ভয় নয় ন্যায়ে সমাধান | সময় বিচিত্রা
ভয় নয় ন্যায়ে সমাধান
সাইফুল হাসান
p1

ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। বিশেষ করে, সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজারের বেশি শ্রমিকের করুণ মৃত্যু পোশাক খাতের ভেতরকার নগ্ন দিকটাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। মানুষের জীবন নিয়ে এমন অবহলোয় সংগত কারণেই দেশের মানুষ পোশাক কারখানার মালিকদের ওপর ক্ষিপ্ত। একই কারণে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার, কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডার মতো প্রভাবশালী সব দেশ ও বিশ্বখ্যাত খুচরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক সংগঠনগুলো। শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক না কিনতে চাপ দিচ্ছে এসব সংগঠন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ, অবকাঠামোগত সংকটে এমনিতেই শিল্পখাত প্রচণ্ড চাপে আছে।

তাজরীন ফ্যাশন ও স্মার্ট গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড, স্পেকট্রাম ও রানা প্লাজা ধসে শত শত শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু, অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষে শিল্পমালিকদের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ভয় পেয়ে গুটিয়ে থাকলে চলবে না। বরং এসব সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে কারখানামালিকদেরই। এ ক্ষেত্রে সরকার নীতি ও আইনি সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু সংকটের সমাধানের চাবিকাঠি মালিকদের হাতে। বিদেশি ক্রেতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক, কারখানামালিক-সবাই বলছেন, সমস্যা দূর হবে তখনই যখন এ খাতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। এ জন্য রাষ্ট্র ও সমাজেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা আবশ্যক। তবে তিন দশকে গড়ে ওঠা শিল্পের সব সমস্যার সমাধান তিন রাতে সম্ভব নয়, সেদিকটাও সক্রিয় বিবেচনায় রাখা উচিত।

স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, রানা প্লাজা ধসের পর শিল্পমালিকদের চিন্তার জগতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলেই মনে হচ্ছে। ইতিহাসের নৃশংসতম ও ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর বিজিএমইএ জাতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে। মজুরি বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কারখানার শ্রমনিরাপত্তায় আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো সুখবর পোশাক খাত অতীতে পেয়েছে বলে সাংবাদিক হিসেবে আমার অন্তত জানা নেই। অন্যদিকে সরকারও প্রশংসা পাওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পোশাক খাতকে সুরক্ষা দেবে। মজুরি বোর্ড গঠন, রানা প্লাজার ঘটনায় ভবন ও কারখানামালিকদের গ্রেপ্তার, কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে গতিশীল করার মতো পদক্ষেপে পোশাক খাতের প্রতি সরকারের আন্তরিকতা ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে ১৮ দিন ধরে যে যুদ্ধ দেশবাসী ও সরকার করেছে, এর সুফল অবশ্যই পোশাক খাত পাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলো যে দক্ষতা, ধৈয্য এবং প্রজ্ঞা দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দারিদার। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের চিরায়ত সহযোগিতার মনোভাবটিই ফুটে উঠেছে বিশ্বের সামনে।

প্রবাদ আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা শত শত সম্ভাবনার জন্ম দেয়।’ রানা প্লাজাও পোশাক খাতের সামনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ এবং হাজারো নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা কাজে লাগাতে পারলে কারখানামালিকদের মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। পোশাক খাতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে। বলে নেওয়া ভালো, রানা প্লাজা বা তাজরীনে যা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়, বরং এসব ঘটনাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড বলে স্বীকার করে নিতে হবে। এই প্রতিবেদকের কাছে অনেক কারখানামালিক স্বীকারও করেছেন, যে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত, তা এড়িয়ে না গিয়ে কাউকে বরণ করতে বাধ্য করা অবশ্যই হত্যাকাণ্ডের পযার্য়েই পড়ে। দুর্ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে এমন উপসংহারেই থামতে হয়।

হুমকিতে মেইড ইন বাংলাদেশ : ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগানটাই এ দেশের মানুষের জন্য অহংকারের। এই অর্জন এসেছে পোশাক খাতের হাত ধরেই। এ ক্ষেত্রে শিল্পসংশ্লিষ্ট লাখ লাখ শ্রমিক আর কয়েক হাজার উদ্যোক্তার কাছে বাংলাদেশ ঋণী। তিন দশকে দেশের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও শিল্প হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। সুশাসনের অভাব, দ্রুত ধনী হওয়ার বাসনা, অতিমাত্রায় ঠকানোর মানসিকতা, ঔদ্ধত্য এবং শিষ্টাচারের অভাবে পোশাক খাত নিজেই নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু উদ্যোক্তার লোভ-লালসায় জ্বলে ছারখার হচ্ছে নিজেদের হাতে গড়া সাম্রাজ্য। শত ঝুঁকি, পবতসম সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানে প্রশংসার বদলে অভিশাপ কুড়োচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এ জন্য কমবেশি সবাই দায়ী হলেও উদ্যোক্তাদের দায় সবচেয়ে বেশি। সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারে তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য এক বিভাজনের দেয়াল। পোশাক খাতে এ এক ক্লান্তিকর, গ্লানিময় সময়। তাই বলে থেমে গেলে কি চলবে, না সমস্যাগুলোকে আমলে নিয়ে সামনে এগোতে হবে? থেমে যাওয়াতে কোনো আনন্দ নেই, তাই এগিয়ে যেতে হবে সম্মিলিত ভাবে। খারাপ এই সময়ে পোশাক খাতের পাশে দাঁড়াতে হবে পুরো রাষ্ট্রকে।

আশির দশকে পোশাকশিল্প যাত্রা শুরু করেছিল বাসা-বাড়ি থেকে। তারপর এই খাতকে শিল্প হিসেবে দাঁড় না করিয়ে এর বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সরকার ও কারখানামালিক-কারও দায়ই কম নয়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পোশাক খাত। একসময় বাসা-বাড়ির কারখানাগুলো চলে এল অভিজাত ও বহুতল ভবনে। অথচ এসব ভবনের বেশির ভাগই শিল্প নয়, বাণিজ্যিক ভবন। দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় ভবনমালিকেরা দুর্নীতি আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ১০ তলার অনুমতি নিয়ে বানালেন ২০ তলা ভবন। এসব ভবনের ঝুঁকি বিবেচনা না করে, কারখানামালিকেরা নিজেদের করপোরেট রূপ দিতে উঠে গেলেন কাচে ঘেরা বহুতল ভবনে। আর মাটির শ্রমিককে তুলে নিয়ে গেলেন বহুতল ভবনে। রানা প্লাজা বা স্পেকট্রাম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অপরিণামদর্শী এমন পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দুঘর্টনা থেকে আমার কি কোনো শিক্ষা নিয়েছি? রানা প্লাজা হোক শেষ দুর্ঘটনা, এই কামনা সবার। কিন্তু রাজউকের পরিসংখ্যান বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা শুধু ঢাকাতেই প্রায় ১০ হাজার। এসব ভবনে রয়েছে শত শত কারখানা, অফিস, বাসা-বাড়ি, শপিং মল এমনকি হাসপাতাল। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা ভবনগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন, রাজউক এসব ভবনের বিরুদ্ধে হালকা মাত্রার অভিযান চালাচ্ছে। সাভারের দুর্ঘটনার পর থেকে কোনো ভবনের প্লাস্টারে ফাটল দেখলে ভয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন না শ্রমিক। অন্যদিকে, সময় মতো রপ্তানি আদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে কারখানাগুলো বসে যাবে, মালিক খেলাপিতে পরিণত হবেন, শ্রমিক কাজ হারাবেন। এতে বহুমাত্রিক এমন সমস্যা একসঙ্গে জেঁকে বসবে। এর আগেই অতিমাত্রায় সতর্কতার সুযোগ আছে। আর সেটাই হবে সবচেয়ে উত্তম।

রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা আর ঘটবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। ফলে, ব্যয়বহুল হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে কারখানাগুলোকে পযায়ক্রমে সরিয়ে নিতে হবে। শ্রমিক ও বিনিয়োগের নিরাপত্তায় শ্রমবান্ধব ভবন তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার শিল্পবান্ধব ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ করতে পারে। এলসি বা রপ্তানির ওপর থেকে নির্দিষ্ট পর্যায়ের টাকা আদায়ের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে। মুন্সিগঞ্জে পোশাকপল্লি নির্মাণের সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে হবে। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, ঢাকা থেকে পোশাক কারখানা না সরালে অস্থিরতা কোনোভাবেই কাটবে না। রাজধানীর বুকের ভেতরে শ্রমঘন এমন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়াই ছিলো ভুল। এতেই প্রমাণিত হয় সরকার ও ব্যবসায়ীদের দূরদৃষ্টির কতটা অভাব ছিল।

পোশাক খাতকে মুনাফার হাতিয়ার না ভেবে একে সত্যিকারের শিল্পের রূপ দিতে হবে। তা না হলে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নিয়ে গর্ব রানা প্লাজার মতো ধসে পড়বে, যার নিচে চাপা পড়তে পারে লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, স্বপ্ন, জীবন এবং বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান অর্থনীতি। ‘মনে রাখা ভালো, পশ্চিমা বিশ্ব চার দশক আগে বাংলাদেশকে “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলে আখ্যায়িত করেছিল। অথচ আজ তাদের বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠী শরীরের সঙ্গে মেইড ইন বাংলাদেশ সিল লাগিয়ে ঘুরতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতি পোশাকের লেভেলে মেইড ইন বাংলাদেশ সিল লাগানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং হচ্ছে, তা বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এই অর্জন ধরে রাখবে কি না, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের ওপর।’-এই মূল্যায়ন পশ্চিমা গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের শিক্ষক মার্থা চেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় বাস করা প্রচুর নারী কাজের জন্য কোনো মজুরি পেত না। এই নারীরাই একসম স্বেচ্ছায় দলে দলে পোশাকশিল্পে যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশের পোশাক খাত গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটা ছিল অসাধারণ একটা সুবিধা।

পোশাকের নিপুণ কারিগর হিসেবে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছে তা ধরে রাখার জন্য তাগিদ দিয়েছে স্বয়ং আমেরিকা সরকার। গণতন্ত্র ও ইউএসের সাবেক মানবাধিকার-বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি মিশায়েল পজনার ‘হাফিংটনপোস্ট’ নামক একটি পত্রিকাকে বলেছেন, ‘সময় এসেছে, বাংলাদেশ সরকার এবং শিল্পসংশ্লিষ্টদের একটি বিবেচনাবোধ তৈরির, যার মাধ্যমে তারা বিশ্ব বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ববোধের জায়গা ক্রেতা-উৎপাদক, শ্রমিক-সবার জন্যই সমান এবং ক্রিয়াশীল হতে হবে।’

দুষ্টচক্রে পোশাক খাত : বিগত প্রায় এক দশক ধরে দেশের পোশাক খাত একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে, হাজার হাজার উদ্যোক্তা, লাখ লাখ শ্রমিক, পোশাক খাতের সুবিধাভোগী অন্য আরও অনেক খাত-উপখাত এই চক্রে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে। এই বৃত্ত ভাঙতে না পারায় স্বস্তির জায়গা নিয়েছে উদ্বেগ ও ভয়। পোশাক খাতে এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট। এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, নীতি, অস্থিরতা, অতিমাত্রায় মুনাফার মানসিকতা, শিক্ষিত ও সৎ উদ্যোক্তার অভাব, অপেশাদারি ব্যবস্থাপনা, অদক্ষ শ্রমিক, শ্রমবান্ধব ট্রেড ইউনিয়ন না থাকা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব, অর্থনীতিবান্ধব কূটনৈতিক কৌশলের অনুপস্থিতি, কারণে-অকারণে শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানা ঘটনার শিকার পোশাক খাত এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি।

সপ্তাহ দুয়েক আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর কনসোর্টিয়ামের নির্বাহী কর্মকর্তা স্কট নোভা কথা প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, যেকোনো শিল্পের ত্বরিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের যাত্রায় অনেক দুবর্লতা থাকে। প্রবৃদ্ধির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক সময়ই মালিকেরা তা লক্ষ করেন না। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তা দৃশ্যমান হয় এবং এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটছে। শিল্পের সবচেয়ে শক্তির জায়গা হচ্ছে দক্ষ শ্রমিক। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক যেখানে যত ভালো, সেখানে সমস্যা তত কম।’

‘বাংলাদেশের পোশাক খাতের মালিকেরা বিপুল কর্মসংস্থান করলেও শুরু থেকেই শ্রমিকদের আস্থায় নেননি। একটা পর্যায়ে এসে শ্রমিকেরা মালিকদের প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে, শিল্পের অভ্যন্তরে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত অবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এই সুযোগটাই নিয়েছে বাংলাদেশের ভেতরের ছিদ্রান্বেষী মহল, প্রতিবেশী প্রতিযোগীরা। যত দিন পর্যন্ত চাকরিদাতা ও চাকরিজীবীর মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল থাকবে, তত দিন বাংলাদেশের পোশাক খাতের অস্থিরতা কাটবে না।’ একই সুরে কথা বলেছেন বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান শ্রমিকনেতা, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক।

কারণে-অকারণে শ্রমিক অসন্তোষ থামাতে হলে কারখানা চালান যেসব কর্মকর্তা তাদের অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মোটিভেশন দিতে হবে মালিকদেরই। পুলিশ, লাঠি, গুলি দিয়ে অসন্তোষ দমানো যাবে না। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, শ্রমিক অসন্তোষের বেশির ভাগ ঘটনার সূত্রপাত নন কমপ্লায়েন্স কারখানায়, যার শিকার সবচেয়ে ভালো কারখানাগুলো। বারবার কেন এমন হচ্ছে তার কারণ খুঁজতে হবে পোশাক খাতের গভীরে গিয়ে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে রাষ্ট্রের সমর্থন এবং শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও একই কথা বলেছেন। শ্রমিককে ক্ষুধার্ত রেখে যেমন পোশাকশিল্প তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না, তেমনি কারখানা ভাঙচুর বা আগুন দিয়েও সমস্যার সমাধান হবে না। তাই শিল্পের স্বার্থেই শ্রমিক-মালিককে আরও কাছাকাছি আসতে হবে।

পোশাকমালিক কারও কারও মধ্যেও একই উপলব্ধি সমান। মোহাম্মাদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক ফাইবারএনফ্যাশন নামক বিদেশি একটি পত্রিকাকে বলেছেন, ‘পোশাকশিল্পকে আলাদা করে নয়, সামগ্রিকভাবে বুঝতে হবে। এই খাতের অবকাঠামোগত সমর্থনের পাশাপাশি বিশ্বক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো দাম পাওয়ার নিশ্চয়তাও দরকার। প্রতিবছর শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো উচিত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। উৎপাদনকারীর মুনাফা থেকে এই টাকাটা দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদেরও দাম বাড়াতে হবে, যেন উৎপাদকেরা শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়নে ব্যয় করতে পারে।’

বিশ্বে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিযোগী হচ্ছে ভারত, কম্পোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস। এই দেশগুলো শ্রমিকদের বিষয়ে কীভাবে কাজ করছে, সেই শিক্ষা নেওয়া উচিত বাংলাদেশের। পোশাক খাত বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার, এমন সন্দেহ-অভিযোগ বারবার করা হলেও এখন পযর্ন্ত এর সপক্ষে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ জনসমক্ষে হাজির করতে পারেনি কেউ। যদিও এমন ধারণা দিন দিন প্রবল হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক ইন্ধনের প্রমাণ মিলেছে অনেকবার। কিন্তু অপরাধীরা কেউই শাস্তির মুখোমুখি হয়নি। ফলে, শ্রমিকের ছদ্মবেশে উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীদের আক্রোশের শিকার হচ্ছে পোশাক খাত।

 

অন্যদিকে শ্রম অধিকারবিষয়ক বেশ কিছু বিষয়ে কারখানামালিকদের অনেকেই নিয়মনীতি এবং শ্রমিকের প্রতি মালিক হিসেবে যে অঙ্গীকার তা রক্ষা করেননি। ফলে, এসব কারখানায় যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে, আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে পুরো খাত। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় মালিক সচেষ্ট না হলে, সরকার হাজার উদ্যোগ নিলেও অন্য কেউ এর সুরক্ষা দিতে পারবে না। বরং সম্পর্কের কানাগলি দিয়ে ইঁদুরের মতো ভেতর থেকে কেটে ফেলবে শিল্পের গোড়া। ফলে, কারখানার মালিক-শ্রমিক সুন্দর সম্পর্ক ছাড়া কোনোভাবেই দুষ্টচক্র ভেঙে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

আমেরিকা সরকারের সাবেক মন্ত্রীর উক্তিটি দুষ্টচক্র ভাঙার ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মিশায়েল পজনার মনে করেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের একটি বিবেচনাবোধে পৌঁছাতে হবে যেন তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। তিনি বলেছেন, দেশটির অবকাঠামো খুবই দুবর্ল। শ্রম ও শ্রমিকনিরাপত্তা আইনও খুব দুবর্ল। কোনো কোনো জায়গায় এগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। অন্যদিকে যতটা সম্ভব কম মূল্যে পোশাক উৎপাদন করতে বাংলাদেশকে মডেল ধরে অন্যদের এখানে আসতে উৎসাহিত করছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। এই দুবর্ল জায়গাগুলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলেই পোশাক খাতের উল্লম্ফন ঘটবে।

তাজরীন বা সাভারের মতো দুর্ঘটনার জন্য যে মূল্য দিতে হয়, তা বহন করার সামর্থ্য পোশাক খাত তো বটেই বাংলাদেশেরই নেই। শিল্প থাকলে, দুর্ঘটনাও ঘটবে। কিন্তু একে কত নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে, সেটাই হচ্ছে মৌলিক প্রশ্ন। বিদেশি ক্রেতা-কারখানামালিকেরা একটি জায়গায় একমত, তা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিদেশি ক্রেতারা যদি কোনো দিন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তা দুর্ঘটনার জন্য নয়, রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতার কারণেই নেয়। সাভারের ভবনধসের পর থেকে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশে সকলেই অতিমাত্রায় মনোযোগ দিলেও ব্যবসার খরচ কমাতে, বিদেশি ক্রেতার উদ্বেগ কমাতে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ, রাহাজানি, রাজপথে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলেও অর্থনীতিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কঠিন।

শিল্প যদি মানবিক হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক যদি ভালো না হয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে শিল্পকে গড়ে তোলা না যায়, সেই শিল্প দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে পারবে না, পারে না। সুতরাং যেসব ঘটনা ঘটে গেছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে মালিকেরা যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন, তবে অবশ্যই পোশাক খাত অর্থনীতির নায়ক হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।

অপরিণত গণমাধ্যম : বাংলাদেশের গণমাধ্যম গত দেড় দশকে রাষ্ট্রে বিশাল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও পরিমিতিবোধ প্রদর্শনে তারা বরাবরই ব্যর্থ। যেকোনো সংকট উত্তরণে গণমাধ্যম চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এখানেও তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলতার অভাবই দেখা গেছে। গণমাধ্যম অবশ্যই তথ্য গোপন করবে না, তা দেশবাসী প্রত্যাশাও করে না। কিন্তু খবর প্রকাশের স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতার পার্থক্য করতে পারার মতো দৃষ্টিভঙ্গি সকলেই আশা করে। সমাজের দর্পণ হিসেবে এটাই গণমাধ্যমের কাছে কাম্য। সাভারের ভবনধসের পর কেউ কেউ চমৎকার ভূমিকা রেখেছে। প্রতি মুহূর্তে জনগণকে তথ্য জানিয়েছে। আবার কেউ কেউ এঙ্ক্লুসিভ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় সাংবাদিকতার নীতি লঙ্ঘনের মতো অপরাধও করেছে। দুর্ঘটনার শিকার শত শত মানুষের লাশ দেখানো সাংবাদিকতার কোন নৈতিকতার মধ্যে পড়ে, সে প্রশ্ন অনেকেই তুলেছেন। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর আমেরিকান বা উন্নত দেশের গণমাধ্যমে লাশের ছবি দেখেছেন, এমন দাবি কেউ করতে পারবেন না। এর অর্থ এই নয় যে উন্নত দেশের গণমাধ্যম মানেই তারা আচার-আচরণ এমনকি দায়িত্বশীলতার দিক থেকে সব সময় উন্নত।

একটি সংবাদ প্রকাশে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটি আন্দাজ করার ক্ষমতা না থাকলে গণমাধ্যম তার ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হতে বাধ্য। তথ্য প্রকাশ প্রধান দায়িত্ব হলেও কোথায় থামতে হবে তা জানা আরও বেশি জরুরি। সবশেষ রানা প্লাজার সংবাদ প্রচারে গণমাধ্যম এ দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার সীমা ছাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক পোশাক কারখানার মালিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উঠে আসা এসব অভিযোগের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিজেও আংশিক একমত। কেননা, ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়া মানুষের মুখের কাছে টেলিভিশনের মাইক্রোফোন ধরে তার অনুভূতি জিজ্ঞেস করার মতো ‘অমানবিক’ আর কী হতে পারে? অথবা দেয়ালের নিচে চাপা পড়া অর্ধেক শরীর, এমন একজন শ্রমিক যখন বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে সাহায্য চাইছে, তখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কেমন আছেন বা কেমন লাগছে, কীভাবে ঘটনাটা ঘটল? সাংবাদিকতা কি এমন অমানবিকতা, বিকারগ্রস্ত প্রশ্ন করার অধিকার কাউকে দেয়? এই প্রশ্ন আমি নিজেকেই করেছি অনেকবার। প্রতিবার সাংবাদিক হিসেবে লজ্জা পেয়েছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনভাবে খবর প্রকাশ করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলেছে, আতংকগ্রস্ত করেছে। পোশাক খাতের শ্রমিকেরা এসব দৃশ্য দেখে উন্মত্ত ক্রোধে পাগল হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে।

বলে রাখা ভালো, সাংবাদিক হিসেবে কোনোভাবেই তথ্য গোপন করার পক্ষে নই। কিন্তু সাংবাদিক এবং নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি দায়িত্ব গণমাধ্যমকর্মীদেরও কম নয়। ফলে, সংবাদ পরিবেশন এমন হওয়া উচিত নয়, যা অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এর শিকার গণমাধ্যম হবে না, এই নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। গণমাধ্যমের অপরিপক্ব আচরণের প্রভাব হচ্ছে, অনেক বিদেশি ক্রেতা তাৎক্ষণিক বাংলাদেশে সফর বাতিল করেছেন। অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিলের খবর গণমাধ্যমেই এসেছে। এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদে ভোগ করতে হবে, যার দায় গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমাদেরও নিতে হবে।

পোশাকশিল্পের অনেক দুর্বলতা আছে সত্য, যার গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই কাম্য। মালিকেরা ঢাকার চেষ্টা করবেন, গণমাধ্যম তা তুলে ধরবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। আরেকটি বিষয় সবার উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন, এই পোশাকশিল্পের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের অন্যান্য খাত বিকশিত হয়েছে। কোনো কারণে পোশাক খাত আক্রমণের শিকার হলে তার প্রভাব অন্যান্য খাত তথা কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও হবে। এই কারখানামালিকদের অনেকেই টেলিভিশন-রেডিও-পত্রিকার মালিক। তাদের মূল ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পার্শ্বিক ব্যবসা ভালো থাকবে, সংবাদকর্মীরা ভালো থাকবেন, অর্থনীতির কোনো তত্ত্বই তা সমর্থন করে না। সবারই বুঝতে হবে, দুর্বলতা সত্ত্বেও ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করেছে পোশাক খাত। এদের ওপর নির্ভর করে কোটি কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান। শোষণ-প্রবঞ্চনা ভোগবাদের অন্যতম দিক হলেও লাখো মানুষের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা দিয়েছে যে শিল্প, তাকে আর যা-ই হোক বামন হিসেবে বিবেচনা করা নিজেদের অজ্ঞতা-অপরিণত দিকটাই সমাজের সামনে ফুটে ওঠে। এটা ঠিক, মালিকেরা কর্মসংস্থান তাদের স্বার্থেই করেছেন।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উচিত এ খাতের প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখা, যেন মালিকেরা যাদের রক্ত-ঘামে প্রতিষ্ঠিত তাদের সাম্রাজ্য সেই শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। অন্যদিকে গণমাধ্যমও এসব দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে শিখছে। ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে গণমাধ্যম পরিণত আচরণ করবে সেই প্রত্যাশা সবার।

ভয়ের কারণ নেই : সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে বিশ্ব ক্রেতারা। এ খাত নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এমন আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তিন দশকে নিজেদের চেষ্টা আর সরকারের সমর্থনে পোশাক খাত অর্থনীতির লাইফ লাইন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই শিল্পের শেকড় বাংলাদেশের অর্থনীতির এত গভীরে যে চাইলেই তা উপড়ে ফেলা যায় না, যাবে না। এইচ এন এম, ওয়াল মার্ট, হুগো বস, ইনডিটেঙ্, গুচি, মার্কস স্পেন্সার, গ্যাপ, প্রাইমার্ক, জে সি পেনি, কেরিফোর, আলটিমোসহ বিশ্বের সব খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো যা-ই বলুক না কেন, তারা বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না। এর পেছনে বহুবিধ কারণ আছে। তবে মুনাফাটাই আসল। মুনাফার হিসাব হয় অঙ্কে, আবেগে নয়। ফলে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক নিয়ে তারা যে মুনাফা করেন, তা দুনিয়ার আর কোনো জায়গায় সম্ভব নয়।

অনেকেই বলেন, সস্তা শ্রমের আকর্ষণেই তারা বাংলাদেশে এসেছে এবং থেকে যাবে। আমি মনে করি, এখানকার শ্রম সস্তা নয়, বরং প্রতিযোগিতায় সক্ষম। যা বিশ্ব পোশাক ক্রেতাদের এখানে টেনে আনছে। যদিও বাংলাদেশ ছেড়ে না যাওয়ার এটাই একমাত্র কারণ নয়। সময়মতো রপ্তানি আদেশ নেওয়া এবং পণ্য সরবরাহ করা, ব্যবসার প্রতি মালিকদের ভালোবাসা-আন্তরিকতা, কাজের প্রতি শ্রমিকদের অঙ্গীকার ও ভালোবাসা-এগুলো বিশ্ব ক্রেতাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোয় ক্রেতারা নড়েচড়ে বসেছে। নিজেদের ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষায় তারা পোশাকের আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হবে। যে কারণে কমপ্লায়েন্স কারখানার ব্যাপারে তারা মনোযোগী হবে।

যত দূর জানি, অনেক ক্রেতা শতভাগ কমপ্লায়েন্স কারখানায় রপ্তানি আদেশ দ্বিগুণ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। এতে সাবকন্ট্রাক্ট করা ছোট ছোট কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, অথবা বড় কারখানা মালিকেরা ছোট কারখানাগুলো কিনে নিয়ে কমপ্লায়েন্স করতে পারেন। এ ছাড়া অন্য কোনো শঙ্কা নেই। তবে দুর্ঘটনা-শ্রমিক অসন্তোষ সামাল দিতে না পারলে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে পোশাক খাত।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত এবং কম্বোডিয়া। যত দূর জানি, কম্বোডিয়াতে বর্তমানে ন্যূনতম মুজরি ৭৪ ডলার, যা বাড়ানোর জন্য সেখানকার শ্রমিকেরা আন্দোলন করছে। আর ভারতে ন্যূনতম মজুরি রাজ্য অনুযায়ী নির্ধারিত। এ হিসাবে প্রতিবেশী দেশটিতে মজুরি ৭ হাজার রুপি থেকে ১৫ হাজর রুপি। সেখানে বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি ৪০ থেকে ৪৩ ডলার, যা বেড়ে সর্বোচ্চ ৬০ ডলার হতে পারে। এর পরও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মজুরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। অর্থনীতির সূত্র মেনে বেশি মুনাফা যেখানে ব্যবসায়ী সেখানেই যাবে। ফলে, এই একটি জায়গায় অন্তত আরও অনেক অনেক বছর বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে এবং বিশ্ব ক্রেতাদের আকর্ষণ করবে।

বিশ্বখ্যাত সুইডিশ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কার্ল জোহান পারসনের একটি সাক্ষাৎকার বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি লন্ডনের ফিনানশিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি প্রতিবছর পযার্লোচনা করা উচিত। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আমরা বাড়তি মজুরি দিচ্ছি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মজুরি বাড়াতে প্রস্তুত। কিন্তু এর জন্য ভালো টেকসই দীর্ঘ মেয়াদি শ্রমিকনিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে।’ শুধু কার্ল জোহান নয়, তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিশ্বের অনেক ক্রেতা এবং শ্রমিক সংগঠন। ডিজনি ছাড়া বিশ্বের আর কোনো ক্রেতাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেনি। বরং বিশ্বের সব ক্রেতাই বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। ফলে, ভয়ের তো কোনো কারণ নেই-ই, বরং নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বের একনম্বর পোশাক বিক্রেতা দেশে পরিণত হতে পারে।

আমেরিকা, লন্ডন, সুইডেন, নরওয়ে, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, কানাডাসহ আরও কিছু দেশের পত্রপত্রিকা গত দেড় মাস ধরে বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন করেছে এবং করছে। কোথাও বাংলাদেশ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার কথা বলেনি ক্রেতারা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে পোশাক না কিনলে সমস্যার সমাধান হবে না। এতে দেশটির মানুষদের আরও দরিদ্র অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে। তা ছাড়া সমস্যা মোকাবিলা না করে অন্যত্র সরে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে, সমস্যাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা। ফলে, পোশাকে যেন রক্তের দাগের বদলে শ্রমিকের ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং এ খাতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন সবাই। এই সুযোগ বাংলাদেশ কাজে লাগাবে না পায়ে ঠেলবে, সেটা একান্তই সরকার এবং মালিকদের ওপর নির্ভর করছে।

দায় নিতে হবে ক্রেতাদের, বাড়াতে মালিক-শ্রমিকের দক্ষতা : বাংলাদেশের পোশাক খাতের আজকের নাজুক পরিস্থিতির জন্য ক্রেতাদের দায় ও তাদের স্থানীয় কার্যালয়গুলোর ভূমিকা নেহাত কম নয়। দিন দিন পোশাকের দাম কমাতে কমাতে ক্রেতারা কারখানামালিকদের এমন এক জায়গায় ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে সবার পক্ষে ফিরে আসা কঠিন। তার পরও কারখানামালিকেরা খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিকের মজুরি বাড়াতে হলে জীবনের নিরাপত্তা, সুন্দর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে মালিকদের বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে। ক্রেতা যদি প্রতিনিয়ত দাম কমাতে থাকে তবে মালিকেরা বাড়তি বিনিয়োগ কোথা থেকে করবেন, সেই প্রশ্ন তোলা উচিত। এ ক্ষেত্রে বিশ্বক্রেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা যদি তাদের মুনাফার দশমিক ৫ ভাগ বাংলাদেশের পোশাক খাতের কল্যাণে করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) হিসেবে ব্যয় করেন, তাহলেও পোশাকখাত রাতারাতি বদলে যাবে।

ব্যবসার ধর্ম মুনাফা হলেও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঠকানো কোনোভাবেই ব্যবসায়িক আদর্শের মধ্যে পড়ে না। বাংলাদেশের বিখ্যাত কিছু পোশাক কারখানার মালিক জানিয়েছেন, ক্রেতারা দাম কমাতে কমাতে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন যে, ব্যাংকের ঋণ ও সুদ পরিশোধ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, জেনারেটর খরচ, ফ্লোর ভাড়া দেওয়ার পর মুনাফা থাকে না। রপ্তানি প্রণোদনা, ঝুট, লেফট ওভার বিক্রি করে মালিকেরা টিকে আছেন। মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা না এলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। অন্যদিকে বেশ কিছু বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দর-কষাকষি করতে পারে না। একজন এক ডজন টি-শার্ট বানাতে ৫ ডলার দাম চাইল, অন্য একজন একই পণ্য বানিয়ে দিতে চাইছে ৪ ডলার বা তারও কমে। এখন ক্রেতা কার কাছ থেকে পোশাক নেবে?

সাংবাদিক হিসেবে এই প্রশ্নের উত্তর সত্যিই জানা নেই। ক্রেতাদের পরামর্শ দিলেন দর-কষাকষির দক্ষতা বাড়াতে হবে। ক্রেতা কেন বাড়তি মূল্য দেবে, সেই যুক্তি উৎপাদকের কাছে থাকতে হবে। ক্রেতা পোশাক নিয়ে ফেলে রাখবে না, বিক্রি করবে, এটাই তার ব্যবসা। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা পোশাক কিনবে, আর উৎপাদক বানাবে। কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দেবে না। ফলে, দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারলে অবশ্যই ক্রেতা বাড়তি মূল্য দিতে বাধ্য থাকবে। বাড়তি মূল্য বাংলাদেশের কেউ পাচ্ছে না এমন নয়। পাশাপাশি কাজ পেতে ব্যবসায়ীর অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে। এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ সমন্বিতভাবে কাটিং-মেকিংসহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে পোশাকভেদে ন্যূনতম একটি মূল্য ঠিক করে দিতে পারে, যার নিচে কোনো মালিক আদেশ নিতে পারবে না। কারখানামালিকেরাও স্বীকার করেছেন, মাত্র কয়েকটি গ্রুপ বাদে বাকি সবাই এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এটা থামাতে না পারলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।

অন্যদিকে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কম্বোডিয়ায় মাত্র ৪ লাখ শ্রমিক প্রতিবছর উৎপাদন করছে ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যাদের দক্ষতা বাংলাদেশের তুলনায় ২০০ গুণ বেশি। শ্রমিকেরা বেশি মজুরি পাবেন, এটা সমাজের সব অংশই প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাড়তি মজুরি নেওয়ার জন্য নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিতে হবে। শ্রমিক ভাইবোনদের বুঝতে হবে, কথায় কথায় রাস্তা অবরোধ, কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই দাবি আদায়ের একমাত্র পথ হতে পারে না। সহিংসতার মধ্য দিয়ে আতংক তৈরি সহজ হলেও নিজেদের দাবির ন্যায্যতা প্রমাণ করা কঠিন।

শ্রমিকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের অশোভনীয় আচরণ যেমন কারও কাম্য নয়, তেমনি খেটে খাওয়া মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়াও শোভনীয় নয়। এ ক্ষেত্রে পোশাকমালিকেরা ট্রেড ইউনিয়ন চালু করলে দু’পক্ষই লাভবান হতে পারে। শ্রমিকদের একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, একজন মালিক চাইলে ব্যবসা না-ও করতে পারেন। কারণ, তার খাওয়ার চিন্তা নেই, বাসাভাড়া দেওয়ার চিন্তা নেই। এমনকি বেঁচে থাকার জন্য যে অর্থ, তারও অভাব নেই। কিন্তু শ্রমিকের কাজ ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় নেই। যে কারখানা আপনার খাবার জোগাচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠান আপনাদের ক্রোধের আগুনে জ্বলে গেলে দিন শেষে আপনাদেরই লোকসান, মালিকের নয়। এখন মালিক যদি কমপ্লায়েন্স কারখানাকে গুরুত্ব দেয়, শ্রমিক তার উৎপাদনের দক্ষতা বাড়াতে পারে এবং ক্রেতাকে ব্যবসার প্রতি মানবিক করে তোলা যায়, তবে পোশাক খাত অন্তত আরও ৩০ বছর রাজত্ব করবে, এমন মন্তব্য চোখ বুজে করা যায়।

অর্থনীতির নায়ক, অর্থনীতির ভিলেন : ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি, কয়েক হাজার উদ্যোক্তা আর ৪০ লাখ শ্রমিক দিয়ে পোশাক খাতকে মাপলে ভুল হবে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগ আসে এই খাত থেকে। এতেও পোশাক খাতের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এ খাতকে দেখতে হবে সামগ্রিক অর্থনীতির বিচারে। পোশাক খাতের পিঠে চড়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। পশ্চাৎসংযোগ শিল্প হিসেবে আরও ৪০-৫০টি খাত গড়ে উঠেছে। এসব খাতেও হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। বাংলাদেশের সব ব্যবসার প্রবৃদ্ধি অর্জনে পোশাক খাতের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অবদান।

এ খাতের সবচেয়ে সুবিধাভোগী হচ্ছে ব্যাংকিং খাত ও পরিবহন খাত। পোশাক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংকিং আজ শক্তিশালী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাংকগুলো লাখ লাখ কোটি টাকার ব্যবসা করছে পোশাক খাতের কল্যাণেই। ট্রাক-উড়োজাহাজ, কাভার্ড ভ্যানের বড় গ্রাহক পোশাক খাত। সময়ের সাথে সাথে এ সবকিছুর দাম বেড়েছে, কমেছে শুধু পোশাকের উৎপাদনমূল্য।

পোশাক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ। অপরিণত বয়সে হাজার হাজার মেয়ে শিশুকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে পোশাক খাত। নারীকে মানুষ এবং শ্রমিকদের মর্যাদা দিয়েছে পোশাক খাত। এই নারীদের লক্ষ্য করে গড়ে উঠেছে চকবাজার, মৌলভীবাজারের নিম্নমানের কসমেটিকস, পাদুকা, টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জেরর শাড়ি, গামছাসহ হাজার হাজার ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। এমন হিসাব দিলে দেখা যাবে, অর্থনীতির এমন কোনো খাত নেই যেখানে পোশাক খাতের অবদান নেই। তার পরও এ খাতটি নায়ক থেকে ‘অর্থনীতির ভিলেন’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিজেদেরই ভুলে।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ