সাংবাদিকতার বিশ্বায়নে : ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক | সময় বিচিত্রা
সাংবাদিকতার বিশ্বায়নে : ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক
ফরিদ আলম
desh1

ঢাকা শহরে যারা রিপোর্টিংয়ের সাথে যুক্ত, তারা সুযোগ পেলেই ঢাকার বাইরে যেতে চান এঙ্ক্লুসিভ স্টোরি করার জন্য। কিন্তু যেতে চাইলেই অনেকে যেতে পারেন না। মানে ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হয় না নানা কারণে। কারণ, অনেক সময় ওই প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যেমন চিফ এডিটর, এডিটর, হেড অব নিউজ, নিউজ এডিটর, অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর বা চিফ রিপোর্টার মনে করেন, যিনি ঢাকার বাইরে রিপোর্ট করার জন্য যেতে চাইছেন, তিনি হয়তো সঠিক বা প্রয়োজনীয় স্টোরি করতে কিংবা সংগ্রহ করতে পারবেন না। আবার অনেক সময় দেখা যায়, যেসব রিপোর্টারের ওপর কর্তাব্যক্তিদের আস্থা আছে, তাদের অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে চান না। তবে যারা সত্যিকারের সাংবাদিকতার স্বাদ নিতে চান, খুব বেশি সমস্যা না থাকলে, তারা কখনোই এ ধরনের সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক টেলিভিশন, পত্রিকা, রেডিও এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম হওয়ার কারণে এঙ্ক্লুসিভ নিউজের একটা বাড়তি কদর রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এঙ্ক্লুসিভ স্টোরি প্রচার বা প্রকাশ করতে হচ্ছে। তা না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে, অনেক রিপোর্টারের জন্যই দূর-দূরান্তে গিয়ে এঙ্ক্লুসিভ স্টোরি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই, জাতীয় সংসদ নিবার্চন হোক কিংবা স্থানীয় সরকার নিবার্চন , ঝাঁকে ঝাঁকে সাংবাদিক ছুটে যাচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত্ম থেকে অন্য প্রান্ত্মে। ইদানীং অনেক রিপোর্টারকে দেখা যাচ্ছে, আজ রিপোর্ট করছেন টেকনাফে গিয়ে, দু-চার দিন পরই যাচ্ছেন তেঁতুলিয়ায়। আজ যাকে উত্তরাঞ্চলে নিউজ করতে দেখা যায়, কয়েক দিন পরই হয়তো তাকে দেখা যায় দক্ষিণাঞ্চলে। একদিন তাকে দেখা যায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে গিয়ে রিপোর্ট করতে। খোঁজ করলে দেখা যাবে, ঢাকার নামকরা গণমাধ্যমগুলোর অনেক রিপোর্টারই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেছেন। বড় বড় ইভেন্ট কাভার করারও অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন অনেকে।

এক দশক আগেও হাতেগোনা কয়েকজন রিপোর্টার ছিলেন, যারা দেশের বাইরে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেছেন। তাদের প্রায় সবাই ছিলেন পত্রিকার। প্রায় দেড় দশক আগে বাংলাদেশে বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলেও তখন টিভি সাংবাদিকেরা বিদেশে গিয়ে রিপোর্ট করার সুযোগ খুব একটা পেতেন না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন মিডিয়ার জন্ম হয়েছে। টেলিভিশন, পত্রিকা, রেডিও কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক বিস্ত্মারের ফলে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের মধ্যে বিশ্বজয়েরও একধরনের নেশা পেয়ে বসেছে। এখন সাংবাদিকেরা চান নতুন নতুন দেশে গিয়ে দর্শক, শ্রোতা কিংবা পাঠকের জন্য কাজ করতে। আমার জানামতে, এমন সাংবাদিক কমই পাওয়া যাবে, যিনি বিশ্বের রাজধানীখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ঘুরতে আসার ইচ্ছা পোষণ করেন না। সংগত কারণেই একজন সাংবাদিকের কাছে নিউ ইয়র্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে রয়েছে জাতিসংঘের সদর দপ্তর, যেখানে প্রতিবছরই বসে সাধারণ অধিবেশন। সারা বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা একত্র হন সেপ্টেম্বর মাসে। এ ছাড়া বছরের প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন থাকে জাতিসংঘে। জাতিসংঘে এসে সব দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজ নিজ দেশের প্রবাসী নাগরিকদের সাথে নানা বিষয়ে মতবিনিময় করে থাকেন। বাংলাদেশের বেলায় এই চর্চা আগে খুব একটা না থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বেড়েছে। কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ, মন্ত্রিপরিষদের অনেক সদস্য এবং সরকারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও নিউ ইয়র্কে থাকা বা নিউ ইয়র্কে আসা সাংবাদিকদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের বাইরেও প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথে তারা নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথেও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গী মন্ত্রীরা। এখানকার গুরুত্ব বুঝতে পেরেই তারা এই কাজটি করে থাকেন। শুধু রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরাই নন, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে আসা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতারাও যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো স্টেটে ঘুরতে এলেও দেশে ফিরে যাওয়ার আগে একবার নিউ ইয়র্কে ঢুঁ মারতে ভোলেন না। বৈঠক করেন সাংবাদিকদের সাথেও। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে নিউ ইয়র্ক।

এই সবকিছু বিবেচনায় রেখেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাংবাদিকদের মতো বাংলাদেশের সাংবাদিকেরাও চান একবারের জন্য হলেও নিউ ইয়র্ক সফর করতে। প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেলে সেটা হয়তো কখনো কারও জন্য সম্ভব হয়, আবার কারও জন্য হয় না। নিউ ইয়র্ক সফরের সুপ্ত ইচ্ছা বেশির ভাগ সাংবাদিকেরই থাকে। প্রচলিত আছে, ‘একবার কেউ নিউ ইয়র্কে এলে, তাকে কমপক্ষে আরও দুবার আসতে হয়।’ সংবাদ সংগ্রহের জন্য একজন সাংবাদিকের কাছে এটা নিঃসন্দেহে একটা ভালো ব্যাপার। কিন্তু যিনি একবারও আসতে পারেননি, তিনি কি আসতে পারবেন না? সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু চেষ্টা, সদিচ্ছা বা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে বিষয়টা তেমন কঠিন নয়। তবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সাথে নিউ ইয়র্কের সাংবাদিকতার রয়েছে অনেক তফাত। বাংলাদেশে একজন রিপোর্টার দেশজুড়ে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু প্রবাসে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকতার গণ্ডি অনেক ছোট। তবে রিপোর্টিংয়ের প্রয়োজনে অন্য স্টেটে যেতে হলে সেটা যেমন ব্যয়বহুল, ঠিক তেমনি সময় সাপেক্ষ ব্যাপারও। কিন্তু তার পরও এখানে রয়েছে অনেক সাপ্তাহিক পত্রিকা। যেগুলো প্রবাসী পাঠকদের চাহিদা মেটায় প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের অনেক টিভি চ্যানেল এখানে দেখা গেলেও তা প্রবাসীদের খোরাক মেটাতে পারছে না। এই প্রবাসেও রয়েছেন অনেক বরেণ্য রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আছেন প্রচুর রাজনীতিসচেতন বাংলাদেশি, সমাজসেবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেক গুণী মানুষ, যাদের চাহিদা অনেক। তারা কেবল টেলিভিশনগুলোতে একতরফা কথা শুনে যাচ্ছেন। বলা যায় শুনতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদেরও অনেক কথা বলার আছে, কিন্তু বলতে পারেন না। ভিন্নভাবে বললে, বলতে পারছেন না। আশার কথা হচ্ছে, প্রবাসীদের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিউ ইয়র্ক থেকে শিগগিরই চালু হচ্ছে আমেরিকা-বাংলাদেশ টেলিভিশন বা এবি টিভি। ইতিমধ্যেই এবি টিভি তাদের সিগনাল টেস্ট প্রচার করছে। টেলিভিশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফোর্থ জেনারেশন প্রযুক্তির এই টেলিভিশন সবার্ধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করবে প্রবাসীদের সংবাদ ও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানের চাহিদা মেটানোর জন্য। বিনোদনের চাহিদাও পূরণ করবে এবি টিভি। নিউ ইয়র্ক সফরে আসা রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের অনুষ্ঠানগুলো সহজেই সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবি টিভি। তা ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে যেসব টিভি সাংবাদিক জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কাভার করতে আসবেন, তাদের জন্য সরাসরি ফিড পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখবে নতুন এই চ্যানেলটি। এখন আর বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকের হাজার হাজার ডলার খরচ করে লাইভ ফিড পাঠানোর মতো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। এটা শুধু প্রবাসী দর্শক নয়, বাংলাদেশি দর্শকদের জন্যও অনেক বড় সুখবর। কারণ, শুধু খরচের কারণে বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলকে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা মিস করতে হবে না।

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের অভিযোগ, নানা দিক দিয়ে নিউ ইয়র্কের গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার পরও বাংলাদেশের মিডিয়া মালিকদের কাছে অবহেলিতই রয়ে গেছে নিউ ইয়র্কের ভূমিকা। কারণ, তারা প্রবাসীদের খবর বেশির ভাগ সময়ই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার বা প্রকাশ করে না। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অনেক সাংবাদিক যোগ্যতা থাকার পরও অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিগত দুই দশকে বহু সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী হলেও বর্তমান চিত্র একেবারেই আলাদা। তার পরও অনেক তরুণ সাংবাদিক এখন নিউ ইয়র্কে শতভাগ পেশাদারি নিয়ে কাজ করছেন। পেশাদার সাংবাদিকেরা ওয়াশিংটন এবং নিউ ইয়র্কের ফরেইন প্রেস সেন্টারের সদস্যপদও পেয়েছেন। ফলে, তারা বহু ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ পাচ্ছেন অনায়াসেই। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না বাংলাদেশের মিডিয়া মালিকেরা। দিন-রাতের বিশাল ব্যবধানের মধ্যেও ঢাকার মিডিয়াগুলোতে প্রতিনিয়ত সংবাদ পাঠিয়ে যাচ্ছেন নিউ ইয়র্কে থাকা সাংবাদিকেরা। বিনিময়ে কিন্তু তারা তেমন কিছুই পাচ্ছেন না। বেশির ভাগ রিপোর্টারই এখানে কাজ করছেন অনেকটা বিনা পারিশ্রমিকে। কেবল নিজের পেশাটাকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে আছেন কোনো প্রাপ্তি ছাড়াই। মালিকেরা বিনা বেতনের রিপোর্টার পেয়ে যারপরনাই খুশি। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন ঢাকার সব মিডিয়া মালিকেরাই নিউ ইয়র্কের সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবেন ডলারের মাধ্যমে এখানকার শ্রমবাজারের হিসাবেই।


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ