প্রসঙ্গ: বায়ুদূষণ, আত্মসচেতনতাই সমাজচেতনার অনুঘটক
সাহাদাৎ রানা

বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীতে বায়ুদূষণ মারাত্মক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশে। বর্তমানে পৃথিবীর দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শুরুর দিকে। ঢাকার বাতাস যে লাল ক্যাটাগরিভূক্ত তা সহজে অনুমেয়। বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বায়ুতে এর মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। ফলে এই শহর সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য সত্যিই দুস্কর হয়ে উঠছে। শঙ্কার আরও খবর হলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বাতাসে দূষণ বৃদ্ধি পায় অন্তত প্রায় ৪ গুণ। এরপর বৃষ্টির মৌসুম এলেও বায়ুদূষণের মাত্রা সেভাবে হ্রাস পায় না। বরং বাতাসের গতি বেশি হওয়ায় তা উন্নীত হয় আরও শোচনীয় পর্যায়ে। বর্তমান সময়ে আমরা যা লক্ষ্য করছি।
এবার দৃষ্টি দেয়া যাক বায়ুদূষণের মূল কারণের দিকে। রাজধানীর বায়ুদূষণের একটি প্রধান কারণ আশপাশের অসংখ্য ইটভাটা। জনবসতির কাছাকাছি ইটভাটা না থাকার আইন থাকলেও বাস্তবতা হলো সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বর্তমানে ঢাকার চারপাশে প্রায় হাজার খানেক ইটভাটা রয়েছে। ঢাকার বাতাসে ভারী ধাতুর উপস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ ঢাকার আশেপাশে অপরিকল্পিত ইটের ভাটাগুলো। ঢাকার বাতাসে অসহনীয় মাত্রায় ধাতুর উপস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত ইটের ভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। বায়ু দূষণের জন্য ইটভাটা অন্যতম প্রধান কারণ বটে, তবে এটাই একমাত্র নয়। এছাড়া রয়েছে আরও নানাবিধ বাস্তব ও মানবসৃষ্ট কারণ। এর একটি হলো মরার উপর খাঁড়া ঘা হয় শহর জুড়ে প্রায় সারা বছর কারণে-অকারণে খোঁড়াখুড়ি ও নির্মাণকাজ। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতাই এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। এসবই ঢাকার বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করে চলেছে। সিসাযুক্ত পেট্রোল আমদানি ও দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট অটোরিক্সার অবাধ চলাচল বায়ুদূষণের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। এছাড়া ঢাকার পাশে বিভিন্ন জায়গায় অবাদে গড়ে উঠা শিল্প-কারখানা আশঙ্কাজনকভাবে রাজধানীর বাতাসকে লাগামহীন ভাবে দূষিত করে চলেছে।
অবাক করা তথ্য হলো- বায়ুদূষণ জনিত কারণে মৃত্যুহারে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন পঞ্চম। এটা আমাদের জন্য সত্যিই ভয়ের খবর। তবে এর পাশাপাশি আশাবাদী হওয়ার মতো খবরও রয়েছে। যদি এখনই সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে এক দশমিক তিন বছর। এমন তথ্য যেমন স্বস্তির, পাশাপাশি অস্বস্তিরও। কেননা, দিনদিন যেখানে প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ হচ্ছে তাতে করে তা কবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এটা সত্যিই বলা মুশকিল। কারণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যা প্রয়োজন তার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও বরং প্রতিদিন বায়ুদূষণ হচ্ছে নানা কারণে। আর দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনের বেলায় শহরের রাস্তায় পরিচালিত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম থেকে শুরু করে রাতে ঘুমতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ার মারাত্মক ধাতব উপাদানের পরিমাণ বাড়ছেই। যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। একটি জরিপের তথ্যনুযায়ী- সবশেষ বছর মানে ২০১৮ সালে ঢাকার বাতাসে অতিমাত্রায় দূষিত ছিল বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৯৭ দিনই। সংখ্যার হিসেবে বছরে প্রায় অর্ধেকের বেশি সময়। এ থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকার বায়ুদূষণ দিন দিন কতটা বিপজ্জনক হচ্ছে। এই সংখ্যাটা যদি আরও বৃদ্ধি পায় তবে তা হবে সবার জন্যই আরও ভয়ানক খবর। যেভাবে এগিয়ে চলছে যদি এভাবে চলতে থাকে তবে দিন দিন আরও খারাপ হবে এটা অন্তত বলা যায়।
এবার জানা যাক বায়ুদূষণের কারণে আমরা কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। ভয়াবহ খবর হলো ঢাকার বিপজ্জনকভাবে বায়ুদূষণের কারণে মানুষ দিন দিন অসুস্থ হচ্ছে। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমনকি ফুসফুস ক্যান্সারসহ নানা রকম মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ ছাড়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ শরীরে প্রবেশ করায় স্নায়ুজনিত অসুখ, মস্তিস্কের রোগ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে আশংঙ্কাজনকভাবে। সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো- বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগব্যাধিতে। এটা ক্রমান্নয়ে বেড়েই চলছে। যা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ভয়ের খবর। অভিভাবক হিসেবেও উদ্বেগের তথ্য এটা সবার জন্য।
বললে, অত্যূক্তি হবে না বায়ুদূষণ আমাদের জীবনকে কি সাংঘাতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে; এবং দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। মাত্রাছাড়া দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, দৃষ্টিশক্তি হারানো, হৃদরোগ ও স্ট্রোক, ফুসফুসে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। এই দূষিত বাতাস নীরব ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে ত্বরাণি¦ত করছে অকালমৃত্যু। মানবসৃষ্ট এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় যে একেবারে নেই তা নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা। আমাদের সামান্য সতর্কতা আর সচেতনতায় অনেকাংশেই বায়ুদূষণ প্রতিরোধ সম্ভব। এক্ষেত্রে অবশ্য আরো প্রয়োজন পরিবেশ আইন ও বিধানের সঠিক প্রয়োগ। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই রাজধানীর বাতাসকে বিষমুক্ত করতে। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগে বায়ু দূষণকারী শিল্প কারখানা, যানবাহন এবং অন্যান্য অনুষঙ্গকে নিষিদ্ধ করে তা উৎখাত করাই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ এবং স্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। পরিতাপের বিষয় হলো এই রাজধানীর বয়স ৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ চলছে সেই ট্র্যাডিশন চলার মতোই। এই উদাহরণ পৃথিবীর আর কোন শহরে মিলবে না। তবে বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করেও এসব নির্মাণ দূষণমুক্ত প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করাটাই হবে যথার্থ।
এখন প্রশ্ন হলো বায়ুদূষণের হাত থেকে রক্ষার উপায় কী? যেহেতু বায়ুদূষণের জন্য প্রধানত মানুষ দায়ি তাই এর প্রতিকারও মানুষের হাতেই। সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে অতি সহজে এই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য সবার আগে কিছু বাস্তব উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে ঢাকার আশে পাশের ইটভাটাগুলো শহর থেকে দূরে সরিয়ে নিতে হবে। এখন উন্নত অনেক দেশে আধুনিক প্রযুক্ত ব্যবহার করে বায়ুদূষণ ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে ইট। আমাদের দেশেও এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইট তৈরি করলে অনেকাংশে বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব। অবশ্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করবে হবে এর জন্য সবাইকে। তাই তাৎক্ষনিক প্রতিকার হিসেবে সবাইকে ধুলা-বালি থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
সবার মনে রাখতে হবে এসব সমস্যা সমাধানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা। বস্তুত আইন তার নিজস্ব পথেই চলে। তবে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। তবেই আইনের প্রয়োগ সম্ভব। এজন্য প্রত্যেক নারিকের দায়িত্ব নিজের প্রিয় এই শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখা এবং অন্যকেও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ