গোলাম রহমানের চার বছর সরকার-দুদক দুপক্ষই ব্যর্থ | সময় বিচিত্রা
গোলাম রহমানের চার বছর সরকার-দুদক দুপক্ষই ব্যর্থ
ইয়াসমিন আরা
7

একটি সংস্থার প্রধান হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালনের পর নিজেকে অসফল দাবি করতে সাহস লাগে। সাবেক দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সে সাহস দেখিয়েছেন। এ জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন তিনি। প্রশ্ন হলো, তিনি ব্যর্থ না দুদককে এমন কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে যেখানে সফল হওয়ার সুযোগই নেই? গোলাম রহমান প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে দায় নিয়েছেন নিজে। এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, দুর্নীতি দমনে তার আন্তরিক চেষ্টা থাকলেও তিনি ব্যর্থ। কেন ব্যর্থ সেটাই খুঁজে দেখা দরকার। একজন সাংবাদিক হিসেবে এটাই বোঝার চেষ্টা করেছি।

দুর্নীতি দমন কমিশনে আমি নেহাতই নবীন সাংবাদিক। সময়ের হিসাবে মাত্র দেড় বছর এই প্রতিষ্ঠানে আমার যাতায়াত। এই সময়ে হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, প্রাইম ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, পদ্মা সেতুসহ দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রিপোর্ট করেছি। দুদককে নিবিড়ভাবে দেখেছি। সাংবাদিক হিসেবে দেখেছি এই প্রতিষ্ঠানটিও নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা যে শুধু আর্থিক লেনদেনের তা নয়। গোলাম রহমান আর্থিকভাবে অসৎ এমন দাবি তার শত্রুরাও করেন না। কিন্তু হাত-পা বেঁধে কাউকে সাঁতার কাটতে দিলে তিনি যেমন ব্যর্থ হতে বাধ্য, গোলাম রহমানের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। যদিও আর্থিক সততাই সফলতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। সাবেক এই দুদক চেয়ারম্যানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক চাপের কাছে অনেক সময় নত হয়েছেন। সমঝোতা করেছেন। যা সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বা ধারণাগত জায়গায় দুদক সম্পর্কে যে ক্ষত জন্মেছে, তা দূর করার উদ্যোগ নেননি তিনি। কখনো কখনো চাপের মুখেও অটল থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কমিশনের অনেকেই রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করে তাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছে, এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সাংবাদিক হিসেবে এমন অনেক ফাইল-ঘটনার কথা আমি জানি, যেগুলোতে দুদকের ভূমিকা রাখার চমৎকার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ নেয়নি দুদকের একশ্রেণীর কর্মকর্তা। অনেক ঘটনা আছে যা দুদক চেয়ারম্যানকে জানানোই হয়নি। বা এমন এক সময়ে দৃষ্টিতে আনা হয়েছে যখন আর কিছু করার নেই তার। এই বাস্তবতা দুদকের সব শ্রেণীর কর্মকর্তারাই ¯^xKvi করেন। এ ক্ষেত্রে দুদকের ভেতর-বাহির মিলে এমন একটি চক্র তৈরি হয়েছে যারা এ কাজগুলো করেন। তাদের শেল্টার দিয়েছেন বা দিয়ে যাচ্ছেন কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, দায়িত্বের একেবারে শেষ দিকে এসে গোলাম রহমান বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন, যা নিয়ে কমিশনার এবং কয়েকজন মহাপরিচালকের সঙ্গে মতবিরোধের ঘটনাও দুদকে কমবেশি যাতায়াতকারী সবার জানা।

গোলাম রহমানের ব্যর্থতার ¯^xKv‡ivw³‡Z দুদকের অনেক কর্মকর্তাই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। এই কর্মকর্তাদের বক্তব্য হচ্ছে, কমিশন চেয়ারম্যান কোনো ব্যক্তি নন, পদটাই একটি প্রতিষ্ঠান। এখন চেয়ারম্যান যদি মনে করেন তিনি ব্যর্থ, এর অর্থ দাঁড়ায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুদকও ব্যর্থ। এই কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে-প্রাণে দুর্নীতিকে ঘৃণা করেন এবং দুর্নীতি নির্মূলে ঝুঁকি নিয়েছেন। মামলাগুলো ভালোভাবে সামলানোর চেষ্টা করেছেন, তদন্ত করেছেন, দিনরাত খেটে চার্জশিট লিখেছেন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিচের কর্তাদের সততা, নৈতিকতা এবং চেষ্টা আটকে গেছে লাল ফিতেয়। সৎ এসব কর্মকর্তা দুদক ব্যর্থ এটা মানতে চান না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান ব্যর্থতা ¯^xKvi করে নেওয়ার পর, অন্যদের মানা না মানায় কীই বা এসে যায়। সাংবাদিক হিসেবে এই কর্মকর্তা এবং দুদক চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের অবস্থানকেই সঠিক বলে মনে হয়েছে।

বরং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের জন্য গোলাম রহমান একা যত লড়াই করেছেন, অন্যরা তা করেননি। তার সহকর্মীদের মধ্যে এই জায়গায় বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। আবার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টাতে mgš^‡qi অভাব ছিল। প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামেও ঘাটতি ছিল। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের বিদায় অনুষ্ঠানেও প্রসঙ্গটি উঠে আসে। সেখানে একজন কমিশনার সরাসরি সাবেক চেয়ারম্যানের বিপক্ষে অবস্থান নেন। দুদকের বহুল আলোচিত কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্‌পু ওই অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ও ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর বিগত দুই কমিশনের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছে বর্তমান কমিশন। ¯^vaxbfv‡e কাজ করেছে। তাই এ কমিশন ব্যর্থ নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে হয়তো আগের দুই কমিশন ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এতে দুই চেয়ারম্যানের কোনো দোষ নেই। তারা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি বরং রাজনৈতিক কারণে তাদের বিদায় নিতে হয়েছে।

দুদকের এই কমিশনের বক্তব্যের আংশিক সত্য। এই কমিশন অনেক কাজ করেছে বা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এর ফল কী তা দেশবাসী জানে না। গোলাম রহমানের কমিশন আগের কমিশনের অনেক কাজ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেছে। নিজেরা কিছু উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বরং তাদের কাজ নিয়ে আগের মতোই রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে এবং একটা জায়গায় গিয়ে প্রায় সব উদ্যোগ আটকে গেছে। বিদায়বেলায় এই কঠোর সত্যটা উপলব্ধি করেছেন এবং তা স্পষ্ট করেই বলতে চেয়েছেন। যে কারণে নিজের বক্তব্যে অবিচল থেকে বিদায়বেলায় সাংবাদিকদের জানিয়ে যান, অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু দুদকের কর্মকাণ্ডে সমাজ ও রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন সূচিত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। তাই জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক জনপ্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। সাবেক কমিশনার ও বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানও ¯^xKvi করে নেন, দুদকের যতটা সফল হওয়ার কথা ততটা হয়নি। কমিশনকে পঙ্গু করে রাখার ষড়যন্ত্র কম হয়নি। কিন্তু, গোলাম রহমানের দৃঢ় অবস্থানের কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়েছে।

সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায়, মঞ্চের এসব বক্তৃতার মধ্যে হতাশা, রাজনৈতিক বদিচ্ছা দুদককে জনগণের সামনে খেলো করার চেষ্টার বিষয়গুলো স্পষ্ট। সাংবাদিক হিসেবে বরাবরই আমার মনে হয়েছে, ঋণদাতা সংস্থাগুলোর চাপে বিগত বিএনপি-জোট সরকার দুদক প্রতিষ্ঠা করলেও কোনো সরকারই এই প্রতিষ্ঠানকে ¯^vaxbfv‡e কাজ করতে দিতে চায়নি। কাগজে-কলমে দুদক ¯^vqËkvwmZ হলেও, এটি একটি মোড়ক মাত্র। পেছন-সামনের দরজা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের কবজায় রাখতে চেয়েছে সবাই। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদক ব্যাপক ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই সংস্থাটির নখ-দাঁত সব ছেঁটে ফেলে দেয়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও হতাশা ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার ছিল না সাবেক দুদক চেয়ারম্যানের।

মোটা দাগে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত চার বছরে সরকার এবং দুদক উভয়েই দুর্নীতি দমন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি এবং সামাজিক-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হবে এমন উদাহরণ তৈরি করতে পারেনি। ফলে দুর্নীতির প্রকোপ আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রাষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও ইচ্ছা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। পদ্মা সেতুর ঘটনায় আবুল হোসেন, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের পরিচালক, প্রধানমন্ত্রীর ¯^v¯’¨ উপদেষ্টাসহ অনেক ঘটনা সামনে আসার পর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি দুদক। এসব রাজনৈতিক নেতা ও তাদের সহযোগীরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, জনগণ ধারণা-বিশ্বাস করলেও দুদক তাদের সৎ মানুষ হিসেবে সনদ দিয়েছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব-ইন্ধন যদি না-ও থাকে, তার পরও এসব নেতার সততায় বিশ্বাস করে না সাধারণ মানুষ।

সেনাসমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক দুর্নীতির অভিযোগে যারা আটক হয়েছিল, তাদের সম্পর্কে জনগণ ভালো ধারণা পোষণ করে না। বরং বিশ্বাস করে দুর্নীতির মাধ্যমেই তারা অর্থবিত্ত ও বৈভবের মালিক হয়েছেন। কিন্তু ওই সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় আটককৃতদের পরে আর আটকে রাখা যায়নি। বরং তারাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কিংবা আরও প্রভাবশালী হয়েছেন। শুধু বিএনপি বা বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের মামলাগুলো রেখে বাকিদের মামলা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারও একেবারে শুরুতেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, দুর্নীতির বিষয়ে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতায় এলে এ বিষয়ে তারা আগের সরকারগুলোকেই অনুসরণ করবে। শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটেছে। দুদক আইন সংশোধন নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও আইনটিকে আধুনিক করা হয়নি। দুদককে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাই গোলাম রহমান যে ব্যর্থ হবেন, এটা সহজেই অনুমেয় ছিল।

গোলাম রহমান ব্যর্থতার দায়ভার যতই নিজের কাঁধে তুলে নিন, এর আড়ালে যে শেষ পযর্ন্ত সরকারে প্রভাবশালীরাই কলকাঠি নেড়েছে। দুদককে ল্যাংড়া করে রাখার বিষয়ে সরকার-বিরোধী দল উভয়েই এক কাতারে। কারণ, এই রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, দুদক তাদের জন্য কাল সাপ হয়ে উঠতে পারে। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী-নেতাদের দুর্নীতির মামলাগুলো সচল থাকলেও কোন সময় তা সামনে আসবে তা নির্ধারিত হয়েছে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছায়। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি কাজ করবে কীভাবে, সেই প্রশ্ন সম্ভবত দুদকেরই তোলার সময় এসেছে।

দুদক যে আইন ও বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়, দুর্নীতি দমনে এই আইনটিই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইন ও বিধিগুলোকে সংশোধন করে এত দুর্বল করা হয়েছে, দুদক যত চেষ্টাই করুক, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। তবে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দল বা শত্রুকে ঘায়েল করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ¯^ivóª মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ৩২৯টি মামলা প্রত্যাহার করেছে গোলাম রহমান কমিশন। এসব মামলার প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বলে আখ্যা দেয় ¯^ivóª মন্ত্রণালয়। আগামী নির্বাচনে সরকার বদল হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে একই ঘটনা ঘটবে। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন, প্রত্যাহার মামলাগুলোতে লড়াই করার মতো যথেষ্ট পুঁজি ছিল। কিন্তু সরকার না চাওয়ায় দুদকের কিছু করার ছিল না। তবে গোলাম রহমানের কমিশন কোনো মামলা তুলে নিতে সুপারিশ করেনি। এই একটি বিষয়ে চাপ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অটল থেকেছেন গোলাম রহমান।

নখ-দন্তহীন হলেও কাউকে হয়রানি করতে চাইলে দুদক অসীম ক্ষমতাবান। ব্যাপারটি জানেন বলেই হয়তো বিদায় অনুষ্ঠানে গোলাম রহমান কমিশন কর্মকর্তাদের সততা, নিষ্ঠা ও বিবেকের কাছ দায়বদ্ধ থেকে কাজ করার পরামর্শ দেন। তিনি অনুরোধ করে সবাইকে বলেন, নিরপরাধকে অপরাধী আর অপরাধীকে নিরপরাধ বানাবেন না। আপনাদের কাছে এ আমার অনুরোধ। দুদকের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আর্থিক বরাদ্দও যথেষ্ট নয়। এর পরও জনগণ যাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেষ্ট হয়, সে জন্য দুদককেই কাজ করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধের যে বীজ সমাজে রোপিত হয়েছে, অবশ্যই আগামী দিনে এর ফল পাওয়া যাবে। কেননা দেশের বেশির ভাগ মানুষ দুর্নীতিকে ঘৃণা করে। রাতারাতি দুর্নীতি নির্মূল হবে না। তবে সংসদে ঝুলে থাকা আইনটি পাস হলে মামলার জট কাটবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনটি পাস করানোর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করি, শিগগিরই আইনটি পাস করবে সরকার।

দায়িত্ব নেওয়ার পর গোলাম রহমান গত চার বছর মূলত ছয়টি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এক. রাজনৈতিক চাপ সামলানো। দুই. রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুদককে আরও ক্ষমতা দেওয়ার জন্য বোঝানো। তিন. দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। ৪. বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে কাজ করা। ৫. জনগণের আস্থা অর্জন করা। ৬. পদ্মা সেতু, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে কাজ করা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এর কোনোটিতেই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি তিনি।

গত চার বছরে দুদক ছিল দেশে-বিদেশে অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে প্রথমে উড়িয়ে দিয়েছিল দুদক। এমনকি সন্দেহভাজনদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের নির্দোষ বলেও দেয় দুদক। একই ঘটনা ঘটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার ঘটনায়। এতে দুদকের কার্যক্রম এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে দেশে-বিদেশে।

টেবিলের আলোচনায় দুদকের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গটি গোলাম রহমান বারবার জনগণের সামনে তুলে ধরলেও সরকার তাতে কান দেয়নি। অন্যদিকে তাদের অযৌক্তিক-ভৌতিক সব সিদ্ধান্তের জন্য সাবেক এই চেয়ারম্যান কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। ব্যক্তিগত সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও রাজনৈতিক চাপ সামলানোয় তিনি বরাবরই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। এই চাপ বরং তাকে দেশবাসীর কাছে নায়ক হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল, কিন্তু তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন গোলাম রহমান। একই কারণে ব্যর্থ হয়েছে দুদক।

গোলাম রহমান কমিশনে আলোচিত ঘটনা

এই কমিশনের সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলো হলো পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র, হল-মার্ক গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি গ্রুপের মানি লন্ডারিং, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, সুরঞ্জিতের এপিএসের ৭০ লাখ টাকার কেলেঙ্কারি ইত্যাদি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি

দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে গোলাম রহমানের যোগদানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ঘটনার নাম পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র। দুর্নীতি হচ্ছে সন্দেহে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করলে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পায় সরকারকে ঘায়েল করার দারুণ হাতিয়ার। আর দুদকের সামনে ইতিহাস হওয়ার হাতছানি। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক উল্টো পথটা বেছে নেয় দুদক। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করলে দুর্বল দুদক আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। এই কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু দুর্নীতির তদন্তে দুদকের কার্যক্রম যথাযথ হয়নি বলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ আছে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের চাহিদা অনুযায়ী দুদক কাজ করেনি। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ কমিটি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি দুদক। পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র কানাডিয়ান নাগরিক রমেশ শাহর ডায়েরি। দুদকের প্রতিনিধিদল কানাডা গিয়েও সেই ডায়েরি সংগ্রহ করতে পারেনি। মামলার তদন্তে নেই কোনো অগ্রগতি।

 

মন্ত্রী সুরঞ্জিতের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা

রেলের নিয়োগ-বাণিজ্যের ৭৪ লাখ টাকা মন্ত্রীর বাড়িতেই নেওয়া হচ্ছিল বলে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান দাবি করেছিলেন। পরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জোরালোভাবে এই অভিযোগ A¯^xKvi করেন। চারদিককার সমালোচনার মুখে তাকে রেল মন্ত্রণালয় থেকে সরানো হলেও দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করে সরকার এর মাধ্যমে দুদক সুরঞ্জিতের বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ইঙ্গিত পেয়ে যায়। এই ঘটনার তদন্তে প্রথম দিকে দুদকের গা ছাড়া ভূমিকা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়। এমনকি সাবেক রেলমন্ত্রী ও তার এপিএসকে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ ওঠে দুদকের বিরুদ্ধে। সুরঞ্জিতের এপিএসের খোঁজ আজ বের করতে পারেনি দুদক। বরং সুরঞ্জিতকে সৎ মানুষের সনদ দিয়ে নিজেদের সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে যায় গোলাম রহমান কমিশন। এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয় দুদক রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে কত তুচ্ছ।

হল-মার্ক কেলেঙ্কারি

গোলাম রহমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও একটি আলোচিত বিষয় ছিল সোনালী ব্যাংক থেকে হল-মার্কসহ পাঁচটি কোম্পানির প্রায় তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। এই ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান দল প্রাথমিক অনুসন্ধানে ফান্ডেড এক হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে গত বছরের ৪ অক্টোবর হল-মার্ক ও সোনালী ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তবে আট মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি দুদক।

ডেসটিনি গ্রুপের মানি লন্ডারিং

বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনির দুটি প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মালটিপারপাস কো-অপারেটিভ ও ট্রি-প্লান্টেশন লিমিটেডের তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গত বছরের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় দুটি মামলা করে দুদক। এরপর প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি দুদকের তদন্ত কমিটি। অবশ্য প্রথম দিকে এই মামলা নিয়ে যতটা সিরিয়াস দেখা গিয়েছিল তাদের, পরে আর তা দেখা যায়নি। এমনও অভিযোগ ওঠে কোনো না কোনোভাবে দুদককে ম্যানেজ করে ডেসটিনি।

বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি

বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। তবে বর্তমান চেয়ারম্যানের সময়ে এর প্রতিবেদন সম্পন্ন হবে না বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় পাঁচ ব্যাংকের ৬০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। গত ২৬ ফেব্রম্নয়ারি অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে এই ঘটনায় গঠিত অনুসন্ধান কমিটি।

আইনি জটিলতায় রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির অনুসন্ধান

সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আবদুল খালেক ও মা মরজিনা বেগমের অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান আইনি জটিলতায় থেমে আছে। সোহেল রানা ও তার বাবা জেলে থাকায় সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ করতে পারেনি দুদক।

যোগ্যতা নয়, চেয়ারম্যান নিয়োগে সরকারের পছন্দই শেষ কথা

তদন্তের উচ্চতর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, নেই দুর্নীতিবিষয়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দুর্নীতিসংক্রান্ত কাজকর্ম খতিয়ে দেখার প্রমাণিত যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয় কমিশন চেয়ারম্যান হিসেবে। ফলে উপযুক্ত ব্যক্তিরা এই পদে আসতে পারে না। তা ছাড়া ব্যক্তিগত সততাই মানুষের একমাত্র যোগ্যতা হতে পারে না, এ বিষয়টিকেও বিবেচনায় নেওয়া হয় না। সরকারগুলো সব সময় এই পদটিতে নিজেদের পছন্দমতো লোক নিয়োগ দিতে পছন্দ করে এবং তেমন নিয়োগই হয়ে আসছে। বদিউজ্জামানের জন্য আমার শুভকামনা। কিন্তু তিনিই কতটা কী করতে পারবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তিনি চাইলে জাতির সামনে দুদককে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কেননা বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতির ঘটনাগুলো নিয়ে কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার ইচ্ছের ওপর নির্ভর করছে দুদক কি নখ-দন্তহীন বাঘ হবে, না দুর্নীতির গ্রাস থেকে জনগণকে রক্ষা করতে সত্যিকারের সিংহ হবে।

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোট তিনজন। প্রথম দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি সুলতানউদ্দিন। বাকি দুজন চেয়ারম্যান হলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাসান মাসউদ চৌধুরী ও গোলাম রহমান।

দুদকের চেয়ারম্যান বাছাইয়ে দুর্নীতি তদন্তে যথাযথ, বিশেষ অভিজ্ঞতা বা প্রমাণিত যোগ্যতা আছে কি না, তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক নয়। ফলে, দুর্নীতি তদন্তে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের চাইতে অন্যান্য বিবেচনা প্রায়শ প্রধান হয়ে ওঠে। গোলাম রহমান দুদক চেয়ারম্যান নিয়োজিত হওয়ার পর সমালোচনা হয়েছিল, তাকে দলীয় বিবেচনায় দুদক চেয়ারম্যান নিবার্চিত করা হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তাদের সততা প্রশ্নবিদ্ধ

নানা (দুদক) কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি, মামলার গোপন রেকর্ড সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, হয়রানির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জন, তথ্য গোপন করে অভিযোগ নথিভুক্ত করা, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা দাবি এবং ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আসছে নিয়মিত। প্রমাণিত হওয়ায় গত সাড়ে ৪ বছরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে ৮ জনকে। অপসারণ করা হয়েছে ৯ জনকে। বেতনক্রমের নিচের স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ৮ জনকে। ২০০৯ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে লঘু দণ্ড দেওয়া হয়েছে ২১ জনকে। বিভাগীয়ভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ২৯ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগ। সমপ্রতি গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। দুদক পরিচালক মেজর আশিষ সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে। কর্মকর্তাদের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই দুদক চেয়ারম্যানকে অবগত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনি সহায়তা চাওয়া হয়েছে র্যাব, পুলিশ ও সিআইডির।

কমিশনের একটি উচ্চ পযার্য়ের সূত্র জানায়, মামলার আসামি ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে দুদকের কতিপয় কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। দুদকের নিজস্ব কোনো কর্মকর্তাকে দিয়ে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে অনুসন্ধান বা করানো হলে তারা ম্যানেজ হয়ে যায়। এ কারণে দুদক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানে বাইরে থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

দুদক পরিচালক মেজর আশিষ সরকার বলেন, দুদকের মূল কাজ দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ করা। দুদকের কর্মকর্তারাই যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরে তাহলে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাই ঘর থেকে দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বেশ কিছুদিন ধরেই চলমান। ইতোমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নজরদারিতে রেখে অনুসন্ধান চলছে অনেকের বিরুদ্ধে। তদন্তও চলছে কারও কারও বিরুদ্ধে। তবে এ মুহূর্তে সংখ্যা বা নাম বলা ঠিক হবে না।

অপ্রতুল বাজেট

চলতি অর্থবছর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি টাকা। ঘোষিত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে দুদকের জন্য একই বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও খাতভিত্তিক অনুন্নয়ন ব্যয়ের বিবরণ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছর দুদকের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩২ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছর বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৩ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে আকার দাঁড়ায় ৩৭ কোটি টাকায়।

গত কয়েক বছরে দুদক হল-মার্ক, ডেসটিনি ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের মতো বড় আকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট বরাদ্দ না থাকায় দুদকের কর্মকর্তারা তাদের কাজ সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। অপরাধীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা দেখাতে পারলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দুদকের কর্মকর্তারা এসব ক্ষেত্রে অজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে বাজেটও অপ্রতুল।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সরকার দুর্নীতি দমনে সত্যিকারভাবে আন্তরিক হলে এ সংস্থার জন্য যৌক্তিক বরাদ্দ রাখা হতো। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি এবারের বাজেটে। অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ রেখে দুর্নীতি দমন কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমনে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

দেশে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে দুর্নীতি বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। অথচ দুদক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের এ বিষয় নির্মূল করার জন্য কাজ করছে না। সরকার বেসরকারি খাতের দুর্নীতি দমনে বরাবরই নিশ্চুপ। দুদক আইন পাস হলে বেসরকারি খাতের দুর্নীতি বন্ধে দুদকও কাজ করতে পারবে। দুদক আইন পাস এখন সময়ের দাবি। কেবল দুর্নীতির জন্য এ দেশ পেছন-পথের পথযাত্রী। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সাংবাদিক হিসেবে এখনো প্রতিদিন দুদকে যেতে হয়। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ হয়। সবার মধ্যে একটু গা-ছাড়া ভাব। নতুন চেয়ারম্যান কি ডিরেকশনে কাজ করেন সেদিকে তাকিয়ে আছেন সবাই। বাংলাদেশ বিপুল সম্ভাবনার দেশ। শুধু দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর জিডিপির দুই শতাংশ অপচয় হয় বা হিসাবের বাইরে চলে যায়। এরচেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে। সাধারণ মানুষের মতো আমাদেরও আকাঙ্ক্ষা, দুদক একসময় নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়াবে। সবাই আপস করে না, কেউ কেউ করে। সরকারকে বোঝাতে পারানোটাও একজন নেতার অন্যতম যোগ্যতা। গোলাম রহমান এবং সরকার যেখানে ব্যর্থ, ঠিক সেখান থেকে কাজ শুরু করবেন বদিউজ্জামান, এমন প্রত্যাশা আমার। জনগণকে আস্থায় নিয়ে কাজ করলে যতই বাধাই আসুক সফল হবেনই। আর পূবর্সূরিদের পথ অনুসরণ করলে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন। বর্তমান চেয়ারম্যান কোন পথ বেছে নেন, তা দেখার জন্য তাকে অন্তত বছর খানেক সময় দিতে চাই আমি। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে যতটা জানি, তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মাথা নিচু করে বাঁচার চেয়ে মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়াকে গৌরবের মনে করেন। ফলে বদিউজ্জামান সফল হোক চোখ বুজে শুধু এই কামনাই করছি।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ