সয় না, আশরাফুলের কান্না | সময় বিচিত্রা
সয় না, আশরাফুলের কান্না
নাজমুল আশরাফ
s2

খেলাধুলার বিষয়ে আমার অজ্ঞতা আর অনাগ্রহের কথা আমার বন্ধু-স্বজন-সহকর্মীদের অনেকেই জানেন। সে জন্য আমাকে অনেকবারই লজ্জায় পড়তে হয়েছে। এখনো পড়তে হয়। দুনিয়াতে যত বিষয় আছে তার মধ্যে খেলাধুলার খবর আমি সবচেয়ে কম রাখি, খেলা দেখিও কম, বুঝিও কম। ফুটবল-ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলার বিষয়েও আমি প্রায় মূর্খ। আমার ছেলে এমনকি ছোট মেয়েটাও আমার চেয়ে বেশি জানে, বোঝে। এ নিয়ে আমার কোনো দুঃখ নেই, লজ্জাও নেই। সবাইকে সবকিছু জানতে ও বুঝতে হবে কেন? খেলাধুলা সম্পর্কে নিজের মূর্খতার কথা বললাম আশরাফুলকে নিয়ে দু-চারটি কথা বলার জন্য।

দেশের হোক, বিদেশের হোক; ফুটবল হোক, ক্রিকেট হোক; আমাদের ছেলেমেয়েরা খেলুক বা অন্য দেশের ছেলেমেয়েরা-আমাকে কোনোটাই খুব বেশি টানে না। টানে না মানে, অনেকের মতো আমার মধ্যে সেই পাগলামিটা আসে না। বিশ্বকাপ ফুটবল বা ক্রিকেট তো বটেই, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ যেখানেই খেলার আসর বসুক না কেন, অন্য সবার মতো সাংবাদিকেরাও উৎসব, উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনায় মেতে ওঠেন। আর দেশের মাটিতে হলে তো কথাই নেই। এমন সহকর্মীদের যন্ত্রণায় বার্তাকক্ষে আমার কাজ করা কঠিন ছিল। অনুরোধ-উপরোধ, হুমকি-ধামকি-কোনো কিছুতেই কাজ হতো না। শেষমেশ খেলাপাগল সহকর্মীদের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হতো। বিশ্বকাপ ফুটবল হলে আমি টুকটাক দেখি। অনেক সময় দেখতে বাধ্য হই। বাসায় বা অফিসে সবাই যখন খেলা দেখা নিয়ে মেতে ওঠেন, আমার তখন কিছুই করার থাকে না। এভাবেই শুরু হয় আমার ক্রিকেট খেলা দেখা। তবে আগ্রহ নিয়ে ক্রিকেট দেখতে শুরু করি যখন বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতেছিল। এর পর থেকে আর কিছু না দেখলেও বাংলাদেশ যখনই ক্রিকেট খেলে, সাধ্যমতো তা দেখার চেষ্টা করি। দেখতে না পারলেও খবরটা রাখি। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ যতবার জিতেছে বা ভালো খেলেছে, ততবারই আমি ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে অনুভব করেছি, নিজের দেশপ্রেমকে জাগ্রত করেছি; বাঙালি হিসেবে, বাংলাদেশি হিসেবে গববোধ করেছি; গরিব দেশের গরিব মানুষ হওয়ার দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে বের হতে চেষ্টা করেছি। ক্রিকেট আমার কাছে কোনো খেলা নয়; ক্রিকেটকে আমি দেখি নিজেকে আবিষ্কার করার, উপলব্ধি করার, আত্মমর্যাদা বাড়ানোর, মাথা উঁচু করার সবচেয়ে কাযর্কর হাতিয়ার হিসেবে।

আমি বিশ্বাস করি, ক্রিকেট বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আমার মতোই অনুভূতি তৈরি করেছে। গোটা দেশের জন্য আনন্দের অনেক বড় উপলক্ষ এনে দিয়েছেন আমাদের ক্রিকেটাররা। রাজনীতিবিদেরা যখন বারবার আমাদের মুখে চুনকালি দেন, সামরিক-বেসামরিক আমলারা যখন সুযোগ পেলেই জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নেন, ব্যবসায়ীরা যখন দেশের সম্পদ লুটেপুটে খান, দুর্নীতিবাজেরা যখন সম্পদ পাচার করেন, পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীরা যখন লুটেরা শ্রেণীর দালালিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন এই ক্রিকেটাররাই আমাদের বারবার আশার আলো দেখান; শত কষ্টের মাঝেও আমাদের একটু স্বস্তি এনে দেন ক্রিকেটের সোনার ছেলেরা। মানছি, এমন সব অর্জনের পেছনে অনেকেরই অবদান আছে। সেসব দিকে না গিয়ে সরাসরি খেলোয়াড়দের কথাই বলি। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের হয়ে যারা, যখন, যেখানেই ক্রিকেট খেলেছেন, তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, ক্রিকেটার আশরাফুল সত্যিই এক বিস্ময়। অসাধারণ নৈপুণ্য ও সাফল্য ছাড়াও এই বিস্ময়বালকের প্রতি আমার বাড়তি আগ্রহের তুচ্ছ কয়েকটি কারণ আছে। এক. আশরাফুলের মতো ছেলেরাই বাংলাদেশি হিসেবে আমাকে বারবার গবির্ত করেছে। দুই. এই আশরাফুলরাই আমাকে একটু হলেও ক্রিকেটপ্রেমী করেছে, খেলার প্রতি আমার অনীহা দূর করেছে। তিন. তার কথাবার্তায় একটা নির্ভেজাল সরলতা আছে। চার. আশরাফুল আমাদের মতোই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ওঠে এসেছে। পাঁচ. বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে আশরাফুলের আলাভোলা বা অতি সাধারণ মানুষের মতো কথাগুলো আমার মনে ধরেছে। বেশ কয়টা অনুষ্ঠানে আমি তাকে গান গাইতে শুনেছি। মান যা-ই হোক, শুনতে আমার ভালো লেগেছে। ছয়. সাংবাদিকদের কাছে তার কথা বলা আমার কাছে সব সময়ই সহজ-সরল মনে হয়েছে। সাত. আশরাফুলের সাথে আমার নামেরও একটা মিল আছে। ফলে, তার সাফল্যে আমারও ভাগ আছে বলে সব সময়ই মনে করেছি।

আশরাফুলের এই দুর্দিনে আমার অনেক কষ্ট লাগছে। যদিও তার সাথে আমার কোনো দিনই দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। টিভি ক্যামেরার সামনে আশরাফুলকে কাঁদতে দেখে আমিও একই কাজ করেছি। তাকে নিয়ে যতগুলো খবর দেখেছি, শুনেছি, পড়েছি, ততবারই আমার চোখ ভিজেছে। কথিত কেলেংকারির কারণে আশরাফুলের এই বিপদ নিয়ে নিজের অনুভূতি লিখতে গিয়ে আমি আবেগ লুকাতে পারছি না। আমি জানি, সাংবাদিক হিসেবে আশরাফুলের প্রতি আমার এমন পক্ষপাত ঠিক নয়। স্বীকার করি, অপরাধ প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত; এবং সেটা ক্রিকেটের স্বার্থেই। তবু তো আমরা মানুষ, তাও আবার বাঙালি; আবেগই যাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়েই কিন্তু আমরা সবকিছু অর্জন করেছি। আমাদের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অগ্রগতি-সব অর্জনের পেছনেই আবেগ ছিল আমাদের প্রধান অস্ত্র। বাড়াবাড়ি রকমের আবেগ না থাকলে কি শ্রমিক-কৃষক-মজুরেরা বিশ্বসেরা সৈনিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারত? আবেগ না থাকলে কি আমরা দেশটাকে পাগলের মতো ভালোবাসতে পারতাম? আবেগ না থাকলে কি শত অপরাধের পরও রাজনীতিবিদদের ডাকে সারা দিতাম? যারা আমাদের বারোটা বাজায়, তাদের কথাই বারবার বিশ্বাস করতাম? তাদের পেছনেই ছুটে যেতাম? যারা আমাদের ঠকায়, দেশ ও মানুষ নিয়ে ব্যবসা করে, তাদের যদি ক্ষমা করে বুকে টেনে নিতে পারি, ভালোবেসে তাদের জন্যই জীবন দিতে পারি, তাহলে আশরাফুলের জন্য এই কাজটা কেন একবারও করতে পারব না? আশরাফুল তো অনেক দিয়েছে আমাদের। চলুন না এবার আমরা তাকে কিছু দিই, বিপদে তার পাশে দাঁড়াই। আশরাফুলের কান্না আর সইতে পারছি না। আমার এই কষ্টটা আর বইতে পারছি না। এই আবেগ যারা মানতে পারবেন না, তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ