আবার যদি শুরম্ন করা যেত | সময় বিচিত্রা
আবার যদি শুরম্ন করা যেত
আনোয়ার সাদী
sha2

আবার যদি শুরু করা যেত, তাহলে আমি কি এই আমি হতাম। নাকি হতাম অন্য কেউ। অন্য কোনো মানুষ। কেমন হতো সেই মানুষটা। তার শরীর কি হতো পেশিবহুল? বাহুতে অনেক শক্তি! ভাবনা পেয়ে বসে আসলাম সাহেবকে। তিনি এখন জানেন, কৈশোর ও যৌবনে শক্ত পেশির শরীর দীর্ঘায়ু পাওয়ার একটা গোপন মন্ত্র। কোনো তান্ত্রিক এই মন্ত্র তাকে দেয়নি। তিনি জেনেছেন পত্রিকা পড়ে। সেখানে রাজনীতির বাইরে আরও অনেক কিছুই ছাপা হয়। তাই নিজের ছেলে যখন জিমে যাবার নাম করে মাস শেষে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নেয়, তাতে তিনি কিছু মনে করেন না। নিক। তার পরও সমস্যাবহুল এই পৃথিবী অনেক দিন ধরে দেখুক।

আসলাম সাহেবের পেশি শক্ত নয়। এমনকি শক্ত নয় তার হাড়ও। নিজের ওজন বইতে গিয়েই হাড় ক্লান্ত্ম হয়। সেটা নতুন নয়। পঁয়ত্রিশ পার হবার পর থেকে অনেকেই বারবার বলেছে ওজন কমান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। কিন্তু তিনি তা পারেননি। আসলে ক্ষুধার কাছে হার মানতে তার লজ্জা হয়নি কখনো। বরং ভালোই লেগেছে। এই ভালো লাগা যে এত যন্ত্রণায় পরিবর্তিত হবে তা ভাবতেও পারেননি তিনি। যদি ভাবতে পারতেন,তাহলে কি অন্য রকম হতো তার জীবন? আবার যদি প্রথম থেকে শুরু করা যেত তাহলে কি তা ভাবতেন আসলাম সাহেব?

আসলাম সাহেবের বাড়ি ছিল নদীর ধারে। রাতে নদীর ওপর বয়ে যাওয়া শোঁ শোঁ বাতাসে ভর করে ঘুম নামত চোখে। সকালে ভেজা ভেজা বাতাসের মোলায়েম পরশে ভাঙত তা। মুখ না ধুয়েই তিনি ছুটে যেতেন নদীর ধারে। বসতেন নোঙর করা কোনো ডিঙি নৌকায়। তারপর তাকিয়ে থাকতেন পানির দিকে। অবিরাম ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকায় কোনো ক্লান্ত্মি আসত না। বরং পানির বয়ের যাওয়া দারম্নণ আমোদের মনে হতো তার। সে কাজ অবশ্য বেশি দিন করা হয়নি আসলামের। কারণ তার মা। বলতেন, নদীর কোনো কিনারা নাই। কূল নাই। এই অসীম জলরাশির দিকে সকালেই তাকিয়ে থাকা ভালো না। জীবনে কূল-কিনারা হবে না। এরপর আর নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা হয়নি তার, এত মনোযোগে, এতটা সময় ধরে। কূল-কিনারাহীন জীবন তার পছন্দ নয়। কী হতো যদি পরদিনও নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত আসলাম? দিনের পর দিন। কী হতো তার? না হয় হতো না পড়া। হতো না সরকারি চাকরি, বড় বিখ্যাত পরিবারে বিয়ে, এক সন্ত্মানের বাবা, সোসাইটি মেইনটেইন আর ব্যাংকে জমানো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। না হয় জীবন কেটে যেত জলের টানে, ডিঙির বৈঠায় ভর করে। কোনো দূর থেকে উড়ে এসে আচমকা মাছ তুলে নেওয়ার মাছরাঙার দক্ষতা আর মাছরাঙার ঠোঁটে জ্যান্ত্ম মাছের নড়াচড়া দেখে কেটে যেত সময়। সোনালি সন্ধ্যায় কোনো এক গ্রামের প্রান্ত্মে উঠানে চাঁদের আলোয় দেহতত্ত্বের গানের টানে মগ্ন হয়ে আকাশের রহস্য বোঝার চেষ্টায় কাটত দিন। সে জীবন কি তার হতো? আবার যদি শুরু করা যেত! আবার যদি ফিরিয়ে আনা যেত মায়ের ডাকে ভাঙা ঘুমের অলস সকাল। এবার নদীর ধারে যেত আসলাম। তাকাত নদীর দিকে। এক জীবনে কূল দিয়ে কী হবে কিনার দিয়েই বা কী হবে? আবার যদি শুরু করা যেত প্রথম থেকে! অ আ ক খ থেকে। রোদ একটু চড়লে বটতলায় গ্রামের একমাত্র পণ্ডিত কাম কৃষকের পাঠশালায় আদর্শলিপি পড়া। লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি

সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।

আসলামের মন বিষণ্ন হয়। চোখ হয় ঝাপসা। বুকে জমে হাহাকার। পায়ের ব্যথা বাড়ে। হাত অবস্থান করে কপালে। বিড়বিড় করে, মা, তোমার পছন্দের জীবনে দেখো আমি কেমন আছি। আসলাম এটাও জানে, তার মা এই ডাক শুনবে না। ডাক শোনার মতো জাগতিক বাঁধন তিনি ত্যাগ করেছেন অনেক আগেই। আসলাম তখন আমেরিকায়। প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পাড়ে। যেখানে যেতে বারো ঘণ্টা বসে থাকতে হয় উড়োজাহাজে। আকাশের বুকে। নিচে কেবল থোকা থোকা মেঘ। সামনে দিগন্তহীন শূন্যতা। মাঝে মাঝে কাঁপে সে উড়োজাহাজ। মনে হয় কারও ডানার ধাক্কা খেয়ে গুঁত্তা মারে বাতাসে। আবারও স্থির হয় তা। তার পেটের ভেতর থাকা মানুষেরা ঘুমায়। পান করে। দেখে চলচ্চিত্র। ভাবে, এই বুঝি থেমে গেল সব। নড়ছে না কিছু। সব থেমে আছে। আর তখনি উড়োজাহাজ থেকে নেমে যেতে ইচ্ছা হয় মানুষের। আমেরিকা পৌঁছানোর আগে অন্তত এমনটাই মনে হয়েছিল আসলামের। এই পথ পার হয়ে সে ফিরতে পারেনি। অথচ তখন ফাঁকি দিয়ে চলে গেল মা। বৃত্তির টাকায় দেশের ফেরার সংগতি ছিল না। আবার যদি শুরু করা যেত, আসলাম কি ফিরে আসত? লুঙ্গি-পাঞ্জাবির সঙ্গে মাথায় কিস্ত টুপি দিয়ে চলে যেত ঈদগাহের মাঠে। দাঁড়াত জানাজার সামনের কাতারে। কাঁধে নিত মায়ের মরদেহ। আবার যদি শুরু করা যেত তাহলে কী করত আসলাম? এটাই কি তবে কিনার, এটাই কি তবে কূল? এই জীবনের নামই তবে সামনে এগিয়ে যাওয়া! এই জীবনের নাম তবে সাইন করা?

আবার যদি শুরু করা যেত তবে কি কছমালির দোকান থেকে ফাৎনা চুরি থামাত আসলাম। কছমালি মালি নয়। নাম তার কছম আলি। মানুষের মুখে মুখে এখন তা কছমালি। আকিকার সময় হয়তো তার নাম ছিল কাসেম আলী। তাতে কী, লোকের মুখেই টিকে থাকা। লোকের মুখে হারিয়ে যাওয়া। আকিকা দেওয়া আদুরে নাম টিকে নাই। টিকে ছিল কছমালি। আর টিকে ছিল তার টং ঘর। খালের ওপর। কাঠ দিয়ে বানানো। কায়দা করে বাইরে থেকে জানালা খোলার বিদ্যা আয়ত্তে এসেছিল আসলামের। সেই বিদ্যা কাজে লাগাতে আলস্য ছিল না তার। ফলে, বন্ধুদের সবার বড়শি ছিল। ছিল ময়ূরের পাখ লাগানো ফাৎনা। কেবল ছিল না বড়শি বাড়ি নেওয়ার সাহস। তার নিজেরটা কিংবা বন্ধুদেরটি। ওগুলো গার্লস স্কুলের পেছনে হিজলের ঝুপে লুকানো থাকত। বড় হয়ে লুকানোর বিদ্যা ভালোই রপ্ত করেছে আসলাম। এনবিআর, দুদক চিনে সে। হিজলের ঝোপের মতোই পরিচিত তা। আবার যদি শুরু করা যেত তাহলে কছমালির দোকানে কি খুব যেত সে? সে দোকানে না যাওয়া মানে সব বন্ধুর বড়শি না হওয়া। বড়শি না হওয়া মানে বর্ষায় ঝাঁকে ঝাঁকে পুঁটি মাছ ধরার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়া। আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা মানে বন্ধুদের সমীহবঞ্চিত হওয়া। সমীহবঞ্চিত হওয়া মানে যেকোনো সাধারণ জীবন। যেকোনো সাধারণ জীবন হলে ঢাকায় দুটি বাড়ি, রাজধানীর উপকণ্ঠে একটা বাগানবাড়ি কোত্থেকে আসবে? আবার যদি শুরু করা যেত তাহলে কছমালির টংঘরের জানালা গলে বড়শির সামগ্রী নিজের মনে করে আনা বন্ধ করত কি আসলাম? ছোটবেলার একটা চুরি মানে ভবিষ্যতে এত সম্পদ! মা তো তাহলে ঠিকই বলত-নদীর দিকে এভাবে আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকিস না, আসলাম। জীবনের কূল পাবি না। আসলাম যদি তাকিয়েই থাকত তবে তার কি হতো অভাবের সংসার? এখন কি সে বসে থাকত কোনো গঞ্জের বাজারে! কোনো বটগাছের নিচে। ঠোঁটে কি থাকত কম দামি সিগারেট? সমাজের অসংখ্য নাম না জানা মানুষের কোনো একজন? আবার যদি শুরু করা যেত আসলাম কি তা হতে চাইত? আসলাম নদীর কাছ থেকেও নিয়েছে। সে নিয়েছে মাছ। নিয়েছে বর্ষায় ফুটে থাকা শাপলা, নিয়েছে পূর্ণিমার রাতে নৌকায় বসে জলের সঙ্গে জোছনার মিশে যাবার অপার্থিব দৃশ্য দেখার মানবীয় আনন্দ। নিয়েছে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে শরীর আনচান করার দারুণ এক অনুভূতি। আবার যদি নতুন করে শুরু করা যেত আসলাম কি এড়িয়ে যেত এ জীবন?

আবার যদি শুরু করা যেত আসলাম কি যেত নতুন জেগে ওঠা চরে। সেখানে বালুর বুকে লুকিয়ে ছিল বাদাম, আলু, কৃষকের ঘাম, মাঝির পায়ের শব্দ, জলের কলকল বয়ে চলা আর অশ্বত্থের ছায়া। সে ছায়ার নিচে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেওয়ার সুখ। খুব ভয়ে সিগারেটে প্রথম টান। ধোঁয়া ছেড়ে খুকখুক করে কাশা। নাকে সামান্য জ্বলুনি। চোখ ভিজে যাওয়া। ছিল নিজের কাছে নিজের শপথ করার দুর্দান্ত সাহস। আর শপথ ভেঙে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে আচ্ছন্ন করার বিদ্যা কি প্রচ্ছন্নভাবে সেই চর থেকেই শিখে এসেছিল আসলাম? আবার যদি শুরু করা যেত জীবন তবে কি আসলাম যেত সেই চরে। নিজেকে শপথের সুতোয় বেঁধে আবার সেই সুতা ছিঁড়ে সাহিত্য থেকে বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝাত আসলাম, বলত, মানুষ প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভেঙে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জন্য। সে কি যৌবনের শপথ ভেঙে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পেরেছে? যদি সেই শপথ মেনে নিজেকে অটুট রেখে এক নৈতিক জীবন কাটাত আসলাম তবে? আজকেরও এই দিন, মানুষের মনোযোগ সে কি পেত? তবে সব কি নতুন করে শুরু করা যেত না? ভাবে আসলাম, তার চোখ বেয়ে নামে কয়েক ফোঁটা পানি।

কান্দেন ক্যান, স্যার? অপারেশন ভয়ের কিছু না।

নার্সের কথায় বর্তমানে ফিরে আসলাম। কথার জবাব দেয় না। কেবল অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। নার্স পর্দা সরিয়ে হাসপাতালের ক্যাবিনকে আরও আলোকিত করে।

অপারেশন মেজর। কিন্তু আমরা এই হাসপাতালে হরদম এই অপারেশন করি। আর আপনার সমস্যা তো অনেক আগের। ডায়াবেটিস ছিল। যত্ন নেওয়া দরকার ছিল। একটু হাঁটা, একটু উদ্বেগবিহীন জীবন কাটালে বাঁচানো যেত পা। আর গ্যাংগ্রিনটা একটু বাজে রকমের। আমরা চেষ্টা করেছিলাম মিস্টার আসলাম, কিন্তু সরি। কাল সকালেই অপারেশন করতে চাই। বস্নাড রেডি রাখতে হবে। ভালো হয় আত্মীয়ের কারও রক্ত নিলে। কী দিন যে পড়ল, এখন নেশাখোররা মাদকের টাকা সংগ্রহের আশায় রক্ত বেচতে আসে।

ডাক্তারে কথা অর্ধেক শুনে আর অর্ধেক শুনে না আসলাম। তবু সে বুঝতে পারে, পা তার বাঁচবে না। একটা পা মানে তার শরীরের কত ভাগ? কাটা পা’টা কী করবে ডাক্তাররা? কীভাবে কাটে পা। কোন শৈশবে এই প্রশ্নটি করেছিল এক ভিক্ষুককে। দুটি পা ছিল না তার। হাতে অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জমানো চাল। তাতে গুঁজে রাখা টাকা। কোত্থেকে তাদের গ্রামে আসত লোকটা? নিজের শরীর টানতে টানতে, এখনো জানে না আসলাম। আসত মাসে একবার। সে জানতে চাইত, কী করে হারাল পা? বলত না লোকটা। শেষে একদিন গ্রামের শেষ মাথা পযর্ন্ত পঙ্গু লোকটির পেছনে পেছনে যায় আসলাম।

কীভাবে হারাল পা?

ভাইজান, আমার ইয়াদ নাই।

ইয়াদ না থাকলে বিপদ। এক হাতে ভিক্ষার বাটি তুলে নেয় আসলাম। এক মুঠ চাল ছড়িয়ে দেয় পাটখেতে।

দোহাই লাগে, আমি ভিক্ষুক মানুষ, আমার চাইল ফেইলেন না, ভাইজান।

তাইলে বলেন, কোথায় গেল আপনার পা?

আমার ইয়াদ নাই।

তাইলে এই দেহেন, আরেক মুষ্ঠি চাল ছড়িয়ে পড়ে ধুলায়।

হাহাকার বন্ধ করে লোকটা। তাকিয়ে থাকে আসলামের মুখের দিকে। সেখানে ঝিলমিল হাসি। সেই হাসি নদীর ঢেউয়ের মতোই বহতা। তার হাতে আরও চাল। মাধ্যাকর্ষণের সূত্র মেনে চাল নামে নিচে। গড়াগড়ি খায় ধুলায়।

আসলামকে পেছনে রেখে এগিয়ে যায় ভিক্ষুক। তার মুখে কথা নেই। দুই হাতে ভর করে সে এগিয়ে চলে খেয়াঘাটের দিকে। পেছনে পেছনে যায় আসলাম। বলে, এই নাও মিয়া তোমার চাইল। এই নাও তোমার টাকা।

লোকটা সে টাকা বা চালের জন্যে অপেক্ষা করে না। পায়ের অভাব মেটাতে দুই হাতে হাঁটে সে। বাড়ায় গতি। পেছনে ভিক্ষার বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বালক আসলাম।

আবার যদি সব শুরু করা যেত, আসলাম কি জানতে চাইত সেই পঙ্গু ভিক্ষুক কীভাবে হারাল তার পা? আবার যদি নতুন করে জীবন শুরু করা যেত তাহলে সে কি এই জীবনই বেছে নিত, নাকি সে জীবন হতো অন্য রকম? যদি অন্য রকম হতো তবে তা হতো কেমন!

রাত বাড়তে থাকে। নার্স ঘুমের ওষুধ দেয়। আসলাম সাহেবকে মনে করিয়ে দেয়, কাল অপারেশন। হাসপাতালের বাইরে বাতাসে দোলে একটা কদমগাছ। তাতে ধরে আছে থোকা থোকা কদম ফুল। সেদিকে মনোযোগ নেই আসলামের। ঘুমের ওষুধ কাজ করতে শুরু করে। সামনে দাঁড়ানো নার্সকে ঝাপসা ঝাপসা লাগে তার।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ