রাজনীতির প্রতি নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ মহিউদ্দিন খান মোহন
Somoy Bichitra

বলিউডের একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘নায়ক’। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে নির্মিত ওই ছবিটি কেব্‌ল টিভির কল্যাণে আমাদের দেশের অনেকেই দেখেছেন। ছবিতে নায়ক অনিল কাপুর যখন উপনিবার্চনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রাজি হচ্ছিল না, তখন পরেশ রাওয়াল তাকে উদ্দেশ্য করে যা বলেছিল, তার বাংলা তরজমা হলো, সব লোক ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, ডাক্তার হতে চায় কিন্তু কেউ নেতা হতে চায় না। ঠিক আছে, যাও, চাকরি-বাকরি করো, বিয়ে করো আর প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠ করে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে স্ত্রীকে বলো, ডার্লিং, পলিটিঙ্ দেশটাকে শেষ করে দিল! বলাই বাহুল্য, অনিল কাপুরকে রাজনীতিতে নামতে উদ্বুদ্ধ করতেই পরেশ রাওয়াল ওই ডায়লগ দিয়েছিল।

শুধু মুম্বাইর ছবির নায়ক কেন। আমাদের দেশেও কি এমন উদাহরণ নেই? প্রতি বছর লাখ-লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি, এইচএসসি পাস করছে। মেধাবীদের অনেকের সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে ব্যাংকার কিংবা ব্যবসায়ী হতে। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সিভিল সার্ভিস ক্যাডার হওয়ার আগ্রহও ব্যক্ত করে কেউ কেউ। কিন্তু একজনও বলে না, ‘আমি রাজনীতিক হতে চাই।’ বরং রাজনীতি-বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সবাই নেতিবাচক মনোভাবই ব্যক্ত করে থাকে। যেন রাজনীতি একটি অস্পৃশ্য বিষয়, ভ্রান্ত পথ।

নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে এই নেতিবাচক মনোভাব কেন তৈরি হয়েছে, সেটা বোধ করি ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না। রাজনীতির নামে আমাদের দেশে যা ঘটছে, তাতে আগামী প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কেননা, রাজনীতির মধ্যে তারা ভালো কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বলা যায়, আমাদের রাজনীতিবিদেরা তাদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করতে পারছেন না। কেন পারছেন না, সেটা বুঝতেও কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

রাজনীতি দেশ ও মানবকল্যাণে ব্রতী হওয়ার সবচেয়ে বড় ও গণমুখী মাধ্যম। কেউ যদি চিন্তা করে যে, সে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর কিছু করবে, তাহলে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগের মাধ্যমেই সে তা সার্থকভাবে করতে পারবে। মানবকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরাই রাজনীতির প্রাণপুরুষ হতে পারেন। আমরা যদি আমাদের রাজনীতির আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, আপন আলোর বিচ্ছুরণের মাধ্যমে তারা তাদের চারপাশ আলোকিত করেছেন। সে আলোর উদ্ভাসিত পথে এগিয়ে এসেছে পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরা।

রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ। এখানে নেতিবাচক কিছু নেই। কেননা, একজন রাজনীতিক তখনই দেশ ও জাতির কল্যাণে অধিকতর অবদান রাখতে পারবেন, যখন তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকারী হবেন। কিন্তু আমরা যেটা দেখছি তা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনীতিকেরা দেশ ও জাতির কথা ভুলে যান। পরিবর্তে স্বজন আর স্বদলীয় লোকদের ভাগ্যোন্নয়নে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। ফলে, তারা জনগণের আস্থা হারান।

নতুন প্রজন্ম কেন রাজনীতি বিমুখ? এর উত্তরও সহজ। আমাদের বর্তমান রাজনীতিকেরা তাদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো নজির সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকৃত রাজনীতিক বা রাজনৈতিক নেতার অভাব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। টাকাওয়ালারা রাজনীতিকে কিনে নিচ্ছে। টাকাপয়সা ব্যয় করলেই নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া যায়, এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতাও হওয়া যায়। এ জন্য রাজনীতি-চর্চা কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজন নেই। এমনও নজির আছে পাঁচ-সাতজন গ্র্যাজুয়েট প্রার্থীকে পেছনে ফেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি, এমন ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তার একমাত্র যোগ্যতা বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হওয়া। এটা ঠিক, কম লেখাপড়া জানা লোকেরাও শিক্ষিত হতে পারেন; অন্তত রাজনীতির ক্ষেত্রে। যারা সারা জীবন রাজনীতি চর্চা করেন, তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলেও ক্ষতি নেই। কারণ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই তাদের এ ক্ষেত্রে ‘স্বশিক্ষিত’ করে তোলে। কিন্তু যে লোকটি কখনো রাজনীতি করল না, রাজনীতি-সম্পর্কীয় কোনো পড়াশোনাও যার নেই, যে হয় কাপড় বিক্রি করেছে কিংবা মুদি দোকান করেছে, তাকে যদি হঠাৎ ‘নেতা’ বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষিত, সচেতন এবং রাজনীতিতে সম্পৃক্তরা হতাশ হবেন না কেন?

আমাদের দেশে একসময় মেধাবী ছাত্ররাই রাজনীতিতে আসত। আমরা ছেলেবেলায় ছাত্রনেতা হিসেবে যাদের নাম শুনেছি, বড় হয়ে তাদের জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের আসনে দেখেছি। তাদের মধ্যে আদর্শবান এবং আদর্শচ্যুত উভয় ধরনের নেতাই রয়েছেন। এখানে নামোল্লেখ করে কাউকে ছোট করার ইচ্ছে আমার নেই। এমন অনেক ‘আদর্শবান’ নেতার নাম আমি জানি, যারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিভ্রান্ত হয়েছেন, আদর্শচ্যুত হয়েছেন; এমনকি দুর্নীতিতেও নিমজ্জিত হয়েছেন। তাদের অধঃপতন দেখেও নতুন প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে।

তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু কেন তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, তা তলিয়ে দেখা হচ্ছে না। কেউ কেউ কারণ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হলেও সমাধান খুঁজে পান না। এটা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে, আমাদের বর্তমান রাজনীতিকেরা মেধাবী ও সৎ তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা সে পরিবেশ তৈরি কিংবা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যে পরিবেশ দেখলে একজন ‘ভালো ছেলে’ রাজনীতির পথে চলতে শুরু করতে পারে।

কেউ হয়তো বলতে পারেন, মেধাবীরা রাজনীতিতে আসছে না বলে কি রাজনীতির অঙ্গনে লোকের অভাব হচ্ছে? কোনো দল বা তার অঙ্গসংগঠনে নেতা-কর্মীর কি কোনো অভাব আছে? না, সে অভাব যে নেই এটা অস্বীকার করা যাবে না। বরং ভিড়টা একটু বেশিই বলা যায়। তাহলে কারা ভিড় জমাচ্ছে সেখানে? লক্ষ করলেই দেখা যাবে, ওই ভিড়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মুখ খুব একটা নেই। যারা আছে, তাদের একটি বড় অংশ নানা দুষ্কর্মের কারণে বিখ্যাত বা কুখ্যাত। ছাত্রসংগঠনগুলোতে এখন অছাত্রদের আধিপত্য। এ নিয়ে কত লেখালেখি হলো, সমালোচনা-আলোচনা হলো। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন নেই। কয়েক মাস আগে একটি দলের মাঝারি পর্যায়ের একজন নেতা একটি ঘটনার কথা বললেন। তার এলাকার এক ছেলে এসেছিল তাদের ছাত্রসংগঠনে সম্পৃক্ত হতে। ছেলেটির দাবি ছিল ছাত্রসংগঠনটির উপজেলা কমিটিতে একটি পদ পাওয়ার। ভদ্রলোক ছেলেটিকে প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কি ছাত্র? সে সগর্বে বলেছিল, জি, আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছি। ভদ্রলোক আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি কি বিয়ে করেছ? এবার ছেলেটি লজ্জা পেল। বলল, কী বলেন চাচা! লেখা পড়াই তো শেষ হয়নি। ভদ্রলোক ছেলেটিকে বললেন, ‘না, তুমি ছাত্রনেতা হতে পারবে না। কারণ ছাত্রনেতা হতে হলে তোমাকে অছাত্র হতে হবে এবং বিবাহিত হতে হবে। যদি দুয়েকটি সন্তান থাকে তাহলে সেটা হবে বাড়তি যোগ্যতা।’ ঠাট্টাচ্ছলে কথাগুলো বললেও ভদ্রলোক যে তার কথার দ্বারা নির্মম সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, সেটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না। দেশের ছাত্রসংগঠনগুলোর দিকে তাকালেই এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। ভদ্রলোক জানালেন, তার পরও তিনি ছেলেটির জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও জানালেন, তার উপজেলায় তাদের ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছে এমন একটি ছেলে, বর্তমানে যার সাথে শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। ক্লাস সিঙ্ পর্যন্ত পড়েই সে ছাত্রজীবনের ইতি ঘটিয়েছে!

অছাত্ররা কেন ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে থাকার সুযোগ পাচ্ছে, এ প্রশ্ন অনেকেরই। কেউ কেউ অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন যে, অভিভাবক সংগঠনের নেতারাই তাদের ব্যক্তিস্বার্থে অছাত্রদের ‘ছাত্রনেতা’ বানিয়ে রাখেন। কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়। অভিভাবক সংগঠনের নেতাদের ইচ্ছা বা পৃষ্ঠপোষকতা এ ক্ষেত্রে একটি কারণ এটা ঠিক। তবে, সিস্টেম এর মূল কারণ।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলি। পাকিস্তান আমলে বা স্বাধীনতার পর পর ছাত্রসংগঠনগুলোর সর্বনিম্ন ইউনিট গঠিত হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-ভিত্তিক। অর্থাৎ একটি থানায় যদি দুটি কলেজ থাকত, তাহলে কলেজ শাখার সদস্যদের সমন্বয়ে থানা শাখা গঠিত হতো। আর কলেজ শাখার সদস্য হতে হলে সংশ্লিষ্ট কলেজের ছাত্র হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। এভাবে মহকুমা, জেলা, সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটি হতো। কিন্তু এখন ছাত্রসংগঠনগুলোর ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়েরও শাখা কমিটি রয়েছে। ফলে অতি সহজেই অছাত্র ও ভবঘুরেরা ছাত্রসংগঠনের নেতা হতে পারছে। ছাত্রসংগঠনগুলোকে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-ভিত্তিক করা যায়, তাহলেই অছাত্র আর পুত্র-কন্যার পিতাদের হাত থেকে ওগুলোকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

রাজনীতির কথা উঠলেই একশ্রেণীর মানুষ নাক সিটকে বলেন, ‘ভালো লোকেরা রাজনীতি করে না।’ এই অর্থহীন উন্নাসিকতা আমাদের রাজনৈতিক জগৎকে খারাপ মানুষের সমাবেশে পরিণত করেছে। ভালোরা আসছে না বা আসতে চায় না বলেই তাদের স্থানটা দখল করে নিচ্ছে খারাপরা। আর নিরীহ জনসাধারণ ভোট দেওয়ার সময় দুটো খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপটিকেই বেছে নিচ্ছে।

অনেকেই বলেন, আমরা খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সামনে আরও খারাপ সময় আসছে। আর এই খারাপের জন্য সবাই দোষ চাপান রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ওপর। হ্যাঁ, এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের দায় থাকলেও রাজনীতির কোনো দায় আছে বলে মনে হয় না। রাজনীতি তো একটা বাহন। এটার চালক বা চালকেরা যেভাবে যে পথে এটাকে চালাবে, এটা সে পথেই যাবে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, আমাদের দেশে যেভাবে রাজনীতি এগোচ্ছে তাতে নিকট ভবিষ্যতে ইতিবাচক কোনো ফল আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নতুন প্রজন্ম যেভাবে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তাতে রাজনীতিতে মেধাশূন্যতা আরও প্রকট হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। মেধাবী, সচেতন আর সৎ ছেলেরা রাজনীতিকে পরিত্যাজ্য জ্ঞান করে এর থেকে যদি দূরে সরে থাকে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

কোনো শূন্যস্থানই কখনো অপূর্ণ থাকে না। নেতিবাচক ধারণার ফলে মেধাবী ও সৎ তরুণদের রাজনীতি পরিত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থানও পূরণ হবে অসৎ আর মেধাহীনদের দ্বারা। যার ফলাফল হবে ভয়াবহ। তাই দেশ এবং জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই মেধাবী ও সৎ তরুণদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সে জন্য রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করে একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব দেশের শীর্ষ রাজনীতিকদেরই।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ