বেসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা সে-রাম জনতুষ্টির চেষ্টা | সময় বিচিত্রা
বেসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা সে-রাম জনতুষ্টির চেষ্টা
সাইফুল হাসান
ba1

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বর্তমান সরকারের এবং নিজের জীবনের শেষ বাজেট ঘোষণা করেছেন গত ৬ জুন। সংসদ-বিমুখ বিরোধী দল কোনো কারণ ছাড়াই এদিন সংসদে যায়নি। পাশাপাশি নেতিবাচক রাজনীতির বরপুত্র হিসেবে যথারীতি মহাজোট সরকারের এই বাজেট প্রত্যাখ্যানও করেছে তারা। একই ঘটনা আওয়ামী লীগও বিরোধী দলে থাকাকালীন করেছিল। অবশ্য ঘোষণার আগে থেকেই বাজেট নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি ছাড়া বাকি প্রায় সব পক্ষই যার যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বাজেট নিয়ে মূল্যায়ন করেছে। তবে সবাই একটি ক্ষেত্রে একমত, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সরকারের সেই সক্ষমতা নেই। নিবার্চনের বছর বলে কোনো সম্ভাবনাই নেই।

২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার সরকারি আয়-ব্যয়ের খতিয়ানকে কেউ কেউ অশোভনীয় আশাবাদ, ব্যাধিগ্রস্ত অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা, ঋণ করে ঘি খাওয়া, উচ্চাভিলাষী এবং নিবার্চন বিলাসের বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এখন পযর্ন্ত সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ঘাটতি ও বাস্তবায়ন-সক্ষমতা নিয়ে। ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবৎ ঘোষিত সব বাজেটই ছিল ঘাটতির। আর বাজেটের আকার যা-ই হোক তা বাস্তবায়নের দক্ষতা যে বাংলাদেশ অর্জন করতে পারেনি, এটি বহু বছর ধরে সবজনবিদিত। ফলে, এই সমালোচনায় নতুনত্ব নেই, দিকনির্দেশনাও নেই। তা ছাড়া এসব সমালোচনা এখন আর সরকারগুলোর গায়েও মাখে না।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব ও করবহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আয় করতে হবে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের হিসাবে নিট ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলেও যা ৫ শতাংশের নিচে। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। কোনো কারণে বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না মিললে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতই হবে ঘাটতি অর্থায়নের একমাত্র বিকল্প। চলতি অর্থবছরেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটাই সবচেয়ে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের জায়গা।

গত তিনটি বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও কোনোবারই তা অর্জন করা যায়নি। রাজনৈতিক সংকট, প্রতিকূল বিনিয়োগ ও বিশ্ব পরিস্থিতি সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রী আশা করেন, আগামী অর্থবছরে জাতীয় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি থাকবে ৭ শতাংশের ভেতরে। এই দুটি লক্ষ্যমাত্রাকেই অর্থনীতিবিদেরা ‘পরাবাস্তব ও অদূরদর্শী’ বলে বাতিল করে দিয়েছেন। তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী ও তার সহকর্মীরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব এবং বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য। যদিও বাস্তবতা, সরকারি বিভাগগুলোর হিসাব, বিশ্ব সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস এই ধারণার পুরোপুরি বিপরীত।

মুহিতের ঘোষিত শেষ বাজেটটি তিনটি সরকার বাস্তবায়ন করবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বর্তমান সরকারের এবং নিজের জীবনের শেষ বাজেট ঘোষণা করেছেন গত ৬ জুন। সংসদ-বিমুখ বিরোধী দল কোনো কারণ ছাড়াই এদিন সংসদে যায়নি। পাশাপাশি নেতিবাচক রাজনীতির বরপুত্র হিসেবে যথারীতি মহাজোট সরকারের এই বাজেট প্রত্যাখ্যানও করেছে তারা। একই ঘটনা আওয়ামী লীগও বিরোধী দলে থাকাকালীন করেছিল। অবশ্য ঘোষণার আগে থেকেই বাজেট নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি ছাড়া বাকি প্রায় সব পক্ষই যার যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বাজেট নিয়ে মূল্যায়ন করেছে। তবে সবাই একটি ক্ষেত্রে একমত, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সরকারের সেই সক্ষমতা নেই। নিবার্চনের বছর বলে কোনো সম্ভাবনাই নেই।

২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার সরকারি আয়-ব্যয়ের খতিয়ানকে কেউ কেউ অশোভনীয় আশাবাদ, ব্যাধিগ্রস্ত অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা, ঋণ করে ঘি খাওয়া, উচ্চাভিলাষী এবং নিবার্চনবিলাসের বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ঘাটতি ও বাস্তবায়ন-সক্ষমতা নিয়ে। ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবৎ ঘোষিত সব বাজেটই ছিল ঘাটতির। আর বাজেটের আকার যা-ই হোক তা বাস্তবায়নের দক্ষতা যে বাংলাদেশ অর্জন করতে পারেনি, এটি বহু বছর ধরে সজনবিদিত। ফলে, এই সমালোচনায় নতুনত্ব নেই, দিকনির্দেশনাও নেই। তা ছাড়া এসব সমালোচনা এখন আর সরকারগুলোর গায়েও মাখে না।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব ও করবহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আয় করতে হবে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের হিসাবে নিট ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলেও যা ৫ শতাংশের নিচে। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। কোনো কারণে বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না মিললে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতই হবে ঘাটতি অর্থায়নের একমাত্র বিকল্প। চলতি অর্থবছরেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটাই সবচেয়ে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের জায়গা।

গত তিনটি বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও কোনোবারই তা অর্জন করা যায়নি। রাজনৈতিক সংকট, প্রতিকূল বিনিয়োগ ও বিশ্ব পরিস্থিতি সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রী আশা করেন, আগামী অর্থবছরে জাতীয় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি থাকবে ৭ শতাংশের ভেতরে। এই দুটি লক্ষ্যমাত্রাকেই অর্থনীতিবিদেরা ‘পরাবাস্তব ও অদূরদর্শী’ বলে বাতিল করে দিয়েছেন। তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী ও তার সহকর্মীরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব এবং বাজেট বাস্ত্মবায়নযোগ্য। যদিও বাস্তবতা, সরকারি বিভাগগুলোর হিসাব, বিশ্ব সংস্থাগুলোর পূবার্ভাস এই ধারণার পুরোপুরি বিপরীত।

মুহিতের ঘোষিত শেষ বাজেটটি তিনটি সরকার বাস্তবায়ন করবে।

সামনে জাতীয় নিবার্চন, ফলে বাজেট করার ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির চেয়ে ভোটারদের তুষ্টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কর আদায়ের তুলনায় রেয়াত দেওয়ার প্রবণতাটা অতিমাত্রায় চোখে পড়েছে। অর্থনীতির বিচারে যা কিছুটা দৃষ্টিকটুও বটে। বাজেট দিয়ে ভোটারদের খুব বেশি খুশি করা যায় না, এটা অতীতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ বাজেটে মরহুম অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও ভোটারদের খুশি রাখার প্রায় সব চেষ্টা বাজেটে করেছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালের নিবার্চনের সময় ভোটাররা সে বিষয়টি মনে রাখেনি। অবশ্য মাঝের দুটি বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আচরণ বিএনপির জন্য নেতিবাচক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে হয়।

বিগত সাড়ে চার বছর বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন। শেয়ারবাজার ও হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, দেশজুড়ে ছাত্রলীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস, বাম্পার ফলনের পরও পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া, গার্মেন্টসগুলোর অস্থিরতা, একাধিপত্য বিস্তার, ভারতের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত মাখামাখিসহ আরও অনেক ফ্যাক্টর নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করবে। ফলে, বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ, শেয়ারবাজারের জন্য প্রণোদনা, পদ্মা সেতুর জন্য বিশাল বরাদ্দ, কর রেয়াতের সংস্কৃতি এবং জনতুষ্টির চেষ্টা নিবার্চনে বর্তমান সরকারকে কতটা সুবিধা দেবে, তার উত্তর পাওয়া যাবে আগামী নির্বাচনে।

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অর্থমন্ত্রী কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, লুটেরা, চোর-ডাকাত, বাটপার, সাধারণ মানুষ সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। যদিও সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা যায় না, এই সহজ সূত্রটি অর্থমন্ত্রী বাজেট করার সময় বিবেচনায় নেননি বলেই মনে হয়। তা ছাড়া, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে নানা হিসাব মেলাতে হয়, অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। সেটা দেশ এবং রাজনীতি উভয় স্বার্থেই। অর্থমন্ত্রীর একমাত্র ভাবনার বিষয় অর্থনীতির কল্যাণ। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা মানুষের স্বস্তির দিকটাতে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হয়। জনকল্যাণে তাই অর্থমন্ত্রীকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব কারণে দুনিয়ার বেশির ভাগ অর্থমন্ত্রীর ভাগ্যে জনপ্রিয়তার জয়টিপ জোটে না। এটা অর্থমন্ত্রীদের জন্য একধরনের সুবিধাও বটে। যদি আবুল মাল আব্দুল মুহিত সে পথে হাঁটেননি। বরং জনতুষ্টির মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

অর্থমন্ত্রীকে দেশের স্বার্থে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হয়, যা দেখে আপাত ভোটাররা খেপে যেতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সরকার, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র যার সুফল ভোগ করে। এ জন্য প্রবল ব্যক্তিত্ব, দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টি প্রয়োজন। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই অর্থমন্ত্রীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে, যা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বরং জনকল্যাণের চেয়ে জনতুষ্টি এবং রাজনীতির আধিক্যই প্রবল হয়ে উঠেছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

নির্বাচিত সরকার নির্বাচনকে মাথায় রেখে বাজেট দেবে এতে দোষের কিছু নেই। ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে নিবার্চনী বৈতরণি পার হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সে যুক্তিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেটকে মেনে নিতেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে জনকল্যাণ এবং তুষ্টি-এই দুটি শব্দের মধ্যে ধারণা ও দর্শনগত যে পার্থক্য আছে, এ বিষয়টি বাজেটে অনুপস্থিত। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি এর সুফল পাবে কি না, বাজেটে দেওয়া সুবিধাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছাবে কি না, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা আছে কি না-এ প্রশ্নগুলোও যদি অর্থমন্ত্রী বিবেচনায় নিতেন, তবে তা অর্থনীতি এবং দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতো। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বিবেচনায় এ বিষয়গুলো যে ছিল না তা মোটামুটি তার বাজেট বক্তৃতায়ই পরিষ্কার। যে কারণে তিনি নিজেই বাজেটে ঘোষিত আকাঙ্ক্ষাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অর্থমন্ত্রী জনগণকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশের বেশি ও মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে ধরে রাখবেন। বাড়বে বিনিয়োগ এবং আদায় হবে ইতিহাসের সর্বোর্চ্চ রাজস্ব। বিনিয়োগ বাড়াতে নানা ক্ষেত্রে শুল্কছাড়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও বিনিয়োগ শুধু শুল্কছাড়ের ওপর নয়, বরং অনেক বেশি অবকাঠামো ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। জনগণকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে সম্পর্কে একটি বাক্যও নেই অর্থমন্ত্রীর ১৮৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ‘স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট বক্তৃতায়। যোগ-বিয়োগে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো গেলেও, বাস্তবতার নিরিখে কোনোভাবেই মেলে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করে এমন সব সংস্থা বলছে, আগামী অর্থবছরে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন কোনোভাবেই অর্থনৈতিক সূত্র দিয়ে মেলানো যায় না। বরং ৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরলে সেটা হতো অনেক বেশি যৌক্তিক।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, মূল্যস্ফীতির ধারা গত কয়েক মাস ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকারের শীর্ষে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল সরকার। কিন্তু গত সাড়ে বছরে এই জায়গায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বর্তমান সরকারের প্রথম চার বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরে প্রায় সব মহল থেকেই দাবি উঠেছিল করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর। এর আগে অর্থমন্ত্রী এবং সরকার প্রকৃত আয় কমার বিষয়টি কোনোভাবেই মানেনি। বরং মানুষের আয় বেড়েছে বলে দাবিসামনে জাতীয় নিবার্চন, ফলে বাজেট করার ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির চেয়ে ভোটারদের তুষ্টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কর আদায়ের তুলনায় রেয়াত দেওয়ার প্রবণতাটা অতিমাত্রায় চোখে পড়েছে। অর্থনীতির বিচারে যা কিছুটা দৃষ্টিকটুও বটে। বাজেট দিয়ে ভোটারদের খুব বেশি খুশি করা যায় না, এটা অতীতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ বাজেটে মরহুম অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও ভোটারদের খুশি রাখার প্রায় সব চেষ্টা বাজেটে করেছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালের নিবার্চনের সময় ভোটাররা সে বিষয়টি মনে রাখেনি। অবশ্য মাঝের দুটি বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আচরণ বিএনপির জন্য নেতিবাচক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে হয়।

বিগত সাড়ে চার বছর বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন। শেয়ারবাজার ও হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, দেশজুড়ে ছাত্রলীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস, বাম্পার ফলনের পরও পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া, গার্মেন্টসগুলোর অস্থিরতা, একাধিপত্য বিস্তার, ভারতের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত মাখামাখিসহ আরও অনেক ফ্যাক্টর নিবার্চনে ভোটারদের প্রভাবিত করবে। ফলে, বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ, শেয়ারবাজারের জন্য প্রণোদনা, পদ্মা সেতুর জন্য বিশাল বরাদ্দ, কর রেয়াতের সংস্কৃতি এবং জনতুষ্টির চেষ্টা নির্বাচনে বর্তমান সরকারকে কতটা সুবিধা দেবে, তার উত্তর পাওয়া যাবে আগামী নির্বাচনে।

তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অর্থমন্ত্রী কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, লুটেরা, চোর-ডাকাত, বাটপার, সাধারণ মানুষ সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। যদিও সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা যায় না, এই সহজ সূত্রটি অর্থমন্ত্রী বাজেট করার সময় বিবেচনায় নেননি বলেই মনে হয়। তা ছাড়া, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে নানা হিসাব মেলাতে হয়, অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। সেটা দেশ এবং রাজনীতি উভয় স্বার্থেই। অর্থমন্ত্রীর একমাত্র ভাবনার বিষয় অর্থনীতির কল্যাণ। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা মানুষের স্বস্তির দিকটাতে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হয়। জনকল্যাণে তাই অর্থমন্ত্রীকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব কারণে দুনিয়ার বেশির ভাগ অর্থমন্ত্রীর ভাগ্যে জনপ্রিয়তার জয়টিপ জোটে না। এটা অর্থমন্ত্রীদের জন্য একধরনের সুবিধাও বটে। যদি আবুল মাল আব্দুল মুহিত সে পথে হাঁটেননি। বরং জনতুষ্টির মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

অর্থমন্ত্রীকে দেশের স্বার্থে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হয়, যা দেখে আপাত ভোটাররা খেপে যেতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সরকার, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র যার সুফল ভোগ করে। এ জন্য প্রবল ব্যক্তিত্ব, দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টি প্রয়োজন। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই অর্থমন্ত্রীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে, যা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বরং জনকল্যাণের চেয়ে জনতুষ্টি এবং রাজনীতির আধিক্যই প্রবল হয়ে উঠেছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

নিবার্চিত সরকার নিবার্চনকে মাথায় রেখে বাজেট দেবে এতে দোষের কিছু নেই। ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে নিবার্চনী বৈতরণি পার হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সে যুক্তিতে অর্থমন্ত্রীর বাজেটকে মেনে নিতেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে জনকল্যাণ এবং তুষ্টি-এই দুটি শব্দের মধ্যে ধারণা ও দর্শনগত যে পার্থক্য আছে, এ বিষয়টি বাজেটে অনুপস্থিত। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি এর সুফল পাবে কি না, বাজেটে দেওয়া সুবিধাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছাবে কি না, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা আছে কি না-এ প্রশ্নগুলোও যদি অর্থমন্ত্রী বিবেচনায় নিতেন, তবে তা অর্থনীতি এবং দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতো। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বিবেচনায় এ বিষয়গুলো যে ছিল না তা মোটামুটি তার বাজেট বক্তৃতায়ই পরিষ্কার। যে কারণে তিনি নিজেই বাজেটে ঘোষিত আকাঙ্ক্ষাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অর্থমন্ত্রী জনগণকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশের বেশি ও মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে ধরে রাখবেন। বাড়বে বিনিয়োগ এবং আদায় হবে ইতিহাসের সর্বোর্চ্চ রাজস্ব। বিনিয়োগ বাড়াতে নানা ক্ষেত্রে শুল্কছাড়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও বিনিয়োগ শুধু শুল্কছাড়ের ওপর নয়, বরং অনেক বেশি অবকাঠামো ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। জনগণকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে সম্পর্কে একটি বাক্যও নেই অর্থমন্ত্রীর ১৮৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ‘স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট বক্তৃতায়। যোগ-বিয়োগে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো গেলেও, বাস্তবতার নিরিখে কোনোভাবেই মেলে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করে এমন সব সংস্থা বলছে, আগামী অর্থবছরে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন কোনোভাবেই অর্থনৈতিক সূত্র দিয়ে মেলানো যায় না। বরং ৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরলে সেটা হতো অনেক বেশি যৌক্তিক।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, মূল্যস্ফীতির ধারা গত কয়েক মাস ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকারের শীর্ষে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল সরকার। কিন্তু গত সাড়ে বছরে এই জায়গায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বর্তমান সরকারের প্রথম চার বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরে প্রায় সব মহল থেকেই দাবি উঠেছিল করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর। এর আগে অর্থমন্ত্রী এবং সরকার প্রকৃত আয় কমার বিষয়টি কোনোভাবেই মানেনি। বরং মানুষের আয় বেড়েছে বলে দাবি করেছে। তবে এবারের বাজেটে ব্যক্তি আয়করসীমা ১ লাখ ৮০ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা করার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকৃত আয় কমার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে গতবারের তুলনায় কম কর দিতে হবে অনেক করদাতাকে, যা সীমিত আয়ের মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে রাখা যাবে এমন কোনো আলামত এখন পর্যন্ত বাজারে নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ স্থবিরতাসহ নানা কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এনবিআরের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এনবিআরের পক্ষে কি নতুন অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ সম্ভব? এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, রপ্তানিতে ধস-সব মিলিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার নয়। ফলে, সরকারকে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমাতেই হবে। অন্যদিকে এত বেশি শুল্কছাড়ের ঘোষণা এবারের বাজেটে আছে, যা শঙ্কাকে বাস্তবে পরিণত করবে বলে এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা।

শুল্কছাড়ের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। অন্যদিকে এনবিআরের কাঁধে চাপিয়েছেন বিশাল রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে এনবিআর মধ্যবিত্তের ঘাড়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ করের বোঝা চাপাবে। যাতে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী জীবন ধারণে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে। আয়কর লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে নতুন বাজেটে ৪৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। যার মানে হচ্ছে, আগামী বাজেটের লক্ষ্যপূরণে এনবিআরকে জনগণের পকেট থেকে বের করতে হবে অতিরিক্ত ১৩ হাজার কোটি টাকা।

ভ্যাটের পরিমাণ না বাড়লেও এর আওতা বাড়িয়ে এ খাত থেকে অতিরিক্ত ৯ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাটের এই টাকা আসবে ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোগ থেকে। ফলে, জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার মধ্যে রাখার লক্ষ্য আকাঙ্ক্ষা দুরাশায় পরিণত হতে বাধ্য। আবগারি, আমদানি, রপ্তানি ও সম্পূরক শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা বাড়েনি। কিন্তু কিছু পণ্যের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এসব পণ্যের প্রধান ক্রেতা মধ্যবিত্ত। গুঁড়ো দুধ, গ্যাস সিলিন্ডার, লৌহজাত পণ্যের কাঁচামাল, বিস্কুট, পটেটো চিপস, মসলা, মশার কয়েল, বিদেশি ফল এনার্জি ড্রিংক, অলংকারের মূল্য বাড়বে। বাজেটে যতটা শুল্ক বাড়বে বাজারে দাম বাড়বে তার চেয়ে বেশি। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে চাপে থাকা মধ্যবিত্ত আরও বামন হয়ে পড়বে বলে গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘হঠকারী রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রায় জমে যায় কালো মেঘের ছায়া। তবে মনে হচ্ছে, নৈরাজ্য সৃষ্টির এই প্রচেষ্টা বাধা পেয়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’ দেশের ১৬ কোটি মানুষ অর্থমন্ত্রীর মতো আশাবাদী হতে চায়। কিন্তু সরকারে এবং বাইরে যারা আছেন, তাদের অনমনীয় আচরণ এমন কোনো ইঙ্গিত দেয় না। বরং হতাশার থমথমে কালো মেঘ বড় কোনো ঝড়ের পূর্বার্ভাস দিচ্ছে প্রতিমুহূর্তে।

পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে জল ঘোলাও কম হয়নি। সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করা গেলে এর চেয়ে ভালো কিছু হতো না। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণায় সরকার পদ্মা সেতু নিয়ে বিপাকেই আছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভোট এবং অর্থনৈতিক বিবেচনায় পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম, যা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও পদ্মা সেতুর কাজই শুরু করতে পারেনি। ভোটের বিবেচনায় নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে চায় সরকার। সে জন্য নতুন বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশই যাবে পদ্মার পেটে। সব মিলিয়ে পরবর্তী তিন অর্থবছরে নিজস্ব তহবিল থেকে সরকার এই সেতু নির্মাণে ব্যয় বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের প্রথম বাজেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারণা দিয়ে চমকে দিয়েছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত পিপিপির ফল শূন্য। করেছে। তবে এবারের বাজেটে ব্যক্তি আয়করসীমা ১ লাখ ৮০ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা করার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকৃত আয় কমার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে গতবারের তুলনায় কম কর দিতে হবে অনেক করদাতাকে, যা সীমিত আয়ের মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে রাখা যাবে এমন কোনো আলামত এখন পর্যন্ত বাজারে নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ স্থবিরতাসহ নানা কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এনবিআরের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এনবিআরের পক্ষে কি নতুন অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ সম্ভব? এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নিবার্চন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, রপ্তানিতে ধস-সব মিলিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার নয়। ফলে, সরকারকে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমাতেই হবে। অন্যদিকে এত বেশি শুল্কছাড়ের ঘোষণা এবারের বাজেটে আছে, যা শঙ্কাকে বাস্তবে পরিণত করবে বলে এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা।

শুল্কছাড়ের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। অন্যদিকে এনবিআরের কাঁধে চাপিয়েছেন বিশাল রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে এনবিআর মধ্যবিত্তের ঘাড়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ করের বোঝা চাপাবে। যাতে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী জীবন ধারণে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে। আয়কর লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে নতুন বাজেটে ৪৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। যার মানে হচ্ছে, আগামী বাজেটের লক্ষ্যপূরণে এনবিআরকে জনগণের পকেট থেকে বের করতে হবে অতিরিক্ত ১৩ হাজার কোটি টাকা।

ভ্যাটের পরিমাণ না বাড়লেও এর আওতা বাড়িয়ে এ খাত থেকে অতিরিক্ত ৯ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাটের এই টাকা আসবে ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোগ থেকে। ফলে, জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার মধ্যে রাখার লক্ষ্য আকাঙ্ক্ষা দুরাশায় পরিণত হতে বাধ্য। আবগারি, আমদানি, রপ্তানি ও সম্পূরক শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা বাড়েনি। কিন্তু কিছু পণ্যের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এসব পণ্যের প্রধান ক্রেতা মধ্যবিত্ত। গুঁড়ো দুধ, গ্যাস সিলিন্ডার, লৌহজাত পণ্যের কাঁচামাল, বিস্কুট, পটেটো চিপস, মসলা, মশার কয়েল, বিদেশি ফল এনার্জি ড্রিংক, অলংকারের মূল্য বাড়বে। বাজেটে যতটা শুল্ক বাড়বে বাজারে দাম বাড়বে তার চেয়ে বেশি। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে চাপে থাকা মধ্যবিত্ত আরও বামন হয়ে পড়বে বলে গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘হঠকারী রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রায় জমে যায় কালো মেঘের ছায়া। তবে মনে হচ্ছে, নৈরাজ্য সৃষ্টির এই প্রচেষ্টা বাধা পেয়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’ দেশের ১৬ কোটি মানুষ অর্থমন্ত্রীর মতো আশাবাদী হতে চায়। কিন্তু সরকারে এবং বাইরে যারা আছেন, তাদের অনমনীয় আচরণ এমন কোনো ইঙ্গিত দেয় না। বরং হতাশার থমথমে কালো মেঘ বড় কোনো ঝড়ের পূবাভাস দিচ্ছে প্রতিমুহূর্তে।

পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে জল ঘোলাও কম হয়নি। সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করা গেলে এর চেয়ে ভালো কিছু হতো না। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণায় সরকার পদ্মা সেতু নিয়ে বিপাকেই আছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভোট এবং অর্থনৈতিক বিবেচনায় পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম, যা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও পদ্মা সেতুর কাজই শুরু করতে পারেনি। ভোটের বিবেচনায় নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে চায় সরকার। সে জন্য নতুন বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশই যাবে পদ্মার পেটে। সব মিলিয়ে পরবর্তী তিন অর্থবছরে নিজস্ব তহবিল থেকে সরকার এই সেতু নির্মাণে ব্যয় বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের প্রথম বাজেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারণা দিয়ে চমকে দিয়েছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত পিপিপির ফল শূন্য। যদিও পিপিপি নিয়ে পুরোনো রেকর্ড এবারে বাজেটেও শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

কৃষি, জ্বালানি খাতে বিগত চার বছর ধরেই ভর্তুকি দিয়ে প্রণোদিত করা হচ্ছিল অর্থনীতিকে। নতুন বাজেটে ভর্তুকি কিছুটা কমানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সরকারদলীয়দের হস্তক্ষেপ, শৃঙ্খলার অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা করুণ। আইএমএফের পরামর্শে ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়াতে থোক বরাদ্দ বাড়িয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে গেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুশি করতে নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছরের বাজেটকে ব্যয় বাড়ানোর মহাকাব্যিক পরিকল্পনা বললে খুব বেশি অন্যায় হবে না হয়তো।

ঐতিহ্যগতভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বাংলাদেশের। এর পরও প্রতিবছর এডিপির আকার বাড়ানো হয় এবং অর্থবছরের শেষ দিকে গিয়ে সংশোধন করে বরাদ্দ কমানো হয়। চলতি অর্থবছরেও একই ঘটনা ঘটেছে। এ সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বাজেটে এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। বর্তমান-সাবেক আমলা, বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সংস্থা, অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, এত বড় এডিপি বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা মন্ত্রণালয়গুলোর নেই। ফলে, আগামী অর্থবছরের শেষে গিয়ে এডিপি সংশোধন করে ছোট করতে হবে। বাস্তবায়ন-সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও বড় এডিপির কারণে বছরের শেষ দিকে এসে অর্থখরচের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রকল্পগুলোতে বড় ধরনের অপচয় হয়। পাশাপাশি কাজের গুণগত মান ভালো হয় না। এর সঙ্গে সময়মতো অর্থ না ছাড়ার হ্যাপা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্তহীনতার মতো অনেক বাধা তো আছেই।

যদিও অর্থমন্ত্রী মনে করেন, সরকার যা করছে তা জনগণ এবং দেশের কল্যাণে। তিনি বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমি মনে করি, আমাদের পরে যারাই আসবেন, তারা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান সরকারের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন।’ এমন আদর্শিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব-প্রজ্ঞা জনগণের কাম্য হলেও কোনো সরকারই তা অনুসরণ করেনি। এমনকি বর্তমান সরকারও না।

বিরোধী দলে থাকাকালীন সব রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব থাকে। সরকারে গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদে নামার আশ্বাসও মেলে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই দেশে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও, কোথাও না কোথাও গিয়ে দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপস করে। আর সৎ করদাতাদের উপহাস করে। এমন প্রবঞ্চনা প্রস্তাবিত বাজেটেও দৃঢ়ভাবে দৃশ্যমান। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একজনের পক্ষে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। সেই চেষ্টাও ভুল। যদিও সেই ভুল চেষ্টাটাই সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। একদিকে তিনি বড়লোকদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করে গরিবদের মাঝে বিলানোর চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ বড়লোকদের সম্পদের ওপর বাড়তি করারোপ করেছেন। সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দিকে সম্পদশালীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পাশাপাশি তাদের রাজস্ব ফাঁকি দিতে বা কালোটাকার মালিক হতে উৎসাহও দিয়েছেন।

বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে, কারও একাধিক গাড়ি থাকলে বাড়তি কর দিতে হবে। যৌথ বা একক মালিকানায় একাধিক মোটরকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আয়করের ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত আয়কর দিতে হবে। এতে বড়লোকদের গাড়ি কেনায় কোনো ব্যত্যয় না ঘটলেও মধ্যবিত্তের গাড়ি কেনার স্বপ্নকে করের মোড়কে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতেও এই প্রস্তাবনা এটি সহজেই বোঝা যায়। যাদের একাধিক গাড়ি আছে বা কিনতে চান, তাদের বেশির ভাগই গাড়ি কেনেন প্রতিষ্ঠানের নামে। ফলে ব্যক্তির গাড়ি কেনা থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের চেষ্টা কতটা সফল হবে, সেটা একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কর আদায় হয় মোবাইল ফোন কোম্পানি, ব্যাংক ও সিগারেট/বিড়ি কোম্পানিগুলো। রাজস্ব আদায়ে এ বছরও সহজ পথটি বেছে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মোবাইল ফোন ও সিগারেট কোম্পানির করপোরেট কর ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো ও গ্রামীণফোনকে করবাবদ বেশি অর্থ গুনতে হবে, যা কোম্পানিগুলো জনগণের পকেট থেকেই নেবে।

কালোটাকার মালিকদের সঙ্গে এই সখ্য নিয়ে সমাজে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হলেও অর্থমন্ত্রীর এই সমঝোতা মূলত রাজনৈতিক। দলের ভেতরে অবৈধ উপার্জনকারী, প্রভাবশালী মহল, দলীয় সমর্থক ব্যবসায়ীদের চাপকে তিনি সামলেছেন সহজ উপায়ে। অর্থাৎ কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে। প্রযোজ্য করহারের সঙ্গে ১০ শতাংশ বাড়তি জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে। নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে ফ্ল্যাট বা জমি কিনলে কেউ আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করবে না। একের বেশি প্লট বা ফ্ল্যাট কিনলেও কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না। তবে কর কিছুটা বেশি দিতে হবে। মূলত আবাসনশিল্পকে প্রণোদনা দিতেই এই সুযোগ। যদিও শেয়ারবাজারে টাকা সাদা করার সুযোগ তুলে দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। নির্বাচনের আগের বাজেটে এমন সুযোগ যে দেওয়া হবে তার ইঙ্গিত যদিও পিপিপি নিয়ে পুরোনো রেকর্ড এবারে বাজেটেও শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

কৃষি, জ্বালানি খাতে বিগত চার বছর ধরেই ভর্তুকি দিয়ে প্রণোদিত করা হচ্ছিল অর্থনীতিকে। নতুন বাজেটে ভর্তুকি কিছুটা কমানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সরকারদলীয়দের হস্তক্ষেপ, শৃঙ্খলার অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা করুণ। আইএমএফের পরামর্শে ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়াতে থোক বরাদ্দ বাড়িয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে গেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুশি করতে নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত নতুন অর্থবছরের বাজেটকে ব্যয় বাড়ানোর মহাকাব্যিক পরিকল্পনা বললে খুব বেশি অন্যায় হবে না হয়তো।

ঐতিহ্যগতভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বাংলাদেশের। এর পরও প্রতিবছর এডিপির আকার বাড়ানো হয় এবং অর্থবছরের শেষ দিকে গিয়ে সংশোধন করে বরাদ্দ কমানো হয়। চলতি অর্থবছরেও একই ঘটনা ঘটেছে। এ সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বাজেটে এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। বর্তমান-সাবেক আমলা, বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সংস্থা, অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, এত বড় এডিপি বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা মন্ত্রণালয়গুলোর নেই। ফলে, আগামী অর্থবছরের শেষে গিয়ে এডিপি সংশোধন করে ছোট করতে হবে। বাস্তবায়ন-সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও বড় এডিপির কারণে বছরের শেষ দিকে এসে অর্থখরচের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রকল্পগুলোতে বড় ধরনের অপচয় হয়। পাশাপাশি কাজের গুণগত মান ভালো হয় না। এর সঙ্গে সময়মতো অর্থ না ছাড়ার হ্যাপা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্তহীনতার মতো অনেক বাধা তো আছেই।

যদিও অর্থমন্ত্রী মনে করেন, সরকার যা করছে তা জনগণ এবং দেশের কল্যাণে। তিনি বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমি মনে করি, আমাদের পরে যারাই আসবেন, তারা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান সরকারের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন।’ এমন আদর্শিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব-প্রজ্ঞা জনগণের কাম্য হলেও কোনো সরকারই তা অনুসরণ করেনি। এমনকি বর্তমান সরকারও না।

বিরোধী দলে থাকাকালীন সব রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব থাকে। সরকারে গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদে নামার আশ্বাসও মেলে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই দেশে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও, কোথাও না কোথাও গিয়ে দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপস করে। আর সৎ করদাতাদের উপহাস করে। এমন প্রবঞ্চনা প্রস্তাবিত বাজেটেও দৃঢ়ভাবে দৃশ্যমান। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একজনের পক্ষে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। সেই চেষ্টাও ভুল। যদিও সেই ভুল চেষ্টাটাই সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। একদিকে তিনি বড়লোকদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করে গরিবদের মাঝে বিলানোর চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ বড়লোকদের সম্পদের ওপর বাড়তি করারোপ করেছেন। সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দিকে সম্পদশালীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পাশাপাশি তাদের রাজস্ব ফাঁকি দিতে বা কালোটাকার মালিক হতে উৎসাহও দিয়েছেন।

বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে, কারও একাধিক গাড়ি থাকলে বাড়তি কর দিতে হবে। যৌথ বা একক মালিকানায় একাধিক মোটরকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আয়করের ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত আয়কর দিতে হবে। এতে বড়লোকদের গাড়ি কেনায় কোনো ব্যত্যয় না ঘটলেও মধ্যবিত্তের গাড়ি কেনার স্বপ্নকে করের মোড়কে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতেও এই প্রস্তাবনা এটি সহজেই বোঝা যায়। যাদের একাধিক গাড়ি আছে বা কিনতে চান, তাদের বেশির ভাগই গাড়ি কেনেন প্রতিষ্ঠানের নামে। ফলে ব্যক্তির গাড়ি কেনা থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের চেষ্টা কতটা সফল হবে, সেটা একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কর আদায় হয় মোবাইল ফোন কোম্পানি, ব্যাংক ও সিগারেট/বিড়ি কোম্পানিগুলো। রাজস্ব আদায়ে এ বছরও সহজ পথটি বেছে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মোবাইল ফোন ও সিগারেট কোম্পানির করপোরেট কর ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো ও গ্রামীণফোনকে করবাবদ বেশি অর্থ গুনতে হবে, যা কোম্পানিগুলো জনগণের পকেট থেকেই নেবে।

কালোটাকার মালিকদের সঙ্গে এই সখ্য নিয়ে সমাজে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হলেও অর্থমন্ত্রীর এই সমঝোতা মূলত রাজনৈতিক। দলের ভেতরে অবৈধ উপার্জনকারী, প্রভাবশালী মহল, দলীয় সমর্থক ব্যবসায়ীদের চাপকে তিনি সামলেছেন সহজ উপায়ে। অর্থাৎ কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে। প্রযোজ্য করহারের সঙ্গে ১০ শতাংশ বাড়তি জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে। নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে ফ্ল্যাট বা জমি কিনলে কেউ আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করবে না। একের বেশি প্লট বা ফ্ল্যাট কিনলেও কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না। তবে কর কিছুটা বেশি দিতে হবে। মূলত আবাসনশিল্পকে প্রণোদনা দিতেই এই সুযোগ। যদিও শেয়ারবাজারে টাকা সাদা করার সুযোগ তুলে দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। নির্বাচনের আগের বাজেটে এমন সুযোগ যে দেওয়া হবে তার ইঙ্গিত আগে থেকেই ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বহুবার এই সুযোগ দেওয়া হলেও তার সুফল খুব একটা মেলেনি। অর্থমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। তার পরও কালোটাকার মালিকদের প্রতি এত ভালোবাসা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বাজেট বক্তৃতায় নেই। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা অঙ্ক করে দেখিয়েছে, কালোটাকার মালিকেরা টাকা দেশে রাখেন না। বরং তারা অবৈধ উপার্জনের নিরাপত্তা খোঁজেন দেশের বাইরে। সর্শেষ ইউএনডিপি এক গবেষণায় দেখিয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গিয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ বাজেট মূল্যায়ন করে জিনিসপত্রের দাম দিয়ে। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাজেট নিয়ে তাই খুব বেশি উত্তেজনাও দেখা যায় না। যদিও এর প্রভাব ব্যাপক এবং বিশাল। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবন-মানের সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক। প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ককাঠামো বিন্যাসের কারণে বেশ কিছু পণ্যের দাম কমবে। মোবাইলের সিম কার্ডের ওপর ধাযর্কৃত ট্যাঙ্ কমাতে বিগত কয়েক বছর ধরে মোবাইল কোম্পানিগুলো সরকারের সঙ্গে দেনদরবার চালিয়ে আসছিল। নতুন বাজেটে সিম কার্ড আমদানি শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মোবাইল কোম্পানিগুলো কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে, যার সুফল পেতে পাবে গ্রাহক।

পরিবেশবান্ধব এলইডি ল্যাম্প, যন্ত্রাংশ, রিচার্জেবল এলইডি ল্যাম্প, এলইডি টিউবলাইট, সৌরশক্তিচালিত হ্যারিকেন, ফ্লোরোসেন্ট বাল্বের ওপর আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক কমানোয় এসব পণ্যের দাম কমবে। নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে দাম বাড়লেও মধ্যবিত্তের স্বস্তির জায়গা হচ্ছে অবচয়সুবিধা পুনর্বিন্যাস করায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কমবে। জানা গেছে, ইতিমধ্যেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কিছুটা কমেছে। শুল্ক কমানোয় পানি পরিশোধনের মেশিন বা ফিল্টারের দাম কমবে। ডিজিটাল প্রজন্মের ভোট পেতে ডিজিটাল ক্যামেরা ও ওয়েবক্যামের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। সব ধরনের চায়ের ওপর থেকে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক তুলে নেওয়ায় চায়ের দাম কমবে। শিশুখাদ্য আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্ক কমানোয় এর দাম কমবে। এ ছাড়া, সব ধরনের মেমোরি কার্ড, ফ্ল্যাশ কার্ড, এসডি কার্ড, কম্পিউটার প্রিন্টারের রিবন, কম্পিউটারর্ যাক, প্রিন্টার সামগ্রী, সাদা সিমেন্ট, অগ্নি নিবার্পণ যন্ত্রসহ আরও কিছু পণ্যের ওপর আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়ায় এসব পণ্যের দাম কমবে।

বিশাল আকারের বাজেটের ব্যয়ের মূল খাত ধরা হয়েছে অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ে। টাকার অঙ্কে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি ৪৭১ টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ২৬ হাজার আর বৈদেশিক ঋণের সুদে যাবে ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। পাশাপাশি অনুন্নয়নমূলক মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এডিপি-বহির্ভূত উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের বাইরে অর্থসংস্থানের জন্য নির্ভর করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর। বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির হার কমে এলেও আগামী অর্থবছরের জন্য নিট বৈদেশিক ঋণ ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধসহ এই লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর অভ্যন্তরীণ উৎস বা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

মাথাপিছু মাত্র ২২৫ কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২৫ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের বেশির ভাগ অংশ যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ও পারিবারিক ভাতা পরিশোধে। দলিত, হরিজন, বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও ভোটের সমীকরণ মেলানোর পাশাপাশি দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, তাতে অবশ্যই অর্থমন্ত্রী প্রশংসার দাবি রাখেন।

বাজেটের মতো একটি মহাকাব্যকে কয়েক হাজার শব্দে বিশ্লেষণ করা কঠিন, দুঃসাহসিক এবং বোকামিও বটে। ফলে, সে পথে না হেঁটে মোটা দাগে যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের মধ্যে যে লুকোচুরি, উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য থাকে, সে দিকটাতেই দৃষ্টিপাত করতে চেয়েছি। কৃষি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ খাতওয়ারি বরাদ্দ বা টাকার হিসাবে না গিয়ে সময় বিচিত্রা বোঝার চেষ্টা করেছে প্রস্তাবিত বাজেটের দর্শন। নির্বাচন, ভোটের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সব রকম চেষ্টা এই বাজেটের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। বাজেটে হতাশার পাশাপাশি উজ্জীবিত হওয়ার মতো পদক্ষেপও আছে। অর্থনীতি টাকাপয়সার জটিল হিসাবে হলেও শেষ পর্যন্ত তা মানুষের জন্য এবং মানুষের কল্যাণে। অর্থমন্ত্রী রাজনীতি করেন; ফলে, বাজেটে অর্থনীতির চেয়ে রাজনীতি অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। এ নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ করার নেই, যদি না সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও দক্ষতা দেখাতে পারে। শেষ বিচারে মানুষ খুশি থাকলে, অর্থনীতিতে গতি আনতে সক্ষম হলেই অর্থমন্ত্রীর শেষ বাজেট সফলতার ইতিহাসে জায়গা পাবে।

লেখাটা শেষ করতে চাই অর্থমন্ত্রীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে-’আমি ৮০-তে পদার্পণ করেছি, জীবনে হতাশা ও সাফল্যের দোলাচলে বারবার নিক্ষিপ্ত হয়েছি, তবে সর্বদাই আমি ঘনঘটার মধ্যে শান্তি দেখেছি। মেঘের আড়ালে রুপালি নয়, সোনালি রেখা দেখেছি।’ আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মতো জনগণও সোনালি রেখাটা স্পষ্ট করে দেখতে চায়। এ জন্য সুশাসন, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, দুর্নীতি দমন, দলীয় দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের আস্থায় নেওয়া, নিজস্ব সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির উন্নয়ন প্রয়োজন। তা না হলে যত ভালো বাজেটই হোক না কেন, এর সুফল অর্থনীতি ও জনগণ পাবে না। বিশ্ব উন্নয়নের ইতিহাস অন্তত তা-ই বলে। এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে সুখী জাতি হিসেবে বিশ্বাস করতে চাই, সময় বদলাবে, রাজনীতি বদলাবে। অর্থনৈতিক মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ, তা রাজনীতিবিদেরাই পূরণ করবে।

আগে থেকেই ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বহুবার এই সুযোগ দেওয়া হলেও তার সুফল খুব একটা মেলেনি। অর্থমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। তার পরও কালোটাকার মালিকদের প্রতি এত ভালোবাসা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বাজেট বক্তৃতায় নেই। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা অঙ্ক করে দেখিয়েছে, কালোটাকার মালিকেরা টাকা দেশে রাখেন না। বরং তারা অবৈধ উপার্জনের নিরাপত্তা খোঁজেন দেশের বাইরে। সর্বশেষ ইউএনডিপি এক গবেষণায় দেখিয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গিয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ বাজেট মূল্যায়ন করে জিনিসপত্রের দাম দিয়ে। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাজেট নিয়ে তাই খুব বেশি উত্তেজনাও দেখা যায় না। যদিও এর প্রভাব ব্যাপক এবং বিশাল। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবন-মানের সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক। প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ককাঠামো বিন্যাসের কারণে বেশ কিছু পণ্যের দাম কমবে। মোবাইলের সিম কার্ডের ওপর ধার্যকৃত ট্যাঙ্ কমাতে বিগত কয়েক বছর ধরে মোবাইল কোম্পানিগুলো সরকারের সঙ্গে দেনদরবার চালিয়ে আসছিল। নতুন বাজেটে সিম কার্ড আমদানি শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মোবাইল কোম্পানিগুলো কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে, যার সুফল পেতে পাবে গ্রাহক।

পরিবেশবান্ধব এলইডি ল্যাম্প, যন্ত্রাংশ, রিচার্জেবল এলইডি ল্যাম্প, এলইডি টিউবলাইট, সৌরশক্তিচালিত হ্যারিকেন, ফ্লোরোসেন্ট বাল্বের ওপর আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক কমানোয় এসব পণ্যের দাম কমবে। নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে দাম বাড়লেও মধ্যবিত্তের স্বস্তির জায়গা হচ্ছে অবচয়সুবিধা পুনর্বিন্যাস করায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কমবে। জানা গেছে, ইতিমধ্যেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কিছুটা কমেছে। শুল্ক কমানোয় পানি পরিশোধনের মেশিন বা ফিল্টারের দাম কমবে। ডিজিটাল প্রজন্মের ভোট পেতে ডিজিটাল ক্যামেরা ও ওয়েবক্যামের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। সব ধরনের চায়ের ওপর থেকে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক তুলে নেওয়ায় চায়ের দাম কমবে। শিশুখাদ্য আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্ক কমানোয় এর দাম কমবে। এ ছাড়া, সব ধরনের মেমোরি কার্ড, ফ্ল্যাশ কার্ড, এসডি কার্ড, কম্পিউটার প্রিন্টারের রিবন, কম্পিউটারর্ যাক, প্রিন্টার সামগ্রী, সাদা সিমেন্ট, অগ্নি নিবার্পণ যন্ত্রসহ আরও কিছু পণ্যের ওপর আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়ায় এসব পণ্যের দাম কমবে।

বিশাল আকারের বাজেটের ব্যয়ের মূল খাত ধরা হয়েছে অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ে। টাকার অঙ্কে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি ৪৭১ টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ২৬ হাজার আর বৈদেশিক ঋণের সুদে যাবে ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। পাশাপাশি অনুন্নয়নমূলক মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এডিপি-বহির্ভূত উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের বাইরে অর্থসংস্থানের জন্য নির্ভর করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর। বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির হার কমে এলেও আগামী অর্থবছরের জন্য নিট বৈদেশিক ঋণ ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধসহ এই লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর অভ্যন্তরীণ উৎস বা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

মাথাপিছু মাত্র ২২৫ কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২৫ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের বেশির ভাগ অংশ যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ও পারিবারিক ভাতা পরিশোধে। দলিত, হরিজন, বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও ভোটের সমীকরণ মেলানোর পাশাপাশি দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, তাতে অবশ্যই অর্থমন্ত্রী প্রশংসার দাবি রাখেন।

বাজেটের মতো একটি মহাকাব্যকে কয়েক হাজার শব্দে বিশ্লেষণ করা কঠিন, দুঃসাহসিক এবং বোকামিও বটে। ফলে, সে পথে না হেঁটে মোটা দাগে যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের মধ্যে যে লুকোচুরি, উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য থাকে, সে দিকটাতেই দৃষ্টিপাত করতে চেয়েছি। কৃষি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ খাতওয়ারি বরাদ্দ বা টাকার হিসাবে না গিয়ে সময় বিচিত্রা বোঝার চেষ্টা করেছে প্রস্তাবিত বাজেটের দর্শন। নির্বাচন, ভোটের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সব রকম চেষ্টা এই বাজেটের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। বাজেটে হতাশার পাশাপাশি উজ্জীবিত হওয়ার মতো পদক্ষেপও আছে। অর্থনীতি টাকাপয়সার জটিল হিসাবে হলেও শেষ পর্যন্ত তা মানুষের জন্য এবং মানুষের কল্যাণে। অর্থমন্ত্রী রাজনীতি করেন; ফলে, বাজেটে অর্থনীতির চেয়ে রাজনীতি অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। এ নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ করার নেই, যদি না সরকার বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও দক্ষতা দেখাতে পারে। শেষ বিচারে মানুষ খুশি থাকলে, অর্থনীতিতে গতি আনতে সক্ষম হলেই অর্থমন্ত্রীর শেষ বাজেট সফলতার ইতিহাসে জায়গা পাবে।

লেখাটা শেষ করতে চাই অর্থমন্ত্রীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে-’আমি ৮০-তে পদার্পণ করেছি, জীবনে হতাশা ও সাফল্যের দোলাচলে বারবার নিক্ষিপ্ত হয়েছি, তবে সর্বদাই আমি ঘনঘটার মধ্যে শান্তি দেখেছি। মেঘের আড়ালে রুপালি নয়, সোনালি রেখা দেখেছি।’ আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মতো জনগণও সোনালি রেখাটা স্পষ্ট করে দেখতে চায়। এ জন্য সুশাসন, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, দুর্নীতি দমন, দলীয় দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের আস্থায় নেওয়া, নিজস্ব সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির উন্নয়ন প্রয়োজন। তা না হলে যত ভালো বাজেটই হোক না কেন, এর সুফল অর্থনীতি ও জনগণ পাবে না। বিশ্ব উন্নয়নের ইতিহাস অন্তত তা-ই বলে। এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে সুখী জাতি হিসেবে বিশ্বাস করতে চাই, সময় বদলাবে, রাজনীতি বদলাবে। অর্থনৈতিক মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ, তা রাজনীতিবিদেরাই পূরণ করবে।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ