হোয়াইট হাউস ও আমেরিকার গণতন্ত্র | সময় বিচিত্রা
হোয়াইট হাউস ও আমেরিকার গণতন্ত্র
এ কে আজাদ মুন্না
desh2

রাতেই ফরিদ ভাই বলে রেখেছেন, সকাল সকাল উঠতে হবে। তাই ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম ভাঙে আমার। এটিএন বাংলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ফখরুল ভাইয়ের লংআইল্যান্ডের বাসায়, ‘ভোরের কাগজ’ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর সম্পাদক নঈম নিজাম ভাইয়ের সাথে দাওয়াত খেয়ে এসে অনেক রাতে ঘুমিয়েছি, তাই বিছানা ছাড়তে একটু কষ্টই হলো। ঘুম থেকে উঠেই ঝটপট রেডি। খানিকক্ষণ পরই ফরিদ ভাই উঠলেন ঘুম থেকে; দরাজ কণ্ঠের জিজ্ঞাসা, ‘মুন্না উঠছো।’ এটা অবশ্য ফরিদ ভাইয়ের প্রতিদিনের কমন প্রশ্ন। এটাকে প্রশ্ন না বলে খোঁজখবর নেওয়া বলা যেতে পারে। রাতে ভালো ঘুম হলো কি না, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না; এসব আরকি। এর মধ্যে বড় ভাই-সুলভ অনেক অনেক খবরদারি খুঁজে পাই আমি। যা আমি উপভোগও করি।

 

এনটিভির বিশেষ প্রতিনিধি ফরিদ আলম সপরিবারে বসবাস করছেন নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা স্টেটে।

 

ভোর সাড়ে পাঁচটায় ফরিদ ভাইয়ের বাসার সামনে গাড়ি নিয়ে হাজির আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দর্পন কবির।

 

একে একে আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল আহসান, জিটিভির প্রধান প্রতিবেদক রকিবুল ইসলাম মুকুল, আমেরিকায় কর্মরত সাংবাদিক রিজু মোহাম্মদ ও সাজ্জাদ হোসেনকে তুললেন দর্পন ভাই।

 

নিউ ইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটনের দূরত্ব সাত ঘণ্টার গাড়ি-পথ।

 

২ এপ্রিল বুধবার, ভোর ছয়টা। আমাদের গন্ত্মব্য বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ‘ওয়াশিংটন ডিসি।’

 

অসাধারণ গাড়ি চালান দর্পন ভাই। হাইওয়ে ধরে দুরন্ত গতিতে ছুটছে আমাদের গাড়ি। মাঝে মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়ায় চা-কফি পানের সংক্ষিপ্ত বিরতি। বেলা সাড়ে ১২টায় পৌঁছালাম ওয়াশিংটনে। দুপুর একটায় আমাদের গাড়ি দাঁড়াল বিশ্বের বিখ্যাত রেডিও স্টেশন ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র সদর দপ্তরের সামনে। সে সময় ওখানে যুক্তরাষ্ট্রস্থ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন।

 

ভোয়া সদর দপ্তর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বাসভবন ‘হোয়াইট হাউস’। পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বাসভবনের সামনে। প্রচুর দর্শনার্থী। সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে আছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বাংলাদেশের গণভবন বা প্রধানমন্ত্রীর কাযার্লয়ের সঙ্গে ‘হোয়াইট হাউস’-এর কোনো রকম মিল খুঁজে পেলাম না।

 

ভাবনায় যেমন ছিল, হোয়াইট হাউসকে তার সঙ্গে মেলাতে পারলাম না। শত শত মানুষ, দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির। ভাবতেই পারছিলাম না, দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবনের আঙিনা সাধারণ জনতার জন্য এমন উন্মুক্ত।

 

তৃতীয় বিশ্বের মানুষ আমি। প্রধানমন্ত্রী যাবেন তাই এক ঘণ্টা আগে থেকে রাস্তা বন্ধ। সরকারপ্রধান বা বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনের আশপাশে সাধারণ মানুষ ঘোরাঘুরি করছে-এমন দৃশ্য অকল্পনীয়, দর্শনার্থীর জন্য কিছুটা বিপজ্জনকও বটে। বারাক ওবামার বাড়ির আঙিনায় উন্মুক্ত বিচরণ, ভাবতেই ভালো লাগছিল। সফরসঙ্গী ফরিদ আলম মজা করে বললেন, ‘তোমরা এখন বারাক ওবামার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছ। তোমাদের কারও কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে তাকে বলতে পারো।’ ফরিদ ভাইয়ের এমন কথায় আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

 

পাশেই চোখে পড়ল, দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যবয়সী এক মার্কিন নাগরিক। জানা গেল, প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে দীর্ঘদিন ধরে তিনি দাবি-দাওয়া নিয়ে অবস্থান করছেন। মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; তা-ও আবার আস্তানা গেড়ে, তার বাসভবনের সামনে। নাগরিকের ক্ষমতায়নের এমন দৃশ্যে অভিভূত হই আমি। গণতন্ত্র বা বাক্‌স্বাধীনতা কাকে বলে নতুন করে উপলব্ধি করি। অনুধাবন করতে একটুও কষ্ট হলো না কেন মার্কিনরা দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের ছবক ছড়ায়। কেনই বা বিশ্ববাসী তাদের খবরদারি মেনে নিচ্ছে। এটাকে সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসন বা খবরদারি যে যা-ই বলুক না কেন, আমার বিশ্বাস, এই যোগ্যতা আছে বলেই তাদের নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বিকল্প না থাকায় মেনে নিচ্ছে বিশ্ব।

 

ঘুরতে ঘুরতেই চোখে পড়ল দাবিদাওয়া নিয়ে উপস্থিত দেশি-বিদেশি বেশ কিছু সংগঠন। ব্যানার, প্ল্যাকার্ড তো আছেই। অনেকে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে নিজেদের চাওয়াগুলো জানান দিচ্ছেন বিশ্বের ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রপ্রধানকে। আন্দোলনরত সংগঠনের অনেক কর্মীর সঙ্গে কথা হলো আমার। তাদের কাছে জানতে চাইলাম, প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে কেন এই প্রতিবাদ? খুব বিনয়ের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে বোঝালেন তারা। জানা গেল, প্রায় প্রতিদিনই এমন হাজারো নালিশ নিয়ে এখানে হাজির হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা সংগঠন ও মানুষ।

 

পাশেই দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রস্থ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হাজির হয়েছেন বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি নিয়ে। আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপ পৃথকভাবে এই কর্মসূচি পালন করায় কিছুটা বিশৃঙ্খলাও দেখা গেল।

 

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনকারী আমাদের এই বাংলাভাষীরা ভালো করেই জানেন, তাদের প্রিয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা! আমেরিকায় বসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সুশৃঙ্খল আন্দোলন করতে পারলেও নিজ দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার অনেকটা অবরুদ্ধ। যে দেশে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র থাকলেও সভা-সমাবেশও বন্ধ করে দেওয়া হয় যখন-তখন, আর দাবি-দাওয়া আদায়ে প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি দেওয়া হলে ১০ কিলোমিটার দূর থেকে কাঁটাতারের বেড়া কিংবা কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পণ্ড করে দেওয়া হয় কর্মসূচি। কখনো কখনো নিবিচারে চলে পুলিশের লাঠিচার্জ। এ থেকে বাদ যায় না স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে আমাদের গুরুতুল্য শিক্ষকেরাও। কখনো কখনো মরিচের গুঁড়াও ছোড়ে দেওয়া হয় নিবৃত্ত করতে।

 

হোয়াইট হাউস থেকে বিকাল সাড়ে চারটায় আবার যাত্রা শুরু হলো আটলান্টিক সিটির উদ্দেশে। এবার ড্রাইভিং সিটে সহযাত্রী সাজ্জাদ, বিশ্রামে দর্পন ভাই। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আটলান্টিক সিটির দূরত্ব চার ঘণ্টার ড্রাইভ। রাত আটটায় পৌঁছালাম আটলান্টিক সিটির অদূরে সফরসঙ্গী আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট নাজমুল আহসানের ছোট ভাই সেলিম আহসানের বাসায়।

 

সেলিম ভাইয়ের বাসায় রাতের খাবারের কর্মসূচি পূবর্নির্ধারিত। গাড়ি থেকে নামতেই নাজমুল ভাইয়ের মাথায় হাত। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘আমার সব শেষ!’ সবাই বুঝতে পারলাম, বড় কোনো সমস্যা। নাজমুল ভাই জানালেন, ওয়াশিংটন থেকে ফেরার পথে মেরিল্যান্ডে যে রেস্টুরেন্টে খেয়েছি, সেখানে ব্যাগ ফেলে এসেছেন। ব্যাগে ক্যামেরা, আইপ্যাড, নগদ ১০ হাজার ডলারসহ জরুরি অনেক কাগজপত্র। নিমেষেই সব আনন্দ মাটি। নাজমুল আহসানের বিষাদ সংক্রমিত হলো আমাদের মধ্যেও। সবাই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই তাকে শান্ত করা সহজ ছিল না। আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল আহসান নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। মেরিল্যান্ডে ফেলে আসা ব্যাগে তার পত্রিকার সব জরুরি কাগজপত্রও ছিল।

 

এ সময় সহযাত্রী সাজ্জাদ তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন। মানিব্যাগ থেকে রেস্টুরেন্টের বিল পরিশোধের কাগজ বের করে ফোন করলেন সেখানে। রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ জানাল, ব্যাগটি তাদের তত্ত্বাবধানে সযত্নে আছে। আপাতত দুশ্চিন্তা কমলেও নাজমুল ভাইয়ের অস্থিরতা কাটছিল না। সেই রাতেই ব্যাগ আনতে মেরিল্যান্ডে যেতে চাইলেন তিনি। রেস্টুরেন্টটি খোলা থাকবে রাত ১০টা পযন্ত। ফলে, সে রাতে নাজমুল ভাইয়ের ব্যাগ ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন ভোরে নাজমুল আহসান তার ছোট ভাইকে নিয়ে মেরিল্যান্ডে যাবেন ব্যাগ আনতে। ফলে তিনি ছোট ভাইয়ের বাসাই থেকে গেলেন। আর আমরা কোনো রকমে রাতের খাবার সেরে রওনা হলাম আটলান্টিক সিটির উদ্দেশে।

 

আটলান্টিক সিটি ক্যাসিনোর শহর। সারা বিশ্বের ফ্যাশনেবল জুয়াড়িরা প্রতিদিন সমবেত হন এখানে। ফলে, আমাদের ইচ্ছে বিশ্বখ্যাত কোনো একটি ক্যাসিনো ঘুরে দেখা। এখানে আমাদের দলে যোগ দিলেন আটলান্টিক সিটির মোশারফ ভাই। ফরিদ ভাইয়ের পূবর্পরিচিত মোশারফ ভাই, দারুণ মজার মানুষ। আমাদের ঘুরে দেখালেন বিশ্বের অন্যতম কয়েকটি জুয়ার আসর। তবে নাজমুল ভাইয়ের ব্যাগ হারানোর শোক আর দর্পন ভাইয়ের নিউ ইয়র্ক ফেরার তাড়া, সে রাতে ক্যাসিনোতে খুব বেশি সময় কাটাতে পারিনি আমরা।

 

 

রাত ১টায় আটলান্টিক সিটি থেকে নিউ ইয়র্কের পথে আমাদের যাত্রা শুরু। গাড়ি চালাচ্ছেন দর্পন কবির। কেউ জোকস বলছেন, কেউ গলা ছেড়ে গান করছেন, কেউ বা একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছেন। তবে গাড়িতে ঘুমানো যাবে না, এমন শর্ত আগে থেকেই সবার জন্য ছিল প্রযোজ্য। এই শর্তের ব্যত্যয় কেউ ঘটাচ্ছে কি না, সেদিকেও ছিল সহযাত্রী রিজু মোহাম্মদের কড়া নজরদারি। আমাদের গাড়ি যখন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন শহরে, তখন ভোরের সূর্য উঁকি দেওয়ার অপেক্ষায়। (চলবে)

 

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ