আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিশোর অপরাধের ঘটনা
সাহাদাৎ রানা

untitled

 

 

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিশোর অপরাধের ঘটনা। সমাজে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে   কিশোররা; জন্ম দিচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধের। এটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য নতুন না হলেও কিশোর অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা; কোন সন্দেহ নেই উদ্বেগের। বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে স্কুলের গন্ডি পেরোনোর আগেই অনেক কিশোর জড়িয়ে পড়ছে অ

পরাধীচক্রের সঙ্গে। ইভ টিজিং, ছিনতাই যেন এখন মামুলি। এসব দিয়ে হচ্ছে হাতেঘড়ি। এরপর তারা বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পিত হত্যাকা-েও অংশ নিচ্ছে। কখনো সহপাঠীকে অপহরণ করে পরিবারের কাছে দাবি করছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। না দিলে তাদের হত্যা করতে কাঁপছে না এসব কিশোরদের হাত। এমনকি ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনায়ও জড়াচ্ছে তারা। এই পরিস্থিতি আমাদের ক্রমেই উদ্বিগ্ন করছে। আরও যে খবর আমাদের চোখ কপালে তোলার জন্য যথেষ্ট, তা হলো কিশোর অপরাধসংক্রান্ত মামলা। প্রতি বছর সারা দেশে এ সংক্রান্ত মামলা হচ্ছে প্রায় পাঁচ শতাধিক। পরিসংখ্যান দিচ্ছে আরো দুঃসংবাদ। কারণ এই সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে আরো বাড়ছে। মামলার সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিশোরদের অপরাধের ধরণে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

এখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, কেন কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে? কেনই বা তারা বেপথু হচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়, এর নেপথ্যে রয়েছে নানা কারণ। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এক্ষেত্রে এ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। কোন কিশোরের অপরাধী হওয়ার ক্ষেত্রে তার সঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। আমাদের সমাজের যে কাঠামো তা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। সন্ধ্যে হলে বাড়ি ফেরা, ভালো বন্ধুদের সঙ্গে মেশা, স্থানীয় বয়োজেষ্টদের সম্মান করার মতো বিষয়ে ছিল কড়াকড়ি। অভিভাবকদের ছিল সতর্ক দৃষ্টি। এমনকি স্থানীয় মুরুব্বীদেরও ছিল শাসনের অধিকার। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। শহরে কে কার প্রতিবেশী তা আমরা জানিই না। ফলে সেই সংযোগ গড়ে উঠছে না। শহরের মতো গ্রামেও একই চিত্র বিদ্যমান। উপরন্তু একটা সময়ে কিশোর-কিশোরীরা পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায়। এটাই জীবনের প্রবণতা। আর তখনই প্রয়োজন পড়ে তাদের চোখে চোখে রাখা। আগে যেটা সহজ ছিল সেটা এখন প্রযুক্তি উৎকর্ষে আরো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে ভালোমন্দের বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং নানা প্রলোভন তাদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। আগে স্কুলেরও একটা প্রভাব ছিল। শিক্ষকরা অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু সেদিন তো আর নেই। আর বর্তমানের কিশোররা ভুলে যায় স্বাধীনতারও সীমাবদ্ধতা আছে। আছে লক্ষণরেখা। আগের দিনে পাঠ্যবইতে থাকত নানা নীতিবাক্য। এর একটি যেমন: ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে নরকবাস।’ এসব এখন আর পড়ানো হয় না। বইতেও থাকে না। এমনকি অনেক শিক্ষকরাও জানেন না। কারণ কেউ কেউ এখন নীতি আর মূল্যবোধের ধার ধারেন না। অনেকে এখন ব্যবসায়ীদের মতো কড়ি গোনেন।
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী এক্ষেত্রে। কারণ এক্ষেত্রে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাও। কারণ, সামাজিক পরিবেশে পরিবারের ভূমিকার পরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব শিশু-কিশোরদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পায়। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এসব সচেতনতার বিষয়গুলো প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষ করে শিক্ষকের বিষয়জ্ঞান, সততা, আন্তরিকতা, ছাত্র শিক্ষকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ছাত্র-ছাত্রীর নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চেতনা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। বরং শিক্ষক ছাত্রের মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতি দৃশ্যত বিদ্যমান। আগে যেটা ছিল অন্যরকম। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের ছিল অগাদ শ্রদ্ধা। এখন যা অনেকটা অনুপস্থিত। এখন ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষকদের সাথে সেভাবে মেশেন না। কৃত্তিম দুরত্ব রক্ষা করে চলেন দুই পক্ষই।
আরো একটা বিষয় হলো, এই বয়সটা; আর এই সময়ে সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে কেউ অসৎ প্রকৃতির বা অপরাধপ্রবণ হলে, তাদের প্রভাবে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা অতি দ্রুত পথ হারিয়ে ফেলে। আর তাদের বেপথু হওয়ার অনুঘটক হচ্ছে গঠনমূলক চিত্তবিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধার অভাব। এজন্যই অপরাধমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে স্কুল পালিয়ে ইভটিজিং, মাদকদ্রব্য গ্রহণ, হত্যাসহ নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির আরও একটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিরূপ প্রভাব। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে কিশোররা বইপত্রের চেয়ে বিশেষ করে মোবাইল, ফেসবুক ও ইউটিউবে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে। অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রভাব। বিশেষ করে কুরুচিকর সাইটে ঢুকে অনৈতিক বিষয়ে অভ্যস্থ হচ্ছে। এসব তাদের মানসিকতাকে বিক্ষিপ্ত করছে। তারা সহজেই বিপথগামী হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে অভিভাবকদের রয়েছে বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু অনেক বাবা-মা এ ব্যাপারে সচেতন নন। বয়সের আগেই তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন। আবার অনেকে এ নিয়ে মাথাও ঘামান না সেভাবে। উভয় বিষয়ই ক্ষতির কারণ হচ্ছে তাদের সন্তানদের জন্য। কিন্তু তারা ভাবছেন না, একটু অবহেলা বা অসচেতনার কারণে কতটা ক্ষতি হচ্ছে তার প্রিয় সন্তানের। অথচ, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আগে এমনটা ছিল না। অভিভাবকরা ছিলেন অনেক বেশি সচেতন। এখনও সচেতন। কিন্তু তা বাস্তবিক জীবন ব্যবস্থায় প্রয়োগ করেন না অধিকাংশ অভিভাবক। সবার মধ্যে আতœকেন্ত্রিতাই এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী।
মাদকদ্রব্য সব অপরাধের মূল চালিকা শক্তি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তিও কিশোর অপরাধের উৎপত্তির প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মাদকদ্রব্য কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ, মাদকাসক্ত ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এতে তাদের মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয় ঘটে। ফলে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী-শিশু নির্যাতন, সহিংসতা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিশোররা যেন অতি মাত্রায় মাদকের প্রতি ঝুঁকছে তার বড় প্রমাণ, ইদানিং মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কিশোরদের সংখ্যা বৃদ্ধি। আশঙ্কাজনক হারের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বাড়ছে কিশোরদের সংখ্যা। এটা আমাদের জন্য সত্যিই উদ্বেগের খবর।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এর থেকে উত্তোরণের উপায় কী? সে পথ অবশ্যই আছে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন পরিবারিক সচেতনতা। কিশোর বা কিশোরী সন্তানের দিকে আলাদাভাবে দৃষ্টি দিতে হবে অভিভাবকদের। আর এক্ষেত্রেও সেই একই আপ্ত্যবাক্য প্রযোজ্য: চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। কারণ পরিবার সচেতন হলেই সন্তানের পথ হারানোর সম্ভাবনা সিংহভাগ কমে যাবে। শিশুর সামাজিক জীবনের ভিত পরিবার থেকেই তৈরি হয়। তাই তাদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। জীবনের প্রারম্ভে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার দায় অতএব পরিবারকেই নিতে হবে। কিশোরদের অপরাধ বন্ধ করার জন্য নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে শুরুটা করতে হবে মা-বাবাকে। এখন এলাকাভিত্তিক সামাজিক কর্মকা- তেমন হয় না বললেই চলে। আগের মতো হয় না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। শিশু-কিশোরদের জন্য নেই পর্যন্ত খেলার মাঠ। সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা করতে না পারার কারণে কিশোররা সাইবার জগতে বুঁদ হচ্ছে। এরপর স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারও রয়েছে বাড়তি কিছু দায়িত্ব। এছাড়া দায়িত্ব আছে প্রশাসন ও মিডিয়াসহ প্রত্যেকে সচেতন নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠানের। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে কিশোরদের প্রতি দায়িত্ব পালন করলে তবে অনেকাংশে কমে যাবে কিশোর অপরাধ।

 

 

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ