একজন নোবেল বিজয়ীর গ্রামীণ ব্যাংক বনাম সরকার | সময় বিচিত্রা
একজন নোবেল বিজয়ীর গ্রামীণ ব্যাংক বনাম সরকার
Somoy Bichitra
6

সালমা খাতুন

সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের কাছেও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠা করা গ্রামীণ ব্যাংকের খবর এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’৷ প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ভাঙা নিয়ে সরকার ও ড. ইউনূস এখন মুখোমুখি৷ ক্রমশই পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে গড়াচ্ছে৷ ব্যাংকটির অবকাঠামো ভাঙার ব্যাপারে সরকারের শক্ত অবস্থান ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ড. ইউনূসের সাথে থাকার ঘোষণা দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ৷ বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত আছে দেশ ও দেশের বাইরের ৮৪ লাখ মানুষের আর্থিক কাযর্ক্রম ৷ অনেকের মতে, রাজনৈতিক জেদের বশে ধ্বংস হতে যাচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক৷ সরকার গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন যখন এই ব্যাংককে ১৯ টুকরো করার সুপারিশ করেছে, তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ব্যাংকটির পাশে থাকার ঘোষণা, স্বভাবতই রাজনীতি ঢুকে পড়ার আভাস৷ আবার গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই ব্যাংকের কাঠামোর ভাঙার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার৷ সুতরাং এ নিয়ে রাজনীতিটা যে ভবিষ্যতে আরও জমবে সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আর অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের শক্ত অবস্থান তা-ই ইঙ্গিত দিচ্ছে ৷

সম্প্রতি সরকার গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন সুপারিশ করে, পল্লী বিদু্যত্‍ সমিতিগুলোর আদলে গ্রামীণ ব্যাংককে ছোট ছোট স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে৷ গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কাযার্লয় কেবল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে৷ এর অংশ হিসেবে গত ২ জুলাই রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে একটি কর্মশালারও আয়োজন করা হয়, যাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মূল বক্তা থাকার কথা ছিল ৷ এ ছাড়া মালিকানা বিষয়সংক্রান্ত বিকল্প হিসেবে শিল্প ব্যাংকের আদলে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি শেয়ারের অংশ ৫১ শতাংশে উন্নীত করে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল৷ কমিশনের সুপারিশ করা নতুন কাঠামোতে গ্রামীণ ব্যাংক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সংবিধিবদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই চালু থাকবে ৷

কমিশনের এসব সুপারিশের ওপর আলোচনা করার জন্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, এনজিও ব্যক্তিত্ব ও আমলাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ সেই কর্মশালায় মতামত প্রদানের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয় ৷ এরপরই নানা মহলে সমালোচনা, এমনকি মার্কিন সরকারের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা স্থগিত করেন অর্থমন্ত্রী ৷ ওবামা প্রশাসন থেকে বলা হয়, ৮৪ লাখ দরিদ্র নারীর মালিকানাধীন বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি স্বনির্ভর আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ করা হলে এটা হবে সরকারের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার ৷ আইনি কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলোর কোনোটাই সামান্যতম বিবেচনারও যোগ্যতা রাখে না ৷
শুধু তা-ই নয়, দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীও এর সমালোচনা করেন৷ তাঁরা বলেন, সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক জেদের বশে গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো ভাঙা হচ্ছে৷ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও গ্রামীণ ব্যাংকের একসময়ের চেয়ারম্যান আকবর আলি খান বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত ঋণগ্রহীতা গরিব সদস্যদের কাছ থেকে আসা উচিত৷ কেননা গরিব মানুষ কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না ৷

আরেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি মালিকানায় গেলে কী হয়, তা আমরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারি৷ সরকারি মালিকানাধীন শুধু আর্থিক খাত নয়, উত্‍পাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত পুঞ্জীভূত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ৷ এতে শুধু ভতুর্কির পরিমাণই বেড়েছে৷ নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়া হয় এসব প্রতিষ্ঠানকে৷ এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না ৷
সরকার গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের সুপারিশের পর গত ২০ জুন চট্টগ্রামে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নোবেল বিজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস ৷ তিনি অভিযোগ করেন, সরকার গায়ের জোরে এই ব্যাংককে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলতে চায়৷ কিন্তু দেশের তরুণেরা জেগে উঠলে সরকারের গ্রামীণ ব্যাংক ধ্বংসের উদ্দেশ্য সফল হবে না ৷ মার্কিন কংগ্রেশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর চট্টগ্রামে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের কোটি দরিদ্র মানুষের ব্যাংকে পরিণত হয়েছে ৷ তাই সরকার এটি ভেঙে ফেলতে চাইলেও সাধারণ মানুষই একে রক্ষা করবে ৷ আমেরিকার সবোর্চ্চ সম্মাননা ‘কনগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল’-জয়ী এই অর্থনীতিবিদ অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে ছিনতাই করতে চায় ৷
ড. ইউনূসের এমন অবস্থান জানানোর পর, গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গ্রামীণ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে তাদের কাযর্ক্রম চালাতে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান৷ আশ্বাস দেন, ক্ষমতায় গেলে গ্রামীণ ব্যাংককে তার আগের অবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া হবে৷ তিনি বলেন, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপমান করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করা হয়েছে ৷ মওদুদের ওই বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের চরিত্র বদল করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই৷ ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়ার পর এর অনেক উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি করেন মুহিত ৷
পরদিন ২৭ জুন, গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারকে আর চক্রান্ত না করার আহ্বান জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর৷ ক্ষমতায় গেলে গ্রামীণ ব্যাংককে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি ৷ রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান মির্জা ফখরুল৷ তার আগে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া৷ এই সম্মাননা পৌঁছে দিতে ২৪ জুন গ্রামীণ সেন্টারে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ৷
গ্রামীণ ব্যাংক, সরকার আর নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের মধ্যে এই যখন রেষারেষি অবস্থা, গত ২৮ জুন, রাজধানীতে সামাজিক ব্যবসা দিবসের আলোচনা শেষে আবারও সাংবাদিকদের মুখোমুখি গ্রামীণ ব্যাংকের এই প্রতিষ্ঠাতা ৷ গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের সুপারিশগুলোকে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেন তিনি৷ ঘোষণা দেন, প্রয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামীণ ব্যাংকের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করবেন তিনি ৷
সবশেষ ১ জুলাই আগারগাঁওয়ে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনে ক্ষুদ্র ঋণ ও দারিদ্র্য বিষয়ক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানিয়ে দেন, গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন নেই ৷ গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান তিনি৷ তবে এসব সমালোচনার মুখে সরকার কিংবা অর্থমন্ত্রী তার অবস্থান থেকে সরে এলেও গ্রামীণ ব্যাংক আর নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে নিয়ে ভবিষ্যতে যে রাজনীতি বাড়বে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা ৷


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ