অনিশ্চিত গন্তব্যে নির্বাচনী ট্রেন: বিএনএফকে নিবন্ধন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ইসি | সময় বিচিত্রা
অনিশ্চিত গন্তব্যে নির্বাচনী ট্রেন: বিএনএফকে নিবন্ধন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ইসি
মাহবুব মাসুম
21

সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে হঠাৎ ২৫ নভেম্বর নির্বাচনী ট্রেনের বাঁশি বাজালেন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। চরম অনিশ্চয়তা-সংঘাতের মধ্যেই যাত্রা শুরু করল নির্বাচনী ট্রেন। তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করা নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। তারা বর্তমান ইসিকে সরকারের অংশ অভিহিত করে এদের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি এ নির্বাচনকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই চলছে টানা হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি। বারোটা বেজে গেছে দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার। নিরাপদে রাস্তায় বের হতে পারছে না সাধারণ মানুষ। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মতে, গণতন্ত্রের নামে দুই পরিবারের ক্ষমতার লড়ায়ে পিষ্ট দেশের ১৬ কোটি জনগণ। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনীতি-বিশ্লেষকেরা বলছেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। দুই দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে দেশের ভবিষ্যৎ।

 

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান-প্রণেতা ড. কামাল হোসেন মনে করেন, জাতির সংকটকালে রাষ্ট্রপতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী তিনিই দল-মতের ঊর্ধ্বে জাতির অভিভাবক। সংকটকালে তাই তিনি নৈতিকতার দায় থেকে শক্ত হাতে হাল ধরবেন, কার্যকর উদ্যোগ নেবেন, এটা দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দিক দিয়ে খুবই অভিজ্ঞ, সংবিধানও তিনি খুব ভালো বোঝেন। তিনি খুব ভালো করে জানেন, সংকট কেন, কোথায়, এর সমাধান কোন পথে। তিনি বিরোধী দলের কথা শুনেছেন, সরকারি দলের কথা শুনবেন। প্রয়োজনে অন্যান্য দলের কথা শুনবেন; বিশিষ্টজন, বিশেষজ্ঞদের কথা শুনবেন। সবার সঙ্গে আলাপের মধ্য দিয়ে নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানের পথ বের হয়ে আসবে। সংবিধানে লিখিত ক্ষমতার বাইরে অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির নৈতিক দায় ও কর্তৃত্ব দুটোই আছে। তিনি একটা সমাধান দিলে তা কেউ অগ্রাহ্য করবে বলে মনে হয় না। এ কারণে তার উদ্যোগ নেওয়াটা খুব জরুরি।

 

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, এভাবে কোনো সভ্য রাষ্ট্র চলতে পারে না। জনগণ ক্ষমতার এ নোংরা রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। তিনি বলেন, নষ্ট রাজনীতির নামে এসবের শেষ চাই। আজই, এখনই। দু’দলকে দ্রুত আলোচনায় বসে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশীদারিমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

 

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের মতও একই রকম। তিনি বলেন, নৈতিক দিক থেকে, নৈতিক দায় থেকে রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করতে পারেন এবং সংকট নিরসনে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

 

নির্বাচনের ভোট গ্রহণের তারিখ আগামী ৫ জানুয়ারি রেখে তফসিল ঘোষণার সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি বলেছেন, ‘আশা করি, জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসবে এবং একটা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সকলের অংশ গ্রহণে একটা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ তাদের রায়ের প্রতিফলন দেখতে পাবে। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলের কাছে বারবার অনুরোধ জানিয়েছি, তারা যেন জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশে শান্তি বজায় রাখতে একটা সমঝোতায় আসেন। গত ১৯ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করেও আমরা তাকে অনুরোধ জানাই তিনি যেন ব্যক্তিগত বিশেষ উদ্যোগ নেন এই অসহনীয় অচলাবস্থা দূরীকরণে। আমরা এখনো আশা রাখি, জনগণের এ প্রত্যাশা উপেক্ষা করবেন না কেউই। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। আমরা সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নিয়েছি। সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যেই নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’

 

এ পর্যন্ত ঘোষিত ইসির যত নির্বাচন :

 

বাংলাদেশে প্রথম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যথাক্রমে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সালের ৭ মে, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর এবং ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮। আর সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নবম সংসদ নির্বাচনের জন্য এম এ আজিজ কমিশন পাঁচবার তফসিল করে। এ টি এম শামসুল হুদার কমিশনও তিনবার তফসিল ঘোষণা করায় মনোনয়ন দাখিলের সময় বাড়ে প্রার্থীদের। সমঝোতা হলে এবারও পুনরায় তফসিল করার সুযোগ ইসির রয়েছে। তবে তা দ্রুততর সময়ের মধ্যে হতে হবে।

 

বিএনএফকে নিবন্ধন দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ইসি

 

অনেক লুকোচুরি করে অবৈধ প্রক্রিয়ায় অবশেষে বিতর্কিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টকে (বিএনএফ) নিবন্ধন দিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশেষ উদ্দেশ্যে সরকারের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে এ দলটির নিবন্ধন-প্রক্রিয়া গত ১৮ নভেম্বর শেষ করল কমিশন। কমিশন স্বয়ং অস্তিত্ববিহীন এ দলটিকে নিবন্ধন দিতে মরিয়া হয়ে কাজ করেছে সাংবিধানিক এ সংস্থাটি। মাঠপর্যায়ের নেগেটিভ রিপোর্টকে রাতের আঁধারেই পজেটিভ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, যে সকল ইসি কর্মকর্তা দলটির অস্তিত্ব সম্পর্কে নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছেন, তাদেরকে উল্টো হুমকি-ধামকিও দিয়েছে ইসি। বিএনএফকে নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে এর আগে এভাবে কোনো দলকে কমিশন কখনো নিবন্ধন দেয়নি। বিএনএফের নিবন্ধন-প্রক্রিয়া শেষ করে এর সপ্তাহ খানেক পরই প্রধান বিরোধী দলের সাথে কোনো রকম সমঝোতা ছাড়াই নির্বাচনী ট্রেনের বাঁশি বাজান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই অশান্ত হয়ে উঠেছে সারা দেশ। সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

বিএনএফের নিবন্ধন নিয়ে গোড়া থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ক্ষমতাসীন দলের যে কট্টর অংশটি বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে চায়, তারাই এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিএনএফকে নিবন্ধন না দিতে তিন দফা বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনারের কাছে আপত্তি দেওয়া হয়েছিল। তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি ইসি। বিএনপির অভিযোগ ছিল, সরকার গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে বিএনপিকে ভাঙতে বিএনএফকে দাঁড় করাচ্ছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বিএনএফের পোস্টারে বিএনপির প্রতীক ও দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানে ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিএনপির কোনো অভিযোগই আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন। মাঠপর্যায়ে কোনো অফিস না থাকলেও নামসর্বস্ব দলটিকে নিবন্ধন দেয় কমিশন। উপরন্তু বিএনএফ যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী শর্তাবলি পূরণ করেনি, তা গণমাধ্যম-কর্মীদের অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে। কোনো সংগঠনকে নিবন্ধিত হতে হলে কমপক্ষে ২২ জেলা ও ১০০ উপজেলা/মেট্রোপলিটনে দলের কমিটি ও অফিস থাকতে হবে। প্রতিটি কমিটিতে ২০০ জন করে ভোটার সদস্য থাকতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কার্যালয় তো দূরের কথা অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বিএনএফ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলটি দাবি করেছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিএনএফের প্রতি ভালোবাসা দেখালে কিছু করার নেই। আবার নিবন্ধন পেয়ে বলেছে, তারা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অনেকেই তাদের সঙ্গে আছে। সময় হলে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে। এ থেকেও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে সন্দেহ করা চলে। বিএনএফের নিবন্ধনের ফলে ইসির প্রতি জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। ইসি পুনর্গঠনে বিএনপির দাবি এখন আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আরও প্রমাণিত হলো, ইসি আসলে স্বাধীন নয়।

 

এদিকে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন পাওয়ার পর গত ২৩ নভেম্বর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই পদ-পদবি নিয়ে হাতাহাতি ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটিয়েছে আলোচিত দল বিএনএফ। তাৎক্ষণিকভাবে দলের কো-কনভেনর মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিসকে বাহিষ্কার ও বিদ্রোহী গ্রুপকে সংবাদ সম্মেলনের স্থান থেকে বিতাড়িত করা হয়।

 

এরপরই বিএনএফের প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, বিএনএফ ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। তিনি দাবি করেন, বিএনএফের কাছে চমক আছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অনেকে বিএনএফের সঙ্গে আছেন। সময় হলে নাম প্রকাশ করবেন। বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষের আদলে প্রথমে ‘গমের শীষ’, পরে ‘ধানগাছ’ প্রতীক চেয়ে কয়েক মাস আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে বিএনএফ। পরে অবশ্য দলটিকে টেলিভিশন প্রতীক দেওয়া হয়। বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেন, বিএনপিকে ভাঙার লক্ষ্যে সরকার গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বিএনএফ নামের একটি দলকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বিএনএফের পোস্টারে বিএনপির প্রতীক, জিয়াউর রহমানের ছবি ও তাঁর ১৯ দফা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বিএনপির এই অভিযোগ আমলে নেয়নি; বরং নিবন্ধিত করতে বিএনএফকে তিন দফায় আইন লঙ্ঘন করে সুযোগ দেওয়া হয়।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ