অটোয়া ভ্রমণ ও টিউলিপ উৎসব | সময় বিচিত্রা
অটোয়া ভ্রমণ ও টিউলিপ উৎসব
Somoy Bichitra
desh3

কানাডার রাজধানী অটোয়া অন্টারিও প্রদেশের অবস্থান দেশটির দক্ষিণ-পূব অঞ্চলে। শহরটির কোল ঘেঁষে প্রবাহিত হয়েছে অটোয়া, গ্যাটিনু ও রিদু নামের তিনটি নদী। গত ৪ মে সিনোরামা ট্র্যাভেলসের উদ্যোগে আয়োজিত হয় গাইডেড ট্যুর ‘টিউলিপ উৎসব ২০১৩’। আর সেই ট্যুর, আমার জন্য সুযোগ করে দেয় কানাডার রাজধানী অটোয়া দেখার। সকাল সাতটায় চায়না টাউন নামে খ্যাত দো লা গস্তিয়াখ স্ট্রিট থেকে আমরা পর পর ছয়টি বাসে রওনা হলাম কিউবেক প্রদেশের মন্ট্রিয়াল শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অটোয়ার টিউলিপ উৎসবে যোগ দিতে। প্রতিটি বাসে প্রায় ৫০ জন করে যাত্রী। আর আমাদের গ্রুপে তখন সদস্যসংখ্যা আট। আমি, আমার স্বামী পার্থ, ওর কলিগ সাইদা, সারা, এডলফ, লিনা, লুকাস ও মার্থা। এই ট্রিপের উদ্যোক্তা এডলফ চায়নিজ নাগরিক। তাই আমাদের এমন একটি বাসে বসিয়েছিলেন, যার বেশির ভাগ যাত্রীই ছিল চায়নিজ। আমাদের বাসের গাইড তার সুললিত কণ্ঠে যাত্রার বর্ণনা করছিল মান্দারিন ভাষায়; যার এক বর্ণও আমি বুঝতে পারিনি। তাই জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম আমার সাথে সাথে এগিয়ে চলা চারপাশের আকাশ, নদী, মাঠ, সবুজ প্রান্তর আর পিচঢালা পথ। পথে লিনা তার নিজের হাতে তৈরি করা কেক পরিবেশন করল গ্রুপের সবাইকে। ঠিক দুই ঘণ্টা পরই আমরা পৌঁছে গেলাম অটোয়া নগরে। প্রথমেই আমরা গেলাম ওয়েলিংটন স্ট্রিটে অবস্থিত কানাডার পার্লামেন্ট হিলে, সবকিছু ঘুরে দেখার জন্য সময় বাধা ছিল এক ঘণ্টা। পার্লামেন্ট হিলের পুরো এলাকা চতুর্ভুজাকৃতি, ভবনগুলো গোথিক রিভাইভাল আকৃতির এবং ইস্ট, ওয়েস্ট ও সেন্টার ব্লকে বিভক্ত। সেন্টার ব্লকে রয়েছে সিনেট ও কমনস চেম্বার, লাইব্রেরি ও পিস টাওয়ার। ইস্ট ও ওয়েস্ট ব্লকে রয়েছে মন্ত্রী ও সিনেটরের অফিস। বহিরাংশ ইংলিশ গার্ডেন স্টাইলে সজ্জিত, যাতে ক্রমান্বয়ে চোখে পড়ে বিখ্যাত বিভিন্ন ব্যক্তির স্ট্যাচু। এদের মধ্যে কুইন ভিক্টোরিয়া, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, জর্জ ব্রাউন, আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি অন্যতম। উত্তর-পশ্চিম অংশে রয়েছে সামার গাজেবো নামে একটি সুদৃশ্য বিশ্রামাগার। গল্প করতে করতে আমরা পথ চলছিলাম, লিনা ছবি তুলছিল অবিরত, এভাবেই এক ঘণ্টা পার করে আমরা পৌঁছালাম কানাডার গভর্নর জেনারেল হাউস রিদু হলে। ভবনটিতে রয়েছে প্রধান প্রবেশপথ, কানাডিয়ান রুম, টেন্ট রুম, বলরুম, ডাইনিং রুম, রিসিপশন রুম, গ্যালারি ও গ্রিন হাউস। বাইরের ৮৮ একর এলাকাজুড়ে বিশাল উদ্যান যেখানে তৃণ, গুল্ম ও বৃক্ষজাতীয় গাছে পূর্ণ। দেখলাম, অসংখ্য ম্যাপল গাছ (যে গাছের পাতা কানাডার জাতীয় পতাকায় শোভিত), যার অনেক গাছই বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির দ্বারা বোনা; যাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নেতানেত্রী কিংবা কোনো পরিবেশ-সম্পর্কিত সংগঠন। প্রতিটি গাছের পাশে একটি পাথরের প্লেটে এসব গাছ কবে, কার দ্বারা রোপিত হয়েছে তার নাম, দেশ আর তারিখ লেখা। নির্ধারিত এক ঘণ্টা পার করে হোটেলে লাঞ্চ সেরে আমরা কানাডিয়ান মিউজিয়াম অব সিভিলাইজেশনে পৌঁছালাম। কানাডার ২০ হাজার বছরের মানবেতিহাস ও সভ্যতার প্রমাণস্বরূপ এই মিউজিয়াম মূলত অটোয়া নদীর পাড়ে কানাডার পার্লামেন্ট হিলের ঠিক উল্টো দিকে অটোয়া শহরের পাশের নগর গ্যাটিনুতে অবস্থিত। মিউজিয়ামটিতে চারটি প্রধান একজিবিশন হল রয়েছে : দ্য গ্র্যান্ড হল, দ্য ফার্স্ট পিপুলস হল, দ্য কানাডিয়ান হল এবং ফেস টু ফেস : দ্য কানাডিয়ান পারসনালিটিজ হল। গ্র্যান্ড হলের কাঠামো অটোয়া নদী ও পার্লামেন্ট হিলের নৈসর্গিক দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করার মানসে ১১২ মিটার প্রশস্ত ও ১৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট কাচের প্রাচীর দিয়ে গঠিত এবং এর অপর পাশের দেয়ালে অরণ্যভূমির আলোকচিত্র সজ্জিত, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রঙিন আলোকচিত্র হিসেবে বিবেচিত। ফার্স্ট পিপুলস হলে কানাডার আদিবাসী মানুষের মূল বাসস্থান থেকে বর্তমানের অবস্থানে বিবর্তনের কাহিনি বিবৃত হয়েছে। কানাডিয়ান হলে কানাডার বিভিন্ন উপকূলে অভিবাসনের শুরু থেকে তার বিস্তারের ধারা বর্ণিত হয়েছে। কানাডিয়ান পারসনালিটিজ হল কানাডার লেখক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, অভিযাত্রী, কর্মী এবং সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের মূর্তি দিয়ে সজ্জিত। মিউজিয়ামের আশপাশে ঘুরে দেখার পর আমরা সবাই আলেকজান্দ্রা ব্রিজ পায়ে হেঁটে পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মিউজিয়ামের ঠিক পাশেই অটোয়া নদীর ওপরেই আন্তপ্রাদেশিক এই আলেকজান্দ্রা ব্রিজ কানাডার কিউবেক ও অন্টারিও প্রদেশের অটোয়া ও গ্যাটিনু শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। ৫৬৩ মিটার দীর্ঘ এই সেতু পার হওয়ার সময় দেখলাম, ব্রিজের স্টিলের গায়ে একটু পর পর কানাডার সব প্রদেশের নাম লেখা। এরপর আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল রিদু ক্যানাল বরাবর ডাওস লেকের কমিশনার্স পার্ক, যেখানে প্রতিবছর আয়োজিত হয় কানাডার টিউলিপ উৎসব। প্রতিবছর এখানে গড়ে প্রায় তিন লক্ষ টিউলিপ রোপিত হয় আর প্রায় পাঁচ লক্ষ দর্শনার্থী আসে। দেখলাম, হরেক রকমের টিউলিপ ফুল, লাল, কমলা, গোলাপি, হলুদ, বেগুনি, সাদা। দেশ-বিদেশের অসংখ্য লোক আর তাদের ক্যামেরার লেন্সে ভেসে উঠল বাহারি রঙের টিউলিপ। যদিও আমি আমাদের দেশের উৎসব পালনের মতো সেই হই-হট্টগোলের আমেজ পেলাম না, তবু শান্ত ও নীরব আমোদের এই নব ধারায় নিজেকে রাঙিয়ে নিলাম। লেকের ওপরে চোখে পড়ল কিছু রেস্তোরাঁও। পাশের মনোরম রিদু ক্যানাল আমার বেশ ভালো লাগল। রিদু ক্যানালই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আইস স্কেটিং রিংক, যার দৈর্ঘ্য ৭.৮ কিলোমিটার, শুরু হয় পার্লামেন্ট হিল থেকে ও শেষ ডাওস লেকে। লেকের পাশে বসে আমরা আটজন কাটালাম অনেকটা সময়। বিকাল পাঁচটায় আমাদের ফেরার পালা। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার যাত্রা শেষে ফিরে এলাম মন্ট্রিয়ালে। মনে মনে শুধু গুনগুন করছিলাম কয়েকটা লাইন-’জানি না কবে শেষ হবে এ পথ চলা, ভাবিনি যেমন শুরুতে, ভাববো না শেষ প্রান্তে, মাঝের সময় কেটে যাক উদ্‌ভ্রান্ত, যেথা নিয়ে যায় উন্মুক্ত এই মন ভেলা’।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ