রাজনীতির থুতুবাবা | সময় বিচিত্রা
রাজনীতির থুতুবাবা
সিরাজুল ইসলাম
23

স্বৈরাচার, বিশ্ববেহায়া, জাতীয় বেইমান, থুতুবাবা এসব বিশেষণ যে রাজনীতিকের নামের সাথে জায়গা করে নিয়েছে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদক্ষণে ক্ষণে নিজের রং পাল্টিয়ে সব সময়ই জায়গা করে নিয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেরাজনীতিতে ষোলো কলা পূর্ণ ছাড়াও বহু নারীর সর্বনাশ করেছেন স্বঘোষিত এই বিশ্বপ্রেমিকবেশির ভাগ মানুষই তার কথা আর কাজের সাথে খুব একটা মিল খোঁজার চেষ্টাও করেন না

এরশাদ আচমকা ঘোষণা দিলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) অংশগ্রহণ করবে না৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বনানীতে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আনপ্রেডিকটেবল হিসেবে পরিচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদঘোষণা দেন যেহেতু সব দল নির্বাচনে যাচ্ছে না তাই তিনিও যাবেন না

জাতীয় পার্টির যেসব সদস্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এরশাদ বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিয়েছি আমাদের কর্মীদের ও প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র তুলে নেওয়ার জন্যনির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এরশাদ বলেন, ‘আমি নির্বাচন করব নাতিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন আমি সকালে এক কথা বলি, বিকেলে এক কথা বলিকিন্তু কেন বলি আপনাদের সেটা বুঝতে হবেআমাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছেমুক্ত পরিবেশ নয়, শৃঙ্খলবন্দী হয়ে রাজনীতি করছি আমি

সাংবাদিকদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে এরশাদ বলেন, ‘আমি না থাকলে আমার দল থাকবে নাতাই আমাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছেপ্লিজ, তোমরা আমাকে নিয়ে বিদ্রপ করো নাআমি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে চাইআমি আর শৃঙ্খলিত থাকতে চাই না

এরশাদ বলেন, ‘মনে অনেক দুঃখ নিয়ে চলছিআট বছর সেনাপ্রধান ছিলেনকিন্তু গত ২০ বছর সেনানিবাসে যেতে পারেননিতিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী সর্বক্ষেত্রে উন্নতি করলেও আমি এখন আর সেনানিবাসে যেতে পারি নাসেখানে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে পারি না

সাবেক এই রাষ্ট্রপতি জানান, তার রাজনৈতিক জীবন হুমকির মুখেনিজেকে একজন শৃঙ্খলিত রাজনীতিবিদ দাবি করে এরশাদ বলেন, ‘আমি মুক্ত হতে চাই, মুক্তভাবে রাজনীতি করতে চাইআমার বিরুদ্ধে ৭৪টি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দেওয়া হয়েছেএমনকি ক্ষমতা ছাড়ার ১৪ বছর পরও আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে

এর আগে বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন, শেষ বয়সে জনমতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে চান না তিনিযদি এ কাজ করেন, মানুষ তার মুখে থুতু দেবেজাতির বিশ্বাসঘাতক কিংবা দালাল অপবাদের কালি লাগাতে চান না তিনিপ্রয়োজনে জেলে যাবেন, তার পরও অংশ নেবেন না পাতানো নির্বাচনেএমনসব বক্তব্যের পর সপ্তাহ না ঘুরতেই ডিগবাজি দিয়েছিলেন সাবেক এই সেনাশাসকএ নিয়ে দলীয় নেতাদের বেশ চাপের মুখে ছিলেন এরশাদপ্রেসিডিয়াম সদস্যসহ পদত্যাগ করেন অনেক নেতাচলে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনা

 

এরশাদের রাজনীতির উত্থান

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এরশাদকে১৯৮১ সালে বিপথগামী কিছু সেনাসদস্য হত্যা করে জিয়াউর রহমানকেজিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে জোর করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেনসে সময় সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেন এরশাদ১৯৮৪ সালে ১৮ দফা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন পরিষদ তৈরি করেনওই বছরই সিনিয়র রাজনীতিকদের নিয়ে গঠন করেন জনদলকিছুদিন পর জনদল পরিবর্তন করে তৈরি করেন জাতীয় পার্টি১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়বিরোধী দল হয় আওয়ামী লীগ৮৮ সালে ওই সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও নির্বাচন দেন এরশাদসে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে৯ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন বাংলাদেশে ইতিহাসের কলঙ্কিত এই রাষ্ট্রনায়ক১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপিদুর্নীতিসহ কয়েকটি মামলায় জেলে ঠিকানা হয় এরশাদের

 

 

 

এরশাদ শত বছরের বিশ্বাসঘাতক

কাজী জাফর

 

এরশাদ শত বছরের বিশ্বাসঘাতকতার রেকর্ড ভঙ্গ করেছেনআমি একশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদের মতো বিশ্বাসঘাতক নেতা দেখিনিনিজের দলীয় প্রধানকে এভাবেই তুনাধুনা করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ

গত ২৭ নভেম্বর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, ‘আমি আর এরশাদের জাতীয় পার্টিতে নেইসত্যিকারের জাতীয় পার্টিতে আছিএরশাদের মতো এত ডিগবাজি দেওয়া লোক পৃথিবীতে নেইআর আমি একশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদের মতো বিশ্বাসঘাতক নেতা দেখিনিএরশাদ রাতারাতি থুতু ফেলে আবার সেই থুতু চেটে তুলবেন-এটা আমার কল্পনাতেও ছিল নাএরশাদ বলেছিলেন, আমি দালাল হয়ে মরতে চাই না, একদলীয় নির্বাচনে গেলে জনগণ আমাকের থুতু দেবেএই সরকারের অধীনে নির্বাচনে কেন, বেহেশতেও যেতে চাই নাকারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে যাব; কিন্তু একদলীয় নির্বাচনে যাব নাএরশাদ তার কথা রাখেননিউল্টো সাতজন মন্ত্রী নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিলেন এরশাদগত ১০০ বছরের ইতিহাসে বিশ্বাসভঙ্গের এমন নজির আমি দেখিনিবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী জাফর বলেন, ‘এরশাদ বলেছেন, জাতীয় পার্টিতে কাজী জাফর কোনো ম্যাটার নাআমি তাকে (এরশাদ) বলতে চাই, আমিই জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাএটাই চিরন্তন সত্য১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি আমার নেতৃত্বাধীন জনদল, ইউপিপি, ডেমোক্রেটিক লীগ (শাহ মোয়াজ্জেম), সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদের ডেমোক্রেটিক পার্টি, বিএনপির শামছুল হুদা এবং এম এ মতিন ও আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান চৌধুরী মিলে প্রথমে জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করিপরে এই ফ্রন্ট জাতীয় পার্টিতে রূপ নেয়বাংলাদেশের প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতা বলেন, ‘যখন আমরা পার্টি গঠন করি তখন এরশাদ ছিলেন প্রধান সামরিক প্রশাসককাজী জাফর আহমদ বলেন, ‘আমার কৈশোর ও তারুণ্য কেটেছে প্রগতিশীল রাজনীতি করেজনগণের কাছে আমরা যে ওয়াদা করি, তা রাখার চেষ্টা করিআর কিছু ত্রুটি থাকলেও তার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইকিন্তু এরশাদ জাতির উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছেন

 

পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার

দুই নেতার পাল্টাপাল্টি এমন অবস্থায় ২৮ নভেম্বর কাজী জাফরকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন এরশাদওইদিন কাজী জাফরও এরশাদকে পাল্টা বহিষ্কার করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেনকাজী জাফর জানান, শিগগিরই দলের বিশেষ কাউন্সিল ডেকে দলের চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হবেদুই নেতার এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে সাবেক সেনাশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি

এরশাদকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে কাজী জাফর বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি সকল দলীয় কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছেবিবৃতিতে বলা হয়, জাপার গঠনতন্ত্রের ৩৭ ধারা অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে এরশাদকে অপসারণ অবিলম্বে জাতীয় কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশনে গৃহীত হবেআর কাজী জাফর আহমদকে চেয়ারম্যান ও গোলাম মসিহকে মহাসচিব করে জাতীয় পার্টির নতুন কমিটি ঘোষণা করেন কাজী জাফর


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ