যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বেগ | সময় বিচিত্রা
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বেগ
সময় বিচিত্রা
31

ন্যাশন অন দ্য ব্রিংক’ ‘খাদের কিনারে একটি জাতি’, বাংলাদেশ নিয়ে এমন উদ্বেগজনক শীর্ষক শুনানি হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসেবাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অনড় অবস্থান, রাজনীতি ও রাজপথে সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সন্ত্রাসবাদের উত্থানের আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসগত ২০ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির শুনানিতে প্যানেল আলোচকসহ কংগ্রেস সদস্যরা তাদের উদ্বেগের কথা জানান

এ শুনানিতে বলা হয়, প্রধান দুদল নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে যে অনড় অবস্থানে আছে তাতে সংঘাত অনিবার্য, এমনকি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছেএই শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন মার্কিন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ও কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাবোট

শুনানিতে মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এড রয়েস, কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড শারমেন, জেরার্ড কোলোনি ও টুলসি গ্যাবার্ড বক্তব্য দেনবাংলাদেশ থেকে শুনানিতে অংশ নেন, প্যানেল আলোচক আলী রিয়াজ, মেজর জেনারেল মুনীরউজ্জামান

শুনানিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, চলমান অসহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারেএ পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের উত্থানে মদদ জোগাবেআর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলে আঞ্চলিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারেনৈরাজ্য অব্যাহত থাকলে সেনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও করা হয়েছে শুনানিতে

বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে স্টিভ শ্যাবোট বলেন, তার সফরের সময় বিরোধী দলের ডাকে হরতাল চলছিলএ হরতালে সহিংসতার অনেক ঘটনা ঘটেছেশ্যাবোট বলেন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠকে আমি অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছিঅথচ তাদের দুজনকেই নিজেদের অবস্থানে অনড় মনে হয়েছেশেখ হাসিনা মনে করেন, একটি অবাধ নির্বাচন করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা আছেআর খালেদা জিয়া মনে করেন, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়শুনানিতে বলা হয়, বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে কি না তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নিতার সফরকালে সহিংসতা বন্ধের জন্য তিনি দুই নেত্রীকে অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করেন প্রভাবশালী এই মার্কিন কংগ্রেসম্যান

সহিংসতা বন্ধ না হলে তা অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকে দেবে বলে তিনি মনে করেনজাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশ ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে শ্যাবোট মন্তব্য করেনবাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম, গ্রামীণ ব্যাংক ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিষয়েও উদ্বেগ জানান মার্কিন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান স্টিভ শ্যাবোট

শুনানিতে বলা হয়, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা বারবার রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের তাগিদ দিলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নিসহিংসতায় মানুষের প্রাণহানি বেড়েই চলেছেসময় গড়ালেও উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছেফলে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক জন শিফটন বাংলাদেশকে এখনই জিএসপি-সুবিধা না দেওয়ার পরামর্শ দেন

শুনানিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এড রয়েসশুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, খ্রিষ্টান ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ ভিন্নমতাবলম্বী লোকজনের ওপর হামলায় তিনি উদ্বিগ্নএ পরিস্থিতিতে মাদ্রাসাশিক্ষা বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো মৌলবাদে মদদ জোগাচ্ছে কি না বা এ সমস্যা কতটা প্রকট তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেনপাকিস্তানে এ সমস্যা অঙ্কুরে বিনষ্ট করা যায়নি, তাই গভীর সংকটের তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের পাবলিক পলিসি স্কলার আলী রিয়াজ বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনটি পরিস্থিতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছেপ্রথমত, একটি রুটিনমাফিক নির্বাচনতবে দুই দলের অনড় অবস্থানের কারণে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নেইসাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভবদ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনবর্তমান পরিস্থিতি ১৯৮৮ ও ১৯৯৬-এর চেয়ে আলাদা হওয়ায় এর ফলাফলও হবে আলাদাতৃতীয় উপায়টি হতে পারে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া

আলী রিয়াজ মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিততার মতে, পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে গণতন্ত্রের মানোন্নয়নে মনোযোগী হওয়া উচিত

 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল মুনীরউজ্জামান বলেন, বিরোধী দলকে বাদ দিয়েই সরকার নির্বাচন করতে যাচ্ছে; যা দেশকে সংঘাত ও কঠিন সংকটের দিকে ঠেলে দেবেতাই দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে, একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব

মুনীরউজ্জামান বলেন, বর্তমানে বিরোধী দলের প্রতি সরকারের যে অসহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত চলছে, তা অব্যাহত থাকলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারেআর এ পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের উত্থানে মদদ জোগাবেচূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে

জেনারেল মুনীর বলেন, তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা আছে কি না? উত্তরে তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সেনাবাহিনীর কোনো ভূমিকা নেই২০০৭ সালের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কোনো ইচ্ছে নেইতবে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো একপর্যায়ে তাদের ভূমিকা নিতে দেখা যেতে পারেতিনি বলেন, ‘আমাদের বোধ হয় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করাটা সমীচীন হবে না


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ