ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক
সাহাদাৎ রানা

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ফল। এ বছর সারাদেশে এইচএসসি পাশের হার ৭৩.৯৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ২৮৬ জন। সংখ্যার হিসেবে এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১০টি বোর্ডের অধীনে মোট পরীক্ষার্থী ছিলো ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। গতবার ১০টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫৭ জন। পাশ করেন ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। গত বছরের চেয়ে এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শঙ্কার খবর হলো পাসের হার বাড়লেও বিভিন্ন কারণে উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে ২ থেকে আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। বাস্তবতা হলো- শুধুমাত্র দারিদ্র ও প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পারায় উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না অনেক শিক্ষার্থী। অথাৎ এইচএসসি পাস করা একটি অংশ ঝরে পড়বে উচ্চশিক্ষা থেকে।
এবার একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ২০১৯ ও ২০১৮ সালে যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন তারা ২০১২ ও ২০১৩ সালে পিএসসি বা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থী ছিলেন। সে সময় পিএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখের মতো। আর ২০১৯ ও ২০১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ থেকে ১৩ লাখের মধ্যে। অথাৎ সময়ে হিসেবে মাত্র ৭ বছরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া হার প্রায় অর্ধেক। ২৬/২৭ লাখ থেকে নেমে এসেছে প্রায় ১২/১৩ লাখে। অর্ধেকের মতো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এমন চিত্র আমাদের জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগের। ভাবনার বিষয় হলো দেশের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া শুধু নির্দিষ্ট কোনো পর্যায়ে নয়। বরং প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করতেই ঝরে পড়ার সংখ্যা শুরু হয়। সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে মূলত অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে যারা পাস করতে ব্যর্থ হন ঝরে পড়ার তালিকায় রয়েছে তাদের নামও। আবার অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগের অভাবে ঝরে পড়ছে।
তবে প্রশ্ন হলো কেনো এতো সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে? এক্ষেত্রে প্রধানতম কারণ দারিদ্রতা। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায়, আর্থিক অভাব-অনটন কারণে সাধারণত শিক্ষার্থী বেশি ঝরে পড়ে। অথচ এর পরিণতি যে কত করুণ হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যিই অস্বস্তির। বাস্তবতা হলো- আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারই দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করে। সেখানে তাদের নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে থাকতে হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সমস্যা। বিভিন্ন পরিবারেই দেখা যায়, সন্তান একটু বড় হয়ে উঠলেই তাকে উপার্জনে পাঠাতে উদ্যত হন অভিভাবকরা। ফলে অনেকেই পড়ালেখা না করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে একরকম বাধ্য হয়েই। এ কারণে প্রতিনিয়ত দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যাও বাড়ছে। বিপরীতে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অথচ শিশুশ্রম প্রতিরোধে দেশে আইন রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় আইনের তোয়াক্কা না করে বেড়েই চলছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা।
আবার যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিককে উত্তীর্ণ হতে পারেননি তারা অনেক সময় পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে এদের বড় একটি অংশ চলে যাবে কর্মসংস্থানে। অনেকে আবার চলে যাবে বিদেশে। এটা শুধু যে এবছর হবে তা কিন্তু নয়। এটা প্রায় প্রতিবছরই নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে শঙ্কার খবর হলো এর সংখ্যাটা দিন দিন শুধুই বাড়ছে। অথচ আমরা কখনো ভেবে দেখি না দেশের সার্বিক অগ্রগতির পথে এটা একটি বড় বাধা। কারণ এভাবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মানে হলো এতে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি আরও একটি তথ্য আমাদের বেশি শঙ্কা জাগাচ্ছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে অপরাধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। দেখা যায়, যাদের স্কুলে থাকার কথা তারা যখন জীবিকার তাগিদে ঝরে পড়ছে, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এর সঙ্গে জড়িত অনেক কিছু।
তাই এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সমাধানের লক্ষ্যে সরকারকে আরো বেশি উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেহেতু এটা একটি সমস্যা তাই বিপরীতে এর সমধানও রয়েছে। এর সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। তবে একদিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যথাযথ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই কমানো সম্ভব শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংখ্যা।

 

 

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ