ধর্মব্যবসা : রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী
ফরিদ আলম
17

ফরিদ আলম, নিউ ইয়ার্ক থেকে

অনেক বছর আগে আমার জন্মস্থান টাঙ্গাইলের এক মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। কবরস্থানের পাশে হওয়ায় এই মসজিদের নাম গোরসত্মান মসজিদ। পাশেই বড়সড় একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা। বাবা-মা দুজনেই প্রয়াত হয়েছেন অনেক বছর আগে। তাই টাঙ্গাইলে গেলে ওই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করার পর গোরস্তানে ঢুকতাম আব্বা-আম্মার কবর জিয়ারত করতে। আব্বা-আম্মার মৃত্যুবার্ষিকীতে ওই মাদ্রাসার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করতাম। আগে আব্বা-আম্মার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা নিজেদের বাসায় রান্না করে ফকির খাওয়াতাম। কিন্তু এক সময় লক্ষ, করলাম, খেতে আসা লোকজন (যাদের আমরা ফকির-মিসকিন বলি) দাওয়াতে এসে যারপরনাই তাড়াহড়া করে। তারা বলে, ‘তাড়াতাড়ি খাবার দ্যান, ট্যাকা আর মুরগি, কী দিবেন, অহনি দ্যান। আমগো সময় নাই। অন্য বাইত্যে (বাড়িতে) যাওয়া নাগবো (লাগবে)। আমরা কয়েক বছর খেয়াল করলাম, এরা আগেই জিজ্ঞেস করে, কী খাবার দেব, মুরগি না মোরগ দেব, আর নগদ টাকা কত করে দেব। আর দাওয়াতে এসে খাওয়া শেষ করেই টাকা আর মুরগি নিয়ে কোনো দোয়া-দরম্নদ না পড়েই চলে যায়। আমাদের কাছে কষ্ট লাগত। ভাইবোনেরা দূর-দূরান্ত থেকে একত্র হয়েছি আব্বা-আম্মার মৃত্যুবার্ষিকীতে, যাতে ফকির-মিসকিন খাওয়ালে একটু সওয়াব পাওয়া যায়। হয়তো আল্লাহ তাদের প্রকাশ্য দোয়ার জন্য অপেক্ষা করেন না। কিন্তু তাই বলে আমাদের প্রকাশ্যে দোয়া আশা করাতে তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু না, তা আর হয় না। একসময় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, মাদ্রাসার গরিব ও এতিম শিক্ষার্থীদের খাওয়াব। আমরা দেখলাম, ওদের খাওয়ানোর পর কোরআন খতম থেকে শুরু করে দোয়া-দরুদ সবই আমাদের প্রত্যাশামতো হয়। আমরা খুশি। আর সে কারণেই এতিমদের খাওয়ানো এবং কবর জিয়ারত-দুটো মিলিয়ে যেতাম গোরসত্মান মসজিতে জুমা আদায় করতে। কিন্তু একদিন আমি আবিষ্কার করলাম, ফকির-মিসকিনদের চেয়েও মসজিদ-মাদ্রাসা আর গোরসত্মান নিয়ন্ত্রণকারী সমাজের সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষগুলো আরও বেশি কমার্শিয়াল। কিন্তু এটা সবাই না। মাদ্রাসা আর এতিমখানার অশিক্ষিত, নিরীহ, শান্ত শিশুগুলোকে নিয়ে তারা যুগ যুগ ধরে ধর্মব্যবসা করে যাচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মকে পুঁজি করেই তারা লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছে। কিন্তু যাদের পুঁজি করে এই ধর্মব্যবসা, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

একদিন জুমা শেষে বাইরে এসে দেখলাম, দুধ-সাদা আলখেল্লা পরা একজন বয়স্ক মানুষ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট মুসল্লির সাথে অকথ্য বাক্য বিনিময় করছেন। যদিও তিনি একটু আগেই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেছেন। পরে যেটা জানতে পারলাম সেটা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি ও মাওলানা নামে পরিচিত। হজ করেছেন একাধিকবার। বিগত ২৫ বছর যাবৎ এই মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং গোরস্তানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অনেক অভিযোগ। তবু তাকে তার দায়িত্ব থেকে সরানো যায় না। কারণ, তিনি ওপরমহলের সাথে যোগাযোগ রাখেন সব সময়। বহু দিন পর তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই নতুন কমিটিতে তিনি আর থাকতে পারছেন না। এটা জানতে পেরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তিনি অন্য মুসল্লিদের মা-বোনকেও ছাড়ছেন না। আমি আকাশ থেকে পড়লাম তার গালাগালি শুনে। একজন সফেদ দাড়ির নুরানি চেহারার বয়স্ক মানুষ কেবল একটি পদে থাকার জন্য এমন করতে পারেন? তা-ও আবার ধর্মীয় উপাসনালয়ের পদে থাকার জন্য? জানলাম, গড়ে প্রতিদিন তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় করেন কয়েক হাজার টাকা, যেটা মাস শেষে কয়েক লাখ। তা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান তো আছেই। আমার বোধোদয় হলো, তথাকথিত এই মোল্লারা পুরোপুরি ধর্মকে পুঁজি করেই নিজেদের অর্থনৈতিক আখের গোছাচ্ছে।

এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদ-মাদ্রাসাই রাজনৈতিক নেতা কিংবা তাদের আশীবার্দপুষ্ট ব্যক্তিদের হাতে জিম্মি। কারণ, এসব ধর্মীয় উপাসনালয়ে সারা বছরই সরকারি-বেসরকারি অনুদান আসে। সেই অনুদানের ভাগ-বাঁটোয়ারাই হচ্ছে আসল মধু। ব্যতিক্রমও আছে, তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। রাজধানী ঢাকাতেই এমন বহু মসজিদ আছে যেগুলো অন্যের জায়গা বেদখল করে গড়ে তোলা হয়েছে। আমার জানার ইচ্ছা, হাদিস বা কোরআনের কোথাও কি লেখা আছে যে অন্যের জায়গা দখল করে আল্লার ইবাদত হবে? পৃথিবীর কোনো হাদিসবেত্তা বা কোরআনের হাফেজই এ কথা বলতে পারবেন না, এটা আমি নিশ্চিত।

ধর্মব্যবসা বা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এখানেই থেমে থাকেনি। এর বীজ এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ধর্মকে পুঁজি করে এখন কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেতে চায়, কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে চায়, কেউ মন্ত্রী হতে চায়, কেউ ইসলামবিরোধী হয়েও ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হতে চায়, কেউ বায়তুল মোকাররমও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। সামপ্রতিক সময়ে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীওহেফাজতে ইসলামকে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে, কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ পীরের মুরিদ হওয়ার সুযোগে গোপন বৈঠক করে, আবার কেউ বিনা মূল্যে পানি সরবরাহ করে। নিঃসন্দেহে ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্ম যথাযথভাবে পালন করাও কারও জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে না। কিন্তু ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করতে চাইলে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইলে এই ধর্মই একদিন হয়তো গ্রাস করবে তাদের।

বাংলাদেশে এখন ইসলাম ধর্ম নিয়ে ব্যবসা বা রাজনীতি করার কারণেই এই ধর্ম নিয়ে যত নেতিবাচক প্রচার হয়, তার অনেকটাই ভিন্ন ধর্ম বা অন্য দেশের মানুষ দূর থেকে বিশ্বাস করে। অথচ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে যত বাড়াবাড়ি হয়, এটা আর কোনো ধর্মের অনুসারীরাই করে না। একই অবস্থা হিন্দুধর্ম নিয়ে পাশের দেশ ভারতেও। সেখানে বারো মাসে তেরো পূজা হলেও সেটা আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিচ্ছিন্ন ঘটনা অবশ্য ঘটতেই পারে যেকোনো ধর্মানুষ্ঠানে। কিন্তু সেটা সমাজে কোনো কুপ্রভাব ফেলে না। কারণ তারা বাড়াবাড়ি করলেও কেউ তা নিয়ে ব্যবসা বা রাজনীতি করছে না। তবে, ভারতের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিজেপি ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করার পাশাপাশি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে বহুবার।

খ্রিষ্টধর্মের সবোর্চ্চ ধর্মীয় নেতা ও পোপ নিবার্চিত হওয়ার আগে খ্রিষ্টধর্মের হাজার হাজার অনুসারী যখন ভ্যাটিকান সিটির চিমনির দিকে ধোঁয়া দেখার জন্য তাকিয়ে তাকিয়ে এক সপ্তাহ পার করে দেয়, সেটাকে ধর্মীয় উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই বলার থাকে না। কিন্তু এই উন্মাদনা নিয়ে কেউ কিন্তু ব্যবসা করার কথা মাথায় আনে না। কিংবা কাউকে বাধ্যও করা হয় না সেখানে যাওয়ার জন্য। স্রেফ একধরনের ভক্তি থেকে তারা যায় এটা দেখার জন্য যে কখন চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হবে। অর্থাৎ তারা এটা নিশ্চিত হতে চায়, যাকে পোপ নিবার্চিত  করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে, তিনিই দায়িত্বটা পেলেন কি না? হাজার হাজার মানুষ দিন-রাত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার মতো উন্মাদনার এটাই মূল কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেকটা হোটেল-মোটেল বা রেস্ট হাউসের প্রতিটা রুমের ড্রয়ারে সযত্নে একটি করে বাইবেল রাখা আছে। যার ইচ্ছা পড়ে, যার ইচ্ছা হয় না সে পড়ে না। কিন্তু হোটেলের রুমে রুমে বাইবেল রাখার অর্থই হচ্ছে, নিজের ধর্মের প্রতি তার আনুগত্যের নিদর্শন। বাইবেলের বাণী সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে সত্যি, কিন্তু সেটা পড়ার জন্য কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে না। সেই হিসেবে ইসলাম ধর্মের বাণী প্রচারের জন্য মুসলমানরা যতটুকু সক্রিয়, তার চেয়েও অনেক বেশি সক্রিয় খ্রিষ্টানরা। যিশুখ্রিষ্ট বা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা রোববারে চার্চে যায় ও সানডে প্রেয়ার বা রোববারের সাপ্তাহিক প্রার্থনার জন্য। ইহুদিরা শনিবারে তাদের ধর্ম পালন নিয়ে এতই মগ্ন থাকে যে ওই দিন তারা তাদের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে। তাদের প্রায় সবারই মুখে লম্বা দাড়ি। ছোট-বড় সবার মাথায় থাকে কালো টুপি বা হ্যাট। এই ধর্মের অনুসারী যারা কম বয়সী বা স্কুল-কলেজের ছাত্র তারা দাড়ি না রাখলেও মাথায় ঠিকই টুপি পরে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ধর্ম নিয়ে তারা রাজনীতি বা ব্যবসা করে না বলেই এ নিয়ে কোনো প্রশ্নও ওঠে না। কিন্তু পৃথিবীর বহু দেশে মুসলমান মেয়েদের হিজাব পরা ঠেকানোর জন্য আইন পাস করা হয়, মুসলিম শিক্ষালয় মাদ্রাসাশিক্ষাকে গোঁড়ামি বলে অপবাদ দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্মের আরও বিস্তার কিংবা অনুশাসন ঠেকানোর জন্যই হিজাবের বিরুদ্ধে তাদের এই অবস্থান। ফ্রান্স বা ব্রিটেনের কোনো স্কুল বা কলেজে একজন মুসলিম ছাত্র টুপি পরে ক্লাসে গেলে কী রিঅ্যাকশন হতে পারে, সেটা কল্পনাই করা যায় না।

সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে মার্কিন ডলার। বিশ্ববাজারে প্রচলিত যেকোনো নোটের চেয়ে এক ডলারের নোটের সংখ্যা বেশি। সেই এক ডলারের এক পিঠে মিসরীয় (Egyptian) দেবতা হোরাসের (Horus) এক চোখের একটি ছবি। একচোখা ছবিটির পাশেই লেখা রয়েছেও ইন গড উই ট্রাস্ট। অর্থাৎ সেখানে বলা হচ্ছে, তারা গড-এ (GOD) বিশ্বাস করে। সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন বলে বিশ্বাস করে তারা। আমার মতে, ইংরেজি তিনটি অক্ষরে গঠিত গড শব্দের অর্থ হচ্ছে, সৃষ্টিকারী, পরিচালনাকারী এবং ধ্বংসকারী। যেমন, G For Genarator (সৃষ্টিকারী) O For Operator (পরিচালনাকারী) এবং D for Destroyer (ধ্বংসকারী)| সেই অর্থে যেকোনো ধর্মের অনুসারীরাই মানে যে একজন সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পরিচালনা করছেন এবং তিনিই ধ্বংস করবেন। সেটা অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের মতো করে বিশ্বাস করে। একই জিনিস ইসলাম ধর্মের অনুসারীরাও বিশ্বাস করে। মুসলমানরা বিশ্বাস করে অদৃশ্য একজন আছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সবকিছু পরিচালনা করছেন এবং তিনিই সব ধ্বংস করে দেবেন। সুতরাং যার যেভাবেই বিশ্বাস থাক না কেন, সবাই বিশ্বাস করে সৃষ্টিকর্তাকে। ধর্ম পালন যার যার ব্যাপার। কিন্তু ধর্ম পালনের নামে বা ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করছে, তাদের যে কোনো সৎ উদ্দেশ্য নেই, সেটা পরিষ্কার।

তর্কের খাতিরে বলতে গেলেও এটা জোর দিয়ে বলা যায়, মুষ্টিমেয় ধর্মব্যবসায়ী ছাড়া ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে উন্মাদনা অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষের চেয়ে কম। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও ক্ষমতা বা দায়িত্ব নেওয়ার সময় কোরআন নিয়ে শপথ নেওয়া হয় না। এমন আরও বহু দেশের ক্ষেত্রেও এ উদাহরণ প্রযোজ্য। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট শপথ নেন বাইবেলের ওপর হাত রেখে। কিন্তু তিনি সেটা অতীত ঐতিহ্য মেনে করলেও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন না। রাজনীতি বা ব্যবসাও করেন না ধর্ম নিয়ে। তিনি কখনো এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন না যে তিনি খ্রিষ্টধর্মের একজন ভীষণ অনুরাগী। আবার ইসলাম ধর্মের সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ হাতে নিয়েও খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কংগ্রেসম্যানের শপথ নেওয়ার উদাহরণ আছে। এখানে বিশ্বাসটাই বড়। যার যার বিশ্বাস থেকে এটা করা হলেও এ নিয়ে রাজনীতি বা অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কোনো নজির এখনো পর্যন্ত নেই। তবে ইদানীং যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে নিবার্চনের আগে খেয়াল করলে দেখা যায়, মুসলমান-অধ্যুষিত স্টেটগুলোতে বিভিন্ন পদের প্রার্থীরা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে গিয়েও ভোট চাচ্ছেন। সেখানে ভোটারদের মন জয় করাই প্রার্থীর আসল উদ্দেশ্য বলে মনে হয়। এখনো পযর্ন্ত এ নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা যায়নি বাংলাদেশের মতো।

কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা। বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে শপথ না করলেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন হরহামেশাই। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নাম ছিল এম এ হান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে ওই বন্দরের নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ও হযরত শাহ আমানত বিমানবন্দর। খালেদা জিয়া মনে করলেন, ধর্মীয় নেতাদের নামে নামকরণ করা হলে এই নাম আর পরিবর্তন করতে পারবে না পরবর্তী সরকার। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। এই নাম পরিবর্তন করলে ধর্মপ্রাণ মানুষ খেপে যেতে পারে। সত্যিই সেটা পারেননি শেখ হাসিনা। এবার ক্ষমতায় এসে একই চিন্তা করলেন শেখ হাসিনাও। তিনি জিয়া আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের নাম বদল করে রাখলেন ও হযরত শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর । স্পষ্টত দুজনেই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলেন। কারণ, এ দুটি বিমানবন্দরের নাম আর কোনো সরকারের পক্ষেই পরিবর্তন করা কখনোই সম্ভব হবে না। একদিন হয়তো ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো দানবের মতোই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার জন্য নিজেদের বানানো দানবরা হাসিনা-খালেদাকেও খাবে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প তারা ভুলে যাচ্ছেন বারবার।

আমাদেরসময়ডটকম এবং আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে এক আলোচনা সভায় হলভর্তি মানুষের সামনে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা নিয়ে কথা বলছিলেন। তার মতে, জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলের চেয়েও আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ধর্ম নিয়ে বেশি রাজনীতি করছে। উদাহরণসহ ব্যাখ্যাও দেন তিনি। অনুষ্ঠান শেষে সবাই তার এই কথা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক করেন। বেশির ভাগ শ্রোতাই তার কথায় সমর্থন জানান।

ইসলাম ধর্ম নিয়ে কি কেবল বাংলাদেশেই ব্যবসা বা রাজনীতি হচ্ছে? এর উত্তর হচ্ছে, না। বাংলাদেশের ধর্মব্যবসায়ীরা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নিউ ইয়র্কের বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দেখা যায়, দিনে দিনে অনেক মসজিদ গড়ে উঠছে। মসজিদ গড়ে ওঠা কোনো সমস্যা নয়। মুসলমান হিসেবে সেটা ভালো লাগার ব্যাপার। খুব সহজেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পায়ে হেঁটে বাসার কাছের মসজিদে যেতে পারছে নামাজ আদায় করতে। কিন্তু খারাপ লাগে যখন দেখি মসজিদের কমিটি নিয়ে মন-কষাকষি, মারামারি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হচ্ছে। দা-চাকু নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটছে মসজিদ কমিটির বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে। এরা কি তাহলে ধর্ম প্রচার করছে নাকি ধর্মব্যবসা করছে? এক মসজিদ ভেঙে আরেকটা হচ্ছে পাশেই। এক মসজিদের মুসল্লিদের ডেকে অন্য মসজিদে নেওয়া হচ্ছে। মুসল্লি নেই, মুসল্লির অভাবে মসজিদে নামাজের জায়গা খালি পড়ে থাকে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নামাজের জন্য আহ্বান জানান মসজিদ-ব্যবসায়ীরা। এমনকি অনেকে পোস্টার সাঁটিয়ে জানাচ্ছেন, ও অমুক মসজিদে নামাজে আসুন, এখানে জুমার নামাজের দুই-তিনটি জামাত পড়ানো হয়। অর্থাৎ আপনি দেরি করে এলেও নামাজ পড়তে পারবেন। আমি ইসলামি চিন্তাবিদ নই। কিন্তু জুমার নামাজের যে একটি নির্দিষ্ট ওয়াক্ত আছে, সেটা আমি নিশ্চিত। এটা তো আর ঈদের নামাজ নয় যে দু-তিনটি জামাত হবে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করার যে জমজমাট আয়োজন শুরু হয়েছে, তা কি বাড়াবাড়ি পযার্য়ে চলে যাচ্ছে না? এখানকার মসজিদ-ব্যবসায়ীরা সেদিন বুঝতে পারবেন, যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট এলাকায় একটির বেশি মসজিদ করা যাবে না মর্মে আইন পাস হবে। হয়তো বাধ্য হয়েই একদিন তারা এমন আইন পাস করাবে।

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বন্ধ না করলে সেই দিন দেখার জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না, যেই দিন বাংলাদেশের অবস্থা হবে আফগানিস্তানের মতো। আর সেটা হলে খালেদা, হাসিনা, এরশাদ কিংবা ইনু, মেনন-কেউই পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ