টিকফায় লাভ টিকফায় ক্ষতি | সময় বিচিত্রা
টিকফায় লাভ টিকফায় ক্ষতি
সাইফুল হাসান
20

বাংলাদেশে রাজনীতি-অর্থনীতিতে এই মুহূর্তে খুবই আলোচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা ৷ যদিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিপুল ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রের সব সময়ই আলাদা প্রভাব বা গুরুত্ব আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে অনুমান করা যায়৷ তবে রাজনীতিকে ছাপিয়ে অর্থনৈতিক কারণে এবার বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে দেশটি ৷ প্রথমত, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের (টিকফা) বা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ৷ দ্বিতীয়ত, গত মাসের একেবারে শেষ ভাগে এসে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা স্থগিত করেছে বারাক ওবামা প্রশাসন ৷ প্রথম কারণে খুব বেশি আলোচনা না হলেও জিএসপি বাতিলের ঘটনায় দেশের রাজনীতি এখন টালমাটাল৷ তবে জিএসপির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টিকফা চুক্তি ৷ কেননা এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে রাজি করাতে আমেরিকাকে দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে ৷

দুটি বিষয়ই অর্থনৈতিক হলেও দুটি ঘটেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে৷ অর্থাত্‍ বাংলাদেশ সরকার অনেক দিন ঝুলিয়ে রাখার পর টিকফায় অনুমোদন করেছে ৷ অন্যদিকে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় জিএসপি স্থগিত করেছে আমেরিকা ৷ এ দুটো সিদ্ধান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং লাভই হয়েছে ৷ কিন্তু ঘরে-বাইরে চাপে বা সমালোচনার মুখে আছে বাংলাদেশ ৷ এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের জন্য লাভবান হওয়ার সুযোগ একেবারেই চলে গেছে ৷ বরং সামনে অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে ৷ টিকফার মধ্য দিয়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনার সুযোগ এবং আরও নিবিড় বন্ধুত্বের সুযোগ এসেছে ৷ অন্যদিকে জিএসপি স্থগিত করায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবন মানের উন্নয়নের সুযোগ এসেছে৷ পেশাদারির সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারলে স্থগিতাদেশ তুলে নিতে বাধ্য হবে ওবামা প্রশাসন৷ এতে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশেরই লাভ হবে ৷ বিলিয়ন ডলার খাতটিতে অস্থিরতা কমে আসবে, কারখানাগুলো মানবিক হয়ে উঠবে, ফলে এ খাতের উত্‍পাদনশীলতা বাড়বে ৷ যার সুফল শেষ পর্যন্ত পোশাক খাতই ভোগ করবে ৷

গত ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি সই করার ক্ষেত্রে আইনি কোনো বাধা নেই৷ আশা করা হচ্ছে, এ মাসেরই কোনো একটা সময়ে টিকফা চুক্তি সই হবে ৷ এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে রাজি করাতে এক দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ৷ সংগত কারণেই একটি জোরালো প্রশ্ন সামনে আসে তা হলো, এই চুক্তির জন্য প্রায় এক যুগ কেন অপেক্ষা করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৷ বাংলাদেশের সঙ্গে এই চুক্তি কেন এত জরুরি আমেরিকার জন্য? শুধু বাংলাদেশের লাভের জন্য মার্কিন প্রশাসন টিকফার জন্য অপেক্ষা করেছে এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, বিশ্বাসযোগ্যও নয় ৷ পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা টিকফা সই করেছে ৷ এতে তাদের কী লাভ হয়েছে, বাণিজ্য বিনিয়োগ কতটা বেড়েছে তা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ ছিল এবং আছে৷ নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করি, অনুমোদনের আগে মন্ত্রিসভা, বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তা নিশ্চয়ই যাচাই করে দেখেছে ৷ একই চুক্তির কারণে সব দেশের অভিজ্ঞতা যে এক হবে এমন নয় ৷ তবে দক্ষ ও পেশাদার কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে এগোলে অবশ্যই এসব চুক্তি থেকে অর্জনের আছে অনেক কিছু ৷

দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তির খসড়ার গভীরে না গিয়েও সামগ্রিকভাবে বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামরিক-কূটনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিলে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির আগে অন্তত শতবার ভাবা প্রয়োজন৷ বাংলাদেশ যেহেতু দীর্ঘ সময় নিয়েছে চুক্তি করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, সুতরাং ধরে নেওয়া যায় বাংলাদেশ সরকার এ দিকও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষার পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করছেন, এটি একটি ভালো চুক্তি, এতে বাংলাদেশেরই লাভ হবে৷ খসড়া অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দিপু মনি সংসদে বলেছেন, এই চুক্তি সই হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সংকুচিত হবে ৷

যদিও অনেকেই বিশ্বাস করেন, গত জুনের মধ্যেই জিএসপি বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই তাদের খুশি করতে কিছুটা তড়িঘড়ি করে টিকফার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়৷ পাশাপাশি নিবার্চন সামনে রেখে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দেশকে চটাতে চায়নি সরকার, সেটিও একটি বড় কারণ হতে পারে৷ তবে মন্ত্রিপরিষদ ও বাণিজ্যসচিবের দাবি, টিকফার সঙ্গে জিএসপির কোনো সম্পর্ক নেই ৷ এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপও ছিল না ৷ বাণিজ্যসচিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমেরিকা নয়, বাংলাদেশই যতটা দ্রুত সম্ভব এই চুক্তি সই করতে চায় ৷’

টিকফার খসড়া অনুমোদনের পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দিন উমরের জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল এর বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে৷ ক্ষয়িষ্ণু এই বামদের আওয়াজ এতটাই ক্ষীণ যে জনগণের কানে পেঁৗছায় না ৷ এমনকি জাতীয় পত্রিকার ভেতরের পাতাতেও তাদের জায়গা দিতে সংকোচ বোধ করেন কুলীন-অকুলীন সম্পাদকেরা ৷ অথচ এই বামদের কথায়-বিবৃতিতে অনেক যৌক্তিকতা আছে৷ বাম রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য আরও বাড়বে ৷ এই চুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মার্কিনদের বাইরে যেতে পারবে না ৷ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় মেধাস্বত্ব বিষয়ে বাংলাদেশ যে ছাড় পাচ্ছে তা আর পাবে না ৷

বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের গণমাধ্যমকে জানান, ‘টিকফা নিয়ে জনগণকে প্রথম থেকেই ভুল বার্তা দেওয়া হয়৷ যারা এটা করেছেন তারা না বুঝেই করেছেন৷ এমনকি তারা জানতেনও না টিকফায় কী আছে ৷ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক এবং কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া আর কারও জানার সুযোগও ছিল না ৷ আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, চুক্তির খসড়ায় এমন কিছু নেই যা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ৷’

এ নিয়ে দেশের দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে একটি কলামও লেখেন বাণিজ্যমন্ত্রী ৷ এই কলামেও তিনি দাবি করেন, টিকফা চুক্তিতে বাংলাদেশই লাভবান হবে ৷ পত্রপত্রিকায় টিকফার যে খসড়া ছাপা হয়েছে, তাতে আসলেই বাংলাদেশবিরোধী কোনো শর্ত, ধারা বা উপধারা খুঁজে পাওয়া কঠিন ৷ তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে ভালো ভালো কথার আড়ালে অনেক গর্ত থাকে তা শনাক্ত এবং এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল ও প্রজ্ঞা দেখাতে পারলেই কেবল টিকফা থেকে অর্জন বের করে আনা সম্ভব ৷

বাণিজ্যমন্ত্রী উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেও টিকফার খসড়াকে সংসদে তুলবেন না ৷ সংসদের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সংসদে আলোচনা হলে জনগণ বুঝত সরকার তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে ৷ পাশাপাশি চুক্তিটি বাস্তবায়নে জনগণের ভালো ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হতো, যা সরকারের জন্য একধরনের স্বস্তির কারণ হতে পারত৷ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত কেউ টিকফা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি ৷ ফলে ধরে নেওয়া যায়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই জনগণের জন্য রাজনীতি করলেও জনগণকে তারা উন্নয়নের অংশীদার নয়, তাদের উন্নয়নের পথে অসুর মনে করে ৷ টিকফায় যে জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগ বা বাণিজ্যব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে তা গড়ে তুলতে হলে জনগণের সম্পৃক্ততা বাদে এর সাফল্য কীভাবে সম্ভব, তা একটি বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন ৷ সরকারের এই দুবর্লতাকে কাজে লাগিয়ে সমালোচকেরা তিরে শাণ দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন৷ অর্থাত্‍ সুযোগটা সমালোচকদের হাতে তুলে দিচ্ছে সরকার নিজেই ৷

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘টিকফা ভালো হলে এত লুকিয়ে করার দরকার কী? জনগণের উপকারের জন্য হলে সংসদে আলোচনা করে বুক ফুলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত সরকার৷ তা কেন করছে না? আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন এই চুক্তি পরিপালনে বাধ্যবাধকতা নেই ৷ বাধ্যবাধকতা না থাকলে চুক্তির দরকার কী? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই ৷ বরং সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিবৃতি-বক্তৃতাতে এর ভেতরের চেহারাটা ফুটে উঠছে ৷ আমেরিকা শ্রম মানের উন্নয়নের কথা বলছে, সেটা আমরাও বলছি ৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের পরামর্শ আমেরিকার কাছ থেকে নেওয়ার কী আছে, বাংলাদেশের প্রায় সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশের জনগণ সব সময়ই সরব ৷ দুর্নীতি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা, জনগণ নয়৷ এই চুক্তি যারা অনুমোদন দিচ্ছে, তারা ঠিক হলে দুর্নীতি হবে৷ তাহলে টিকফা করার দরকার কী?’
টিকফা চুক্তিতে সরকারের সম্মতি আর মার্কিন প্রশাসনের জিএসপি স্থগিত নিয়ে আনু মুহাম্মদের ব্যাখ্যাটা বিবেচনায় নেওয়ার মতো ৷ ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র না থাকলেও অনেকেই এতে সংযোগ খুঁজেছেন ৷

আনু মুহাম্মদ বলছিলেন, নির্বাচন সামনে মার্কিনদের খুশি করতে টিকফায় রাজি হলো সরকার৷ কিন্তু লাভ কী হলো? আমেরিকা তাদের পরিকল্পনামতোই এগোচ্ছে৷ তাদের কোনোভাবেই থামানো যাবে না৷ তারা যে জিএসপি-সুবিধা দেয়ই না বলা চলে, তা স্থগিত করে উল্টো বাংলাদেশকে চাপে ফেলল৷ বাংলাদেশ সীমাহীন অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার সহিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে৷ পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও এই চুক্তি হয়েছে৷ সেখানে দুর্নীতির কী কমেছে? ওই সব দেশের সঙ্গে বিনিয়োগ-বাণিজ্য কতটা বেড়েছে, সেদিকে তাকালেই বোঝা যায় টিকফা থেকে বাংলাদেশ নয় মার্কিনরা লাভবান হবে৷

রাজনৈতিক এবং দর্শনগত কারণে এই অর্থনীতিবিদ মার্কিন বিরোধিতা করলেও তার কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে৷ বিবেচনায় বা উপলব্ধিতে নেওয়ার মতো অনেক উপাদান আছে৷ যদিও ক্ষমতার ভেতরে এবং বাইরে থাকা প্রভাবশালীরা এসব বিরোধিতাকে আমলে নেন না৷

টিকফা একটি কাঠামোগত বা সহযোগিতা ফোরামের চুক্তি, যার আওতায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করতে পারবে দুই দেশ৷ সাড়ে তিন পৃষ্ঠার খসড়ার প্রারম্ভিক প্রস্তাবনায় আটটি স্বীকৃতি, তিনটি সদিচ্ছা এবং সাতটি অনুচ্ছেদ রয়েছে৷ স্বীকৃতির অংশে বলা হয়েছে, উভয় দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটি খোলামেলা ও দৃষ্টিগ্রাহ্য ভালো পরিবেশ তৈরি করবে৷ সম্প্রসারিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে লাভবান হবে উভয় পক্ষ এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা এবং রক্ষণশীল উপাদানগুলো কমিয়ে আনা হবে৷

সদস্যদেশ হিসেবে উভয় পক্ষই জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের প্রতি আনুগত্য দেখাবে৷ বিশেষ করে, কনভেনশনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত ধারাগুলো অনুসরণ হবে বাধ্যতামূলক৷ দেশীয় ও বৈদেশিক-উভয় ক্ষেত্রেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ যাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তথ্য প্রযুক্তি খাত তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়৷

স্বীকৃতির অংশে আরও বলা হয়েছে, উভয় পক্ষের সেবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় মেধাস্বত্ব আইন বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মূলনীতি মেনে উভয় পক্ষ শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন এবং পরিবেশের সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে পরিবেশ আইন মেনে চলা৷

স্বীকৃতি অংশের এই বিষয়গুলো নিয়ে নিশ্চয় দেশের মানুষ দ্বিমত করে না৷ দুর্নীতি দমন, বিনিয়োগ বাণিজ্যে বাধা দূর করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টাকে বরং জনগণ স্বাগতই জানাবে৷ তার পরও এই চুক্তি করার আগে সংসদে আলোচনা করলে সমস্যা কোথায়? এই প্রশ্নের সরকার ছাড়া আর কারও জানা নেই৷ এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, বর্তমান সংসদের ৮০ ভাগের বেশি সদস্য টিকফায় কী আছে, এই চুক্তি করলে কী লাভ তা বলতে পারবেন না৷ কিন্তু সংসদে আলোচনা করলে চুক্তিটি সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিরা এ সম্পর্কে জানতেন, এর ভালো-মন্দ জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারতেন৷ এতে শেষ পর্যন্ত সরকারেরই লাভ হতো৷ কেননা, জনগণই সরকার কিংবা রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় সেফগার্ড৷

জনগণের কল্যাণে যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ম্যান্ডেট সরকারের আছে এবং তা জনগণই দিয়েছে৷ কিন্তু এর অর্থ তো এই নয় যে এসব চুক্তিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা যাবে না৷ টিকফায় কী আছে, কেনই বা এই চুক্তি রাষ্ট্রের জন্য জরুরি তা জনগণকে জানাতে সমস্যা কোথায়? গত ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ এই প্রশ্নের জবাব খুঁজলেও তা মেলেনি৷

আমেরিকা এত প্রভাবশালী রাষ্ট্র, এর পরও রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে যেকোনো আইন, দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় চুক্তি, ফোরামের জন্য কংগ্রেস সিনেটের অনুমোদন নিতে হয়৷ এর মাধ্যমে আমেরিকা সরকার জনগণের কাছে নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে৷ সাংবিধানিকভাবে দেশের মালিক জনগণ৷ দেশের কল্যাণের কথা তারা কোনো অংশেই সরকারের চেয়ে কম ভাবে না৷ অথচ তাদের উপেক্ষা করে সরকার যখন কিছু করতে চায় বা করে তখন পুরো কাজটি নিয়েই সন্দেহের আঙুল তোলে নাগরিক৷ তা সে যত ভালো প্রকল্প বা চুক্তিই হোক না কেন?

জনগণের গলার আওয়াজ হয়তো উঁচু নয়, বলার ধরন খুবই সাধারণ, কোনো কোনো তা ক্ষেত্রে হয়তো অতিমাত্রায় ক্ষীণ বা নিশ্চুপ, এর পরও জনগণের সন্দেহই বারবার সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে৷ ঠিক তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হঠাত্‍ টিকফা চুক্তি অনুমোদন এবং এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত সরকারকে সন্দেহের বাইরে রাখেনি মানুষ৷ জনগণের এই অবিশ্বাস এবং সন্দেহ একেবারেই নিজস্ব৷ তাদের অভাব-অভিযোগ বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি৷

আধুনিক এই বিশ্ব অনেক বেশি নিকটতম, পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল৷ উট পাখির মতো বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে থেকে আজকের দুনিয়ায় টিকে থাকা যায় না৷ ফলে উন্নত-অনুন্নয়নশীল, বন্ধু-শত্রু-মিত্র দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণে চুক্তি-সমঝোতা স্মারক সই হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ সারা বছর বিশ্বে এমন কয়েক হাজার চুক্তি হয়৷ এক রাষ্ট্রের প্রতি অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন-পারস্পরিক সহযোগিতার যে বৈশ্বিক অঙ্গীকার তা এসব চুক্তির মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়৷ তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বা এর বাইরে থাকা নেতৃত্ব জনগণকে কোনো দিন আস্থায়ই নেয়নি৷ ফলে জনগণও এসব চুক্তিকে কোনো সময়ই খুব ভালোভাবে দেখেনি৷ যদিও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবি, তারা যা করেন বা করছেন, তা জনগণের কল্যাণেই৷ কিন্তু এই কল্যাণ শেষ পর্যন্ত কিছু মানুষের পকেটস্থ হয়েছে বলেই সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস৷

গণমাধ্যমে প্রকাশিত টিকফার খসড়ার স্বীকৃতি ও অনুচ্ছেদগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখা যাবে, সেখানে এমন কিছু নেই, যা বাংলাদেশকে উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে৷ টিকফার স্বীকৃতি অংশে মেধাস্বত্ব বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকেই অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে৷ এর পরও অনেকের আশঙ্কা আছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্ব আইনের (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস-ট্রিপস) বাংলাদেশ ওষুধ খাতসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে আসছে, টিকফার কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ এই আশঙ্কা যে একেবারেই অমূলক তা নয়৷ প্রভাব টিকিয়ে রাখতে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-কৌশল ও তা প্রয়োগ, চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, নিজেদের স্বার্থ আদায়ে বিভিন্ন দিক থেকে চাপ দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই শঙ্কার জায়গাটি পরিষ্কার হয়৷ এটা জানার পরও তাদের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, এই আশঙ্কা দূর করার দায়িত্ব মার্কিনদের নয়, বাংলাদেশের৷

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের মতো বড় অর্থনীতি ও পরাশক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য দর-কষাকষি করা খুব কঠিন ৷ কেননা এসব দেশ বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে রাজনীতিকে টেনে আনে ৷ নিজেদের প্রয়োজনে বা স্বার্থ আদায়ে বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে৷ উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, টিকফা চুক্তি হয়েছে৷ এখন বাংলাদেশে তাদের কোনো স্বার্থ আদায়ের ব্যাপার থাকলে তারা অন্য কোনোভাবে তা আদায় করবে, সেটা টিকফার মূলনীতি ভেঙে নয়৷ যেমন জিএসপি-সুবিধা বহাল রাখার জন্য তারা শ্রমিকের কর্মপরিবেশ ও জীবনমান উন্নয়নের শর্ত দিয়েছে ৷ বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির পক্ষে এ অবস্থা থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়, এটা জানার পরও তাদের দেওয়া নামমাত্র জিএসপি স্থগিত করেছে৷ এখন এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে শ্রম মানের উন্নতির সঙ্গে অনেক নতুন নতুন দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান শর্ত আসতে পারে৷ অর্থনৈতিক এই বিষয়ের সঙ্গে যোগ হতে পারে রাজনৈতিক কোনো ইসু্য৷ এ সবই ধারণা মাত্র, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন বহু নজির পৃথিবীতে আছে ৷

তাদের এই আচরণ সব সময় যে খারাপ এমন নয়৷ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে দেশটি একেক দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা কৌশল ব্যবহার করে৷ বাংলাদেশ আগামীকাল আমেরিকার অবস্থানে গেলে তারা একই পথ অনুসরণ করবে৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ এ ক্ষেত্রে নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ে পেশাদারি হওয়ার পরামর্শ দিলেন সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান৷ টিকফাকে ইতিবাচক কাঠামোগত চুক্তি হিসেবে দেখছেন এই অর্থনীতিবিদ৷ তিনি বলেন, টিকফা একটি চুক্তির চেয়ে বেশি কিছু৷ এটি একটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিবিষয়ক কাঠামোগত চুক্তি৷ এ নিয়ে নাটকীয় হতাশার কোনো কারণ নেই৷ এত প্রতিক্রিয়া দেখানো কিংবা আমেরিকা সুপার পাওয়ার বলে তারা যা ইচ্ছে তা-ই করে ফেলবে, এমন গ্রাম্য চিন্তার বা যুক্তিরও কোনো কারণ নেই৷ এমন সেকেলে চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে৷

তিনি যোগ করেন, পৃথিবী অনেক এগিয়েছে৷ বিদ্যা-বুদ্ধি, সমঝোতা দক্ষতা, বিশ্ব শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার মতো সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে মার্কিনরা অর্ধশতাব্দীর বেশি বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে৷ শুধু গায়ের জোরে এটা সম্ভব নয়৷ টিকফায় যে বিষয়গুলো এসেছে এগুলো অধিকতর পেশাদারির ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে৷ এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারি বাড়াতে হবে৷ যদিও এখানে পেশাদারি সব প্রতিষ্ঠানের মান এখন নিম্নমুখী৷ টিকফায় যে পর্যায়ে আলোচনা-চিন্তার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশকে ওই পর্যায়ে যেতে হবে৷ ইউএসটিআরের সঙ্গে বৈঠকে পেশাদারি ও দক্ষতা দেখাতে না পারলে সেটা আমাদের ব্যর্থতা৷ শুধু আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলে গালি দিয়ে লাভ কী৷ আমাদের তো কেউ তাদের মতো পর্যায়ে যেতে মানা করেনি, বাধাও দেয়নি৷ ফলে যে দেশের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি হোক না কেন, লাভবান হতে হলে রাষ্ট্র-সমাজ সব পর্যায়ে পেশাদারি আনতে হবে৷ গেঁয়ো রাজনীতির গোয়ার্তুমি না দেখিয়ে যেকোনো বিষয়কে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে৷ সেটা না পারলে আমেরিকার কোনো ক্ষতি নেই৷ কারও কোনো ক্ষতি নেই৷ যা ক্ষতি তার পুরোটাই বাংলাদেশের৷

তবে অন্যদের মতো সাবেক এই উপদেষ্টাও জানালেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব বিষয়ে যে ছাড় পায় সেটা যেন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ৷

অতীতে যত চুক্তি বাংলাদেশ করেছে তার তুলনায় টিকফার খসড়া অনেক লিবারেল বা উদার, এই সত্যটুকু মানতেই হবে৷ চুক্তি অনুযায়ী পণ্যের ও সেবার বাজার বাড়ানো এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে পারলে তাতে আমেরিকার চেয়ে বাংলাদেশেরই লাভ বেশি৷ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করা, নিয়মিত উভয় দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিকে নজর রাখা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা আছে তা দূর করবে টিকফার আওতায় গঠিত ফোরাম৷ কাজটি ঠিকঠাকমতো করতে পারলে আমেরিকার চেয়ে বাংলাদেশেরই লাভ বেশি৷ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে এসব দিকে নজর দিতে হবে৷ তবে লক্ষণীয় যে, ‘প্রতিবন্ধকতা’-এই শব্দটির অর্থ এত ব্যাপক যে, প্রতিবন্ধকতা বলতে উভয় পক্ষ কী বোঝে তা উল্লেখ থাকলেই ভালো৷ এ বিষয়ে সাধারণ সমঝোতা না হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে৷
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে জানানোর সুযোগ থাকবে এবং উভয় দেশের জাতীয় আইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না এই চুক্তি৷ আইনে বিষয়টি অনুচ্ছেদ আকারে উল্লেখ থাকলেও এর সুরক্ষা কীভাবে হবে সে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে৷ বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য এই সুরক্ষা খুব জরুরি৷ বছরে একবার নোটিশ দিয়ে বৈঠক করার বাধ্যবাধকতার সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে দ্বিপক্ষীয় অনেক সমস্যা আলোচনার ভিত্তিতে মীমাংসার সুযোগ তৈরি হবে৷ অন্যদিকে স্বীকৃতি অংশে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন মেনে চলার যে কথা বলা হয়েছে তা বাংলাদেশের জন্য অর্থনীতি-রাজনীতি-সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অসম্ভব জরুরি৷

তবে স্বীকৃতি অংশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মূলনীতি মেনে উভয় পক্ষ শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন এবং পরিবেশের সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে পরিবেশ আইন অনুসরণ, অশুল্ক বাধা অপসারণের মতো যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা বা প্রস্তুতি না থাকলে টিকফা বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে৷ বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান একটি অর্থনীতিতে শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন, পরিবেশ আইন অনুসরণ কঠিন৷ অশুল্ক বাধা উন্নত দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হলেও স্বল্পোন্নত দেশের জন্য তা হতে পারে না৷ বরং অশুল্ক বাধা নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করা সুযোগ পাওয়াটা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য অধিকার হওয়া উচিত৷ বাংলাদেশ অর্থনীতি হিসেবে ছোট হলেও বাজার হিসেবে বিশাল৷ এত বড় ভোক্তাশ্রেণী এবং বাজারের দিকে দুনিয়ার সব অর্থনীতির বিশেষ দৃষ্টি থাকা স্বাভাবিক৷

বাজার বড় হলেও বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ৷ আমদানিনির্ভরতা কাটাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সুরক্ষা প্রয়োজন৷ যদিও বিশ্ব প্রতিদিনই উন্মুক্ত হচ্ছে৷ এর পরও দুনিয়ার সব দেশ তাদের নিজস্ব পণ্যের সুরক্ষা দেওয়ায় জন্য শুল্ক এবং অশুল্ক বাধা আরোপ করে৷ আমেরিকা উদার অর্থনৈতিক দেশ হলেও তারা নিজেদের বাজারের সুরক্ষায় কত রকম নিয়ম-কানুন বানিয়ে রেখেছে তা সত্যিই গবেষণার বিষয়৷ ফলে অশুল্ক বাধা অপসারণ, শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন, পরিবেশের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আমেরিকানদের মোকাবিলায় স্থানীয় সব অংশীদারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন৷

লেখাটা শেষ হতে পারে ভারতীয় একজন কূটনীতিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা দিয়ে৷ গত বছর ভারত-বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক শেষে একজন ভারতীয় কূটনীতিক চা পান করতে করতে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘উভয় দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি হওয়ার পর তা থেকে যদি ভারত একা লাভবান হয় তবে তা ভারতের দোষ নয় বরং বাংলাদেশের ব্যর্থতা৷ এ ক্ষেত্রে শুধু শুধু ভারতবিরোধিতা না করে তোমাদের (বাংলাদেশের) উচিত নিজেদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে দেখা এবং তা প্রতিকারে ব্যবস্থা নেওয়া৷ এটা শুধু ভারত নয়, যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর তা থেকে লাভবান হওয়ার জন্য অন্য পক্ষের মুখ চেয়ে বসে না থেকে পেশাদারির সঙ্গে প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করতে হবে৷ সেই সক্ষমতা অর্জন না করলে বিরোধিতার বৃত্তেই আটকে থাকবে বাংলাদেশ, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এগোতে পারবে না কোনোদিন৷’

বক্স-১
অনুচ্ছেদ-১: উভয় পক্ষ আকর্ষণীয় বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে সম্মত এবং পণ্য ও সেবার বাজার বাড়ানোসহ পণ্যের বহুমুখীকরণে একমত৷
অনুচ্ছেদ-২: টিকফা নামের একটি ফোরাম গঠিত হবে৷ বছরে কমপক্ষে একবার বৈঠক করবে এই ফোরাম৷ বাংলাদেশের পক্ষে এতে প্রতিনিধিত্ব করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইউএসটিআর৷
অনুচ্ছেদ-৩: এ ফোরাম উভয় পক্ষের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সম্ভাবনা চিহ্নিত করবে৷ এ ছাড়া উভয় পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয় চিহ্নিত করবে এই ফোরাম৷ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা অপসারণেও পদক্ষেপ নেবে৷ ক্ষেত্রবিশেষে বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের পরামর্শ চাইবে এ ফোরাম৷
অনুচ্ছেদ-৪: বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট বিষয় যেকোনো পক্ষ ফোরামে লিখিতভাবে উত্থাপন করতে পাররে৷ উত্থাপনকারী পক্ষ যদি ফিরতি আবেদনে বাতিল না করে তবে ফোরাম যথাশিগগির তা গোচরে নেবে৷
অনুচ্ছেদ-৫: উভয় পক্ষের জাতীয় আইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না এই এই চুক্তি৷
অনুচ্ছেদ-৬: এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষই প্রস্তুত রয়েছে৷ চিঠি দিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে জানিয়ে দেবে, কবে থেকে তারা তা বাস্তবায়ন করতে চায়৷ উভয় পক্ষের বাস্তবায়ন তারিখ যদি এক না হয়, তাহলে যে পক্ষ পরে তারিখ দেবে, সেই তারিখ থেকে তা কার্যকর হবে৷
অনুচ্ছেদ-৭: এক পক্ষ আরেক পক্ষকে লিখিতভাবে নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে বলতে পারবে৷ যে পক্ষ চুক্তি বাতিলের নোটিশ দেবে, সেই পক্ষ যদি তা প্রত্যাহার না করে নেয়, তাহলে ১৮০ দিনের মধ্যে তা কার্যকর হয়ে যাবে৷

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ