জিএসপি স্থগিত অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত | সময় বিচিত্রা
জিএসপি স্থগিত অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত
সাইফুল হাসান
18

আর্সেনাল এফ সি প্রিসিজন খেলতে এ বছর ভিয়েতনাম যাচ্ছে। এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনা মাঝেমধ্যে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রগতি। ভিয়েতনাম এবং ভারত এই দুটো দেশকে আমার প্রচণ্ড হিংসা হয়। কারণ বিগত দুই দশকে দেশ দুটোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঈর্ষা করার মতো। ভিয়েতনাম ১৯৯০ সালে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, যেখানে কোনো শিল্পকারখানা ছিল না। ছিল কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ আর উর্বরা ধানি জমি। শুধু ভালো নেতৃত্ব ২০ বছরে এই দেশের সাথে আমাদের আকাশ-পাতাল পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ৪ হাজার মেগাওয়াট, এখন তা ৮ হাজার মেগাওয়াট। একই সময়ে ভিয়েতনামে ছিল ৪ হাজার মেগাওয়াট, আর আজ তা ১৮ হাজার মেগাওয়াট।

আর্সেনালের মতো টিম ভিয়েতনামে যায় প্রিসিজন খেলতে। কারণ তাদের খেলার মান বাড়ছে, তারা ব্যবসা করবে। ঝকঝকে রাস্তা, হাইওয়ে, উজ্জ্বল মানুষ, কোটি কোটি মানুষ দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্তে এগিয়েছে। আর আমরা পচা, গান্ধা রাস্তায় নাকে রুমাল চেপে হাঁটি, নেটা জড়ানো প্লেটে শিঙাড়া খাই, ফরমালিন দেওয়া সবজি খাই। ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৭ শতাংশ হতদরিদ্র মানুষ গার্মেন্টসের কল্যাণে এখন নিম্নমধ্যবিত্ত হয়েছে। এই গর্ব নিয়ে থাকি। হেফাজত-নাস্তিক নিয়ে গুলি করে মানুষ মারি, সারা দেশের খেলাধুলা চলে গেছে রাজনীতিকদের হাতে, বাচ্চাদের খেলার জায়গা নেই, হিন্দি ফিল্ম আর বস্তাপচা সিরিয়াল দেখে বড় হয় আমাদের শিশু। আর ভিয়েতনাম আগায়, ইন্ডিয়া-শ্রীলঙ্কা আগায়। আর আমরা ১০ বছরে গার্মেন্টসের কল্যাণে ১৭ শতাংশ দরিদ্র থেকে নিম্নবিত্ত হওয়ার ডাটা নিয়ে পড়ে থাকি।

 

জিয়া হাসান নামক এক তরুণ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ওপরের কথাগুলো লিখেছেন। আর এক বন্ধু লেখাটি শেয়ার করেছে বন্ধুদের পড়ার জন্য। জিয়ার স্ট্যাটাসে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে হতাশা, যন্ত্রণা, সম্ভাবনা এবং উন্নতি নামক মশকরা নিয়ে একধরনের উপহাস আছে। মনোযোগ গভীর হলে বোঝা যায়, এই তরুণের ভেতর বাংলাদেশ নিয়ে কত আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন| ভালো নেতৃত্বের অভাবে হাজারো তরুণের স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। দেশপ্রেমের অভাবে ধ্বংসের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে সব সম্ভাবনা। এই স্বপ্ন এবং হতাশা শুধু জিয়া হাসানের একার নয়, বরং কোটি কোটি তরুণের। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে এবং অন্যান্য সংকটকে পাশ কাটিয়ে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া উন্নতির তথ্যে যে তারা খুশি নয়, সেটা স্পষ্ট।

 

যে দেশে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন-অনুন্নয়ন নিয়ে সচেতন এমন যুব সমাজ আছে সেই দেশের সামনের যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াবার শক্তি কারও নেই। যদিও ক্ষয়িষ্ণু রাজনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, টেকনাফ-তেঁতুলিয়াকে রাজনীতির পাঁকচক্রে ঢুকিয়ে দেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। এর পরও থেমে নেই বাংলাদেশ। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত দুই দশক ধরে উচ্চ-মধ্যম পযার্য়ের প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে ছোট এই দেশটি। ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাষায়, বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের বিরল অর্থনীতির একটি। উন্নয়নের পথে পবতসম বাধা, উন্নয়নবিরোধী সব উপাদান রাষ্ট্রে সমান কার্যকর থাকার পরও প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিকতা ঈর্ষণীয়। এর শক্তি ও উৎস নিয়ে বিশ্বের উচিত গবেষণা করা। শুধু দুর্নীতিকে সহনীয় পযার্য়ে নিয়ে আসা গেলে প্রবৃদ্ধি এমনিতেই আরও দুই শতাংশ বেশি হতো। এর সঙ্গে সব পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, ভাবলেই শিহরিত হতে হয়। দুর্ভাগ্য, নিশ্চিত সুযোগ সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না রাজনৈতিক নেতৃত্বের গোয়ার্তুমি আর অঙ্গীকারের অভাবে।

 

মানবদেহের শ্বেতকণিকার মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির নিজস্ব একধরনের প্রতিরোধ শক্তি আছে, যা যেকোনো প্রতিকূলতার মধ্যে যুদ্ধ করে টিকে থাকে এবং অতীতে বারবার বিভিন্ন সংকটে তা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অদৃশ্য এই প্রতিরোধক্ষমতার উৎস হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ, বিকাশমান বেসরকারি খাত এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সাধারণ মানুষের অঙ্গীকার। সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই অর্থনীতির চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতা, ক্ষমতার বাইরের মানুষগুলো অর্থনীতিকে কখনো কূটচালে কখনো বা শক্ত হাতে দমন করছে বা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এর সব শেষ উদাহরণ হচ্ছে, আমেরিকার বাজারে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্যসুবিধা বা জিএসপি স্থগিতের ঘটনা। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একজনের অপরাধে অন্যজনকে শাস্তি দিয়েছে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা-আহ্বানে এমন ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ কোনো পক্ষই সুবিবেচনার পরিচয় দেয়নি।

 

ঠেকানো গেল না তাকে

 

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী খবরের কাগজ ওয়াশিংটন টাইমসে এ বছরের ৩০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বাণিজ্যসুবিধা বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত দুইবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

তাই বলে খালেদা জিয়া নিবন্ধ লেখার কারণেই জিএসপি-সুবিধা স্থগিত হয়েছে এমন নয়। বরং পোশাক খাতের বড় বড় দুর্ঘটনার পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় এই সুবিধা স্থগিত হতোই, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। গত কয়েক মাসে পোশাক খাতে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক শ্রমিক জীবন হারিয়েছে, চিরকালের জন্য প্রতিবন্ধিত্ব বরণ করতে হয়েছে আরও কয়েক হাজারের। এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর।
তড়িঘড়ি করে শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ, পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরো খাতের পরিস্থিতি উন্নয়নে যথেষ্ট ছিল না বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ সরকার এবং খাত-সংশ্লিষ্টদের এ ক্ষেত্রে যত ক্রিয়াশীল হওয়ার কথা ছিল সেই তুলনায় তারা ছিলেন মন্থর। এই যুক্তিতে জেনারালাইজ সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস-জিএসপি-সুবিধা স্থগিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

জিএসপি বাতিলে সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‘আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে জিএসপি-সুবিধা পায়, সেটা স্থগিত করাই উপযুক্ত পদক্ষেপ। কেননা, তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না । একই দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস জিএসপি বাতিল নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। যেখানে ওবামা প্রশাসনকে সমর্থন জানিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি বারবার তাদের কর্তব্য পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে পাশ্চাত্যের সরকারগুলোর এটা (জিএসপি) প্রত্যাহার করার অধিকার রয়েছে।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই সম্পাদকীয়র মূল বার্তাটা অনুধাবন করে ব্যবস্থা নিতে পারলে পরিস্থিতি উন্নত হতে বাধ্য। তবে, জিএসপি স্থগিতের ঘটনার পর প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট বা দলের নেতারা মূল ঘটনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। ইস্যুটিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু জিএসপির ওপর থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে ব্যবসায়ী বা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো নড়াচড়া এখনো চোখে পড়েনি। ওই সম্পাদকীয়তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং জিএসপি স্থগিতের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়।

 

তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের উল্টো মতও খোদ আমেরিকাতেই আছে। দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্য শাস্তি বলে অভিহিত করেছে। পত্রিকাটি তাদের এক নিবন্ধে বলেছে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উন্নয়নে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটানো যাবে না। বরং দেশটির দরিদ্র শ্রমিকদের আরও কঠিন জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে চলবে না। বরং ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে পত্রিকাটি।

 

খালেদার নিবন্ধ, খালেদার না

 

খালেদা জিয়ার প্রবন্ধ ছাপা হয় এ বছরের ৩০ জানুয়ারি। আর মার্চের শেষভাগে ওয়াশিংটনের জিএসপি নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এই শুনানিতে অংশ নেওয়া একজন ব্যবসায়ী জানান, শুনানিতে প্রসঙ্গটি তুলেছিল ইউএসটিআর (আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি)। কিন্তু শোনা ছাড়া বাংলাদেশের কাছে কোনো জবাব ছিল না। যদিও শ্রমপরিস্থিতির উন্নতি, শ্রমিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতার লেখাটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বের সামনে কতটা বিব্রত করেছে, তা বলে বোঝানো কঠিন।

 

জিএসপি স্থগিত করার পর সরকারি দল বিরোধী দলকে আক্রমণ করতে থাকে ওই লেখা নিয়ে। তার কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি স্থগিত করেছে বলে প্রচারণা চালাতে থাকে। রাজনীতির মাঠে বেকায়দায় পড়ে যাওয়ায় বাজেট বক্তৃতায় ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত লেখা তার নয় বলে দাবি করেন খালেদা জিয়া। এর দুদিনের মাথায় ওয়াশিংটন টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক বাংলাদেশের দুটো গণমাধ্যমকে জানান, লেখাটি বেগম জিয়ারই এবং তা নিশ্চিত হয়েই ছেপেছেন। অন্যদিকে সরকার/সরকারদলীয় নেতারাও আছেন বেগম জিয়াকে নিয়ে। ফলে জিএসপি স্থগিতের ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে তা উদ্ধারে মনোযোগ নেই কারও।

 

 

কে লিখেছে, কে লেখেননি, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের কিছু খাত আমেরিকার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পেত, তা থেকে বঞ্চিত। এর পেছনে আমেরিকার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার যেমন আছে, তেমনি বাংলাদেশের সরকার-বিরোধী দল এবং খাত-সংশ্লিষ্টদের দায়ও ব্যাপক এবং গভীর।

 

টিকফা হজম করে জিএসপি বমি করেছে ওবামা প্রশাসন। টিকফা নিয়ে যত না আলোচনা হয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনীতি হচ্ছে জিএসপি স্থগিতের ঘটনায়। সরকার বিরোধী দল ও ড. ইউনূসকে দুষছে, আর বিরোধী দল ক্ষমতাসীনদের ঘায়েল করতে তাদের দুষছে। এ অবস্থায় ওবামা প্রশাসনের দেওয়া এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে কাজটা কে করবে তা বুঝতে পারছেন না কেউই। জিএসপি স্থগিত করায় কতটি কারখানা বা খাত ক্ষতিগ্রসত্ম হবে, অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হলো বা দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব কী, তা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। বরং রাজনৈতিক তির-ছোড়াছুড়ি করে খুব মজা আর ফায়দা লুটছেন রাজনীতিকেরা। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু নিয়ে জনগণের সঙ্গে এমন বিদ্রূপ করার সাহস সম্ভবত শুধু বাংলাদেশেই দেখানো সম্ভব।

 

দায় মেটাতে হবে নিজেদেরই

 

ওপরের ছোট এই উদাহরণের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় বাধার জায়গাটি যত না অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক তারচেয়েও বেশি অভ্যন্তরীণ এবং রাজনৈতিক। অর্থনীতির রাজনীতিকীকরণ, রাজনৈতিক কারণে অর্থনীতিকে আক্রমণ, দৃশ্যমান দুর্নীতি, যুগোপযোগী নীতি ও দেশপ্রেমের অভাব, অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের প্রবণতা, সহিংস রাজনীতি, সবর্ক্ষেত্রে দলীয়করণ, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের অভাব, জনমত উপেক্ষার মতো নানা কারণে অর্থনীতি দেশের ভেতরেই আক্রমণের শিকার হয়েছে বা হচ্ছে বেশি। পাশাপাশি প্রতিযোগী রাষ্ট্র ও বিশ্বরাজনীতির স্ট্রাইকারদের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান আক্রমণ তো আছেই।

 

এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলছিলেন, অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ কী, আগে নিজেদের ঠিক হতে হবে। নিজেদের দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করে নিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। তা না করে অন্যদের দোষারোপ করলে বিভেদের ফাটল আরও বড় হবে, যা দিয়ে প্রথমে পিঁপড়া, পরে ইঁদুর, এরপর হাতি-বাঘ-সিংহ সব চলে আসবে। তাই জাতীয় ইস্যুতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে বিদেশি স্ট্রাইকাররা গোল করার সুযোগই পাবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের ফাউল খেলার সম্ভাবনাই বেশি। এতে লাভ বাংলাদেশের। কিন্তু ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সব ক্ষেত্রে বিভক্তি আরও প্রকট হচ্ছে। এটাই ভয়ের জায়গা।

 

এ বিষয়ে একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বাতিল না করে জিএসপি স্থগিত করায় ওবামা প্রশাসন ধন্যবাদ পেতে পারে। কেননা, পোশাক খাতে গত কয়েক মাসে রানা প্লাজা, তাজরীনের মতো ঘটনায় এই সুবিধা বাতিল করলে বলার কিছু থাকত না। এসব দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বাণিজ্যিক সুবিধা বাতিলের জন্য ওবামা প্রশাসনের ওপর মারাত্মক চাপ ছিল। কংগ্রেসম্যান, সিনেটর এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের চাপের মুখে জিএসপি স্থগিতের ঘটনাকে মন্দের ভালো বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে, আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং রক্ষণশীল শ্রমিক সংগঠন ও আমেরিকার ফেডারেল অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশনের (এফএল-সিআইও) শুরু থেকেই জিএসপি বাতিলসহ পশ্চিমা বিশ্বের হাতে যত ধরনের অস্ত্র আছে তা প্রয়োগের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।

 

জিএসপি স্থগিত করায় তা প্রত্যাহারের সুযোগও আছে। এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা হতে হবে বাংলাদেশের। যদি খাত-সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করতে সক্ষম হন, ব্যবসা মানে শুধুই মুনাফা নয়, তারচেয়ে বেশি কিছু, তবে অবশ্যই স্থগিতাদেশ বাতিল হবে এবং পোশাক খাতের সামনে আরও সুন্দর দিন আসবে। গত তিন দশকে পোশাক খাত বাংলাদেশের একমাত্র বিলিয়ন ডলার খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও খাতটিতে অনেক দুবর্লতা আছে। কারখানার পরিবেশের উন্নয়ন, শ্রমিকের জীবন মানের উন্নয়ন, শ্রমিকের সম্মানজনক স্বীকৃতি কারখানা ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, আহত-নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গড়ার দিকে নজর দিতে হবে। আর সরকারের কর্তব্য হবে নীতিসহায়তার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং পোশাক খাতকে জিএসপির আওতায় আনতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানো। খাতটিতে দৃশ্যমান উন্নতি হলে বিশ্ব অবশ্যই স্বপ্লোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেবে। এমন বিশ্বাস বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের।

 

তিনি বলেন, সমস্যা আমাদের, সমাধানও আমাদের হাতে। এটা অন্য কেউ করে দেবে না। সহজ এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। কারখানার পরিবেশের উন্নতি হলে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা-ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলে, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা বাড়লে লাভ আমেরিকার নয়, বাংলাদেশের। এটা সরকার এবং খাত-সংশ্লিষ্টদের বুঝতে হবে। অর্থনীতির কল্যাণ কিসে, তা এ দেশের মানুষের চেয়ে বেশি কেউ জানে না। ফলে, নিজেদের ভুল শোধরাতে হবে। অন্তত ভুল স্বীকার করে সংশোধনের মানসিকতা থাকতে হবে। আজ যদি বাংলাদেশ ব্যর্থ হয় তবে কাল এর জন্য অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, আধুনিক বিশ্বে ব্যবসা শুধু মুনাফায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক বেশি মানবিক এবং কখনো কখনো ভীষণ রূঢ়। বড় অর্থনীতিগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় দুবর্লতা পেলে সুযোগ নেবেই। তাদের সুযোগ দেব কি না, তা নির্ভর করছে আমরা কী ধরনের আচরণ করছি তার ওপর।

 

জ্বালানি তেল-ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়লে, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো নাজুক হলে অবশ্যই আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রপ্তানির ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হয়। আমেরিকা-ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব গত কয়েক বছর ধরে মোকাবিলা করছে সারা বিশ্ব। কিন্তু এই মন্দার চেয়ে অর্থনীতি অনেক বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বিগত ছয় মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতায়। পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচন অনিশ্চয়তায় অর্থনীতি-বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ থমকে আছে। উভয় দলই যার যার অবস্থানে অনড় থাকায় দশম জাতীয় সংসদ নিবার্চন হবে কি না তা নিয়েই সংশয়ে আছে দেশের মানুষ। কূটনীতিকেরাও উদ্বিগ্ন। কিন্তু এ অবস্থা উত্তরণে কেউ সাহায্য করতে পারবে না। সমাধান নিজেদের মতো করে নিজেদেরই খুঁজতে হবে।

 

আমেরিকান জিএসপি: লাভ-ক্ষতি

 

জিএসপি প্রত্যাহার নিয়ে এত রাজনীতি, আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে কিন্তু দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানে না বস্তুটা কী। এমনকি জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারীদের মধ্যে কতজন বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ওয়াকিবহাল তা নিয়েও সন্দেহ আছে অনেকের। ইপিবির হিসাবে বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করে মাত্র ৯৮টি পণ্য। এর মধ্যে জিএসপি-সুবিধার আওতায় ছিল ৯৬টি পণ্য। দেশের সবচেয়ে পোশাক খাতকে ইউরোপ জিএসপি-সুবিধা দিলেও আমেরিকা দিত না। বরং শেষ বছরেও দেশটিতে ৭৪৬ মিলিয়ন ডলার শুল্ক দিয়েছে পোশাক খাত। অর্থাৎ দেশের জিএসপির বাইরে থাকায় আপাতদৃষ্টিতে পোশাক রপ্তানিতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।

 

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি-সুবিধা পাওয়া পণ্যগুলো হলো, সিরামিকস, প্লাস্টিক, তাঁবু, সবজি ও ফল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য, তামাক, শতরঞ্জি, হেড গিয়ার, মানুষের চুল, পাখির চামড়া ও পালক, অল্প কিছু খেলনাসামগ্রী ইত্যাদি। এসব পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে সাড়ে চরশো কোটি টাকার বেশি আয় করে। এর মধ্যে সিরামিকস এবং প্লাস্টিকজাত পণ্য আমেরিকার বাজারে খুব ভালো করছিল। এ দুটি পণ্যের চাহিদাও ভালো। ফলে, চাহিদাও প্রতিনিয়ত বাড়ছিল। জানা গেছে, প্লাস্টিক ও সিরামিকস রপ্তানি করে বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় হতো। কিন্তু জিএসপি স্থগিত করায় সম্ভাবনাময় এই দুটি খাতকে বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে প্লাস্টিক ও সিরামিকস। মোটা দাগে মার্কিনদের এই সিদ্ধান্তে উদীয়মান ১০টি খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়বে।

 

মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছিলেন, জিএসপি স্থগিত করায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে দেশের ইমেজসংকট সবকিছুকে ছাপিয়ে আরও বড় হয়ে উঠবে। আমেরিকার এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্যরাও বাংলাদেশকে মার্কিংয়ের মধ্যে রাখবে। এটাই হচ্ছে বড় সমস্যা। জিএসপিতে যত কমই মার্কিন বাজার থেকে পাওয়া যাক না কেন, তাদের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অনেক ও বহুমুখী। ফলে, আমেরিকা যেন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে সেই লক্ষ্যে কাজ করা উচিত। এটি রাজনৈতিক কোলাহলের সময় নয়।

 

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জিএসপির আওতায় আমেরিকায় রপ্তানিকৃত পণ্যের বাজারকে সাড়ে চারশো-পাঁচশো কোটি দিয়ে মাপলে ভুল হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে হবে। বিশ্ব রাজনীতিতে অর্থনীতিই প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত। অর্থনীতিকে উন্নত রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে প্রয়োজনে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেছে কি না, তা সরকারের খুঁজে বের করা উচিত। যদিও আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

 

তিনি বলেন, আমেরিকা কেন এই সিদ্ধান্ত নিল তা কোনোভাবেই আমার বোধগম্য নয়। আমেরিকা মুক্তবাণিজ্যের কথা বললেও এই সিদ্ধান্ত তার বিপরীত। আমার ধারণা, এএফএল-সিআইও নামক শ্রমিক সংগঠনকে খুশি করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওবামা প্রশাসন। এই সংগঠনটি মুক্তবাণিজ্যে বিশ্বাস করে না। জিএসপি স্থগিতের পেছনে অর্থনৈতিক কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না।

 

আমেরিকা ভবনের নিরাপত্তা, শ্রমিকের নিরাপত্তা, কারখানার পরিবেশ উন্নয়নের কথা বলছে, যা অবশ্যই যৌক্তিক এবং শিল্পের জন্য ভালো। কিন্তু বিশাল এই কর্মযজ্ঞ রাতারাতি করা যাবে না। এ জন্য সময় লাগবে, অর্থ লাগবে।

 

জাহিদ হোসেন বলছিলেন, ইউএসটিআর যদি পোশাক খাতের উন্নয়নে একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে বলত, প্রয়োজনীয় উন্নতি ঘটাতে পারলে পোশাক খাতকে জিএসপি-সুবিধা দেওয়া হবে। এতে যে টাকাটা বাঁচত তা পোশাক খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যেত। বড় অর্থনীতির পক্ষে এমনটা করলেই সেটা যৌক্তিক হতো। জিএসপি-সুবিধা পায়, এমন খাতগুলো কোনো অন্যায় করেনি, অথচ শাস্তি পেল তারাই। এটা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমেরিকা যদি বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য না করে তাহলে কে করবে? পোশাক খাতের উন্নয়নে দেশটি এত আগ্রহী কিন্তু জিএসপি-সুবিধা দেবে না। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ কত দেশ জিএসপি পায়, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য এই সুবিধার বাইরে থাকে কীভাবে, যুক্তি খুঁজে পাই না। আমেরিকা যদি এটা না করে কে করবে? জিএসপি স্থগিত করায় রপ্তানি ক্ষতি খুব একটা হবে না, এটা উদ্যোক্তারা কাভার করতে পারবেন। কিন্তু নেসেসিটি অব ডকটিনের সঠিক প্রয়োগ হয়নি।

 

আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত ইউরোপ-কানাডা অনুসরণ করতে পারে এমন একটা আশঙ্কা শুরুতে সবার মধ্যেই ছিল। ইউরোপ বাংলাদেশি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। ফলে ইউরোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করলে এর চেয়ে খারাপ কোনো খবর আর হতো না। যদিও ইউরোপ-কানাডা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, তারা আপাতত এমন কিছু ভাবছে না। এতে নিঃশ্বাস ফেলার ফুসরত মিললেও স্বস্তির কোনো কারণ নেই। ইউরোপে এই মুহূর্তে ইবিএ-এভরিথিং বাট আর্মস অর্থাৎ অস্ত্র ছাড়া বাকি সব পণ্য জিএসপি-সুবিধা পেয়ে থাকে। পোশাক খাতের দুর্ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্বিগ্ন। তারাও পোশাকশিল্প-শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা, উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরিতে চাপ দিচ্ছে।

ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, ইউরোপ-কানাডার বর্তমান অবস্থানে আত্মতুষ্টির কোনো কারণ দেখি না। ইউরোপ কিন্তু বলেনি তারা জিএসপি-সুবিধা তুলে নেবে না। আবার সুবিধা বহাল থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তাও দেয়নি। তারা বাংলাদেশেকে পযবেক্ষণে রেখেছে। আমেরিকার সিদ্ধান্তকে ওয়েক আপ বা জেগে ওঠার সংকেত বলা যেতে পারে। এখন পোশাক খাতে যদি অব্যাহত দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে, শ্রমিক অসন্তোষ চলতেই থাকে, মালিক-সরকার গা না করে তবে অনন্তকাল ধরে ইউরোপ-কানাডা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা অব্যাহত রাখবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নিজেদের স্বার্থেই পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন করতেই হবে।

 

জিয়া হাসানদের কথা দিয়েই লেখাটা শেষ হতে পারে। মানুষের কল্যাণ আর রাষ্ট্রের উন্নতি, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো সামনে যাওয়ার দৃশ্যমান প্রত্যাশাই এই তরুণদের কাছে শেষ কথা। কিন্তু দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের কথা কে শুনছে? দেশপ্রেম যেমন বই পড়ে জন্মায় না, তেমনি রাষ্ট্রীয় উন্নতি সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে এই তরুণ প্রজন্মকে বোঝানো যায় না। এই সহজ বিষয়টি রাষ্ট্র পরিচালনা যারা করেন তারা হয় বোঝেন না, অথবা বুঝেও আস্থায় নেন না। এটা যে দেশের আর দশজনের মতো এরা বোঝে না তা নয়। তার পরও যুক্তির জায়গা নেয় আবেগ, অন্ধ দেশপ্রেম। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিক্ষাজীবন শেষে কাজের নিশ্চয়তা, সব শ্রেণী-পেশার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করা, সামাজিক-রাষ্ট্রীয় বৈষম্য দূর, জাতীয় ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও এক হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার, জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচার নিশ্চয়তা চাই সব নাগরিক। যা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আর নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

 

চকচকে হাইওয়ে, যানজটহীন সড়ক, আর্সেনাল-ম্যানইউ-বার্সেলোনার মতো দল খেলতে আসবে বাংলাদেশে। সাকিব-তামিম বিপ্লব-সুমনরা বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে। বিদ্যুতের আলোয় ভেসে যাবে অন্ধকার। নিজেদের সিনেমা-নাটক দেখবে, গান শুনে বড় হবে আগামীর নেতা-সম্ভবত দেশের ৯০ ভাগ মানুষের চাওয়া এমনই। শুধু এইটুকু স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার নেতৃত্বের থাকলে বিশ্বের যে দেশের সঙ্গে শক্ত প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রাখে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশ যারা চালায় এবং যারা চালাতে চায় এই দু’পক্ষের মধ্যে দেশপ্রেম শব্দটি বহুল আলোচিত হলেও দেশের প্রতি ন্যূনতম মমত্ববোধ বা ভালোবাসা নেই বলেই অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস। এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা, ভারতের সঙ্গে তিস্তা বা ট্রানজিটের মতো চুক্তির কথা শুনলেই জনগণ প্রতিক্রিয়া দেখায়। চুক্তির ধারা-উপধারা, অনুচ্ছেদ-উপচ্ছেদ যত ভালোই হোক, সাধারণ মানুষ এর মধ্যে নিজেদের খুঁজে পায় না, ফলে সন্দিহান হয়ে ওঠে।

 

জনগণের সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব সরকার, বিরোধী দল এবং সর্বোপরি রাজনীতিকদের। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে পোশাক খাতের দুর্ঘটনাগুলো উদ্বেগকে দুশ্চিন্তায় পরিণত করেছে। পোশাক খাতে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে তা কারখানামালিকদেরই দূর করতে হবে। সরকার-বিরোধী দল বা বিদেশি শক্তির দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো সমাধান মিলবে না। অতীতে বহু সংকট, দুর্ঘটনা বেসরকারি খাত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে বলে আশা সবার। রিল্যাক্স করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে জিএসপি স্থগিতসহ যা ঘটেছে বা ঘটবে, তার জন্য আমেরিকা বা অন্যদের দায়ী করে কোনো লাভ নেই। বরং আমেরিকা এক সুবর্ণ সুযোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ তা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে জিএসপির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হবে।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ