাজানা, কাছের-দূরের অনেক নারীর মধ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করছি৷ পরিবর্তনটা হিজাবসংক্রান্ত৷ হিজাব নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ‘ভালো লাগা-খারাপ লাগা’ নেই৷ এমনকি এ বিষয়টিকে উল্লেখ করার মতোও কিছু মনে হয় না আমার৷ কিন্তু পরিবর্তনটা চোখে লাগছে৷
ম আমেরিকায় থাকেন ১৫ বছর ধরে৷ সেখানকার নাগরিকত্ব পেয়েছেন৷ দেশে থাকতে তিনি ছিলেন মারাত্মক রকম ফ্যাশনসচেতন৷ পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা ছাড়া তার জীবনে আর কিছু আছে বলে মনে হতো না৷ বিদেশ গিয়েও তা-ই৷ সেখানকার বাঙালি কমিউনিটিতে তিনি ছিলেন ফ্যাশন আইকন৷ ৪-৫ মাস পর পর চুলের রং বদলাতেন৷ শিফন জর্জেট শাড়ি ছিল তার প্রিয় পোশাক৷ ব্লাউজের গলার ডিজাইনের কথা নাইবা বললাম৷ দীর্ঘ বিরতির পর মাস দুয়েক আগে তার সঙ্গে ফোনে কথা হলো৷ জানলাম, বছর খানেক ধরে হিজাব করছেন৷ শুনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমি উচ্চস্বরে হেসে দিলাম৷ একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! নানান ধরনের প্রশ্ন করে হিজাবের রহস্য বোঝার চেষ্টা করলাম৷ ইসলামের দৃষ্টিতে হিজাব নিয়ে এমন নতুন কোনো কথা বলতে পারলেন না, যা তিনি আগে জানতেন না৷ তবে বুঝলাম, বিদেশ-বিভূঁইয়ে তার আত্মপরিচয়ের সংকট রয়েছে৷ প্রথমত হিজাব না করার কারণে বিদেশে অনেকেই তাকে ইন্ডিয়ান মনে করে৷ দ্বিতীয়ত, মুসলিম কিন্তু হিজাব নাই-এই আবার কেমন মুসলিম? এ ধরনের পরোক্ষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়৷ এখন হিজাব পরার পর থেকে তার হয়েছে আরেক বিড়ম্বনা৷ চেনাজানা মানুষেরা কমবেশি সবাই আমার মতো কারণ জানতে চায়, যা কখনো কখনো কৈফিয়তের পর্যায়ে পড়ে৷
এখন বলছি একটি পরিবারের কথা৷ অত্যন্ত সেকু্যলার একটি পরিবার৷ ঈদ-কুরবানির মতো পূজাও তাদের কাছে বড় উত্‍সব৷ তবে তাদের কিছু গোঁড়ামি আছে-পীরের কথায় উঠ-বস করেন৷ কেউ একজন দুঃস্বপ্ন দেখেছে, সঙ্গে সঙ্গে ছুটবেন পীরের কাছে৷ পীর হয়তো বলবেন, জানের ছদকা দিতে-একটা খাসি৷ দুঃস্বপ্ন একটু ছোটমোটো হলে কিছু টাকা দানখয়রাত করলে চলে৷ আবার স্বপ্ন যদি ভালো দেখেন, তাহলেও শুকরিয়া আদায় করতে যান পীরের বাড়ি এবং ভালো স্বপ্নের জন্যও আছে ভিন্ন তরিকা৷ দুই থেকে দশ জন মানুষকে খাওয়ানো বা এ বাবদ কিছু টাকা পীরের দরবারে দান৷ পীরচর্চা ওই পরিবারে বেশ পুরোনো, পীরের আদেশ শীরোধার্য এবং সবাই তা ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গেই পালন করেন৷ তবে আবারও বলছি, পরিবারটি কিন্তু আধুনিক উচ্চশিক্ষিত এবং সেকু্যলার৷ গত ৪-৫ বছর ধরে এই পরিবারের সব নারী সদস্যদের মাথায় হিজাব উঠেছে, কিন্তু কারও সাজসজ্জায় এতটুকু কমতি পরেনি৷ বরং হিজাবের জন্য নিত্যনতুন ফ্যাশনসামগ্রী সংযুক্ত হয়েছে৷ একেকটি হিজাবের দামও নেহাত কম নয়৷ তাতে আবার নানান কায়দার, নানান বাহারের পাথর বসানো! একদিন কথাচ্ছলে হিজাব-রহস্য জানতে চাইলাম৷ ‘পড়লে ক্ষতি কী!’ জবাব পেলাম৷ ‘ক্ষতির কথা উঠছে না, শানে নজুল এবং মাজেজা জানতে চাই,’ বললাম৷
হিজাবসংক্রান্ত ইসলামে দীর্ঘ বয়ান শুনলাম৷ তবু সন্তুষ্ট হতে না পেরে বললাম, আগে এসব অজানা ছিল কি না?
‘না, তা-ও নয়৷ আগেও জানতাম, মানতাম না৷ এখন মানছি৷ ভালো লাগে৷ জেনেশুনে বুঝে মন থেকে করছি৷’
‘বাহ্৷ খুব ভালো৷ কিন্তু হিজাবের একটি অন্যতম প্রধান কারণ অন্য মানুষ যেন আকৃষ্ট না হয়৷ কিন্তু এত চকমকা হিজাব পরলে তো অন্ধকারেও চোখ ওই সব ঝলমলে পাথরের দিকে যাবে, নাকি?’
‘ইসলামে সাজতে তো নিষেধ নেই৷’
‘না, তা নাই৷ কিন্তু অন্যকে আকৃষ্ট করার মতো সাজসজ্জায় তো নিষেধ আছে, না কি?’ কথা আর না বাড়িয়ে প্রসঙ্গ বদলালাম৷ ‘স্টার প্লাসের কোন কোন সিরিয়াল ভালো লাগে?’
‘স্টার প্লাস দেখি না আমি৷ আমি আর আমার শাশুড়ি দেখি জি বাংলা৷ আমার জা স্টার প্লাসের পোকা৷’
এরপর আলোচনা শুরু কোন সিরিয়ালের কোন চরিত্র কী করে, কার পোশাক-আশাক বেশি স্টাইলিশ৷ শাশুড়ি, দুই জা, ননদ-একজনকে ছাপিয়ে আরেকজনের বলার তাড়না৷ এতক্ষণ হিজাবসংক্রান্ত আমার কৌতূহলী প্রশ্ন শুনেও যিনি গভীরভাবে অন্যমনস্ক ছিলেন, তিনিও ওঠে পড়ে লাগলেন আলোচনায় অংশ নিতে৷ অবশ্য সেই আলোচনায় আমার ভূমিকা নাটকের মৃত সৈনিকের মতো৷
২০০১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার পর সারা পৃথিবীতেই মুসলমানদের মধ্যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে৷ সেই পরিবর্তনের অনেকখানি বাহ্যিক, বিশেষ করে, পোশাকের পরিবর্তন এবং তা যে শুধু বাংলাদেশি মুসলমানদের মধ্যে, তা নয়৷ তবে বাংলাদেশের মুসলমানদের পরিবর্তনটা হয়তো বেশি দৃশ্যমান, তা দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক৷ তবে আমার ধারণা, বিদেশের মাটিতে আত্মপরিচয়ের সংকট এবং নিঃসঙ্গতা ওই বাহ্যিক পরিবর্তনের অন্যতম কারণ৷ আবার ওই সব প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের প্রভাবে দেশে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনের পরিবর্তন৷ আবার সেই পরিবর্তন সাইক্লিক হারে অন্যদেরও প্রভাবিত করে৷ তবে বাহ্যিক পরিবর্তনটি যতটা দৃশ্যমান, অন্তর্গত পরিবর্তন কতটা, সে সম্পর্কে স্বভাবতই অনুমান করা কঠিন৷
তবে হিজাবের পেছনে আরও একটি কারণ কয়েকজনের মুখে শুনেছি৷ চারদিকের ‘বেলাল্লাপনা এবং অশ্লীলতা’ অনেককে হিজাবের প্রতি আকৃষ্ট করেছে৷ নিজেকে ব্যতিক্রম রাখা এবং ওই দুষ্ট স্রোতে গা ভাসানো থেকে বিরত থাকতেও অনেকে ঢাল হিসেবে হিজাব বেছে নিয়েছে৷ টিন এজারদের মধ্যে যারা হিজাব করে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমার এমনই ধারণা হয়েছে৷ কয়েক দিন আগে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে ১৫-১৬ বছরের চারটি মেয়েকে দেখেছিলাম সাইকেল চালাতে৷ তারা রেস করছিল৷ প্যান্ট, টি-শার্ট পরা, মাথায় হিজাব৷ প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা বোধ হয় বিদেশ থেকে এসেছে, নয়তো পরিবারের চাপে হিজাব করছে৷ আমি তাদের কাছে আগন্তুক হলেও খুব সহজ সাবলীলভাবে তারা আমার সঙ্গে কথা বলেছিল৷ একথা-সেকথার পর হিজাব প্রসঙ্গ তুললাম৷
‘হিজাব করলে কেউ ফালতু মনে করে না, উল্টা-পাল্টা কথা বলার সাহস পায় না’-তাদের এই এক বক্তব্য৷
‘তোমাদের যেসব বান্ধবী হিজাব করে না, তাদের সবাইকে কি উল্টা-পাল্টা কথা শুনতে হয়?’
‘সবার কথা বলতে পারি না৷ তবে অনেকে তো নিজেরাই আলতু-ফালতু কথা বলে, ফালতু লোকের সঙ্গে ঘোরে’, একজন বলল৷
‘কী রকম?’
‘সারাক্ষণ মোবাইলে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে, ৩-৪টা প্রেম করে৷ কে কয়টা প্রেম করেছে, সেই সব গল্প বলে৷ ওদের সঙ্গে আমরা মিশি না৷’
‘তোমাদের সবার মা কি হিজাব করে?’
‘আমার আম্মু করে না৷ আমি করি, সেই জন্য বকাবকি করে’, বলল একজন৷
‘বকাবকি করে কেন?’
‘আম্মু মনে করে, আমার মানসিক সমস্যা হইছে’, বলে হাসে মেয়েটি, উচ্চস্বরে হেসে ওঠে বাকি তিন বান্ধবীও৷
‘ও তো অন্য স্কুলে পড়ে৷ ক্লাসে ওর কোনো বন্ধু নাই৷ আমরা ছাড়া ওর আর কোনো বান্ধবীও নাই৷ অন্য কারও সঙ্গে ও মেশে না, এই জন্য ওর আম্মু টেনশন করে’, এক বান্ধবী ব্যাখ্যা করল৷
আমিও হেসে হেসে বললাম, ‘আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাও না?’
‘স্কুল আর কোচিং ছাড়া কারও বাসায় যায় না আপু৷ বাসায় মেহমান আসলে ও নাকি দরোজা বন্ধ করে বসে থাকে’, সবাই এক সঙ্গে হি হি করে উঠল৷ মেয়েটিকে একটু বিব্রত মনে হলো৷ বলল, ‘আমার কাউকে ভালো লাগে না৷’
মনে পড়ল আমার এক জুনিয়র নারী সহকর্মীর কথা৷ সাংবাদিক৷ ছোটবেলায় বাবা মারা গেছে৷ এইট-নাইনে পড়ার সময়ই আত্মীয়স্বজন তার বিয়ের জন্য বেশ চাপ দিল৷ কিন্তু মেধাবী মেয়েটি কিছুতেই বিয়েতে রাজি হলো না৷ বরং বোরকা পরা শুরু করল৷ এরপর অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যে কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে অনার্স, মাস্টার্স করল, চাকরি শুরু করল৷ তুখোড় রিপোর্টার হিসেবে সুনাম আছে তার৷ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাকে চিনতাম, জুনিয়র হলেও আমার সঙ্গে সখ্য ছিল, বিভিন্ন সময়ে তার সুখ-দুঃখের কথা আমাকে বলত৷ সেই সুবাদেই তার পারিবারিক কিছু কথা আমাকে বলেছিল৷ কয়েক বছর আগে একটা অ্যাসাইনমেন্টে তার চেহারা দেখার সৌভাগ্য হলো৷ বলল, ‘আপু, চিনছেন আমাকে?’ আমি ‘হঁ্যা-না’ বলে আমতা আমতা করি৷ পরিচয় শোনার পর প্রথম প্রশ্নটিই ছিল, ‘হিজাব কই তোমার?’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘আমি এখন শক্তিশালী নারী৷ হিজাব আর দরকার নাই আমার৷ তাই খুলে ফেলছি৷’


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ