ভোটের দাম ৮ টাকা লাশের দাম কত? | সময় বিচিত্রা
ভোটের দাম ৮ টাকা লাশের দাম কত?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী
42

নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছেহরতালের পর হরতাল, অবরোধের পর অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত, অর্থনীতির গ্রাফ শূন্যের কোটায়প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোটের ডাকা প্রথম ও দ্বিতীয় দফার অবরোধে কমপক্ষে ২৫-৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে১৮-দলীয় জোটের প্রথম দফার অবরোধের শেষ দিনে শাহবাগের সামনে যাত্রীসমেত বাসে পেট্রল বোমা মেরে ১৯ জন নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা প্রমাণ করে প্রধান দুটি জোটের কাছে এ দেশের নিরীহ মানুষ কতটা জিম্মিঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন এই ১৯ জন নিরীহ মানুষ, যাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে আইনজীবী, সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষ রয়েছে, তারা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা বড় একটি জ্বলন্ত উদাহরণএ দেশের সাধারণ মানুষ সারা দিন খাটাখাটুনি করে, ক্লান্তিসমেত বাড়ি ফেরার চেষ্টায় যখন তারা উন্মুখ তখন তাদেরই ভোটে যারা মসনদে বসে এসি রুমে-গাড়িতে চড়ে বেড়ায় তাদের জেদের আর প্রতিহিংসার রাজনীতির বলি হয়কী অপরাধ ছিল ওই বাসযাত্রীদের? কী অপরাধ ছিল গত সাড়ে নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত সাড়ে তিনশ মানুষের?

 

বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের সর্বোচ্চ রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় বলে গণতন্ত্র এখনো সর্বাধিক স্বীকৃত শাসনব্যবস্থাএ গণতন্ত্রের মুখ্য শর্ত হলো, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের উন্নতি নিশ্চিত করাকিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্র মানে ক্লাস সেভেন-এইটের গণিত বইয়ে পড়া ঐকিক নিয়মের সেই বানরের বাঁশের গল্পের মতোআমরা গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে প্রতিবার ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করি, তিন কি চার বছর আপাত ভালো কাটেতারপর শুরু হয় অধঃপতনস্বাধীনতার পর থেকে গত ৪২ বছরে আমরা কখনোই দেখিনি লাশের রাজনীতি ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর হতে, কখনোই দেখিনি মা-বোনের বুক খালি হওয়া ছাড়া ক্ষমতার মসনদ পাল্টাতেকিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা গোল্ডফিশের মতো তাড়াতাড়ি সবকিছু ভুলে যায়, শিক্ষা নিই না অতীত থেকে১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে বারবারআমাদের দেশে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা সব সময় ভাবেন, ক্ষমতায় তারা চিরদিনের জন্য এসেছেন, বিরোধী দলে যারা থাকেন, তারা ভাবেন, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে হবেএ দুইয়ের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হালি-ডজন-শত-হাজার যে হারেই প্রাণ যাক না কেন, তাতে রাজনীতিবিদদের কিছু যায় আসে না

 

চরম নৃশংসতার ঝুঁকির মধ্যে প্রতিনিয়ত কাটাতে হচ্ছে এ দেশের মানুষকেদুদলের জেদ এতটাই বেশি যে সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী কিংবা বিদেশি রাষ্ট্র ও দাতাগোষ্ঠীদের সকল উদ্যোগ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছেঅবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ দেশে নাগরিক ও নাগরিক অধিকার তো দূরের কথা, জনগণ বলেও কিছু নেইআছে শুধু ভোটার, যারা হয় বোমা কিংবা ককটেলের আঘাতে মরবে, না হয় নৃশংসতা সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারলে ভোটের দিন মহা উৎসবে গিয়ে ভোট দিয়ে নেতা-নেত্রী নির্বাচন করবে, তারাই আবার কয়েক বছর পর সেই ভোটারদেরই মারবে

 

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোট গত এক বছর ধরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেনানা মহল থেকে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার পর কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছিলসবশেষ দুই দলের মহাসচিবের একান্ত গোপন বৈঠকে শান্তির একটা সুবাতাস পাওয়া গিয়েছিলকিন্তু নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার অজুহাতে তফসিল ঘোষণার পর সেটা মিইয়ে গেছেএকটা দেশের জাতীয় নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল ও জোটকে বাইরে রেখে করলে তা যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না তা বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশন না বোঝার কথা নয়উপরন্তু বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে না দেওয়া, রাতের আঁধারে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অফিস থেকে গ্রেপ্তার করা, দলীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলার পর মামলা দায়ের করা কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে নাবেশির ভাগ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এমন দলগুলোর নেতাদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে যেনতেনভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অভিপ্রায়টা পরিষ্কার হয়ে ওঠেনির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীদের শুধু রুটিনকর্ম করার কথা থাকলেও ইতিমধ্যে নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছেফলে, তাদের অধীনে অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে

 

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দলও বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রাণহানির দায় এড়াতে পারে নাকারণ, বিরোধী দলের খুব কম কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছেসরকার ও বিরোধী দল আলোচনা ও সমঝোতার পথে না গিয়ে একগুঁয়ে আর জেদাজেদির রাজনীতিতে লিপ্ত থাকায় নাভিশ্বাস উঠছে দেশের সাধারণ মানুষেরএ দায় দুই পক্ষের, দুই দলের আর দুই জোটের

 

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হওয়ার কথা আছেতার আগে কমিশন নির্ধারণ করেছে, এবার প্রতি ভোটারের জন্য একজন প্রার্থী আট টাকা খরচ করতে পারবেকিন্তু দেশজুড়ে যে হারে মানুষ পুড়িয়ে, পিটিয়ে মারা হচ্ছে তাতে প্রতি ভোটারের আরও কম দাম নির্ধারণ করলেই পারত নির্বাচন কমিশনদেশজুড়ে যে ভীতিকর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি তাতে শুধু দেশের মানুষই নয়, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেইতিমধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দুই-দুইবার সমঝোতায় পৌঁছার জন্য দুই নেত্রীকে বার্তা পাঠিয়েছেনইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে কি না তা নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়েছেএ দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহল কোনোভাবেই আরেকটি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন চায় নাতাই সময় আর শেষ হতে না দিয়ে সমঝোতার উদ্যোগ নিতে হবে

একদিকে প্রতিদিনই মানুষ মরছে, অন্যদিকে সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছেএভাবে দ্রুত সময় শেষ হয়ে গেলে যদি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে সেটি কী ভয়ংকর পরিস্থিতি টেনে আনবে তা রাজনীতিবিদদের চেয়ে ভালো আর কারও জানার কথা নয়সমঝোতার নামে এখনো সুযোগ আছে, সমঝোতা হলে পুনরায় তফসিল সম্ভব-এমন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কথাবার্তা বাদ দিয়ে সত্যিকার অর্থে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবেকারণ, জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করলে তা যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তা যে দীর্ঘ মেয়াদে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য খারাপ হবে, এটি আওয়ামী লীগের বোদ্ধা রাজনৈতিক নেতাদের না বোঝার কথা নয়অন্যদিকে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নির্বাচনের বাইরে থাকলে দলীয় ঐক্য ও ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যে বড় মাশুল দিতে হবে তা বিএনপি এবং ১৮-দলীয় জোটেরও জানার কথাসে জন্য দুপক্ষকেই সমঝোতায় পৌঁছতে হবেএর জন্য দরকার নিজেকে ক্ষমতার বাইরে দেখতে পারার মতো মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসাছাড় দেওয়ার মানসিকতা অর্থ পরাজয় মেনে নেওয়া নয়, বরং রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম কৌশলএ কৌশল প্রয়োগ না করলে যে আলামত দেখা যাচ্ছে তা জাতির ও দেশের জন্য গভীর অমঙ্গল ডেকে আনবে 

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ