বাঙালির ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব | সময় বিচিত্রা
বাঙালির ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব
মাহবুব মাসুম
4

নবান্ন উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিঅগ্রহায়ণের শুরুতেই এপার বাংলা ও ওপার বাংলাতে চলে উৎসবের নানা আয়োজননতুন ধান কাটা আর সেই ধানের প্রথম অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নবান্ন উৎসববাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণএ যেন সত্যি হৃদয়ে বন্ধনকে আরও গাঢ় করার উৎসবহেমন্ত এলেই দিগন্তজোড়া প্রকৃতি ছেয়ে যায় হলুদ-সবুজ রঙেএই শোভা দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভাসতে থাকেকারণ, কৃষকের ঘর ভরে উঠবে গোলা ভরা ধানেবছর ঘুরে আবার এসেছে অগ্রহায়ণবাঙালির প্রধান কৃষিজ ফল কাটার ক্ষণস্মরণাতীত কাল থেকে বাঙালির জীবনে পয়লা অগ্রহায়ণকে বলা হয়ে থাকে বাৎসরিক সুদিনএদিনকে বলা হয় নবান্ননবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণনতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ হরেক রকমের খাবার; বাড়ির আঙিনা নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে

সোনালি ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালি সংস্কৃতির বিশেষ অংশ নবান্নকে প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধরা পড়েছে দারুণভাবেতিনি লিখেছেন, ‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল/ তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল,/ প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে/ পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাড়ারের দেশেপুনর্বার ফিরে আসার আকুতি ধ্বনিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়, ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশেপ্রকৃতির বিচিত্র এ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এ দেশের সব কবি-সাহিত্যিককুয়াশায় আচ্ছন্ন চারদিক আর কৃষকের গোলায় উঠছে পাকা ধানচিরায়ত বাংলার চিরচেনা রূপ এটিকৃষকের মাঠে এখন সোনারঙা ধানের ছড়াছড়িসারা দেশেই আমন ধান কাটার উৎসব শুরু হয়ে গেছেকৃষক রাশি রাশি ভারা ভারা সোনার ধান কেটে নিয়ে আসে ঘরেধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয় বাড়ির আঙিনাঅবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় নাতার পরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে মুখে দেওয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশেতৈরি হবে নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর-পায়েসকৃষক-কৃষাণীরা নবান্নের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নবান্নে বাড়ির জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়মেয়েকেও বাপের বাড়িতে নাইয়রআনা হয়নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাইতাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র ধ্বনিত হয়, ‘আজ নতুন ধানে হবে রে নবান্ন সবার ঘরে ঘরে…নতুন ধানের ভাত মুখে দেওয়ার আগে মিলাদ পড়ানো হয়মসজিদে শিন্নি দেওয়ার রেওয়াজও আছেহিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষকের ঘরে পূজার আয়োজনও চলে

নবান্নের শাব্দিক অর্থের দিকে আমার যাওয়ার ইচ্ছে নেইতার পরও এক কথায় বলতে পারি, ‘নবান্নশব্দের অর্থ নতুন অন্ননবান্ন ঋতুকেন্দ্রিক একটি উৎসবহেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়এই উৎসব পালিত হয় অগ্রহায়ণ মাসেঅগ্র অর্থ প্রথমআর হায়ণঅর্থ মাসএ থেকে সহজেই ধারণা করা হয়, একসময় অগ্রহায়ণ মাসই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাসহাজার বছরের পুরোনো এই উৎসব সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক, সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম মাটির সঙ্গে চিরবন্ধনযুক্ত

নবান্নের প্রাণ গ্রামীণ মেলা

নবান্ন উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন হলো মেলাহরেক রকমের দোকান নিয়ে বসে গ্রামীণ মেলাতবে গ্রামীণ মেলা এখন আর শুধু গ্রামেই হয় না; শহরেও ব্যাপকভাবে আয়োজিত হয়এই মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, মন্ডা-মিঠাই, খেলনা-পুতুল, মাটির জিনিসপত্র আর বসে বাউল গানের আসরনবান্ন উৎসবকে ঘিরে গ্রাম-গঞ্জে সব শ্রেণীর মানুষের ঢল নামেনাচ আর গানে মুখরিত হয় মেলাপ্রাঙ্গণপ্রকৃতি আর পরিবেশের মধ্যে আত্মহারা হয়ে ওঠে বাঙালিমানস

নগরেও নবান্ন উৎসব

এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবেএই স্লোগান সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও নগরে নবান্ন উৎসব পালিত হয়েছেএই সময়ে কৃষকের ঘরে নতুন ফসল আসে, সোনালি ফসলে ভরে ওঠে কৃষকের গোলাঘরে থাকে খুশির আমেজ, আর সেই খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটে নবান্ন উৎসবের মাধ্যমেরাজধানীর শাহবাগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ও বকুলতলায় প্রতিবছর নবান্ন উৎসব উদ্যাপিত হলেও এ বছর কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় এবার রমনার বটমূলে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়উৎসবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বাউলগান, আদিবাসীদের পরিবেশনা ও নবান্নকথনএ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী নানা রকম পিঠা প্রদর্শনী সকাল থেকে বিরতিহীনভাবে চলবেউৎসবে প্রায় ৩৫টি সংগঠনের প্রায় ৩০০ শিল্পীসহ প্রায় চার শতাধিক শিল্পী সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন

বলতে গেলে অগ্রহায়ণের প্রথম সকালে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে রাজধানীবাসীনানা শিল্পীদের কণ্ঠে আনন্দে মাতিয়ে তুলেছিল রমনা বটমূলআবহমান কাল থেকে নবান্নের এ শুভক্ষণে উৎসব-আনন্দে পূজা-পার্বণে মেতে ওঠে বাঙালিশিল্পায়ন ও নগরায়ণের কশাঘাতে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার আনন্দময় সরল জীবনএর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের ওপর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রবল প্রভাবতবু নাগরিক জীবনে নবান্নের শুভক্ষণের শুভ ছায়া ছড়িয়ে দিতে অগ্রহায়ণের প্রথম দিনে আয়োজন করা হয়েছিল নবান্ন উৎসবেরহেমন্তের মিষ্টি রোদ যখন চারদিক নিজের আলোর রোশনাই ছড়িয়ে দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় রমনা উদ্যানের বিশাল অশ্বত্থগাছের নিচ থেকে, যা রমনা বটমূল বলেই বেশি পরিচিত, সেখান থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুমধুর সুরউৎসবের উদ্বোধন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানউৎসব উদ্বোধন করে বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গ্রামে যে নবান্ন উৎসব করা হয়, সেটাই প্রধান ও আসল নবান্ন উৎসবযেখানে আমরা নতুন ধানকে স্পর্শ করতে পারিখেতে পারি নানা রকম মুখরোচক পিঠাসে হিসেবে শহুরে জীবনে যে নবান্ন উৎসব করা হয়, সেটা তো প্রতীকীআমরা যাতে আমাদের উৎসকে ভুলে না যাই সে জন্যই এ আয়োজন

বাঁশির সুরমূর্ছনা শেষ হতে না হতেই মঞ্চ মাতায়  ধ্রব শিশু-কিশোর সংগঠনখুদে কণ্ঠে এক সুরে গেয়ে ওঠে, ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লীজননীগানের পরিবেশনা শেষ হতেই আসে কবিতার পালাকবিতা শেষে এবার নাচের পালাকান্নাহাসির দোল-দোলানো পৌষ ফাগুনের পালাগানের সঙ্গে নূপুরের ঝংকার তোলেন নৃত্যশ্রীর শিল্পীরানাচ শেষে আবারো গানের পালাবহ্নিশিখার শিল্পীরা গেয়ে শোনায়, ‘নাও ছাইড়া দে রে মাঝি/ পাল উড়াইয়া দেএ গান শেষে পরিবেশিত হয় নজরুলের নানা গানএ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় মেতে ওঠে গোটা রমনা বটমূল প্রাঙ্গণএরপর বের করা হয় নবান্ন শোভাযাত্রারমনা বটমূল থেকে বের হয়ে রমনার পাশের রাস্তা ধরে কিছুটা পথ ঘুরে আবার বটমূলেই শেষ হয়এরপর বিকালে উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে ঢাকঢোল, বাউলগান, লাঠিখেলা, নৃত্য ও সংগীতের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় শহরের নবান্ন উৎসবএদিকে, উৎসব উপলক্ষে গোটা বটমূল ও এর সংলগ্ন এলাকাকে সাজানো হয় গ্রামীণ আদলেসেখানে ছিল বাঙালিয়ানারও ছাপছেলেদের পরনে ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবিমেয়েদের পরনে এক প্যাঁচে পরা একরঙা বা চেকের তাঁতের শাড়িউৎসবে দিনভর ছিল নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়সব শ্রেণী-পেশার মানুষের এই মিলনমেলায় এসেছিলেন ভিনদেশিরাওসব মিলিয়ে তাই অনন্য সাধারণ একটি দিনএ অসাধারণ দিনকে আরও অসাধারণ করতে আগত সবাই নিই নব অঙ্গীকার, ‘একটি শান্তিময় দেশ গড়ার


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ