মহানায়ক থেকে খলনায়ক আশরাফুল! | সময় বিচিত্রা
মহানায়ক থেকে খলনায়ক আশরাফুল!
সাহাদাৎ রানা
s1

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আলোচিত চরিত্রের নাম মোহাম্মদ আশরাফুল। ব্যাট হাতে বোলারদের পিটিয়ে সীমানা ছাড়া করার জন্য নয়, স্পট ফিক্সিংয়ে নিজের জড়িত থাকার বিষয় স্বীকার করে আজ তিনি খলনায়ক। অথচ বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে মহানায়কের তালিকা রয়েছে, তার প্রথম সারির নামটি হলা আশরাফুল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ আশরাফুল নায়ক থেকে বনে গেলেন খলনায়ক। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

 

স্পট ফিক্সিং বিষয়ে আশরাফুলের স্বীকারোক্তি

বেশ কয়েক দিন ধরেই ম্যাচ ফিক্সিং বিষয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশের কয়েকজন ক্রিকেটার ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এমন খবরও হাওয়ায় ভাসছিল। সেই পালে হাওয়া লাগে দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে আশরাফুলসহ অন্য তিন ক্রিকেটার জড়িত এমন খবরে। আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসু) কাছে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন আশরাফুল। এরই মধ্যে আকসুর কাছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে স্পট ফিক্সিংয়ের সঙ্গে নিজে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকারোক্তিমূলক দেন তিনি। পাশাপাশি আরও কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িত বলে আকসুর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন আশরাফুল। এমন খবরও প্রকাশ করে দৈনিকটি।

এই সংবাদের পর তোলপাড় শুরু হয় সবখানে। আর বিষয়টি বিসিবির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বাতাসে গুঞ্জন রটে যায়, নিষিদ্ধ হতে পারেন সবার প্রিয় আশরাফুল।

 

নিষিদ্ধ হলেন আশরাফুল

গুঞ্জনকে সত্যি প্রমাণ করতে বেশি সময় নেয়নি বিসিবি। পাতানো খেলা (ম্যাচ ফিক্সিং) নিয়ে আইসিসির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক খেলায় আশরাফুলের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আর আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসু) চূড়ান্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আশরাফুলের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি।

তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যাবে না বলে উল্লেখ করেন বিসিবি সভাপতি। কিন্তু আশরাফুল যেহেতু জড়িত থাকার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তাই তার ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলো বলে জানালেন তিনি। আর সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি কঠিন ভাষায় জানিয়ে দেন, ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিং বিষয়ে বোর্ড খুবই কঠোর। তাৎক্ষণিক ‍ আশরাফুলের ওপর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিসিবি তাদের সেই কঠোর অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার করল বলেও জানান পাপন।

 

আমাকে মাফ করে দিন : আশরাফুল

এমন কান্না-কান্না চেহারার আশরাফুলকে কখনো দেখেনি তার কোটি কোটি ভক্ত। প্রতিপক্ষ বোলারদের ছাতু বানিয়ে জাতির সামনে নিজের ব্যাট যিনি বারবার তুলে ধরেছেন, সেই আশরাফুল জাতির সামনে এভাবে হাজির হবেন, কেউ হয়তো কল্পনাতেও ভাবেননি। কিন্তু এটাই সত্যি। লক্ষ-কোটি সমর্থকের কাছে উপস্থিত হন এক অন্য আশরাফুল। যাকে এভাবে কেউ কোনো দিন ভাবেনি। ৫ জুন নিজের কৃতকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন স্পট ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত জাতীয় দলের ক্রিকেটার আশরাফুল। বনশ্রীস্থ নিজের বাসায় সাংবাদিকদের কাছে বিসিবির নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। আশরাফুল জানান, ১২ বছরের ক্যারিয়ারে যে কয়েকটি ভুল করেছেন তা তিনি আকসুর কাছে স্বীকার করেছেন। তার অন্যায় কর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান। আশরাফুল বলেন, ‘আমার অনেক ভক্ত ছিল, অনেক মানুষ আমাকে ভালোবাসত। আমি তাদের ঠকিয়েছি। আমি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ব্যাপারে আকসুর কাছে যা বলেছি, তা সত্য।’ তাকে এসব কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলেও জানান আশরাফুল।

 

ক্ষমা চেয়ে উদাহরণ হলেন অ্যাশ

বিশ্ব ক্রিকেটকে কাঁপিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকে টেস্ট সেঞ্চুরি করে জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি এসেছেন ক্রিকেটে নতুন কিছু দেওয়ার জন্য। দিয়েছেনও। যা এর আগে তার মতো করে কেউ পারেনি। ভুল করে সেই ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে উদাহরণ হলেন সবার কাছে। আর তিনি প্রমাণ করলেন আশরাফুল আসলেই ব্যতিক্রম।

 

এখন প্রশ্ন হলো, কী শাস্তি হতে পারে এই ব্যাটিং জিনিয়াসের। আপাতত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হবেন তিনি। তবে আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসু) কাছে নিজের দোষ স্বীকার করায় শাস্তির পরিমাণটা কম হতে পারে। আশরাফুলের শাস্তি হবে এটাই স্বাভাবিক। অপরাধীর শাস্তি হওয়া উচিত। এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্পট ফিক্সিং-সংক্রান্ত বিষয়ে কি আশরাফুল একাই জড়িত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না। একা জড়িত থাকার কোনো কারণও নেই। শীর্ষ দৈনিকে আশরাফুলসহ তিন সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট ও মোহাম্মদ রফিকের নাম এসেছে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তিনজনই মিডিয়ার কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তাহলে কে দোষী! শুধু কি আশরাফুল একা। কখনোই নয়। যে জুয়াড়ির কাছ থেকে টাকা খেয়ে আশরাফুল খারাপ খেলেছেন, সে জুয়াড়ির সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন কে? জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা কঠোর নিয়মকানুনের মধ্যে থাকেন। তাদের সাথে সবার পরিচয়ের সুযোগ খুবই কম। তার মানে আশরাফুলের সঙ্গে জুয়াড়ির পরিচয় কেউ না কেউ করিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কে সে। আশরাফুলের দাবি, সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জুয়াড়ির সঙ্গে। আশরাফুলের দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে এখানে কি আশরাফুল একা অপরাধী?

 

আশরাফুল ক্ষমা চাওয়ার পর দেশে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। আবার কেউ বলছেন, তার শাস্তি হওয়া উচিত (যদিও এই সংখ্যা অনেক কম)। আশরাফুলকে ক্ষমা করে দেওয়ার দাবি রীতিমতো রাজপথে এসে ঠেকেছে। আশরাফুল-সমর্থক গোষ্ঠীর ব্যানারে বিসিবি কার্যালয়ের সামনে তার ভক্তরা মানববন্ধনও করেছে। যদিও পুলিশ মানববন্ধন করতে দেয়নি। আশরাফুল-ভক্তদের লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দিয়েছে। বিসিবি কার্যালয় থেকে ওই ভক্তদের সরিয়ে দিলেও তাদের মন থেকে আশরাফুলকে সরাতে পারেনি পুলিশ। কেননা, দিন দিন আশরাফুলের প্রতি সাধারণ মানুষের দরদ বাড়ছে। এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। যে দেশে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমলারা দুর্নীতি করে দেশের কোটি কোটি টাকা নিজেদের পকেটে ভরছেন, সে দেশে আশরাফুল নিজ কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে আসলেই অনন্য উদাহরণ হলেন। কারণ, এ দেশে রাজনীতিবিদ আর আমলারা নিজেদের ভুল কখনো স্বীকার করেন না। বরং নিজেদের দোষ অন্যদের ওপর চাপিয়ে শিকার করেন। তাই ভক্তদের দাবি, আশরাফুলের শাস্তি কম হওয়া উচিত। যেটা হতে পারে প্রতীকী।

 

আশরাফুলের শাস্তি কেমন হবে, তা আগ বাড়িয়ে বলা যাচ্ছে না। তার বর্তমান বয়স ২৮। দোষ স্বীকার করায় আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসু) নিয়ম অনুযায়ী যদি আশরাফুলের শাস্তি কম হয়, তবে আসলে মঙ্গল হবে এ দেশের ক্রিকেটের। কেননা, ব্যাট হাতে দেশকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে আশরাফুলের। দীর্ঘদিন পর শ্রীলঙ্কা সফরে জাতীয় দলে ফিরে নতুন জন্ম হয়েছিল আশরাফুলের, যা দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। আশরাফুল যদি আবারও শত বাধা পেরিয়ে ব্যাট হাতে মাঠে নামতে পারেন, লাভবান হবে দেশের ক্রিকেট। কারণ, আশরাফুলদের জন্ম এ দেশে বারবার হয় না।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ